• সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন

‘ফ্ল্যাট নাম্বার নয়ছয়’-এর তৃতীয় পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস : ফ্ল্যাট নাম্বার নয়ছয়

  লামইয়া চৌধুরী

০৮ জুলাই ২০১৯, ১২:০৫
কবিতা
ছবি : প্রতীকী

- রোগীর নাম??
আদুরী পাশ থেকে বলল, ‘নাফিসা শায়েরী।’
ছিপছিপে গড়নের ছেলেটা বলল, ‘ডাক্তার সাহেব নিজেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তাই আপনাদের কাল আসতে হবে।’
আদুরী বলল, ‘দেখুন ইটস্ আর্জেন্ট! বেশিক্ষণ লাগবে না।’
- বললাম তো হবে না। স্যার রেস্ট নিচ্ছেন। 

শায়েরী কটমটিয়ে আদুরীর দিকে তাকাল। মনে মনে বলল, বলদীর কি দরকার ছিল মিথ্যে বলার? সব বিষয়ে ন্যাকা ন্যাকা। তারপর সামনে বসা ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আমরা উনার রিলেটিভ। বেশি সময় লাগবে না। আপনি এক কাজ করুন উনাকে কল করে বলুন মৌনের ফ্রেন্ডস এসেছে।’
- ওহ্ আপনারা মৌন ম্যামের ফ্রেন্ড? তাহলে যেতে পারেন। 
শায়েরী হেসে বলল, ‘অন্যরা তাহলে কী দোষ করল?’
- নাহ্ তা করবে কেন? তবে আপনাদের যেতে না দিলে পরে স্যারই রাগ করবেন। 
- ধন্যবাদ ভাইয়া। 

আদুরীই প্রথম চেম্বারের ভিতর এলো, শায়েরী এলো পিছন পিছন। চেয়ারে হেলান দিয়ে একটা ছেলে চোখ বুজে আছে, ঘুমিয়ে পড়েছে কি? ছেলেটা অস্বাভাবিক রকমের ফর্সা। আদুরী বিড়বিড় করে বলল, ‘স্কিনের সমস্যা নাকি, শ্বেতরোগ আছে নাকি? এজন্যই বুঝি মা-বাবা হুটহাট করে বিয়ে করাতে চাচ্ছে।’
শায়েরী চেয়ার টেনে বসে ঠান্ডা গলায় বলল, ‘আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল। আপনার শরীর কি বেশি খারাপ? তাহলে না হয় কাল আসছি।’
ছেলেটা মাথা থেকে হুডিটা সরিয়ে আধশোয়া থেকে উঠে বসে চোখ মেলল। সাথে সাথে আদুরী বলল, ‘ওহ্ মাই গড! আমি তো শেষ।’
শায়েরী অবাক হয়ে সামনে বসে থাকা নীল চোখের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। মাথায় হুডি থাকায় ডিপ ব্রুনেট চুলগুলো এতক্ষণ আড়াল হয়ে ছিল। ছেলেটার হাতে ব্যান্ডেজ করা। আদুরীর কথাটা ছেলেটা শুনেছে হয়তো! ছেলেটা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে সামান্য ঝুঁকে একদম আদুরীর মুখোমুখি হয়ে বলল, ‘ওহে মার্জারি! তোমার রূপের ছটা দেখিয়া অনেক মার্জার কবি হইয়া পড়ে আর তুমি কি না এই আমিতে শেষ?’
আদুরী কিছুটা নড়েচড়ে বসল। শায়েরী মনে মনে বলল, ‘তোমার নীল চোখের সাগরে আমিও যে কবি হতে চাই।’

কথাটা বলে নিজের মনেই শায়েরী প্রবোধ গুণলো। নিজেকেই নিজে বলল, শায়েরী আর যাই হোক তুই কখনো কোনো ছেলেকে দেখে পাগল হতে পারিস না, কখনো না! শায়েরী এসির মধ্যে বসেও দরদর করে ঘামছে, সত্যি সত্যি এবার মনে হচ্ছে ওর অসুখ হয়েছে। অসুখটা কোথায় বুকের মাঝে নাকি চোখের দৃষ্টিতে? সে উঠে দাঁড়াল, আর এক মুহূর্তও এখানে থাকবে না, এক মুহূর্তও না। একটা ঘোরের মাঝেই সে হেঁটে চলে এলো। মাথা ঝিমঝিম করছে ওর, সমস্ত পৃথিবীটা যেন হঠাৎ থমকে গেছে, আর শায়েরীর হার্টবিট ম্যারাথন গতিতে দৌড়চ্ছে। 

শায়েরীর পিছন পিছন আদুরীও কিছু না বলেই চলে এসেছে। সিএনজিতে উঠে বসে বলল, ‘মুণ্ডুর হাসপাতাল আমার আর মুণ্ডুর ডাক্তার! শালার এমন ডাক্তার দেখলে ভালো মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়বে। মানুষ ডাক্তারের কাছে যায় সুস্থ হতে আর আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম। অ্যাঁই শায়েরী ব্রেক আপ তৈমুরের সাথে! আমার মাথা ঘুরছে, চোখ জ্বলছে। আমি বোধহয় মরেই যাব।’

আদুরীর কোনো কথা শায়েরীর কানে ঢুকছে না। শায়েরী গালে হাত দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। আদুরী তৈমুরকে ফোন করে বলল, ‘হ্যালো তৈমুর আম স্যরি,  রিয়ালি স্যরি। আই থিংক আই এম ইন লাভ উইথ এনাদার ম্যান, আ ম্যান অফ ব্লু আইস! ইটস টাইম ফর দা ব্রেকআপ সং।’
তৈমুরের চোখের যেন পলক পড়ছে না, কিছু বলতে যেয়েও বলতে পারছে না সে। সব কথা গলায় এসে আটকে রইল। আদুরী কিছু শোনার জন্য অপেক্ষাও করল না। কথা শেষ করেই সে খট করে মোবাইল রেখে দিল। 

সায়াহ্ন লাঞ্চব্রেকে বাইরে গিয়েছিল লাঞ্চ করতে। হসপিটালের উল্টোপাশেই একটা রেস্টুরেন্ট। আসার সময় দেখল একজন মানুষ কানে হেডফোন দিয়ে গান শুনতে শুনতে রাস্তা ক্রস করছে। শুধু যে গান শুনছে তাই নয় সাথে হাত পা বিভিন্ন এঙ্গেলে নেড়ে চলেছে। মুন ওয়াক করে রাস্তা পার হচ্ছে, চোখও বন্ধ করে রেখেছে। যদিও বা রাস্তাটা সবসময় বেশ ফাঁকাই থাকে তাও বিশ্বাসের নিঃশ্বাস নেই। কখন কি হয় বলা যায়! সায়াহ্ন বিড়বিড় করে বলল, ‘রিডিকিউলাস!’

প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দেখল একটা বাস ছেলেটার দিকেই ছুটে আসছে। সায়াহ্ন তড়িৎ দৌড়ে গেল। মানুষটাকে টেনে সরিয়ে আনল। পাশেই ল্যাম্পপোস্ট ছিল। সায়াহ্ন সেই ল্যাম্পপোস্টের সাথে আঘাত পেল। ছেলেটাকে সরিয়ে আনতে যেয়ে নিজের মাথা এখন ফুলে অবস্থা খারাপ। প্রচণ্ড ব্যথায় সে রোগী দেখাই অফ করে বসে আছে। ওয়াশরুমে যেয়ে চোখে মুখে পানির ছিটা দিতেই মাথাটা ঘুরে উঠল তার। কোনোরকমে ওয়াশরুম থেকে বাইরে বের হলো। সায়াহ্নকে দেখে ছেলেটা আন্তরিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করল, ‘হ্যাই ডুড! তুমি ঠিক আছো তো?’

তার চোখে একই সঙ্গে কৃতজ্ঞতা আর অনুশোচনা। সায়াহ্ন ওকে নিজের চেয়ারে বসতে দেখে ভারি অবাক হলো। পরক্ষণেই নিজের মনকে বুঝাল যে ছেলে চোখ বন্ধ করে কানে হেডফোন গুঁজে মুন ওয়াক করতে করতে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করে ওর দ্বারা সবই সম্ভব। সায়াহ্ন সামনের চেয়ারটায় ধীরে সুস্থে বসে বলল, ‘আপনার কি চান্দের দেশে যাওয়ার এতই শখ নাকি ভাই?’
সলজ্জিত গলায় সায়াহ্নের সামনে বসে থাকা ছেলেটা বলল, ‘আমি দুরুক! দুরুক খান। তুমি আমার জন্য যা করেছ সবসময় মনে থাকবে আমার। এই দুরুক আজ থেকে তোমার জন্য সব করতে পারবে। যে কোনো পরিস্থিতিতে, যে কোনো সময়ে তোমার যাই হেল্প লাগুক না কেন আমাকে তুমি পাশে পাবে। অনেক ধন্যবাদ আজকে তুমি না থাকলে মুন ওয়াক করতে করতে চান্দের দেশেই চলে যেতে হতো।’
সায়াহ্ন হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘আমি সায়াহ্ন! আপনার হাতে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছি, হালকা আঘাত, বেশি না। ভাগ্যিস ল্যাম্পপোস্টে দুজনেই ধাক্কা খেলাম। বাস ধাক্কা দিলে এতক্ষণে মুন ওয়াক করতে করতে চাঁদের দেশে। হা হা হা।’
- হেই ম্যান তুমি আপনি আপনি করবে না, তুমি করে বলবে। আমার মনে হয় তুমি  আমার চেয়ে বয়সেও বড় হবে।
- ২৮ শুরু হলো। 
- দেখলে তো আমার চেয়ে বছর তিনেকের বড়।
সায়াহ্ন হেসে বলল, ‘তুমি খুব সুন্দর বাংলা পার। তোমার মা বাঙালি নাকি বাবা?’
- দুজনেই।
সায়াহ্ন খানিক ভরকে গেল। দুরুকের ডিপ ব্রুনেট চুল আর নীল চোখ দেখে তারপর ভাবল হয়তো ফ্যামিলির অন্য কেউ ফরেনার। কিন্তু আগ বাড়িয়ে আর কিছু জিজ্ঞাসা করল না।

মৌন বেশ বিরক্ত। আদুরী আর শায়েরী দুজনের একজনও সায়াহ্নকে কিছুই বলে আসেনি। তার ওপর দু’জন কিসব আবোল তাবোল বলছে। সায়াহ্ন ভাইয়ার চোখের মণি নীল কী করে হলো আর চুলের রঙইবা কালো থেকে পাল্টে গেল কী করে? মৌন এ ঘর ও ঘর পায়চারি করে বেড়াচ্ছে। তার মেজাজ বিগড়ে গেছে শায়েরী আর আদুরীর অবস্থা দেখে। আদুরী সায়াহ্নকে দেখে তৈমুরের সাথে ব্রেক আপ করে ফেলার সিদ্ধান্তও নিয়ে নিলো! আর শায়েরী সেখান থেকে আসার পর এখনও অব্ধি একটা কথাও বলেনি। চুপচাপ বই নিয়ে বসে গেছে। শায়েরী তো পরীক্ষার দিন সকাল ছাড়া বই ছুঁবেই না, আর এখন বইয়ে বুঁদ হয়ে আছে। এক্সাম তো সেদিন মাত্র শেষ হলো! মৌন এবার না পেরেই শায়েরীর সামনে থেকে বইটা সরিয়ে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলল। শায়েরী হকচকিয়ে গেল যদিও সে পড়ছিল না শুধুমাত্র বইয়ের পৃষ্ঠার দিকে তাকিয়ে ছিল। 
- কি হলো কিছু বলিস না কেন? 
শায়েরী বললো, ‘কি বলব?’
মৌন চিৎকার করে বলল, ‘কি বলব মানে? তোরা সেখানে কেন গিয়েছিলি মনে নেই?’
আদুরী বলল, ‘তোর কাজিনকে দেখে আমরা সব ভুলে গেছি, শায়েরীর কথা জানি না তবে আমি পুরোপুরি শেষ। আচ্ছা আমাকে কি বিড়ালের মতন লাগে? আমার চেহারা তো কিছুটা লম্বাটে তাহলে আমাকে মার্জারি বলল কেন?’
মৌন চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘তুই বলতে চাচ্ছিস উনি তোকে মার্জারি বলেছেন?’
আদুরী কপালের সামনে পড়ে থাকা ছোট ছোট চুলগুলো কানের পিছনে গুঁজে বলল, ‘রূপের ছটার কথাও বলেছেন। ’
- সিরিয়াসলি? 
শায়েরী এবার মুখ খুলল, ‘তুই কি পাগল মৌন? তুই উনাকে রিজেক্ট করছিস?’
আদুরী শায়েরীর কথা কেঁড়ে নিয়ে বলল, ‘ইশ্ আমাকে তোর চাচা- চাচী আমাকে দেখল না কেন? পুরাই ডিজনি থেকে উঠে আসা প্রিন্স চার্মিং। কি সুন্দর নীল চোখ। তারপর চুল গুলো উফ! সোনালী আর বাদামীর মিশেলে ডিপ ব্রুনেট রঙের। ফেয়ারেস্ট ওয়ান! এই শায়েরী লম্বা পাঁচ ফুট দশ কিংবা এগারো হবে না?’
মৌন নিজের চুল টেনে বলল, ‘হেমায়েতপুর পাঠাতে হবে তোদের। নীল চোখ? কি যা তা বলছিস।’
শায়েরী বলল, ‘হয় তো তোর ভাই লেন্স লাগিয়েছে, আর চুলও কালার করেছে।’
- হাইটও কি চেঞ্জ করে ফেলবে নাকি? বেশি হলে পাঁচ ফুট সাত হবে আর তোরা কিসব বলছিস।
শায়েরী কিছু বলতে যাচ্ছিল তার আগেই মৌন শায়েরীর বইটা দিয়েই শায়েরীকে দু’তিনবার মারল। তা দেখে আদুরী বলল, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে মারিস না। তুই যে কারাটে পারিস জানি তো! আমাদের ওপর এই বিদ্যা ফলাতে হবে না।’
মৌন আদুরীর দিকে এগিয়ে যেতেই আদুরী দৌড়ে পালালো, আর মৌন বলল, ‘তোদের কারও কথা বলতে হবে না, আমি নিজেই বলব।’

(চলবে...)

আরো পড়ুন ‘ফ্ল্যাট নাম্বার নয়ছয়’-এর দ্বিতীয় পর্ব- ধারাবাহিক উপন্যাস : ফ্ল্যাট নাম্বার নয়ছয়

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড