• সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

অন্ধকার যুগ পেরিয়ে যেন এক নতুন অন্ধকারে

সম্পাদকীয়

আজ থেকে দুই দশক আগের সময়টা ছিল দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক 'অন্ধকার যুগ'৷ ভয়ানক ঘুটঘুটে সে অন্ধকারটি হলো নকলের অন্ধকার। পরীক্ষায় নকলের প্রবণতা এমনই ভয়াবহ ছিল যে সময় পরীক্ষায় প্রশ্ন আসতো— পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন না করার উপদেশ দিয়ে ছোট ভাইকে একটি পত্র লেখ। একটি দেশের পাঠ্যবইতে এগুলোর অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনের চাইতে করুণ পরিস্থিতি আর কিছু কি হতে পারে? এমন একটা সময়, যখন বোর্ড পরীক্ষাগুলো চলাকালে পরীক্ষাকেন্দ্রের আশপাশে পুলিশের পাহারা বসানো হতো কেবল বাইরে থেকে যারা জানালা দিয়ে নকল ছুড়বে, তাদের আটক করার জন্য। নকলের সে মহাসমারোহের মহোৎসবের লজ্জাজনক অন্ধকার সময়টা আমরা পেরিয়ে এসেছি বহু বছর হলো।

এখন আর এ দেশের কোনো পরীক্ষার্থী নকলের কথা ভাবে না। গল্পটি এখানেই শেষ হলে ভালো হতো। কিন্তু তা হয়নি। কেননা নকলের চাইতেও অদ্ভুতুড়ে ও অবিশ্বাস্য এক রোগে পেয়ে গেল আমাদের ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের। এ রোগের নাম 'প্রশ্ন ফাঁস'। প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টা যে এই গত কয়েক বছরের আবিষ্কার— তা অবশ্য নয়। আমাদের এ ইতিহাসও পুরোনো। তবে সেটা বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার কিছু জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় ফণির মতো হঠাৎ কোত্থেকে একটা ঝড় এসে আছড়ে পড়ল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। বিশেষত ২০১৪ সালের দিকে প্রশ্নফাঁসের ব্যাপারটি এমনভাবে 'ওপেন সিক্রেট' হয়ে উঠতে থাকল যেন স্লো পয়জনের মতো ধীরে ধীরে শিক্ষাব্যবস্থার পুরো শরীরটাকেই যেন গ্রাস করে নেবার উপক্রম হলো। কিন্তু যখন এ বিষের প্রভাব প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল, তখন বোঝা যায়নি যে এটা কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। 

এইচএসসি ও এসএসসির প্রশ্নপত্র নিয়ম করে ফাঁস হওয়া শুরু করল, আমরা চোখ বন্ধ করে রেখে না দেখার ভান করে বসে থাকলাম। সর্বপ্রথম এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের টনক নড়ল যখন ২০১৫ সালের মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে সারা দেশে আন্দোলন শুরু হলো। কিন্তু, সেসবও ছিল ক্ষণকালস্থায়ী৷ কেননা 'গোল্ডফিশ মেমোরি'র এই আমরা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ইস্যুই বেশিকাল স্মৃতিতে ধরে রাখতে পারি না। ফলস্বরূপ অষ্টম শ্রেণির সমাপনী হয়ে প্রশ্নফাঁসের বিষ ঢুকে পড়ল পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার মধ্যে পর্যন্ত।

দীর্ঘকাল ধরে একের পর এক প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় পুরো ব্যাপারটা আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেল। মানে, আমরা নকলের কড়াই থেকে লাফ দিয়ে প্রশ্নফাঁসের চুলোয় এসে পড়লাম। এমন একটা সময়ে এসে আমরা উন্নীত বা অবনত হলাম, যখন আর কড়া রোদে পুলিশের লাঠির ঝুঁকি নিয়ে নকল ছোড়ার কোনো ঝামেলা থাকলো না; পরীক্ষার আগের রাতেই যুগোপযোগী পন্থায় সকল প্রকার 'নকল' কার্যক্রম সুসম্পন্ন করে রাখার ব্যবস্থা তৈরি হলো।

তৃতীয় শ্রেণির স্কুল ভর্তিপরীক্ষা থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থায় প্রত্যেকটি স্তরেই যখন প্রশ্নফাঁসের মহড়া চলে, তখন সেখানে শিক্ষার কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না৷ এমনিতেই আমাদের শিক্ষার মান নিয়ে অবর্ণনীয় প্রশ্ন রয়েছে; শিক্ষা, গবেষণা, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকের মান— এ সকল দিকের নিম্নমান নিয়ে যখন আমাদের হিমশিম খেতে হয়, এমন একটা সমকালে প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্য কতটা ভয়ানক, সেটা বুঝতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি— এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়৷ শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক— কোনো পর্যায়েই এ সমস্যাটি নিয়ে যথেষ্ট পরিমাণ উদ্বিগ্নতা পরিলক্ষিত না হওয়াটা আরও বেশি উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে দিনকে দিন।

শিক্ষামন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকল পর্যায় হতে যদিও সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালানো হচ্ছে, কিন্তু সে চেষ্টা কতটা আন্তরিক এবং সময়োপযোগী, সেটা একটা বড় প্রশ্ন৷ গত শুক্রবার সর্বশেষ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনা সে প্রশ্নকে আরও মজবুত করে তুলেছে। কেননা গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও প্রশ্নপত্র ছাপা হয়েছে পরীক্ষার কেন্দ্রে। এ বছর একটি প্রশ্নপত্র করা হলেও বিন্যাস পরিবর্তন করে সেট করা হয়েছে ৮টি। এ প্রশ্নপত্র এনক্রিপ্ট ফরমেটে দুই ভাগে একটি ডিসি এবং আরেকটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়। পরে দু’জনে একত্র হয়ে বিশেষ পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে ডাউনলোড করে বৃহস্পতিবার রাতে সে প্রশ্ন ছাপানোর ব্যবস্থা নেন। এত বড় একটি প্রক্রিয়া সত্ত্বেও যখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে— সর্ষের মধ্যেই ভূত নেই তো? 'বেড়ায় ধান খাওয়া' বলে একটি গ্রাম্য প্রবাদ আছে৷ আমাদের ধান বেড়ায় খাচ্ছে না তো? ভাবতে হবে, গভীরে গিয়ে সমস্যার মূল খুঁজে বের করতে হবে৷ আমাদের মনে রাখতে হবে, বেড়ায় যদি ধান খায়, তাহলে তা রক্ষা করার ক্ষমতা কারও নেই!

ওডি/আরএডি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড