• রোববার, ০৩ জুলাই ২০২২, ১৯ আষাঢ় ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

আওয়ামী লীগের কাছে বিজয় দিবসের প্রত্যাশা

  নিয়ামত আলী

১৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০৯:৪১
আওয়ামী লীগের কাছে বিজয় দিবসের প্রত্যাশা
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পতাকা (ছবি : প্রতীকী)

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে আওয়ামী লীগের অবদান অতুলনীয়। ১৯৪৭ পরবর্তী পাকিস্তান কর্তৃক ২৪ বছরের স্বৈরশাসনের ভিত নাড়িয়ে দেবার জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা সারা বিশ্বের যে কোন মুক্তিকামী মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষা লাভের জন্য বঙ্গবন্ধু এক অর্থে উনিশ শতকের রাজনৈতিক আন্দোলনের ঝাণ্ডাটি অনেক দূর এগিয়ে দিয়ে গেছেন। তারই বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৭১ সালে বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাসের সাথে আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধু এক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর কথা ভাবাই যায় না।

২০২১ সাল বাংলাদেশের জন্য এক মাইলফলক। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যখন প্রায় ৭৩ বছর পূর্ণ করতে যাচ্ছে, বাংলাদেশ তখন তার বিজয়ের ৫০তম বছর অতিক্রম করল। স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া দেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কাছে সাধারণ মানুষের চাওয়া পাওয়ার তালিকা সুবিশাল। মুক্তিযুদ্ধের পর সংবিধান রচনায় গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে আকাঙ্ক্ষা দলটির মাথা থেকে বের হয়েছিল, ৫০ বছর পর সংবিধানের চারটি মূলনীতি কতটুকু বাস্তবায়ন দলটি করতে পেরেছে তার বিশ্লেষণ আওয়ামী লীগের মুখ থেকে শোনার দাবি করাই যেতে পারে।

১৯৪৭ পূর্ববর্তী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি থেকে সারা ভারতবর্ষ যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সামগ্রিক বিবেচনায় আওয়ামী লীগ সেই শিক্ষা থেকেই অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথে হেঁটেছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে সেই ধারাবাহিকতায় ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বীজ বপন করা হয়েছিল। সংবিধান রচনার দীর্ঘকাল পরিক্রমায় অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে তাই আওয়ামী লীগের কাছে মানুষের প্রত্যাশার অন্ত নাই। সেই সাথে প্রত্যাশাও কম নয়।

স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের কাণ্ডারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হওয়ার পর সামরিক বেসামরিক সরকারের হাতে পড়ে ১৯৭২ সালে রচিত সংবিধানের অনেক ধারা উপধারা বদলে যেতে শুরু করে। সব চেয়ে বড় আঘাতটি আসে রাষ্ট্রের মূলনীতিসমূহের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। মেজর জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে স্বৈরশাসক হুসাইন মুহাম্মাদ এরশাদের সামরিক সরকার সংবিধানের আজকের সাংঘর্ষিক অবস্থার পুরো কৃতিত্বের দাবীদার। দুই সামরিক শাসকের হাতে সংবিধান যে ভাবে সংশোধিত হয়েছে তার কয়েকটি সংশোধন মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দিয়েছে বটে কিন্তু মোটাদাগে সংবিধান তার পূর্ববর্তী চেহারা ফিরে পায়নি।

গণতান্ত্রিক সরকার নিজেদের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার প্রয়োজন ছাড়া সংবিধানে সংশোধনীতে হাত দেয়নি। সংবিধান নিয়ে তাদের অবস্থান অনেকটা ‘কূল রাখি না শ্যাম রাখি’ নীতির মতো। ১৯৭২ সালের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক সংশোধনী বাতিল করতে বিএনপিকে সংসদে প্রস্তাব আনতে দেখাই যায়নি। আওয়ামী লীগ যা করেছে তাকে এক অর্থে জনতুষ্টিকর বলা গেলেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য ইতিবাচক বলা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় আওয়ামী লীগকেই সংবিধানকে কেন্দ্র করে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে নজর দিতে হবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অপরাপর রাজনৈতিক দলের চেয়ে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব বেশি।

আওয়ামী লীগ তার জন্মলগ্ন থেকেই এ দেশের সাধারণ মানুষের দল হিসেবে খ্যাতি এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতারা ছিলেন এ দেশের অতি পরিচিত ব্যক্তিবর্গ। প্রায় সকলে ছিলেন কৃষক পরিবারের সন্তান। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু একটি কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবেই রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। তার হাত ধরে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিজয় পতাকা ছিনিয়ে এনেছে। স্বাধীনতার পরে দলটি যে আদর্শের ভিত্তিতে সংবিধান রচনা করেছিল, ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে এসে সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠা বার বার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৯০ সালে দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসলেও দলীয়ভাবে কোনো দলই দেশে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সফল হতে পারেনি।

আরও পড়ুন : হৃদয়ে বাংলাদেশ

নির্বাচন কমিশন নামক সংবিধানটি প্রতিষ্ঠানটি বরাবরের মতো সব সরকারের আমলেই নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচন কাঠামোর চিত্র আরও ভয়াবহ। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শের উত্তরাধিকারী আওয়ামী লীগের কাছে গণতন্ত্র এখন পুতুল খেলায় রূপ নিয়েছে। রাতের আধারে ভোট চুরির কালিমায় আক্রান্ত দলটি সমাজতন্ত্র তথা সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় হাবুডুবু খাচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের নাম করে সারা দেশে দুর্নীতির গবেষণাগার খুলে রাখা হয়েছে।

সার্বিক উন্নয়নের চিত্র এসে ধরে পড়েছে কোভিড-১৯ নামক সংকট মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা দেখে। কোভিড-১৯ এসে বলে দিল বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার নাজুকতার কথা। সারা দেশে দৃশ্যত মনে হচ্ছে কোন সরকার নাই। আছে রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগকারী লুটেরা। দুর্নীতিতে নিমজ্জিত প্রশাসন ব্যবস্থা। এমতাবস্থায়, মোটাদাগে বলতে চাই, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের করণীয় আছে অনেক কিছু। দেশের সার্বিক অগ্রগতির লক্ষ্যে নানা বিষয়ে দলটিকে দীর্ঘ মেয়াদী কার্যক্রমের বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে।

অনেকগুলো দাবির মধ্যে আওয়ামী লীগের কাছে দেশের অর্থনৈতিক খাতসমূহের সংস্কার করা একটি বড় দাবি। যে উল্লম্ফন গতিতে উন্নয়ন ঘটছে বলে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে তার মধ্যে গণমানুষের হিস্যা কতটুকু নিশ্চিত হচ্ছে সে বিষয়ে দলটিকে ভাবতে হবে। পাকিস্তানি আমলে বাংলাদেশ যেভাবে অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়েছিল, স্বাধীনতার পরে সেই পুরনো চেহারা ফিরে আসার চেষ্টা করছে কি-না সে বিষয়ে দলটিকে সজাগ থাকতে হবে। পাকিস্তান আমলের বাইশ পরিবার চলে গেছে কিন্তু তার বিপরীতে স্বাধীন দেশে কি পরিমাণ দেশীয় বাইশ হাজার পরিবার তৈরি হয়েছে, তাদের সম্পর্কে আওয়ামী লীগকে ভাবতে হবে।

সারা দেশের শিল্প কারখানা চালু রাখার ব্যাপারে সরকারি তদারকির অভাব বোধ হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ২৫টি পাটকলকে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়ে সরকার সেই বার্তাটিই সকলের সামনে প্রকাশ করে দিয়েছে। প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক তথা ১ লক্ষ মানুষের জীবিকা নির্বাহের পথ বন্ধ করে সরকার বেসরকারিকরণ নীতিমালার প্রতি যে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন সেটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যায় না। এমতাবস্থায়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে সরকারি কলকারখানা বন্ধ করার নীতি থেকে দলটিকে বের হয়ে আসতে হবে।

ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে সরকারি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হোক। ব্যক্তি মালিকাধীন প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বা লভ্যাংশ সরকারি তহবিলে হস্তান্তরে ভূমিকা গ্রহণ করা হোক। বন্ধ করে দেয়া সকল সরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে ফিরিয়ে আনা হোক। স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তি মালিকানার অংশ পরিবর্তন করে করে সর্বক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনা আরোপ করা হোক। কোভিড-১৯ সংকটে যেসব হাসপাতাল এগিয়ে আসেনি, তাদেরকে আইন করে রাষ্ট্র মালিকানায় নিয়ে আসা হোক। দেশের শতকরা ৫০ ভাগ মানুষকে স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আনা হোক।

আরও পড়ুন : উদীয়মান তারকার দেশ বাংলাদেশ

শিক্ষা সংস্কারের ধাপ হিসেবে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সকল প্রকার শিক্ষাকে একমুখী করা হোক। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সরকারি মালিকানায় আনা হোক। শিক্ষক মানোন্নয়নের অংশ হিসেবে দেশের প্রতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক ‘শিক্ষক মান নির্ণয়’ পরীক্ষার আয়োজন করা হোক। সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জেলা ভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের দিকে নজর দেওয়া হোক।

লেখক : নিয়ামত আলী, পিএইচডি গবেষক, কর্ভিনাস ইউনিভার্সিটি অব বুদাপেস্ট, হাঙ্গেরি।

শিক্ষক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

ওডি/কেএইচআর

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড