• বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

‘ছায়াবৃত্ত’-এর তৃতীয় পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস : ছায়াবৃত্ত

  তাসলিমা তাহরিন

১৮ জুলাই ২০১৯, ১৩:১৪
উপন্যাস
ছবি : প্রতীকী

জোনাবালি দ্রুত দৌড়ে বাড়ির উঠনে চলে আসে। বুকটা ধুকপুক ধুকপুক করছে, শ্বাস- প্রশ্বাসের চরম অবনতি। এ মুহূর্তে মুখ থেকে কোনো শব্দ বের করবার জো নাই তার। বুকের ভেতরটা আষাঢ় মাসের ন্যায় বিদ্যুৎ চমকানি আর বিকট আওয়াজ। এই বুঝি তার বাবার কোন আচরণ সহ্য করতে হয়, যা এর আগে কখনো ঘটেনি। নাকি বাবা মেয়ের সম্পর্কের অবনতি ঘটবে আজ এই ভেবে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পরে জোনাবালি। অপ্রতিভ ভাবে দাঁড়ায় বাবার সম্মুখে মাথা নিচু করে। একবার প্রস্তুতি ছাড়ায় আড়চোখে তাকায় কিন্তু না তার বাবার মুখে অস্বাভাবিক আচরণের বিন্দু মাত্র ছিটেফোঁটা নাই। জোনাবালি স্বস্তির নিশ্বাস নেয়। প্রতিদিনের মত  ফজরের নামাজ ও জিকির শেষ করে দোয়া দরুদ পাঠ করে তিনবার করে ফুঁ দেয় জোনাবালির আপাদমস্তক। তার বাবার বিশ্বাস এতে শরীর ও মন দুটোই ভালো থাকে। ফুঁ দেবার শেষে ঘটলো সেই অঘটনটা যেন মাথায় কেউ বড়সড় আঘাত করে বসলো। জোমসের সরস গলায় বলে বসে, ‘তোমার মত মেয়েদের বাড়ির বাহিরে যাওয়া ঠিক না মা। আর কখনো যেওনা। সমাজের লোকজন ভালো চোখে দেখবো না।’

জোনাবালি হতবাক হয়ে নিজের মাথা নিচু করে চক্ষুলজ্জা আড়াল করার চেষ্টা করে। তার বাবা তাহলে কি তার বাহিরের করা কার্যকলাপ দেখে নিয়েছে? তাহলে কি চৈতন্যে কেউ দেখতে পেয়েছে? দেখতে পেয়েছে কি তার শিশুসুলভ চঞ্চলতা? এসব ভেবে নিজেকে ধিক্কার দেয় সে। এই লজ্জা সে কোথায় লুকবে এই ভেবে কুল কিনারা পায় না। বাবার মুখে মেয়ের এমন কথা, ইস কি লজ্জা! কি লজ্জা!

বাবার অমন কথার পর নিজেকে অসংখ্যবার সংযত করার চেষ্টা করছে জোনাবালি। কয়েকদিন বাতায়নের ধারে কাছে অব্ধি যায় নি। কিন্তু না অবাধ্য মন মানতে নারাজ। ওই যে, গুপ্ত জিনিসের প্রতি দুষ্ট হওয়াটায় স্বাভাবিক। তেমনটায় ঘটলো তার ক্ষেত্রে। শুধু জোমসের বাড়িতে থাকা অব্ধি নিজের মনকে সামাল দিলেও বারংবার ভেবেছে ছেলেটার কথা, কয়েকদিন তাকে না দেখতে পেয়ে যদি আর না আসে তখন। একদিনেই তার বসন্তের সন্ধ্যায় বর্ষা এসে যাবে। তাই সন্ধ্যার অভিমুখে একটা চিরকুটে কয়েকটা শব্দ ভরে সেই গাছের নিচে রেখে আসে জোনাবালি। 

চৈতন্যে তার সময়ের বেড়াজালে বন্দি। সময় তাকে টেনে-হিচরে নিয়ে যায় ইউক্যালিপটাস গাছের নিচে। যদিও একটানা কয়েকদিন জোনাবালিকে দেখা হয় নি তবুও সে অপেক্ষায় ছিলো অস্থির ছিলো সময়ের। কারণ সে জানে অসময়ে কোনো কার্য সম্পন্ন হয় না, চাওয়া কেউ কাছে পাওয়া হয় না। আর কবিরা যেহেতু অন্তর্মুখী তাই এদের অস্থিরতা বাহিরে বেরোবার অবকাশ নাই। তাই তার  অস্থিরতা দেহঘরের দেওয়ালে বন্দি।  

মূলত তার কাছে জায়গাটা ভালোলাগার বিশেষ অর্থ আছে। সেখানে আছে প্রকৃতি আর প্রেমের সংমিশ্রণ, আছে প্রেয়সীর আড়চোখের প্রেম বর্ষণ।

সন্ধ্যায় চৈতন্যে হিমুর ন্যায় হলুদ পাঞ্জাবী, খালি পা, আর হাতে সিগারেট নিয়ে সেখানে যায়। এটা তার অভ্যস্ততায় পরিণত হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে সে নিজেকে হিমু বানায়। আজও তার বিপরীত নয়। তখন সন্ধিক্ষণ চলছে, সূর্যের লাল আভায় যখন সূর্যের চারপাশটা মাখো মাখো তখন যেন সেই সূর্যকে টেনে-হিচরে এক অন্ধকার কুটরির মধ্যে আবদ্ধ করছে আকাশ।আর তখন চৈতন্যের কবি মন বিদ্রোহ করে,  এই আকাশ তুই এতো নির্দয় কেন? কেন এতো হিংস্র? তোর কি মায়া দয়া নাই সৌন্দর্যের প্রতি, ভালোবাসা নাই। থাকুক না লালচে আভা তার ইচ্ছা মত।

প্রোক্ষণে চৈতন্যে চিরকুট দেখতে পেল। যে সময়ের জন্য এত আগ্রহ তা বুঝি এসে গেলো তার সম্মুখে। চিরকুটের অন্ত্যদেশে লেখা আছে, ‘রাতে আমার সাথে জোনাকির আলো আর ঝিঁঝিঁ পোকা ডাক শোনা যাবে তো। আমি কিন্তু আসবো আর তোমার অপেক্ষায় থাকবো’

চৈতন্যের গাল জুড়ে হাসির মুক্তধারা যেন থৈ থৈ করছে। সমস্ত মনুষ্যকুল যখন ঘুমের শহরে ব্যস্ত তখন চৈতন্যে ও জোনাবালি জনমানবহীন নীরব নিস্তব্ধ রাতের প্রহরী সাথে চাঁদের ফিকে আলো। আজ আলোটা ঝকমকে না আকাশের মেঘ আলোটাকে গ্রাস করেছে। তারপরও ফিকে আলো মেঘের ফাঁকে ফাঁকে বেরুচ্ছে।  পৃথিবীতে যত প্রেমিক প্রেমিকা আছে তারা সকলে এই রাতটাকে  চায়, শুধু রাত নয় চায় আরও গভীর রাত। কারণ  প্রেমের নেশা তো রাতেই চরে। 

যখন তারা গাছের নিচে দাঁড়ায় তখন তাদের কারো মুখে কোনো বলার শব্দ অব্ধি থাকে না চোখের ভাষা বুঝবার ও কোনো উপায় নেই কারণ চোখের লজ্জা দৃষ্টিকে গ্রাস করেছে। মাঝে মাঝে চৈতন্যে তার দৃষ্টি দিয়ে জোনাবালিকে পরখ করছে। আর মনে মনে বলছে, নারীরা আসলে লোভনীয়,  এদের একবার দেখতে নেই, আবার বারবার ও দেখতে নেই। এতে নিজেকে খোয়ানোর ভয় থাকে।' 
সে নিজেও তো খুইয়েছে তাকে।

 আজ তাদের মধ্যে প্রেমের লহর বয়ে যাচ্ছে নির্বাকতায়। খানিকটা নীরবতার পাশ কাটিয়ে জোনাবালি বলল, ‘চৈতন্যে কিছু তো একটা বলো!’

চৈতন্যে খানিক বাদে বলে উঠল, ‘প্রেয়সী, তোমার প্রেম জালে বন্দি আমি। খুঁজে নাহি পাই পথ। অতল গরলে হারিয়েছি আমি দিশেহারা অনবরত।’

- প্রেয়সী, তোমার প্রেমজলে নায়তে গিয়ে। খোয়া গেছে আমার তরি। সে তরি খুঁজতে গিয়ে আহার নিদ্রাহীন হয়ে মরি। সবে থেকে আমার প্রাণ নাই দেহে এখন কি যে করি....!

জোনাবালি শোনার পর আহ্লাদের সুরে বলে, ‘এই প্রেয়সীটা আবার কে? কোথ থেকে উড়ে এসে জুরে বসল?’

চৈতন্যে হা হা করে হাসতে লাগলো। যেন তার হাসিতে চাঁদের ফিকে আলো ঝরে পরছে। জোনাকির সবুজ আলো মিটমিট করে লাফাচ্ছে। তাল গাছের মাথা হালকা হাওয়ায় সায় দিচ্ছে সেই সাথে ব্যাঙ আর ঝিঁঝিঁ পোকারা গান গাচ্ছে। 

- আহ্ এমন করে হাসার কি আছে বলেন তো, জোনাবালি বিরক্তির সুরে বলে।

- সে যে এক নারী। সুদর্শীনি, সুবাসিনী, মায়াবিনী, চৈতন্যে বলে উঠলো। 

- মন ভার করে, নারী মানে সে অন্য কেউ?

- আমার কাছে সে যে কেউ নয় আবার অন্য কেউ ও নয়, সে আমার কাছের কেউ।

- তাহলে বলা হোক মেয়েটা কে?

- না বলাটায় তো ভালো।  থাকনা একটু অগোচরে।

-  কর্কশ গলায়, কেন থাকবে শুনি। আমাকে বলতে হবে। 

- যার কথা তাকেই বলতে হবে এমন নির্লজ্জ হতে আমি পারবো না। ভাবো না একটু, মাথা খাটাও।

-  রাগান্বিত গলায়, না আমি এতো ভাবতে পারি নে বাপু। 

- এত রাগের কি আছে আমার সামনের মানুষকে ছেড়ে আমি আবার কাকে প্রেয়সী বলব।  এমন দুর্ভাগ্য যেন আমার না হয়।

- আচ্ছা তোমার সামনের মানুষ তো আ...মি বলে জোনাবালি মুখ ঘুরিয়ে নিলো। লজ্জায় মুখ লাল হয়ে গেলো। চাঁদের ফিকে আলোয় তা কিছুটা ফুটে উঠল।
হৃৎস্পন্দন চলছে দ্রুত থেকে দ্রুততর, ঘন ঘন নিশ্বাস চলছে। যেন মনের চরে জোয়ার ভাটা শুরু হয়ে গেছে। চৈতন্যের মুখের দিকে তাকানোর বিন্দু মাত্র শক্তি নেই। 

অতিমাত্রা প্রমোদে দেহঘর থেকে চিৎকার করে প্রকৃতিকে বলতে ইচ্ছা করছে জোনাবালির,' প্রকৃতি তুই খুব শান্ত, অমলিন, তোর দেহের বাতাসে আজ প্রেমের অমৃত সাধ। তোর বাতাসে আজ আমি বিলীন। 
 
চারদিকে জোনাকির আলো, ঝিঁঝিঁ পোকা আর ব্যাঙের ডাক খেলা করছে। এরা পারিশ্রমিক ছাড়ায় চৈতন্যে আর জোনাবালির প্রেমের গীতিকাব্য রচনা করছে রাতের চাঁদমাখা ফিকে আলোয়। তাদের কেউ স্ফীত স্বরে বলতে ইচ্ছে করছে তার,

এই দুষ্টু ঝিঁঝিঁ পোকা এতো ডাকছিস কেনরে? সাথে ব্যাঙটাও যেন, তুইও তো কম যাস নে। জোনাক পোকার মিটমিট আলোক এই যে তুইও ভারি দুষ্টু হয়েছিস বটে। দেখ না তাল গাছটাও নির্লজ্জের মত থ মেরে আছে। আমার বুঝি লজ্জা পায় না। এভাবে চাতক পাখির মত অপেক্ষার প্রহর  গুনে প্রেমের লহরে ভেসে ভেসে দিন, সময় কাটতে লাগলো। কিছুদিন পর হঠাৎ রাতে বেরোবার পথে..........

(চলবে...)

আরো পড়ুন ‘ছায়াবৃত্ত’-এর দ্বিতীয় পর্ব- ধারাবাহিক উপন্যাস : ছায়াবৃত্ত

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড