• শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২০, ২১ চৈত্র ১৪২৬  |   ৩৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বোনকে হারিয়েও বিশ্বজয় আকবরের

  শফিউল করিম শফিক, রংপুর

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৬:২৪
আকবর
আকবর আলী ও তার বাবা-মা (ডানে) (ছবি : দৈনিক অধিকার)

মানুষ শুধু না পাওয়ার দুঃখ বা কষ্টেই কাঁদে না বরং ভালো কিছু পাওয়ার আনন্দেও কাঁদে। ভালো কোনো কিছু পাওয়াটা আমাদের কাছে মাঝে মাঝে দুর্লভ মনে হলেও অনেক সময় সেটা ধরা দেয় খুব সহজেই। আর সেই পাওয়াটা যদি সমগ্র দেশবাসীর জন্য হয়, তাহলে তো আর কিছু বলার থাকে না। ঠিক এমনি এক ঘটনা ঘটেছে বিদেশের মাটিতে। বলছিলাম বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের বিশ্বজয়ের কথা। 

রংপুরের কৃতী সন্তান আকবর আলী। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক। ছেলের ব্যাটে বিশ্বজয়ের ছবি দেখে আনন্দে কেঁদে ফেলেন আকবরের বাবা-মা। আকবরের বাবা বলেছেন, কান্না থামাতে পারছি না। এ কান্না খুশির কান্না। আকবর পুরো বিশ্বের সামনে গর্বিত করেছে শুধু নিজেকে নয়, দেশ ও জাতিকে। 

সহোদর একমাত্র বোন রাণীকে হারানোর ব্যথা নিয়ে, বুকে পাথর বেঁধে দক্ষিণ আফ্রিকায় দেশের জন্য ক্রিকেট খেলায় লড়ে গেছেন আকবর আলী। গত ২২ জানুয়ারি আকবর আলীর বোন যমজ কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার পরপরই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তখন ক্রিকেটার আকবর দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে। পরিবারের কোনো সদস্য বোনের মৃত্যুর খবরটি না জানালেও ২৪ জানুয়ারি কোনো এক মাধ্যমে বোনের মৃত্যুর খবরটি জানতে পারে আকবর আলী। 

বোনকে শেষবারের মতো একবার দেখতে না পারা ও জানাজায় অংশগ্রহণ করতে না পারার ব্যথা নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন দল বাংলাদেশের নেতৃত্ব দানকারী রংপুরের তরুণ আকবর খেলায় থেমে যাননি। শত ব্যথা নিয়ে খেলার মাঠে ছিলেন স্বাভাবিক। লক্ষ্য ছিল খেলার মাঠে বিজয় ছিনিয়ে নিতেই হবে। 

রংপুর নগরীর নিউ জুম্মা পাড়ায় তার পৈত্রিক নিবাস। সেখানে কথা হয় ক্রিকেটার আকবর আলীর বাবা মোস্তফা মিয়া, মা সাহিদা বেগম ও বড় ভাই মুরাদের সঙ্গে। আকবর আলীর বাবা মোস্তফা মিয়া ক্রিকেটার ছেলের সাফল্য নিয়ে গর্ববোধ করে বলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসা করে আকবর আলীর বিকেএসপিতে লেখাপড়ার খরচ চালানোর মতো আমার সামর্থ্য ছিল না। 

তিনি বলেন, ক্লাস সেভেনে বিকেএসপিতে ভর্তি হয় আকবর আলী। সে বছরেই সেভেনে ভালো ফল করে। তখন বিকেএসপি তার লেখাপড়ার খরচ ফ্রি করে দেয়। সেখান থেকে বিনা পয়সায় ইন্টারমিডিয়েট পাস করে আকবর আলী। এখন সে ঢাকায় আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করছে। আকবর তার লেখাপড়া ও খেলায় খুব কষ্ট করে এত দূর এগিয়েছে। আমার কাছে টাকা পয়সার জন্য কখনো চাপ দেয়নি। নিজের খরচ নিজে যতদূর পেরেছে চালিয়েছে। 

তিনি বিকেএসপির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, বিকেএসপি যদি সহযোগিতা না করত তাহলে আকবর আলী আজ এত ভালো ক্রিকেটার হতে পারত না। এসএসসিতে এ প্লাস নিয়ে পাস করার পর বিকেএসপি কর্তৃপক্ষ ধন্যবাদ জানান বাবা গোলাম মোস্তফাকে। 

আকবরের বাবা ফার্নিচার ব্যবসায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী খেলাধুলার পৃষ্ঠপোষক। বিশ্বকাপজয়ী এই ছেলেদের প্রধানমন্ত্রী দেখবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এছাড়া আকবর একদিন জাতীয় ও টেস্ট দলেও সুযোগ পাবে এবং দেশের জন্য আরও সুনাম বয়ে আনবে এটা আমার বিশ্বাস। 

আকবর আলীর মা সাহিদা বেগম এখনো মেয়ে হারানোর দুঃখ ভুলতে পারছেন না। দুটি যমজ মেয়ের জন্ম দেওয়ার সময় আকবরের বোন রাণী এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যায়। বর্তমানে যমজ মেয়ে দুটি নানা বাড়িতেই আছে। এত বড় দুঃখের পরেও আকবর আলীর মা সাহিদা বেগম ছেলের সাফল্যে আনন্দিত।  

তিনি বলেন, আমার বড় ছেলে মুরাদ ক্রিকেট খেলত। কিন্তু সে বেশিদূর এগোতে পারেনি। ছোট ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম সে যাতে বড় ক্রিকেটার হয়। আল্লাহ আমার স্বপ্নপূরণ করেছে। দেশের জন্য সম্মান এনে দিয়েছে। এজন্য আমি গর্বিত। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট আকবর আলী। আকবর আলীর বড় ভাই মুরাদ হোসেনও ঢাকা লীগে ক্রিকেট খেলত।

মুরাদ হোসেন জানান, আমার ছোট ভাই আকবর আলী ছোট বেলা থেকেই ভালো ক্যাপ্টেন্সি করত। ওকে নিয়ে আমার অনেক বড় আশা ছিল সে আশা আজ পূরণ হয়েছে। আমি আশা করি আকবর জাতীয় দল ও টেস্ট দলে সুযোগ পেলে আমাদের স্বপ্ন আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। 

ক্রিকেটার আকবর আলীর ক্রিকেট কোচ অঞ্জন সরকার জানান, অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন দল বাংলাদেশের নেতৃত্বে ছিল রংপুরের ছেলে আকবর আলী। সে আমার একাডেমি অসিম মেমোরিয়ালে ২০১০-১১ সাল পর্যন্ত রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ক্রিকেট অনুশীলন করে। পরে ঢাকা বিকেএসপিতে ২০১২ সালে ভর্তি হয়। পরবর্তীতে বিকেএসপি থেকে প্রথম বিভাগ লীগ ও প্রিমিয়ার লীগে অংশগ্রহণ করে সফলতা অর্জন করে। আমি একজন ক্রিকেট কোচ হিসেবে আমি খুব খুশি এবং বিজয় ছিনিয়ে নেওয়ায় খুশি রংপুরের ক্রীড়াপ্রেমীরা। 

আরও পড়ুন : ফেনীতে ২১ শয্যার মানসিক হাসপাতাল উদ্বোধন

এ দিকে সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাতে দলকে জেতানোর নায়ক ক্রিকেটার আকবরের বাসায় গিয়ে তার বাবা-মাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন স্থানীয়রা। এ সময় জেলা প্রশাসক ও বিসিবির পরিচালক অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে আকবরের বাবা-মাকে ফুলের শুভেচ্ছা জানান এবং মিষ্টি মুখ করান। 

ওডি/এএসএল

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড