• বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০, ৭ কার্তিক ১৪২৭  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বুক রিভিউ : সেই রাতে পূর্ণিমা ছিল

  কাজী সায়েম রহমান

১৮ জুন ২০২০, ২০:৫৮
করোনা
ছবি : সংগৃহীত

শহীদুল জহীরের লেখা “সেই রাতে পূর্ণিমা ছিল” উপন্যাসটি নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে অদ্যবধি বাংলা সাহিত্যে রচিত যুগান্তকারী উপন্যাসসমূহের তালিকায় প্রথম সারিতে স্থান করে নেয়া এক অতুলনীয় কালজয়ী সাহিত্য। সম্পূর্ণ রচনায় বাংলার গ্রাম্যরসের এক পৌরাণিক আবহ গড়ে ওঠে। মনে হয় যেন বাংলার প্রত্যন্ত কোন গ্রামাঞ্চলে যেখানে আজও বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, সে গ্রামের কোন এক শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সহস্র বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এক প্রবীণ বটগাছ। আর সেই চিরন্তন নিরন্তর অস্তিত্বশীল বটগাছের গোড়ালিতে একদল জটলাপাকা মানুষ জড়সড় হয়ে বসে আছে। আর সেসব শ্রোতাকে সামনে রেখে জ্যোৎস্নাময়ী মধ্যরাত্রির নিস্তব্ধতা ভেদ করে শহীদুল জহির বলে চলছে তার গল্প।

প্রগলভতার মত গড়বড় করে বলে চলা তার গল্পে চোখে মুখে কেমন ঘোর লেগে যায়। সেই গভীর রাত, গোলাকৃতি মস্তবড় সেই পূর্ণিমার চাঁদ, গ্রামের কাঁচা মাটির সরু পথ, রউহার নদী, বাঁশঝাড়ের তলায় সারি সারি কবর, গ্রাম্য জীবনে স্বার্থের দায়ে জীবনমুখী সব রাজনীতি। আর হাজারও সব মিথ। সেসব মিথ কালের নিরিখে মিথ্যা হলেও সেসবই ছিল যেন গ্রামবাসীর প্রাত্যহিক জীবনের এক পরম সত্য অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিংবা ধাঁধাঁ ধরে যায় মনে, হয়ত সেসবই ছিল সত্যিকারের কোন সত্য।

হঠাৎ মফিজুদ্দির নিজ হাতে কাটা খাল বেয়ে ছয়-ছয়টি নৌকা আসে রাতের অন্ধকারে সুহাসিনী গ্রামের ভেতরে। পরদিন মিয়াবাড়ির আঙিনায় সারি হয়ে পড়ে থাকে ২০টি কিংবা তার কিছু কম কিংবা তারও কিছু অধিক লাশ। এরপর গল্প এই মর্মান্তিক মুহূর্ত থেকে আগ-পিছ করে সময়ের খাঁজে খাঁজে চলে যায় বিভিন্ন ঘটনায়। সমাবেত গ্রামবাসীরা হয়ত তখন গুনগুন তুলে মফিজুদ্দির ১১১ বছরের পূর্বনির্ধারিত আয়ুর কথা বলে। তাদের মনে পড়ে যায় কিভাবে মফিজুদ্দির বাবা জংলার ভেতরে হঠাৎ একদিন কুড়িয়ে পেয়েছিল মফিজুদ্দির বোবা মাকে কিংবা কিভাবে মফিজুদ্দির জন্ম হল এক রাতের ভরা পূর্ণিমায় নির্জন কুঁড়ে ঘরের আঙ্গিনায়। কখনও গল্প ওঠে চন্দ্রাভানের নিশির ডাকে দিনের পর দিন রাত্রির অন্ধকারে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে নগ্ন হয়ে রউহার বিলে ডুব দেয়ার ঘটনা। কখনও কথা ওঠে কিভাবে সুহাসিনী গ্রামের হর্তাকর্তা হয়ে ওঠে মফুজুদ্দি, সাথে লোকেরা এও জানত ঐ রাতেই নির্জন নৌকায় মফিজুদ্দি মারা পড়ত দুই আততায়ী খুনির হাতে যদিনা সেই রহস্যময়ী গণিকা নিজের প্রান বিসর্জন দিয়ে বাঁচিয়ে না তুলত মফিজুদ্দিকে।

সেই গনিকার নামেই নামকরণ করেছিল মফিজুদ্দি নয়নতারার হাটের। মফিজুদ্দির ১৪ জন ছেলে। তাদের গ্রাম্য পারিবারিক জীবন, রাজনৈতিক জীবন অথবা ব্যক্তি জীবন প্রান পেয়ে ওঠে সুহাসিনীর গ্রামবাসীর স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে। এরপর কালের স্রোতে ভেসে আসে এক-একটি অবিস্মরণীয় চরিত্র, একের পর এক মিথ জন্ম নেয় সুহাসিনীর বুকে। মফুজুদ্দি মিয়ার বামপন্থী কনিষ্ঠ ছেলে রফিকুলের মৃত্যু, তার মৃত্যুরও বহুদিন পর রোকেয়া হলে বসে তার প্রেমিকা আবিষ্কার করে নাম না জানা এক ভালবাসার সে ঢল প্রবাহ। দীক্কের হাতে কয়লা ঘসে আঁকানো আলেকজানের স্কেচ।আবার সেই স্কেচের কারনেই হয়ত একদিন আলেকজান ধর্ষিত হয়েছিল পাক আর্মির হাতে। আর তার ধর্ষিত হওয়ার কারনেই হয়ত সিদ্দীক মাষ্টার গেল মুক্তিযুদ্ধে।সুহাসিনীর আকাশে শেষ অবধি পূর্ণাঙ্গ চাঁদ হয়ে যেন গ্রামময় জোৎস্না ছড়িয়ে যায় দুলালি নামের কৃষ্ণবর্ণা মেয়েটি।মফিজুদ্দির ছেলে নাসিরুদ্দিনের কাছে খাসি করার জন্যে সে মোরগ নিয়ে যেত।সেখান থেকে দুইয়ে দুইয়ের সাথে মিষ্টি প্রতারনা, আঘাত-প্রতিঘাত, তা থেকেই অজান্তে অব্যক্ত প্রেম, বলতে না পেরে একের পর এক চিরকুট দিয়ে যায় দুলালি।শেষটায় এক বিরহের ঘোরে টানা পাঁচদিন বৃষ্টির তোপে ঘরবন্দী হয়ে পড়ে থাকা দুলালি আত্মহত্যা করে। কিন্তু তার শেষ ইচ্ছা ছিল গৃহত্যাগী নাসিরুদ্দিন ফিরে এসে তার মুখ না দেখা পর্যন্ত যেন তার কবর না দেয়া হয়।

এরপর গ্রাম্য কলহ, আচার, বিবাদ সব ছাপিয়ে ঢাকা থেকে টেনে আনা হয় নামিরুদ্দিনকে এবং হয়ত ৫ দিন কিংবা তারও বেশি কিংবা তারও কিছু কম সময় বাদে কবর হয় দুলালির আর গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী হয় নাসিরুদ্দিন। কত কত সব ঘটনা টানা-পোড়ান ওঠা-নামার পরেও চলতে থাকে সুহাসিনীর মানুষগুলোর জীবন। চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ইদ্রিস খানের হাতেই হয়ত ১১১ বছর আয়ু নিয়ে আসা মফিজুদ্দি মিয়া সপরিবারে মাত্র ৮০ বছর বয়সেই মারা যান সেই পূর্ণিমার রাতে। লাশের স্তূপ পড়ে যায় সে রাতে মিয়া বাড়ির আঙিনায় আর সে রাতে পূর্ণিমা ছিল বটে।

শহীদুল জহীরের গল্প বলার ভঙ্গি একদম স্বতন্ত্র। এই উপন্যাসে মনে হয়েছে অসাড় চৈতন্যলোপ প্রায় কোন ব্যক্তি অনর্গল একটানে বলে যাচ্ছে সেই সুহাসিনী গ্রামের গল্প। একই কথার বার বার উক্তি করা আর তা কেমন জাদুমন্ত্রের মত যেন টেনে হিঁচড়ে পাঠককে নিয়ে চলে সুহাসিনীর মাঠে-ঘাটে নদী-বিলে ক্ষেতে-জঙ্গলে, নিয়ে যায় গল্পের অতল গহীন রাজ্যে। সে গল্পের নেশায় আমাদেরও কেমন টলমল নেশা ধরে যায়। মনে হয় আমরাও হয়ত ঘর ছেড়ে ছাদে গেলেই দেখতে পারব মস্ত বড় এক পূর্ণিমার চাঁদ, যে কিনা সহস্র রাতের গল্প বুকে আগলে নিয়ে আজও আকাশের বিষণ্ণ নীলাভ-কালচে জমিনে মায়া-মোহে বিমোহিত করে রেখেছে আমাদের অথবা তোমাদের অথবা সুহাসিনীর গ্রামের মানুষগুলোকে।

গ্রন্থ পর্যালোচনা- কাজী সায়েম রহমান

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: +8801703790747, +8801721978664, 02-9110584 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড