• শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন আজ

‘একদিন রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রের সমপর্যায়ে আমার নাম ঘোষিত হবে’

  সাহিত্য ডেস্ক

১৯ মে ২০১৯, ১০:২১
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

“দেখো,  দুটি ডাল-ভাতের সংস্থান না রেখে বাংলাদেশে কেউ যেন সাহিত্য করতে না আসে।”

-মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

কথাগুলো যে এক ধরনের অসহায়ত্ব আর বেদনা থেকেই বলা সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলা সাহিত্যের অলি-গলিতে ঘুরে বেড়ানো একজন সাহিত্যবোদ্ধা ছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। এক কথায় বাংলা সাহিত্যকে উচ্চ মর্যাদার আসনে নিয়ে গেলেও এই মানুষটিকেই শেষ জীবনে পোহাতে হয়েছে দারুণ অর্থকষ্ট। 

১৯০৮ সালের ১৯ মে বিহারের সাঁওতাল পরগনা,বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দুমকা শহরে জন্মগ্রহণ করেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ঢাকার বিক্রমপুরে। জন্মপত্রিকায় তাঁর নাম রাখা হয়েছিল অধরচন্দ্র। তাঁর পিতার দেওয়া নাম ছিল প্রবোধকুমার আর ডাকনাম মানিক। পিতা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতা নীরদাসুন্দরী দেবী। চৌদ্দ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন অষ্টম। পিতা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তদানীন্তন ঢাকা জেলার সেটেলমেন্ট বিভাগের সাব-রেজিস্টার। পিতার বদলির চাকরির সূত্রে মানিকের শৈশব-কৈশোর ও ছাত্রজীবন অতিবাহিত হয়েছে বাংলা-বিহার-ওড়িষার দুমকা, আরা, সাসারাম, কলকাতা, বারাসাত, বাঁকুড়া, তমলুক, কাঁথি, মহিষাদল, গুইগাদা, শালবনি, নন্দীগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, টাঙ্গাইল প্রভৃতি শহরে। তাঁর মা নীরদাসুন্দরীর আদিনিবাস ছিল পূর্ববঙ্গের গাউদিয়া গ্রামে। এই গ্রামটির পটভূমি তিনি রচনা করেন তাঁর প্রসিদ্ধ উপন্যাস 'পুতুলনাচের ইতিকথা'।

১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মেদিনীপুর জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় এবং ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে বাঁকুড়া ওয়েসলিয় মিশন কলেজ থেকে আই.এস.সি. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিত বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হন।

মানিকের গণিতের অনার্সের তখন আরও এক বছরের মতো বাকি। কলকাতার প্রেসিডেন্সিতে প্রতি সন্ধ্যায় তুমুল আড্ডা হয় রাষ্ট্রনীতি, সমাজ, মার্ক্স, লেনিন, ফ্রয়েড নিয়ে। এরপরই আসে সাহিত্য। ফ্রয়েড আর মার্ক্স পছন্দ করা ছেলেটি সাহিত্য আসতেই চুপ হয়ে যায়। 

একদিন তো কথায় কথায় বন্ধুদের তুমুল আড্ডায় ভেসে আসে 'গণিতের ছাত্ররা আবার সাহিত্যের কি বুঝে রে' ঠাট্টাচ্ছলে বলা কথাটা কানে ভেসে আসতেই ঝাঁঝালো গলায় ও পাশ থেকে জবাব আসে,‘কেন সাহিত্য কি বাঘ ভাল্লুক নাকি?’ 

‘আচ্ছা বাপু তা লিখে দেখাও না দেখি?’ তাচ্ছিল্যভরা সুরে বলা কথাটি সেদিন মানিক যে কতটা আক্রোশে নিয়েছিলেন তা মানিকের পরবর্তী জীবনের দিকে তাকালেই জলের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠে।

সাহিত্যের মায়ায় মানুষটির আর গণিত নিয়ে পড়া হয়ে উঠেনি। অসমাপ্ত ডিগ্রি নিয়ে ছেড়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। আর সেদিন থেকে বাঙলা সাহিত্যের কোলজুড়ে এসেছিল ’মানিক বন্দ্যোপ্যাধায়’ নামে গল্প বলার এক ধ্রুপদী। 

একবারের ঘটনা। 

পরীক্ষায় বরাবর ভালো রেজাল্ট করা মানিক যখন রাজনীতি আর সাহিত্য নিয়ে মেতে উঠলেন সে সময় পরপর দুবার বিএসসিতে ফেল করলেন। তখন পড়াশোনার যাবতীয় খরচ চালাতেন তাঁর বড়দা। ভাইয়ের রাজনীতি করার খবর পেয়ে চিঠিতে লিখলেন, ‘‘তোমাকে ওখানে পড়াশোনা করতে পাঠানো হয়েছে, ফেল কেন করেছ, তার কৈফিয়ত দাও।’’

উত্তরে তিনি লিখলেন, গল্প উপন্যাস পড়া, লেখা এবং রাজনীতি ছেড়ে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।

প্রচণ্ড রেগে গিয়ে দাদা বললেন, ‘‘তোমার সাহিত্য চর্চার জন্য খরচ পাঠানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’’ টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিলেন দাদা।

উত্তরে তিনি লিখলেন, ‘‘আপনি দেখে নেবেন, কালে কালে লেখার মাধ্যমেই আমি বাংলার লেখকদের মধ্যে প্রথম শ্রেণিতে স্থান করে নেব। রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রের সমপর্যায়ে আমার নাম ঘোষিত হবে।’’

নিজের লেখার প্রতি প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী এই মানুষটি তাঁর কথা রেখেছিলেন। এখন তাঁর নাম সাহিত্যে সত্যিই রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রের সমপর্যায়ে উচ্চারিত হয়। 

শিক্ষা জীবনের ডিগ্রি অর্জন করতে না পারা মানিক বন্দোপাধ্যায় কিছুদিন নবারুণ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে এবং পরবর্তী কালে বঙ্গশ্রী পত্রিকার সহসম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি একটি প্রেস ও প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন যা কিছুদিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে মানিক কয়েকমাস একটি সরকারি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে সুরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে কমলা দেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। এ সময় থেকে তাঁর লেখায় কম্যুনিজমের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ১৯৪৬ সালে প্রগতি লেখক সংঘের যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতের দাঙ্গা-বিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন এবং ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন।

জীবনের প্রথমভাগে তিনি ফ্রয়েডীয় মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এছাড়া মার্ক্সবাদও তাঁকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছিল। তাঁর অধিকাংশ রচনাতেই এই দুই মতবাদের নিবিড় প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ব্যক্তিগতভাবে মানিক ছিলেন মধ্যবিত্ত মানসিকতার উত্তরাধিকারী। তাঁর প্রথম গল্পগুচ্ছ 'অতসী মামী' ও অন্যান্য সংকলনে সব কয়টি গল্প এবং প্রথম উপন্যাস দিবারাত্তির কাব্য মধ্যবিত্ত জীবনভিত্তিক কাহিনী নিয়ে গড়া। এছাড়া গ্রামীণ হতদরিদ্র মানুষের জীবন চিত্রও তার বেশকিছু লেখায় দেখতে পাওয়া যায়। 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যে বস্তুবাদের প্রভাব লক্ষ্যণীয়। মনুষ্যত্ব ও মানবতাবাদের জয়গানই তাঁর সাহিত্যের মূল উপজীব্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের ভাঙা গড়ার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবকে তিনি তাঁর সাহিত্যে চিত্রায়িত করেছেন। সমাজের শাসক ও পুঁজিপতিদের হাতে দরিদ্র সমাজের শোষণবঞ্চনার স্বরূপ তুলে ধরেছেন সাহিত্যের নানান চরিত্রের আড়ালে। 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মূলত তার লেখনীতে বিশাল বিস্তীর্ণ নদ-নদীর পটভূমিকায় সাধারণ মানুষের কথা যেমন বস্তুনিষ্ঠ জীবনচিত্র অঙ্কন করেছেন, তেমনি মানুষের কর্মে পিপাসায় জীবনচিত্র তুলে ধরতে গিয়ে আদিমতার অন্ধকারে ফিরে গেছেন বার বার। অদ্ভুত নিরাসক্তভাবে তিনি মানুষের জীবন ও সমস্যাকে দেখেছেন, সমাধানের চেষ্টাও করেছেন বুদ্ধি ও লেখনীতে। নর-নারীর জৈবসত্তা বিকাশের নানাদিক তাকে আকৃষ্ট করেছিল। তার লেখায় জৈবসত্তা ও দৈহিক বর্ণনায় ছিলেন কিছুটা বেপরোয়া প্রকৃতির।

দৈহিকভাবে অসুস্থ হলেও মানসিকভাবে যথেষ্ট বলিষ্ঠ ছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বলিষ্ঠতা রক্তের উষ্ণ-স্রোত উত্তাপ টের পাওয়া যায় তার গল্প-উপন্যাসের চরিত্রের বর্ণনায়, পেশায়, কাজে-কর্মে। মানিকের সাহিত্যাঙ্গনে প্রবেশটা একটা চমক এবং চমক ‘অতসী মামী’ রচনার ইতিহাস, চমক ‘দিবারাত্রির কাব্য (১৯৩৫), ‘জননী’ (১৯৩৫), ‘পদ্মানদীর মাঝি’ (১৯৩৬), ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ (১৯৩৬), ‘অহিংসা’ (১৯৪৮) ও চতুষ্কোণ (১৯৪৩) প্রভৃতি। পাঠকের চেতনাকে নাড়া দিতে পেরেছেন বলেই এগুলো পাঠকের কাছে আদরণীয়।

‘অতসী মামী’ গল্পের মাধ্যমে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যাঙ্গনে যাত্রা। পরবর্তীতে তিনি ‘প্রাগৈতিহাসিক’ ‘সরীসৃপ’ ‘হারাধনের নাতজামাই’ ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’ ‘ফেরিওয়ালা’ ‘বৌ’ ‘সমুদ্রের স্বাদ’-এর মতো জীবন-সমৃদ্ধ শিল্পসার্থক গল্প লিখলেন। তাঁর এই সফলতা ও সার্থকতার কারণ রয়েছে। তাঁর অভিজ্ঞতার পসরা ছিল বিচিত্র ও বিস্তীর্ণ। মধ্যবিত্ত অভিযাত্রিক সচেতনতার মধ্যে জন্ম বর্জিত হলেও বিত্তের অসচ্ছলতার চাপ শিল্পীকে ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করতেই হয়েছে প্রায় আগাগোড়া। এককথায় মানবিক বিশ্বাসের মূলে চিড় ধরেছিল। আসলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন মানব সত্যের প্রাণ ও স্বপ্নপুরুষ।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন অভিজ্ঞতা ছিল ব্যাপক ও গভীর। ফলে তিনি জীবনের দিকটি দেখতেন তার সমগ্রতায়, খণ্ড খণ্ড করে নয়, অখণ্ডতায়। এটি তাঁর প্রধান গুণ এবং লেখক মাত্রেই শ্রেষ্ঠ গুণ। তিনি যেমন ফ্রয়েডীয় মতবাদে প্রভাবিত হয়েছিলেন, ঠিক তেমনি জীবনের, মনুষ্য জীবনের মুক্তি দেখেছিলেন মার্কসবাদে। মার্কসবাদই তাঁকে দীক্ষা দেয়। এই মতবাদেই তিনি জীবন ও জগৎ সম্পর্কে যে বিশ্বাস পোষণ করেন, তাই তাঁর সাহিত্য জীবনের পাথেয়। মনে রাখতে হয়, ব্যক্তিগতভাবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন মধ্যবিত্ত মানসিকতারই উত্তরাধিকারী। তাঁর প্রথম গল্পগুচ্ছ ‘অতসী মামী ও অন্যান্য’ সংকলনে সব কয়টি গল্প এবং প্রথম উপন্যাস ‘দিবারাত্রির কাব্য’ মধ্যবিত্ত জীবনভিত্তিক কাহিনী নিয়ে গড়া। মানিক বন্দোপাধ্যায় যখন কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের মুখে এসেছিলেন, তখন থেকেই বাঙালির মধ্যবিত্ত জীবনে সার্বিক অবক্ষয়ের চেতনা চারপাশ হতে ঘিরে চেপে বসতে চাইছিল। বিশ্বজোড়া মধ্যবিত্ত বৈমানসিকতা বোধের তাড়নায় বাংলা সাহিত্য তখন পীড়িত। পাঠকের অভিজ্ঞতাতেও এ নিয়ে তারতম্য ছিল না। তবু তাঁর অন্তরের আকাঙ্ক্ষা ছিল অন্ধকারের নিরবচ্ছিন্নতাকে উতরিয়ে উত্তরণের পথ খোঁজার। সে জন্যই তিনি চিরস্মরণীয় ও বরণীয়।

১৯৫৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, 

‘ছোটগল্প রচনায় রোমাঞ্চ আছে। এতে গভীর মনঃসংযোগ করতে হয়। এত দ্রুত তালের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে চলতে হয় বলেই মন কখনো বিশ্রাম পায় না। ছোটগল্প লেখার সময়ে প্রতি মুহূর্তে রোমাঞ্চ বোধ করি।’

১৯৫৪ সালে ‘কেন লিখি’ নামে একটি সংকলন বেরিয়েছিল ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের পক্ষে। সংকলনটির সম্পাদক ছিলেন হিরণকুমার সান্যাল ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ‘বাংলাদেশের বিশিষ্ট কথাশিল্পীদের জবানবন্দি’-এই ঘোষণা থাকলেও সংকলনটিতে কথাশিল্পীদের সঙ্গে কবিরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ওই সংকলনটিতে অন্যদের সঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও একটি লেখা লিখেছিলেন। নিতান্তই ফরমাশি রচনা। কিন্তু বাস্তবিকই সেটি ছিল তাঁর অসাধারণ রচনা। তার মধ্যে প্রতিভাসিত হয়েছে শিল্পীমাত্রেই, কিন্তু বিশেষভাবে প্রতিবিম্বিত হয়েছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে। সে রচনার প্রথম চরণ ছিল, ‘লেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায়েই যে সব কথা জানানো যায় না সেই কথাগুলো জানাবার জন্যই আমি লিখি।’

‘আড়াই বছর বয়স থেকে আমার দৃষ্টিভঙ্গির ইতিহাস আমি মোটামুটি জেনেছি।’- এই উক্তিটির মধ্যেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমস্ত শিল্পকর্মের যে সচেতন বুদ্ধির প্রকাশ পায় তাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘কেন লিখি’র তিন বছর পরে ১৯৪৭ সালে, শারদীয় ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘প্রতিভা’ নামে আরেকটি প্রবন্ধ লিখেন। ওই প্রবন্ধে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝাতে চেয়েছেন প্রতিভা কোনো ‘ঈশ্বরপ্রদত্ত রহস্যময় জিনিস’ নয়। বুঝালেন, ‘প্রতিভা আসলে এক। বৈজ্ঞানিক আর কবির প্রতিভায় মৌলিক পার্থক্য কিছু নেই- পার্থক্য শুধু বিকাশ আর প্রকাশে।’ এখানে ‘কবি’ বলতে লেখক শিল্পী মাত্রকেই বুঝিয়েছেন মানিক। আর প্রতিভা জিনিসটা কী?- না, ‘দক্ষতা অর্জনের বিশেষ ক্ষমতা।’ এছাড়া আর কিছুই নয়।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কবিতা লিখেছেন, নাটক লিখেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন; কিন্তু আসলে তিনি কথাশিল্পী, ঔপন্যাসিক ও ছোট গল্পকার। যা তাঁর প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছে।

১৯২৯ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস 'দিবা-রাত্রির কাব্য' প্রকাশিত হয়। তাঁর লেখা বিষয়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ঔপন্যাসিক হিসাবেই চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, 'মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অন্য কিছু নন, তিনি ঔপন্যাসিক।' 

অপরদিকে সুকুমার সেন মনে করতেন, ‘ছোটগল্পগুলিতেই শিল্পী মানিকবাবুর শ্রেষ্ঠ পরিচয় নিহিত।' কারণ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ঔপন্যাসিক হিসাবে সফল নন, বরঞ্চ গল্পকার হিসাবে সফলতা অর্জন করেছেন।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বমোট ৪০টি উপন্যাস এবং ৩০০টি ছোট গল্প রচনা করেছেন। তিনি তাঁর সংক্ষিপ্ত ৪৮ বছরের জীবনকে সম্পূর্ণ উৎসর্গ করেছিলেন সাহিত্যে। 

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত মানিককে বলেছেন, ‘কল্লোলের কুলবধন।’ 

দিনেশরঞ্জন দাশ সম্পাদিত 'কল্লোল' পত্রিকা চলছিল বছর সাতেক। রবীন্দ্রোত্তর তরুণ লেখকদের মুখ্যতম মাধ্যম ছিল এই পত্রিকা। ‘কালিকলম’, ‘প্রগতি’ ইত্যাদি আরো অনেক পত্রিকা ছিল তরুণ সাহিত্যের বাহন। কিন্তু ‘কল্লোল’ এর নামেই আধুনিক উত্তর জৈবিক আধুনিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘কল্লোল’ সম্পর্কে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন শ্রদ্ধাশীল।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবদ্দশায় তাঁর ১৬টি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। গল্পগুলো হলো: 

অতসী মামী (১৯৩৫), প্রাগৈতিহাসিক (১৯৩৭), মিহি ও মোটা কাহিনী (১৯৩৮), সরীসৃপ (১৯৩৯), বৌ (১৯৪০/দ্বিতীয় সং ১৯৪৬), সমুদ্রের স্বাদ (১৯৪৩), ভেজাল (১৯৪৪), হলুদপোড়া (১৯৪৫), আজ কাল পরশুর গল্প (১৯৪৬/দ্বিতীয় সং ১৯৫০), পরিস্থিতি (১৯৪৬), খতিয়ান (১৯৪৭), মাটির মাশুল (১৯৪৮), ছোট বড় (১৯৪৮), ছোট বকুলপুরের যাত্রী (১৯৪৯), ফেরিওলা (১৯৫৩/দ্বি-সং ১৯৫৫), লাজুকতা (১৯৫৪)

মানিকের জীবদ্দশায় তাঁর দুটি গল্পসংগ্রহ প্রকাশিত হয়। সেগুলো হলো: 

১. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৫০) 

২. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বনির্বাচিত গল্প (১৯৫৬) 

আজ অব্দি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁচে থাকলে তার বয়স হতো ১১১ বছর। বাংলা সাহিত্যের এই বরপুত্রের সমগ্র জীবন কেটেছে ভীষণ কষ্টে। শেষ জীবনে ওষুধের পয়সা জোগাড় করতে পারেননি। মানিকের স্ত্রী প্রকাশকের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন। মেলেনি যথার্থ সাহায্য। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে লেখক মৃগী রোগে আক্রান্ত ছিলেন যা পরবর্তী কালে জটিল অবস্থায় গমন করে। দীর্ঘদিন রোগভোগের পর ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী এই লেখক। 

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট 

ওডি/এএন 

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড