• মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

পাহাড়, পানি আর সবুজের টানে (পর্ব - ০১)

  ইমাম হোসেন

১৫ জুলাই ২০১৯, ১৬:৩৬
পাহাড়
মেঘ আর সবুজে চোখ জুড়াতে ছুটে গিয়েছিলাম পাহাড়ে। (ছবি : ইশতিয়াক আবীর)

বছর দেড়েক আগে ঠিক করেছিলাম রাঙামাটি যাবো। তারপর কত জায়গা গিয়ে ঘুরাঘুরি করলাম কিন্তু রাঙামাটি আর যাওয়া হলো না। রাঙামাটি রাঙামাটি করতে করতে অবস্থা এমন এসে দাঁড়িয়েছে, আমার আশেপাশের মানুষগুলো আমার মুখে রাঙামাটির নাম শুনলেই এমন ভাবে আমার দিকে তাকায় দেখলে মনে হয় এখনই আমাকে পুকুরে চুবানি দেবে।

হুট করেই দেখি গগন ভাই আর রাফা ব্যাগ গুছিয়ে রেডি। আবীরকে বললাম, ওকে তাহলে চলেন রাঙামাটি থেকে ঘুরে আসি। কিন্তু তখনো আমি কনফিউজড। রাফা আর গগণ ভাইয়ার তৎপরতা আর উৎসাহ দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েই নিলাম রাঙামাটি যাবো। কিন্তু তার আগে আগামী ৬ দিনের কাজ সেরে তারপর ঢাকা ছাড়তে হবে।

ব্যাগ গুছিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে গিয়ে যখন কাউন্টারে পৌঁছলাম তখনই আমাদের বাসে এসে দাঁড়ালো। আমি রাফা আর গগণ ভাই উঠলাম কল্যাণপুর থেকে। আকাশ আর আবীর ভাই ধানমন্ডি ৩২ থেকে উঠবে। ধানমন্ডি ৩২ এ এসে দেখি সেখানে আমাদের বিদায় দিতে হাজির মুরাদ ভাই আসলাম ভাই সোহেল ভাই। সোহেল ভাইয়া আমাদের সাথে টিটি পাড়া অবধি যাবেন। এই ছোট বাস আমাদের নিয়ে যাবে টিটি পাড়া সেখান থেকে রাত ১০.৪৫ এ আমাদের রাঙামাটির বাস ছাড়বে।

টিটি পাড়া পৌঁছে মনে হলো পাশেই তো এপি আপুর বাসা। অমনি কল করলাম এপি আপুকে। কয়েক মিনিটের মধ্যে সাইকেল নিয়ে হাজির এপি আপু। বেশ কয়েকদিন পর আপুর সাথে দেখা, কোন গল্প ছেড়ে কোন গল্প করি।

সত্যিই তখন অভিযাত্রীকে মিস করছিলাম। রাত ১০.৪৫ আমাদের বাস এসে হাজির। কিন্তু তার আগে সোহেল ভাইয়াকে একশো রকম অফার দিলাম, নাহ্ তাকে আর রাঙামাটি নিতে পারলাম না।

পাহাড়

কবে থেকে অপেক্ষায় ছিলাম এমন দৃশ্য দেখবো বলে। (ছবি : ইশতিয়াক আবীর) 

আমাদের বাস যখন চলতে শুরু করলো তখন অবধি জানি না রাঙামাটি কতদিন থাকবো, কোথায় কোথায় যাবো, শুধু দুইটা ব্যাপার জানি। সকালে বাস থেকে নেমে ভাইয়ার বাসায় যাবো। আইরিন দিদির বাড়ি যাবো। গাড়ি ঢাকা চিটাগং হাইওয়েতে,আমি গগণ ভাই পাশাপাশি বসে আছি। আমি বারবার পিছু ফিরে দেখছি মিটিমিটি আলো গুলো দ‚র থেকে দ‚রে যাচ্ছে,শহরের কোলাহল আর গরম বাতাস দ‚রে ঠেলে নিস্তব্ধ এক ঠান্ডা বাতাস এসে গেয়ে লাগছে। কুমিল্লায় বিরতির পর গাড়িতে উঠে ঘুম,ঘুমের মধ্যেই ঠিক পাচ্ছি একবার ডানে হেলে যাচ্ছি আবার বামে হেলে যাচ্ছি।

চোখ বন্ধ করেই মোবাইল বের করলাম। ৪.৫১ বাজে,বাইরে তাকিয়েই দেখি আবছা আলোয় পাহাড়। আবছা মায়াবি আলো তার মধ্যে আঁকাবাঁকা পথে গাড়ি ছুটে চলছে। আবার কখন জানি তন্দ্রা চলে এসেছে। হুট করে তাকিয়ে দেখি রাফা আর আবীর পাহাড় দেখছে। আমিও যোগ দিলাম তাদের দলে। ৫.১০ বাজে মানিক ছড়ি বাজার পার হচ্ছি। আমাদের বাস এখন উপরে আরো উপরে উঠছে। ডানে খাড়া পাহাড়, বামে গভীর খাদ এর মধ্যের আমাদের পাইলট যেভাবে গাড়ি চালাচ্ছে তাতে বুকের মধ্যে ধুকপুক করছে। খাদের নিচে বিদ্যুতের খুঁটি দেখে একটু কৌতুহল হলো। ভালো করে খেয়াল করে দেখি নিচে ঘরবাড়ি। যদিও ঘরবাড়ি গুলো খেলনার মতো লাগছে। কিন্তু বুঝলাম এখানে মানুষের বসবাস।

বাস শহরের মধ্যে ঢুকলো ১০ মিনিটের মধ্যেই। শহরের মধ্যেই আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু পথ। রাস্তার দুই পাশে সরকারি অফিস, কোনো ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে না, কিছু দূর পরপর গলি রাস্তা নিচে নেমে গেছে। পুরনো একটা স্কুল চোখে পরলো, রানী দয়ামনী উচ্চ বিদ্যালয়।

আমরা এসে নামলাম লেকার্স স্কুলের গেটে। কিন্তু আশেপাশে কোনো স্কুল দেখছি না। বড় একটা সাইনবোর্ড দেখলাম, সেখান থেকে একটা রাস্তা নেমে গেছে। আমরাও নামছি, কিছু দূর নেমে দুই দিকে রাস্তা,বামে জেলা শিক্ষা অফিস। আমরা গেলাম ডানে কিন্তু আরো নিচে আরো নিচে। হায়রে, উপরে ওঠার সময় তো খবর আছে।

নৌকা

এই নৌকাতে করেই পাড়ি জমিয়েছিলাম কাপ্তাই লেকে। (ছবি : ইশতিয়াক আবীর) 

আমরা যখন ভাইয়ার বাসায় পৌঁছলাম তখন ৫.২৫ বাজে। মুত্তাকীন (ছোট ছেলে) দুই দিন ধরে খুব আনন্দে আছে কখন চাচ্চু আসবে? চাচ্চু আসছে না কেন? বেচারার রাত থেকে জ্বর।
সবাই ফ্রেশ হচ্ছে। আমাদের রুম পূর্ব দিকে, দক্ষিণে বড় জানালা পর্দা সরিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। ভাইয়ার বাসা চার তলায় তারপর কাপ্তাই লেক আর তিন দিকে পাহাড়।

দূর পাহাড়ে মেঘ জমেছে। আহা এই একটা রুমে থাকব অথচ আমি চার বছর ধরে রাঙামাটি আসবো আসবো করে আসিনা। সবাই ফ্রেশ হচ্ছে। আমি আর ভাইয়া বেরুলাম বাইক নিয়ে। এই শহরে বাইক চালানো একটা বড় চ্যালেঞ্জ। শহীদ মিনার, ডিসি হিল, পুরানো বাসস্ট্যান্ড, পৌরসভা সব ঘুরে বাসায় এসে দেখি তখনও সবাই রেডি হতে পারিনি। আসলে রেডি হয়ে কী হবে আমরা যাবো কোথায়? ভাইয়া বললেন তোমরা আজ "বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সি আবদুর রউফ" এর সমাধি থেকে ঘুরে আসো।

ভাইয়া ট্রলার ড্রাইভারকে কল করলেন। তিনি আসবেন ৯.০০ টার সময়। আমরা ডাইনিং রুমে গিয়ে নাস্তা করতে বসলাম। বড় জানালার সাথে ডাইনিং টেবিল। জানালা দিয়ে তাকালে পানি পাহাড় আর মেঘ। নাস্তা করবো না বাহিরে তাকিয়ে থাকবো এটাই ভাবার বিষয়। জীবন অসম্ভব সুন্দর...

ট্রলার চলে এসেছে। ভাবি পানি দিয়ে দিলেন। বাসার নিচেই ঘাট। এখানে একটু পরপর ঘাট। আমরা ঘাটে গিয়ে অবাক হয়ে একবার ভাইয়া দিকে তাকাই আর একবার ট্রলারের দিকে। এটাকে ট্রলার বলবো না অন্যকিছু বলবো। দুই তলা এত বড় একটা ট্রলার আমরা মানুষ মাত্র পাঁচ জন। কম করে ২০ জন খুব অনায়াসে এখানে চরতে পারবে।
আমাদের ট্রলার ছাড়লো। ভাইয়া ঘাটের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আমাদের ছবি তুলছেন। আমাদের ট্রলার দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে।

আমরা যাচ্ছি নানীয়ার চর উপজেলার দিকে। চারদিকে অথৈ পানি,মাঝে মাঝে ছোট ছোট টিলা। এই টিলা গুলো বর্ষায় ডুবে যায়। রাঙামাটি শহর থেকে এদিকের কোনো উপজেলায় যাওয়া আসার সহজ মাধ্যম ট্রলার। কাপ্তাই লেকের স্বচ্ছ পানি মোটেই আমাকে আনন্দ দিচ্ছে না। নীল আকাশ ভর্তি সাদা মেঘের ভেলা, দূরে পাহাড়,মাঝে মাঝে পাহাড় ঘেসে কালো মেঘ। মনের মধ্যে কেমন এক অস্থিরতা কাজ করছে। আবীর একটা নিশ্বাস ছেড়ে বললেন,’ইমাম ভাই,এই কাপ্তাই লেক নিয়ে কাউকে কখনো কথা বলতে শুনিনা।‘

পাহাড়

পৌঁছে গেছি গন্তব্যে। (ছবি : ইশতিয়াক আবীর) 

ডানে ছোট্ট একটা টিলা পানির মধ্যে মোটা কালো গাছের গুড়ি বেড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে সেই গাছ চিৎকার করে আর্তনাদ করছে। বলছে, দেখো কিভাবে আমাদের হত্যা করা হয়েছে। আসলেই আমরা কতজন কাপ্তাই লেক সম্পর্কে জানি। একটা কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে একটা সভ্যতাকে ধ্বংস করা হয়েছে। ৫৪ হাজার একর কৃষি জমি পানির নিচে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। ২৫৪ বর্গমাইল বনাঞ্চল পানিতে ডুবে ধ্বংস হয়ে গেছে। ১৮ হাজার পরিবারের প্রায় ১ লক্ষ মানুষ বাস্তুহারা হয়েছিলো।

আমাদের ট্রলার ভেসে যাচ্ছে নিশ্চয়ই কোনো একটা কোলাহল মুখর জনপদের উপর দিয়ে। নিশ্চয়ই এখানে কোনো একটা বাড়ির উঠোন ছিল। সেই উঠানে দুরন্ত কিশোর কিশোরীরা তাদের শৈশবের দুরন্তপনায় মেতেছিলো। পানিতে হাত দিয়েই শিউরে উঠছি। যেন শত সহস্র হাত আমাদের হাত স্পর্শ করতে চাইছে। আমাকে বলছে দেখো এখানে আমার সাজানো সোনার সংসার ছিল। এখানে লাউয়ের মাচা ছিল। এই রাস্তার মোড়ে আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। আশেপাশে অনেক ট্রলার বিভিন্ন পাহাড়ের দিকে ভেসে যাচ্ছে। স্কুল কলেজ ইউনিফর্ম পরা ছেলেমেয়েরাও আছে। কেউ বাজার করে ফিরছে। আমরা যাচ্ছি নানীয়ারচর কদম তলী। যেখানে শায়িত আছেন আমাদের বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ।

১০.৪০ নাগাদ কদমতলী এসে পৌঁছলাম। একদম জনমানব শূন্য উঁচু টিলার উপরে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তিনি। ৮ এপ্রিল ১৯৭১। পাকিস্তানি বাহিনীর দুই কোম্পানি সৈন্য মর্টার, মেশিনগান ও রাইফেল নিয়ে বুড়িঘাটের মুক্তিবাহিনীর নতুন প্রতিরক্ষা ঘাঁটিকে বিধ্বস্ত করতে সাতটি স্পিডবোট এবং দুইটি লঞ্চ নিয়ে এগিয়ে আসতে থাকে। এটি ছিলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের কোম্পানি।

কবর

এখানেই ঘুমিয়ে আছেন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ। (ছবি : ইশতিয়াক আবীর) 

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ঘাঁটির কাছাকাছি পৌঁছেই পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ শুরু করে। স্পিডবোট থেকে মেশিনগানের গুলি এবং আর লঞ্চ দুইটি থেকে তিন ইঞ্চি মর্টারের শেল নিক্ষেপ করছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের দিকে। পাকিস্তানি বাহিনীর উদ্দেশ্য ছিলো রাঙামাটি-মহালছড়ির জলপথ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের পিছু হটিয়ে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা।

অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারাও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পরিখায় অবস্থান নিয়ে নেন। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর গোলাগুলির তীব্রতায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙ্গে যায় এবং তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করে ফেলে। যুদ্ধের এই পর্যায়ে প্রতিরক্ষা ঘাঁটির কমান্ডার মুন্সি আব্দুর রউফ বুঝতে পারলেন, এভাবে চলতে থাকলে ঘাঁটির সকলকেই পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে মৃত্যু বরণ করতে হবে।

মুন্সি আব্দুর রউফ তখন কৌশলগত কারণে পশ্চাৎপসারণের সিদ্ধান্ত নিলেন। এই সিদ্ধান্ত সৈন্যদের জানানো হলে সৈন্যরা পিছু হটতে লাগল। পাকিস্তানি বাহিনী তখন আরো এগিয়ে এসেছে, সকলে একযোগে পিছু হটতে থাকলে আবারো একযোগে সকলকেই মৃত্যুবরণ করতে হতে পারে ভেবে আব্দুর রউফ পিছু হটলেন না।

সহযোদ্ধাদের পিছু হটার সুযোগ করে দিতে নিজ পরিখায় দাঁড়িয়ে অনবরত গুলি করতে লাগলেন পাকিস্তানি স্পিডবোটগুলোকে লক্ষ্য করে। পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে একা কৌশলে লড়ছিলেন তিনি। সাতটি স্পিডবোট একে একে ডুবিয়ে দিলে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের দুটি লঞ্চ নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। লঞ্চ দুটো পিছু হটে রউফের মেশিনগানের গুলির আওতার বাইরে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেয়।

পাকিস্তানি বাহিনী এরপর লঞ্চ থেকে মর্টারের গোলাবর্ষণ শুরু করে। মর্টারের গোলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা রউফের একার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। একটি মর্টারের গোলা তাঁর বাঙ্কারে এসে পরে এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর আগে সহযোগী যোদ্ধারা সবাই নিরাপদ দ‚রত্বে পৌঁছে যেতে পেরেছিলো। সেদিন আব্দুর রউফের আত্মত্যাগে তাঁর কোম্পানির প্রায় ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধার জীবন রক্ষা পায়।

আরও পড়ুন : পাহাড়, পানি আর সবুজের টানে (পর্ব - ০২)

সবাই গিয়ে দাঁড়ালাম সমাধিসৌধের সামনে। সারা শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। দৃষ্টি সীমা যতদূর যাচ্ছে শুধু পানি আর পাহাড়। জনমানবহীন একটা ছোট দ্বীপে শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন। ভীষণ রকম কান্না পাচ্ছে। আজকাল নিউজ পড়তে ভয় লাগে। না জানি কী নৃশংসতার খবর পড়তে হয়। কার জন্য এই বীর এমন জনমানবহীন এমন জায়গাতে শুয়ে আছেন। কিসের জন্য সেই দিন নিজে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে ১৫০ জনকে বাঁচিয়েছিলেন তিনি। এই বাংলাদেশ দেখার জন্য...

এখন এটার দেখাশোনা "বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ" করে থাকে। সমাধিসৌধের পাশে জাম জলপাই গাছ। জাম পেকে শুকিয়ে গেছে। এখানে মানুষ আমরা মাত্র পাঁচজন। পাশের আর একটা টিলা সেখানে গেছে রাফা। তারা হাঁকডাকে সেদিকে পা বাড়াব এমন সময় একজন ছোট্ট একটা নৌকাতে করে এসে নামলেন ওখানে।

কবর

এই জায়গাটি ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। (ছবি : ইশতিয়াক আবীর) 

পাশে জাম গাছ। ছোট ছোট জাম ধরে আছে। তিনি বললেন,’এই জাম খাওয়া যায়। আপনার খান।‘ কেমন এক শূন্যতা এসে ভর করছে জানিনা। নৌকা থেকে নামা ব্যক্তির নাম 'দেবব্রত চাকমা’। তিনি আর তার ভাই এখানে চাকরি করেন। তার চাচাই প্রথম সনাক্ত করেন আব্দুর রউফ এর কবর। চাচার এই অবদানের ফলে তাদের এই চাকরি। ছোট্ট একটা টিনের ছাউনি ঝড় বৃষ্টির সময় এটাই তার আশ্রয়। পানি খাবার সব সাথে করে নিয়ে আসেন। এখানে একটা পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স হবে বলে জানালেন তিনি।

তার সাথে কথা বলছি আর মুগ্ধ হচ্ছি। এই পাহাড়ে তার বসবাস। চাষবাস বলতে যা হয় তাও প্রকৃতির উপরে নির্ভর করে। তার চোখে মুখে গভীর দীর্ঘশ্বাস। যথেষ্ট সচেতন, সমসাময়িক রাজনৈতিক ও পাহাড়িদের নিয়ে। দেবব্রত খুব আফসোস করে বললেন, ‘এখানে একজন শহীদ শুয়ে আছেন অথচ এখানে অনেকে জুতা পায়ে ওঠে। কেউ সমাধির উপরে উঠে বসে ছবি তুলে।‘ তার এই সচেতনতায় মুগ্ধ হলাম।

অনেক বিষয় নিয়েই গল্প হলো রাফা, গগণ ভাই আর দেবব্রতের। আসার সময় উনার সাথে ছবি তুলতে চাইলে তিনি সবিনয়ে জানালেন, আমার পোশাকে ময়লা লেগে আছে,সরি এই অবস্থায় ছবি উঠবো না। তার এই ব্যবহার,তার বিনয় দেখে বেগ ভাইয়া কথা মনে হল। ভাইয়া আসার সময় বলেছিলেন,’ইমাম পাহাড়িদের কাছে অনেক শেখার আছে জানার আছে। আমি নিশ্চিত আপনি মুগ্ধ হবেন।‘ হ্যাঁ দারুণ এক মুগ্ধতা নিয়ে টিলা থেকে নামতে শুরু করলাম।

ট্রলার চলতে শুরু করেছে। দূরে দেবব্রত চাকমা দাঁড়িয়ে আছেন। দূর আরো দূরে চলে যাচ্ছি। চোখ ফেরাতে পারছি না। শান্তিতে ঘুমান বীর... জানিনা পরের প্রজন্ম আপনার এর আত্মদান কিভাবে স্বীকার করবে তবে আপনার জন্যই আজ আমি বাংলাদেশী।

চলবে... 

ওডি/এসএম

দেশ কিংবা বিদেশ, পর্যটন কিংবা অবকাশ, আকাশ কিংবা জল, পাহাড় কিংবা সমতল ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা অথবা পরিকল্পনা আমাদের জানাতে ইমেইল করুন- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড