• শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১  |   ৩৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ঘুরে এলাম ভুর্সবার্গ

  রহমান মৃধা

০৩ আগস্ট ২০২৩, ১৪:২৭
ঘুরে এলাম ভুর্সবার্গ
ভুর্সবার্গে ফাইজারের প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের সাবেক পরিচালক রহমান মৃধা (ছবি : সংগৃহীত)

সুইডেনের স্টকহোম আরল্যান্ডা এয়ারপোর্ট নতুন করে মেরামত করছে। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সিকে ব্যবহার করে যাত্রীর ভোগান্তি কমানো থেকে শুরু করে সবকিছু যাতে আরও নিরাপদ এবং দ্রুতগতি সম্পন্ন হয় সেটাই মূল লক্ষ্য। আমাদের ছেলে জনাথান গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জার্মান বুন্ডেসলিগা টেনিস খেলছে হায়ার প্লেয়ার হিসাবে।

মূলত তার খেলা দেখতে এবারের জার্মান ভ্রমণ। মোট পাঁচ দিনের ভ্রমণের একদিন ফ্রাঙ্কফোর্ট, একদিন মিউনিখ আর তিন দিন থাকব ভুর্সবার্গে। আমি এবার ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং মিউনিক শহর দুটি শুধুমাত্র ট্রানজিট হিসাবে পাশ কেটে চলে যাব, তবে ভুর্সবার্গ শহরটির ওপর আলোকপাত করব বেশি। তাহলে চলুন সংক্ষেপে একটু জানি ভুর্সবার্গ সম্পর্কে।

ভুর্সবার্গ জার্মানের ফেডারেল রাজ্য বাভারিয়ারের একটি স্বাধীন শহর। এ শহরে প্রায় ১৩০ হাজার জার্মানির বাস। এটি বাভারিয়ার পঞ্চম বৃহত্তম শহর (মিউনিখ, নুরেমবার্গ, অগসবার্গ এবং রেজেনসবার্গের পরে এর অবস্থান) এবং আন্টারফ্রাঙ্কেনের প্রশাসনিক অঞ্চলের রাজধানী।

এ শহরের মানুষের গড় বয়স ৪১ বছর, যার মানে ভুর্সবার্গ জার্মানির একটি সর্বকনিষ্ঠ শহর জনসংখ্যার দিক দিয়ে। অনেক বাসিন্দা ফ্রাঙ্কোনিয়ান উপভাষায় কথা বলে। রোমান ক্যাথলিক চার্চের জন্য শহরটি বিখ্যাত।

শহরটি ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং নুরেমবার্গের প্রায় ১১৯ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে মাইন নদীর উভয় তীরে অবস্থিত।

ভুর্সবার্গ ঐতিহাসিক গির্জার জন্য পরিচিত। এখানে পাহাড়ের ওপর সেই ১১২৮ সালে নির্মিত একটি মনোমুগ্ধকর রাজপ্রাসাদ রয়েছে যা সত্যি চমৎকার টুরিস্ট অ্যাট্রাকশন। শহরের অলিতে গলিতে শুধু গির্জা আর গির্জা। ভুর্সবার্গ জার্মানির ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয় শহরগুলোর মধ্যে একটি।

জুলিয়াস-ম্যাক্সিমিলিয়ানস-ইউনিভার্সিটি, ১৪০২ সালে প্রতিষ্ঠিত, বাভারিয়ার প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জার্মানির প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এটা একটি।

ঘুরে এলাম ভুর্সবার্গ

ভুর্সবার্গে ফাইজারের প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের সাবেক পরিচালক রহমান মৃধা (ছবি : সংগৃহীত)

ভুর্সবার্গ প্রাথমিকভাবে একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সবচেয়ে বড় নিয়োগকর্তা হলো বিশ্ববিদ্যালয় এবং পৌরসভা। শিল্প খাতে, সাধারণত শুধুমাত্র ছোট এবং মাঝারি আকারের কোম্পানি আছে। শহরটি ফ্রাঙ্কোনিয়া ওয়াইন ক্রমবর্ধমান অঞ্চলের কেন্দ্র এবং এর ওয়াইন সংস্কৃতির জন্য সুপরিচিত।

ভুর্সবার্গের সঙ্গে সারা দেশের চমৎকার যোগাযোগের ব্যবস্থা রয়েছে।

এ শহরের নামকরা কিছু কৃতি সন্তানদের মধ্যে ফ্রাঙ্ক বাউম্যান, ফুটবল খেলোয়াড়, ডার্ক নাউইটজকি, বাস্কেটবল খেলোয়াড় এবং উইলহেম কনরাড রন্টজেন, পদার্থবিদ, নোবেল বিজয়ী

এডওয়ার্ড কাসপার জ্যাকব ভন সিবোল্ডসহ আরও গণ্যমান্য ব্যক্তির নাম উল্লেখযোগ্য। এখানে মে মাসে আফ্রিকা উৎসব, জুন/জুলাই মাসে মোজার্টফেস্ট এবং জুলাই মাসে কিলিয়ানি ভক্সফেস্ট হয়ে থাকে।

আমি যদিও টেনিসের জগতে থাকবো বেশিরভাগ সময় আমার ধ্যানে এবং জ্ঞানে, কারণ ছেলের খেলা দেখা এবং তার সঙ্গে পুরো সময় দিতেই কিন্তু এসেছি এখানে। তারপরও এমন একটি চমৎকার শহর পরে আর আসা হবে কিনা কে জানে তাই শুক্রবার লেট ডিনার সেরে জনাথানকে বললাম, বাবা তোমার তো ডে অফ তোমরা বন্ধুরা তোমাদের মত প্লান কর, আমি কাল বিকেল অবধি শহরটিকে ঘুরে ঘুরে দেখব।

জনাথান বললো, ঠিক আছে তবে টেনিস ক্লাবে সামার পার্টি, তোমাকে তারা দাওয়াত করেছে। দয়া করে, সময়মত চলে এসো।

দিনের শুরুতেই সোজা পথে হাঁটতেই যে জিনিসটা প্রথমে চোখে পড়লো সেটা ছিল শহরের পরিকাঠামো। হাঁটার জন্য এক পথ, সাইকেলের জন্য এক পথ, গাড়ির জন্য এক পথ, ট্রামের জন্য এক পথ। পথগুলো পাশাপাশি কি সুন্দর ভাবে বয়ে চলেছে এবং সবকিছু যার যার গতিতে চলছে।

দেখতে আর ভাবতে সময় দিলেও সরাসরি টেলিফোনটা ধরে যেতে যেতে পথে যেটা মনে হচ্ছে ভালো, সে সম্পর্কে কিছু বর্ণনা করছি, দর্শকদের উদ্দেশ্যে। নিজে কিছু দেখা এবং অন্যকে সে সুযোগটা করে দেওয়া আমার শেয়ার ভ্যালু কনসেপ্টের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় যা আমি চেষ্টা করি শেয়ার করতে।

ঘুরে এলাম ভুর্সবার্গ

ভুর্সবার্গে ফাইজারের প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের সাবেক পরিচালক রহমান মৃধা (ছবি : সংগৃহীত)

আমি তাদের জন্যই কাজটি করি যারা হয়তো সুযোগ পাবে না কোনোদিন আসার বা দেখার কিন্তু আমার মাধ্যমে জানবে এবং নতুন প্রজন্মদের গড়তে সাহায্য করবে বা অনুপ্রাণিত করবে- এটাই মূলত কারণ।

এতক্ষণে চল্লিশ মিনিট হেঁটেছি, এখন পাহাড়ের উপর উঠতে হবে। যেখানে রয়েছে বিশাল এক প্রাসাদ। পুরো ঘটনা জানবো এবং উপর থেকে পুরো শহরকে দেখবো এটাই উদ্দেশ্য। চলতে পথে দেখি পাহাড়ের পাশ দিয়ে চমৎকার ভাবে এবং সুন্দর পরিপাটির সাথে আঙ্গুরের চাষ করেছে জার্মান কৃষকরা, অপূর্ব এবং মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।

আঙ্গুর ফলগুলো ফুলের তোড়ার মত এক সঙ্গে বদ্ধ ভাবে গাছে ঝুলে রয়েছে, একটু হাত বুলিয়ে নিলাম, সেলফিও তুললাম সাথে। সেই পায়েচলা মেঠো পথ ধরে উপরের দিকে উঠতে পথে বড় এক সাইন বোর্ডে দেখি লেখা রয়েছে, ১১২৮ সালে নির্মিত এই কাসেল এবং সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। জার্মান ভাষা কিছুটা আন্দাজ করে যতটুকু জানলাম সেটা এমন- খ্রিষ্টান ধর্মের বড় এক নাম করা পৃষ্ট রাজা যিনি এটা তৈরি করেন, যেখানে রয়েছে তার বসতবাড়ি সহ অতি পুরাতন সেই ১১২৮ সালের নির্মিত এক চমৎকার গির্জা। অতীতে হয়ত মানুষের ধারণা ছিল যতো উপরে গির্জা হবে ততই স্রষ্টার নিকটতম হওয়া সম্ভব!

যাইহোক পুরো বিষয়টি সম্পর্কে মোটামুটি একটি ধারণা নিয়ে কাসেল থেকে ফিরতে পথে একটি গাড়ি এবং একজন নারী নজর কেড়ে নিল। সাত সকালে মেয়েটি গাড়ির পাসে বসে হাত দিয়ে থালাবাসন পরিষ্কার করছে। আমি নিচের দিকে যাব, যদি ভুল পথে নেমে যাই, তাহলে আবার পাহাড়ের ওপর উঠতে হবে, ভাবলাম মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করি, এত উপরে গাড়ি নিয়ে উঠেছে নিশ্চিত জানে নামার পথ আর উপরে উঠার পথ। শুনেছি এখানে নাকি শর্টকাট পথও আছে!

বেশ কাছে গিয়ে বিনয়ের সাথে বললাম সরি, তোমাকে সাত সকালে বিরক্ত করার জন্য। আমি আমার সামনে যে পথটা দেখছি মনে হচ্ছে এই পথে নিচে যাওয়া সম্ভব কিন্তু রাজবাড়ির ব্যাপার স্যাপার হয়ত দেখা গেল যে এপথ পাবলিকের জন্য নয়। মেয়েটি একটু হেসে দিয়ে বললো, আমিও তোমার মত টুরিস্ট, তবে নিজ দেশে।

গতকাল সন্ধ্যায় এখানে এসেছি। গাড়ি এই প্রাসাদের পাশে পার্ক করে রাত এখানেই কাটিয়েছি। সবকিছু ঠিক মত দেখা হয়নি এখনও, তবে ওখানের সাইন বোর্ডে কি লিখা আছে চল দেখি। মেয়েটি সাইনবোর্ডের তথ্য জেনে বললো, তুমি যে পথ দিয়ে উপরে উঠেছ ওই পথে আসতে চল্লিশ মিনিট লাগে, তবে চার পাশের সৌন্দর্য চমতকার ভাবে দেখার সুযোগ থাকে। আর এই পথ সোজা নিচে গিয়ে মাইন নদীর ব্রিজে গিয়ে মিলেছে, সেখানে যেতে সময় লাগবে মাত্র ২০ মিনিট। আমি বললাম আমি তো সেখানেই যাব। আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিলাম।

ঘুরে এলাম ভুর্সবার্গ

ভুর্সবার্গে ফাইজারের প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের সাবেক পরিচালক রহমান মৃধা (ছবি : সংগৃহীত)

একটু সামনের দিকে যেতে আবার সাইডে তাকাতে দেখি গাড়িটা বেশ খোলামেলা। নতুন কিছু দেখলে যে কৌতূহল আমার মধ্যে উদয় হয় তা না জানা অবধি আমার তো শান্তি নেই, ফিরলাম আবার ওই মেয়ের দিকে। মেয়েটি আমাকে দেখেই বললো, আবার কি হলো? কোনো সমস্যা? আমি বললাম, এসেছিলাম উপরে কাসেল দেখতে, কিন্তু তোমার গাড়ি এবং গাড়ির পরিকাঠামো দেখে কোনোভাবেই এখান থেকে যেতে মন চাইছে না।

তাই ফিরে এলাম ঘটনা জানতে, বলেই বললাম, আমি রহমান মৃধা বাংলাদেশি সুইডিশ। মেয়েটি আবারও হেসে দিয়ে বললো, আজব পরিচয় তো, বলেই হাত বাড়িয়ে বললো আমি হ্যানা। হ্যানা নিজের গাড়িকে ক্যারাভ্যান করেছে। সে গাড়িতে ঘুমায়, তার গাড়িই মূলত তার বাড়ি, বিশেষ করে প্রতি উইকেন্ডে। উইকেন্ড এলেই দুই ঘণ্টার ভেতরে যত শহর, জঙ্গল, লেক, পাহাড়, পর্বত বা কাসেল আছে সেখানেই সে তার উইকেন্ড কাটায় এবং এই ভাবে গত এক বছর হলো এই জীবন শুরু করেছে।

আজব দেশের এক তাজ্জব কাহিনী না দেখলে নিজেও মনে করতাম কোন গাঁজাখুরে গল্প। না, তাজ্জব বা অন্য কিছু না। হ্যানার বয়স ৩০ প্লাস, আপাতত একাকী জীবন যাপন করছে। হ্যানা রীতিমতো সোলার শক্তির ওপর চাকরিও করে। পরিবেশের সাথে সহজভাবে জীবন যাপন করার চেষ্টা চলছে- মানে সে একজন বৈজ্ঞানিক, পরিবেশ বিজ্ঞানের ওপর মূলত সে গবেষণা করে। এ কথা সে আমাদের পরিচয় পর্ব শেষ হবার পর বলেছিল, বিদায় বেলা হাতদুটো ধরে বলে দিল-ফোন কোর কথা হবে, হয়ত আবারও দেখা হবে।

আমি হ্যানা এবং তার লাইফ স্টাইল সম্পর্কে জানার পর যে জিনিসটি ভাবতে ভাবতে নিচের দিকে যেতে লাগলাম সেটা ছিল, মানুষ সত্যিই সামাজিক জীব, সমাজ এবং পরিবেশই মানুষের সুখের সময়, বাকি সব ঝামেলা।

শহরের মেইন অ্যাট্রাকশনই হচ্ছে মাইন নদীর উপর গড়ে উঠা এই পুরাতন সেতু, একেবারেই ভালোবাসার সেতু। আমি অবশ্য গতকাল রাতেই এই সেতুর ওপর দিয়ে হেটে ডিনারে গিয়েছি। আমার সাথে জনাথনের বন্ধুরা সহ জার্মানের আরও অনেকে ছিল, তখনই বুঝেছি পৃষ্ট রাজার রুচি ছিল ভালো। পাহাড়ের ওপরে প্রাসাদ সামনে মাইন নদী, সেতু দিয়ে মাইন নদী পার হয়ে শহরে নতুন রাজ প্রাসাদ তৈরি করেছে যাকে এরা বলে রেসিডেন্স।

রেসিডেন্সের চারপাশ জুড়ে ফুল আর ফুল সাথে নানা ধরনের সৌন্দর্যের ছোঁয়া। দেখলে মন ভরে যায়- সেভাবেই সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছে। পুরো শহর ঘুরে দেখা হলো, ভুর্সবার্গ শহরে স্থানীয় মানুষের সাথে বাইরের পরিবেশে বসে লাঞ্চটাও সেরে নিলাম। পুরো শহর পর্যটকে ভরা, সেই নিউজিল্যান্ড থেকে শুরু করে বাংলাদেশ, ইউরোপ, আমেরিকা আর জাপানিরা তো আছেই। অনেক নতুন চেনা-জানা স্মৃতি নিয়ে বিকালের আগেই ফিরে এলাম জার্মান সামার পার্টিতে, সে আর এক নতুন এক্সপেরিয়েন্স…।

লেখক : রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন।

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড