• সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

গল্প

একটি কবিতা ও তিনটি চরিত্র

মৌ দাশগুপ্তা

  সাহিত্য ডেস্ক ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০০:১৫

গল্প: একটি কবিতা ও তিনটি চরিত্র

ব্যস্ত যান্ত্রিক মহানগর, ঠাট্টা করে যাকে বলে আনন্দ নগরী – ‘সিটি অফ জয়’, কল্লোলিনী কলকাতা। ঠাসাঠাসি মানুষের ভীড়, যন্ত্রদানবদের অকারণ তর্জন গর্জন, ম্রিয়মান সবুজকে অগ্রাহ্য করে মিশকালো ধোঁয়ার সবল আস্ফালন, রাতে সোডিয়াম লাইটের তীব্র নিয়নের  আলোয় ঝিকিয়ে ওঠে ধোঁয়াটে পিচঢালা পথ। আকাশচুম্বী অট্টালিকার দাপটে নিরীহ আকাশ মুখ ঢাকে অপরিসীম লজ্জায়। তারাঘন রাত বুঝি পথ হারায় যান্ত্রিকতার অমোঘ বিমূর্ত  সময়ে। কারেন্ট চলে গেলে এই শহরের সব বাতি নিভে যায়। আজ কিন্তু তবু সেই কালো মহানগরীর বুকে অতন্দ্র প্রহরীর মত জেগে আছে এই শহরের একটি চিলেকোঠা। আর সেই চিলেকোঠার অন্ধকার অপরিসরে একলা দাঁড়িয়ে আছে বকুল, বকুল আহমেদ। সরকারী অফিসের কলমপেষা বড়বাবু। রাজ্যসরকারী আমলা। চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে তার ঘরের একমাত্র দক্ষিণমুখী জানালাটার পাশে। জানালার বাইরে চেয়ে দেখছে কালো গাছের সিলু্য়েটে থোকা থোকা জোনাক পোকাদের অদম্য উড়ান, অন্ধকার ঘরে একাকী সিগারেটের কুন্ডলিত ধোয়ার ভীড়ে  সে খুঁজে নিচ্ছে তার জীবনের একান্ত দুঃখবিলাস।

চিলেকোঠার এক প্রান্তে পড়ে আছে কবি বকুলের বস্তাবন্দী কবিতার জীবন। অথবা বলা যায় বৃত্তে বন্দী কবিমনের স্বপ্নসুধা। হলিউডের আ্যাকশেন ছবির চিত্রনাটের মতো আজ সে প্রতিনিয়ত নিজেকে নিজে  বদলাচ্ছে । বদলাচ্ছে  তার আমিত্বকে। সিগারেটের জ্বলন্ত ফুলকির সাথে এক এক করে পুড়ে যাচ্ছে তার অনুভবী কবিমনের সব রং। মনে হচ্ছে অনন্তকাল আলোর জন্য অপেক্ষার পর যেন আত্মপোলব্ধী হয়েছে যে `এখন আমার আর কোন অপেক্ষা নেই।' রোজকার শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবনে আজ ঝড় উঠেছে, একলহমায় সে ঝড় উড়িয়ে নিয়ে গেছে ওর মনের শান্তি। বিছানার ওপর পড়ে থাকা বাংলা বিনোদন পত্রিকাটার কবিতার পাতাটা চুম্বকের মত টানছে ওকে, কবিতার নাম- অন্তহীন শৈশব।

‘শৈশব ছিলো বড় অভিমানী,অল্পেই চোখে জল, 
কথা বলবো না আড়ি আড়ি আড়ি 
সহজ দলবদল। 
কৈশোরে ছিল রূপসা নদী, বকুল, যূথীর গন্ধ, 
বুড়ো শিবতলা, তালপুকুর আর 
সুনিবিড় আনন্দ। পুতুলখেলার সঙ্গী ছিলো, 
সকালে কিম্বা রাতে, 
কোনদিন কোন বিভেদ বুঝিনি ধর্ম কিংবা জাতে। 
সাহসী কিশোর ছুঁয়েছিলো মন, 
সুগভীর অনুরাগে, 
নতুন চোখে, নতুন আলোয়, নতুন স্বপ্ন জাগে। 
বাস্তব বড় অচেনা জগত,হিসাব মেলানো দায়, 
যাই ভেবে রাখি এক ফুৎকারে হাওয়ায় উড়িয়ে নেয়। 
শেষ বিকালে হিসাবের ছলে যখন নিজেকে দেখি, 
হাতে রয়ে গেছে শুধু পেন্সিল, বাদবাকি সব ফাঁকি।'

নাসিক শহরে আজ বৃষ্টি নেই। সন্ধ্যার গাঢ় আকাশে কোন তারাও নেই, বোধহয় দল বেঁধে কোথাও বেড়াতে গেছে ওরা।যেমন টানা চারদিন পরে বৃষ্টি থামায় হৈ হৈ করে শপিংয়ে বেরিয়ে গেছে ওর বউ সুধা, সাথে অবশ্য ছেলেমেয়ে দুটোও গেছে। মেজাজটা বিগড়ে থাকায় সঙ্গ দেয়নি আনন্দ। ওর মনের মতই চারপাশে কেমন যেন একটা থম ধরা ভাব । দোতলার পূবমুখী খোলামেলা ঘরটার সবকটা জানালা খুলে দিলেও হাওয়ার নামগন্ধ নেই। মাথার ওপরে ঘুরন্ত  কৃত্রিম হাওয়াটাও  এখন গোঁসাভরে থমকে আছে। ইলেকট্রিসিটি নেই। কদিন ধরেই এমন হচ্ছে,  রাত্তিরে মেঘ ডাকলেই ফুরুৎ হয়ে যায় সে। অনেকদিন পর আজ আনন্দ খুঁজে পেতে সেই পুরোনো হ্যারিকেনটা জ্বালালো । আজ অন্ধকারে থাকতে মন চাইছে না। অথচ এমর্জেন্সী লাইটের ঝকঝকে আলোটাও বড় চোখে লাগছে আজ।  কেমন যেন নিজেকে অস্থির লাগছে। কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে মন খারাপের কালো মেঘ। সাথেআচম্বিতেই ভীড় করেছে কত অজানা,   অস্থির, চিন্তা ধারা। সময়ের সাথে সাথে মানুষের মন বদলায়, আশে পাশে পুরানো কে ভুলিয়ে কত নতুন মুখ আসে, কিন্তু স্মৃতিগুলো বদলায় কিভাবে? স্মৃতির সরণি বেয়ে আজকের কৃতী বাস্তুবিদ আনন্দ দিনভর অহেতুক  নিজেকে খুঁজে ফিরেছে, সোনালী অতীতে, ধূসর বর্তমানে, কিন্তু কিছুতেই কিছু মেলাতে পারেনি।

নিজেকে বড় বেশি একা মনে হচ্ছে আজ। যেন কারো বা কাদের থাকার কথা ছিল ওর পাশে কিন্তু কেউ নেই। কেউ কথা রাখেনি। অভিমানে অনেকদিন পরে চোখ জলে ভরে যায়, নিজের কাছে নিজেকে লুকাতে মুখ তুলে তাকাতে গিয়ে দেয়ালে টাঙান একটা পেইন্টিং এর দিকে চোখ আটকে গেলো। পেইন্টিংটা কাঁচা হাতে আঁকা একটা ফটোগ্রাফের রেপ্লিকা, তবু আনন্দের মনে হয়  আশ্চর্য রকমের একটা দ্যুতি আছে। পেইন্টিং এর কিশোরী মেয়েটির কাপড়ের ভাঁজে, বাঁধা চুলে, আর মুখের হাসিতে অবিশ্বাস্য সজীবতা। ভীষণ চেনা অভিমানী ভ্রূ-ভঙ্গী।  যূথীর পড়ার ঘরের দেরজে রাখা ফ্যামলি অ্যালবাম থেকে  থেকে কৌশলে যূথীর মায়াবী মুখের ছবিটি লুকিয়ে এনেছিল বকুল। যূথী জানতে পেরেছিল অনেক পরে। জেনে খুব  অভিমান করেছিল । কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল দুজনের সাথেই। কেন, তা আনন্দ জানে না ! তবে যূথীর ব্যবহারে নিজের ভুল বুঝে, রাগে - লজ্জায় অথবা কিছুটা নিজের ওপর ধিক্কারে, প্যান্টের পেছনের পকেটের ওয়ালেটের নিভৃত আশ্রয় থেকে ছবিটা বার করে অন্ধকারেই বুড়ো শিবতলার মাঠের খালধারে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে উঠে গেছিল বকুল। চোরের মত চুপিসারে সে ছবি কুড়িয়ে নিয়েছিল আনন্দ। একটু পরেই ফেরত এসে পাগলের মত অন্ধকার মাঠ হাতড়াতে শুরু করেছিল বকুল,ছবিটা পকেটে রেখেও অজানা কুন্ঠায় আর বুকের ভেতর রক্ত ছলকানো গোপন আনন্দে সেটা বন্ধুকে ফেরত দিতে পারেনি আনন্দ। ছবিটা খুঁজে না পেয়ে হতাশ হয়ে কান্নায় বকুলের ভেঙ্গে পড়াটা আজও স্পষ্ট চোখের সামনে দেখতে পায়। এতদিন সাফল্যের পিছনে ছুটতে ব্যস্ত যান্ত্রিক মনে অতীতের কোন ছায়াটুকু ছিল না। আজ একটা বাংলা ম্যাগজিনের এক ছোট্ট কবিতা ওর রোজকার ধরাবাঁধা জীবনটায় ঝড় তুলে দিয়েছে। 

 হ্যারিকেনের স্বল্প আলোতেই আবার ‘অন্তহীন শৈশব’ কবিতাটা পড়তে আরম্ভ করে। আচমকাই সমুদ্র পাড়ের হু হু বাতাসের তীব্রতা বাড়ে। ফাজিল দমকা সামুদ্রিক হাওয়া সদ্য তরুণী জুনের গায়ের বাসন্তী ওড়নাটা উড়িয়ে নিয়ে কাছেই ঝাউগাছটার ডালে ঝুলিয়ে দেয়। কাছেই হোস্টেলের বন্ধুরা বিচভলি খেলছিল।  হইহই রবে তারা হাততালি দেয় । সোনিয়া সিটি দিয়ে ওঠে। রুমমেট অন্তরা খেলা ছেড়ে এসে ওড়নাটা হাতে দিয়ে যায়। তার ভাবনায় ছেদ পড়ে। লক্ষ্য করে, এই পড়ন্ত বেলায় কমলা আকাশে চুপিসারে ভীড় জমাচ্ছে কালো মেঘ। ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপ্টা লাগছে চোখেমুখে।দেখতে দেখতে ঝুপ করে কাঙ্ক্ষীত সন্ধ্যা নেমে আসে।নীল আরব সাগরের বুকে, সোনালী বালুতটে, পিচঢালা রাস্তায়, জনাকীর্ণ ঝুপড়িতে, ক্যাসুরিনা ঝাউয়ের পাতায়, সবুজ দূর্বার ডগায়। চুপ করে বসে নির্বিকার ঘোরগ্রস্থর মত পৃথিবীর বুক থেকে সূর্য্যের আলোর শেষরশ্মিটাকে মুছে যেতে দেখে সে। বন্ধুরা ডাকলেও তাদের সাথে পানপুরী- ভেলপুরীর দোকানের লাইনে দাঁড়াতে ইচ্ছা করেনা তার। জুনের রাগত মেজাজ দেখে বন্ধুরাও জোরজার করে না। নোনাবালিতে আধডোবা এক পাথরের ওপর পা ঝুলিয়ে অলস ভঙ্গিতে সে বসে থাকে। হঠাৎই একটি ঢেউ তার পায়ের পাতা ভিজিয়ে দিয়ে যায় । তার হৃদয়ও ভিজে যায়। হৃদয় ভেজা এই অনুভূতির নাম তার অজানা। মাকে মনে করে সকাল থেকে নীরবে রক্ত ঝরছে তার সদ্য মা-হারা হৃদয়ে।এবার মায়ের শেষ কাজ সেরে হোস্টেল ফেরত আসার আগে মায়ের নিজস্ব আলমারীতে বিয়ের শাড়ীটার ভাঁজে যত্ন করে তুলে রাখা মায়ের ডায়েরীর পাতায় লেখা কবিতাগুলো তার চিরপরিচিত মাকে নতুন করে চিনতে শিখিয়েছে জুনকে। তার থেকে একটা পাঠিয়েছিল নামকরা এক বাংলা ম্যাগাজিনের কবিতার পাতায়, আর ওকে হতবাক করে সম্পাদকের সম্মতিসূচক চিঠি আসার পর থেকেই ওর সাগ্রহে দিন গোনা শুরু হয়েছিল। আজ তার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। ছাপার অক্ষরে ম্যাগাজিনের কবিতার পাতায় মায়ের নামটা এক অদ্ভুদততৃপ্তি দিয়েছে ওকে। মায়ের কথা মনে পড়তেই আবার এক ভীষণ মন কেমন করা অনুভূতিতে দুচোখ জ্বালা করে জলে ভরে আসে। ঘাড় তুলে আকাশে ফুটে থাকা তারার ভীড়ে কি যেন খোঁজার চেষ্টা করে জুন।  ওর অজান্তেই দু’গাল বেয়ে মুক্তোর দানার মতো অজস্র বৃষ্টি বিন্দু ঝরে ঝরে পড়ে। আর কান্নায় কাঁপতে থাকা ঠোঁটের আগল খুলে দিয়ে এক ধাক্কায় তখন একটা ভীষণ পরিচিত শব্দ ছিটকে বেরিয়ে আসে।
         - ‘মা!'

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড