• বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

'সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮' কে সাধুবাদ, তবে...  

  সম্পাদকীয়

০৫ নভেম্বর ২০১৯, ২১:১৭
সড়ক

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান মতে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল- চার বছরে নিহতের সংখ্যা ২৯ হাজার ৩১৫, আহত প্রায় ৬৯ হাজার ৪২৮ জন। তথ্য আরও বলছে, গত চার বছরে বাংলাদেশে সড়কে দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে প্রায় ২২ হাজারের মতো। আর এ সকল দুর্ঘটনায় মারা যায় দৈনিক গড়ে প্রায় ২০ জন মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনায় একজন ব্যক্তি অপমৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ার সাথে সাথে একটি সম্ভাবনারও অপমৃত্যু ঘটে। পরিবার হারায় আপনজন, আশ্রয়।  

দিন কে দিন সড়কে লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি, দুর্ঘটনার মহাসমারোহ, এর পেছনের কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞগণ পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে সবচাইতে বড় কারণটি হচ্ছে যানবাহন চালকদের বেপরোয়া আচরণ। সড়কে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর প্রবণতার প্রত্যক্ষ ফল হচ্ছে ওভারটেকিং; আর ওভারটেকিং হচ্ছে দেশে সড়ক দুর্ঘটনাসমূহের সিংহভাগের মূল উদ্দীপক। এছাড়া চালকদের দক্ষতার অভাব, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিআরটিএর উদাসীনতা এবং পথচারীদের অসাবধানতাও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

এ সকল দিক বিবেচনায় গত বছরের মাসাধিক কালব্যাপী চলা শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তড়িঘড়ি করে পাস করা হয় 'সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮'।

সড়ক পরিবহন আইনটি কার্যকর না করতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের চাপ ছিল বলে উল্লেখ করেছিলেন সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। শুরু থেকেই নতুন সড়ক পরিবহন আইনের বিভিন্ন ধারার বিরোধিতা করে আসছিলেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। 

প্রস্তাবিত এ আইনের বিভিন্ন ধারা বাতিলের দাবিতে তারা আন্দোলনেও নেমেছিলেন। তবে সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ১ নভেম্বর কার্যকর হয়েছে নতুন সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮। এর আগে ২২ অক্টোবর আইনটি কার্যকরের তারিখ ঘোষণা করে গেজেট জারি করে সরকার। 

এমন বাস্তবতার আগামী ১ নভেম্বর থেকে 'সড়ক পরিবহন আইন- ২০১৮' কার্যকর হয়েছে। অত্যন্ত সময়োপযোগী এ আইনটি অনেক সম্ভাবনার আলোক ছড়ালেও এর যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে সন্দিহান সংশ্লিষ্ট অনেকেই। তাই এ আইনটি কেবল প্রণয়নের মধ্যেই আটকে থাকবে না, বরং এর সুষ্ঠু প্রয়োগেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ যথাযথ উদ্যোগ নেবেন- এটাই এখন প্রত্যাশা। সড়কে মৃত্যুর এ মিছিল ঠেকাতে আইনের কঠোর প্রয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা একান্ত আবশ্যক।

নতুন আইনের উল্লেখযোগ্য বিধানগুলোর মধ্যে- সড়কে গাড়ি চালিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে হত্যা করলে ৩০২ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের বিধান যথার্থ বলেই বিবেচ্য হচ্ছে। সড়কে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালালে বা প্রতিযোগিতা করার ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। অর্থদণ্ডের সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেয়ার সুযোগ থাকাও ভালো উদ্যেগ মনে করা হচ্ছে।

মোটরযান দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতর আহত বা প্রাণহানি হলে চালকের শাস্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল ও সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা, ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরযান বা গণপরিবহন চালানোর দায়ে ছয় মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড, নিবন্ধন ছাড়া মোটরযান চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার এবং প্রদর্শন করলে ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, ফিটনেসবিহীন ঝুঁকিপূর্ণ মোটরযান চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড, ট্রাফিক সঙ্কেত মেনে না চললে এক মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড, সঠিক স্থানে মোটরযান পার্কিং না করলে বা নির্ধারিত স্থানে যাত্রী বা পণ্য ওঠানামা না করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বললে এক মাসের কারাদণ্ড এবং ২৫ হাজার টাকা জরিমানা, একজন চালক প্রতিবার আইন অমান্য করলে তার পয়েন্ট বিয়োগ হবে এবং এক পর্যায়ে লাইসেন্স বাতিল, গণ পরিবহনে নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে অতিরিক্ত ভাড়া, দাবি বা আদায় করলে এক মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড, আইন অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্সে পেতে হলে চালককে অষ্টম শ্রেণি পাস এবং চালকের সহকারীকে পঞ্চম শ্রেণি পাস হওয়া, গাড়ি চালানোর জন্য বয়স অন্তত ১৮ বছর, সড়ক পরিবহন আইনের প্রায় সকল বিধানই পরিবহন সেক্টরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ ছাড়া বাংলাদেশের আপামর জনগণ সাদরে গ্রহণ করেছে বলে প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। 

শক্ত এবং পোক্ত এ আইন প্রনয়নে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সাধুবাদও জানিয়েছে। কিন্ত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শুধু চোখের দেখা দেখে এই আইনের বাস্তবায়ন কতটুকু কার্যকরী করা যাবে সেই সংশয় থাকছে, তাই সিসিটিভির ব্যাপ্তি দেশব্যাপী সর্বত্র করার দাবি এসেছে। 

আইন প্রণয়নে স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোন অতিরিক্ত অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের সুযোগ গ্রহণ করবে কি না সেই আশঙ্কা জনমনে থেকেই যাচ্ছে। জরিমানার ৪০ শতাংশ অর্থ মাঠপর্যায়ে কর্মরত জরিমানাকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পাবেন, এই তথ্যটিই এমন আশঙ্কার মূল উৎপত্তি ঘটিয়েছে। এই যে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যগণ যে দোষীদের বাদেও নির্দোষ কাউকে বিড়ম্বনায় ফেলবে না এই নিশ্চয়তা জনগণ খুঁজে পাচ্ছেন না। যেখানে আগে থেকেই প্রত্যক্ষ করা গেছে, পরিবহন খাতের সাথে সম্পর্কযুক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার কর্মকর্তাগণ, পুলিশ এবং পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের নিয়ে এক ধরনের দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছিল, এই বিষয়গুলো পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার অন্যতম অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। 

তবে শুধু পুলিশ নয় আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে, সময় বাঁচানোর জন্য অরক্ষিত ভাবে রাস্তা চলাচলের মত অনিরাপদ কার্যাবলী থেকে বিরত থাকা রাষ্ট্র নয় আমাদের দায়িত্ব। আসলে ভয় দেখানোর মতো এই আইনের সঠিক প্রয়োগ করলে শৃঙ্খলা আপনা আপনি আসবে বলে আমরা বিশ্বাস করছি।  

পরিবহন খাতে জবাবদিহিতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো নিয়ন্ত্রণও করা সম্ভব হবে। এমন পরিস্থিতিতে সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা এ মুহূর্তে একটি বড় চ্যালেঞ্জই বটে। এই আইনের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পুলিশকে সততার সাথে সর্বদা সক্রিয় হতে হবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন এই আইন প্রয়োগে সদা তৎপর থাকে সে ব্যাপারে নজর দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আইনটি কার্যকর হলে সড়কে বিশৃঙ্খলা রোধে সরকারের সদিচ্ছার ব্যাপারটিও ইতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে। 


       
 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড