• বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

আয়বৈষম্য কমিয়ে আনতে ব্যবস্থা নিন

  সম্পাদকীয়

০৩ নভেম্বর ২০১৯, ২১:০৮

গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বাহ্যত অগ্রসরমান হলেও দেশের ব্যাংকিং খাত একটি সংকটজনক দুরবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের বিস্ময়কর পরিসংখ্যান এবং তারল্যের ক্ষেত্রে গতি কিছুটা কমে আসায় এ খাত নিয়ে দুশ্চিন্তা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তবে, এরই মধ্যে জানা গেছে একটি চমকপ্রদ তথ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবমতে, বর্তমানে দেশে ব্যাংকিং খাতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ৮০ হাজারের উপর। বিশেষত চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন- এ তিন মাসে কোটিপতি আমানতকারী বৃদ্ধির হার বিস্ময়োদ্দীপক। এ সময়ে মাত্র তিন মাসে ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারী বৃদ্ধি পেয়েছে ৪ হাজার ১১০ জন। যে কোনো বিবেচনাতেই এ তথ্যটি সহজ গ্রাহ্য নয়। 

সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, দেশে একদিকে একটি শ্রেণি 'ব্যাংক লুট করে' কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন। অপরদিকে তারাই আবার হয়তো ব্যাংকে টাকা জমা রাখছেন। শেয়ারবাজার থেকে 'লুট করা' টাকা দিয়েও কেউ কেউ কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন এবং সে টাকায় ব্যাংক একাউন্ট ভারি করছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল- এ  দশ বছরে দেশের ব্যাংকগুলোতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। প্রতিবেদন বলছে, দেশের ব্যাংকগুলোতে কোটিপতির তালিকায় প্রতি বছরই গড়ে সাড়ে ৫ হাজার ব্যক্তি নতুন করে যুক্ত হচ্ছেন। এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়কালে দেশে প্রতিবছর গড়ে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে এক হাজার ৭৭৭ জন করে। 

পরের দুই বছর কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ২ হাজার ৫৫৭ জন করে। সে তুলনায় গত এক দশকে কোটিপতি আমানতকারী বৃদ্ধির হার অসামঞ্জস্যপূর্ণ। অপর একটি তথ্য বলছে, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট আমানতের ৩১ শতাংশ ছিল কোটিপতি আমানতকারীদের একাউন্টের। 

দশ বছর পর ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেখা যাচ্ছে, দেশে মোট আমানতের ৪৪ দশমিক ২৭ শতাংশই কোটিপতিদের দখলে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ প্রতিবেদনটি দেশের অভ্যন্তরে আয়বৈষম্য বৃদ্ধির সবচাইতে বড় প্রামাণ্য দলিল। এছাড়াও, গত কিছুদিনে সরকার পরিচালিত 'শুদ্ধি অভিযান' থেকে এটাও পরিষ্কার যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরেও কোটি কোটি টাকা সঞ্চিত থেকে যাচ্ছে, যা এসব পরিসংখ্যানের অন্তর্ভুক্ত নয়। এভাবে অস্বাভাবিক গতিতে কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি আমাদের সমাজে আর্থ-সামাজিক ভারসাম্যের দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। 

নানাবিধ নেতিবাচক পন্থায় অর্থ উপার্জনের প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। উপার্জিত এসব আনরিকগনাইজ্ড অর্থের একটি অংশ দেশের বাইরে পাচারও হয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন। এমন হারে কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধির অবশ্য আরেকটি অর্থ হতে পারে; এত এত টাকা বিদেশে পাচারের পরিবর্তে অন্তত দেশের মধ্যেই থেকে যাচ্ছে- এই একটি দিক বিবেচনায় এসব তথ্য কিছুটা আশাব্যঞ্জনা তৈরি করতে পারে। 

এমন পরিস্থিতিতে এটা ছাড়া আর কোনো ইতিবাচক প্রবণতা ভেবে নেয়াটা কঠিন। কেননা আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধির এ ব্যাপক হার দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ভঙ্গুরতাকেই নির্দেশ করে। আয়ের এ বৈষম্য যত বৃদ্ধি পেতে থাকবে ততই দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্যে টানাপড়েন তৈরি হবার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে, যা সামাজিক অস্থিরতার একটি বড় কারণ হয়েও দেখা দিতে পারে। বিশেষত, দেশের মোট সঞ্চিত অর্থের প্রায় অর্ধেক একটি নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র অংশের হাতে চলে গেলে সমাজ-রাষ্ট্রের নানা ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারী প্রবণতা প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেয়ে যেতে পারে। 

তাই দীর্ঘমেয়াদী ক্ষেত্রে দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে এহেন ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য কমিয়ে আনার ব্যাপারে বাস্তবভিত্তিক কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে; আর তা করতে হবে সময় আরও অনেক গড়িয়ে যাবার আগেই।

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড