• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন

পাহাড়, পানি আর সবুজের টানে (পর্ব - ০২)

  ইমাম হোসেন

১৭ জুলাই ২০১৯, ১৮:১২
পাহাড়
যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। (ছবি : লেখক)

ট্রলার চলছে,গগণ ভাই রাফা আর আবীরের ইচ্ছে হলো এই পানিতে গোসল না করলে চলে না। আমাদের ট্রলার দারুণ একটা টিলার পাশে এসে থামলো। বাকীরা পানিতে ঝাপ দিয়েছে। আমি দোটানায় আছি, কিন্তু রাফা,আবীর আর গগণ ভাইয়ের উচ্ছ্বাস দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। নেমে গেলাম পানিতে, দারুণ স্বচ্ছ পানি। প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। লাফালাফি শেষে আবার ট্রলারে চেপে যাত্রা শুরু করলাম।

এই মধ্যেই ভাইয়ার ফোন। ভাইয়া বললেন ডিসি হিল,ঝুলন্ত ব্রিজ ঘুরে শহীদ মিনার ঘাটে এসে নামতে। ডিসি হিল হলো জেলা প্রশাসকের বাসভবন। জেলা প্রশাসক ও বাংলাদেশ পুলিশের দুইটা প্রজেক্ট পাশাপাশি। একদম কাপ্তাই লেক ধরে গড়ে তুলেছে পর্যটক কেন্দ্র। এখন অবশ্য অফ সিজন,এই সময় রাঙামাটিতে তেমন পর্যটক যায়না। এখন লেকে পানিও কম।

পাহাড়

টলটলে এই পানিতে গোসল না করলে কী চলে? (ছবি : লেখক ) 

ডিসি হিলের পাশেই পানির মধ্যে বড় বড় মৃত গাছের ডালপালা বেরিয়ে আছে। আমাদের মাঝি বললেন,এখানে একটা রাজবাড়ী আছে। রাজবাড়ীর সামনের গাছ এই গুলো। বিশ্বাস করবো কিনা ভাবছি। পরে অবশ্য শহরে সবাই বলেছে এখানে একটা দুই তলা রাজবাড়ী আছে। কাপ্তাই বাধ দেবার ফলে সেটা পানির নিচে চলে গেছে। আবার মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল। কত আনন্দ বেদনা,ইতিহাস ঐতিহ্যের সাক্ষী এই পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

আরও পড়ুন : পাহাড়, পানি আর সবুজের টানে (পর্ব - ০১)

শহীদমিনার ঘাটে এসে থামলাম। ভাইয়া দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের জন্য। কেমন ঘুরলাম,কেমন লাগলো সব শুনলেন। আমরা আবার রওনা হলাম বাসার ঘাটের দিকে।
এখানে যেতে ট্রলারে ১৫-২০ জন বহন করতে পারবে এমন ট্রলার ভাড়া নেবে ২০০০/- ২২০০/-। একটু দাম দর করে নিতে হবে। এই শহরে রিক্সা চলে না। সিএনজিতে যাতায়াত করতে হবে। সিএনজি ভাড়া নাগালের মধ্যেই।

পাহাড়

মায়াবী পাহাড়ি পথ । (ছবি : লেখক ) 

বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে চোখ ছানাবড়া। পুরো টেবিল ভর্তি হরেক রকম খাবার আর ফল। এত খাবার দেখে ক্ষুধাও জেগে উঠলো। যা খেলাম তাকে মোটামুটি একটা ভুড়িভোজ বলায় যায়। খেয়ে রেস্ট করছি এমন সময় ভাইয়া এসে বললেন,’একটা কাজ করো দুইটা বাইক আছে তোমরা বাইক নিয়ে বের হও।‘ আমি তো মহাখুশি। কিন্তু আমার বাইকে কেউ উঠতে রাজি না। রাফা আর গগণ ভাই বলে এই রাস্তায় আপনার গাড়িতে মাপ চায় ভাই।

আমরা বাসা থেকে বেরুলাম উদ্দেশ্য বেদবেদি। রাঙামাটি "যুব উন্নয়ন" এখানে আইরিন দিদির বাড়ি। আন্টি (দিদি ভাইয়ের মা) বারবার ফোন করছেন। কোথা থেকে সিএনজি নিব, কিভাবে আসবো? এখনো আসছি না কেন? এমন শতেক প্রশ্ন। আমরা যখন দিদিভাই এর বাড়িতে পৌঁছলাম তখন বাজে ৫.৩০ এর মতো। দিদিভাইয়েরা চাকমা। তাদের বাড়ির আশেপাশে কোনো বাঙালি পরিবার চোখে পড়লো না।

পাহাড়

পাহাড় আর আমি বসেছিলাম মুখোমুখি। (ছবি : ইশতিয়াক আবীর) 

দিদি ভাইদের বাড়ি থেকে বেরুতে বেরুতে সন্ধ্যা। ওখান থেকে আমরা চলে গেলাম আসাম বস্তি বাজার। বড় একটা ব্রিজ আছে এখানে। যারা রাঙামাটি যাবেন তারা অবশ্যই বিকেলবেলা আসাম বাজার ব্রিজে ঘুরে আসবেন। শুধু বলতে পারি নতুন একটা উপলব্ধি পাবেন। আসাম বাজার ব্রিজে আমরা যখন গেলাম তখন সন্ধ্যা। পশ্চিম দিগন্তে আবীর মাখা আকাশের প্রতিফলন হচ্ছে নিচের পানিতে। এখন পানি একদম কম। দূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছে। এই অঞ্চলের সব থেকে বড় পাহাড় এটাই। ব্রিজে বসে আছি। চাকমা ছেলে মেয়েরা আসছে এখানে তাদের প্রিয়জনদের নিয়ে।

এই প্রত্যন্ত পাহাড়ে যে জীবন প্রবাহিত হচ্ছে,যে আলো জ্বলছে তা আমাকে এক নতুন আলোর পথ দেখালো এটা বলতে দ্বিধা নেই। আসাম বস্তি থেকে আসলাম রাঙামাটি শহরের বনরূপাতে। এটাই সবচেয়ে বড় মার্কেট এখানকার। একটু হেঁটে শহর দেখতে বেরুলাম। কিন্তু পকেটে টাকা নেই,এটিএম বুথ খুঁজতে খুঁজতে মাথা খারাপ।

পাহাড়

পাহাড়ের সন্ধ্যাটা মনে থাকবে বহুকাল। (ছবি : লেখক) 

ভাইয়াকে ফোন দিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে ভাইয়া বাইক নিয়ে এসে হাজির। জানালেন, এখানে তো তোমার এই বুথ পাবে না। কিছু সময় হাসলাম। ভাইয়া নিয়ে গেলেন আমাদের এখানকার মিষ্টি খাওয়াতে। বিশেষ কোনো বিশেষত্ব পেলাম না। কী আর করা ভাইয়ার সাথে গল্প করতে করতে বাসায় ফিরলাম। রাতের ডাইনিং টেবিলে আবারও দুপুরের পুনরাবৃত্তি। মুরসালিম আর মুত্তাকিনের সাথে গল্প জমলো। মুত্তাকিন একটু অসুস্থ। তার ইচ্ছে ছিলো আমাদের সাথে ঘুরতে যাবে।

আরও পড়ুন : পাহাড়, পানি আর সবুজের টানে (শেষ পর্ব)

শুতে যেয়ে টের পেলাম বেশ ক্লান্ত। বারবার দিদিভাই এর কথা মনে পড়ছে। দিদিভাই বলেছিল আমরা একরাত পাহাড়ে থাকবো। কেমন তন্দ্রা লাগছে। পিচ্চিগুলোও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সবাই অদ্ভুত ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবে কিনা দ্বিধান্বিত। একটু হেসে বললাম এটাই তো জীবন। প্রতিনিয়ত ছুটে চলা এই জীবনে আবেগ বড্ড মূল্যহীন।

মায়া যে বড্ড খারাপ... ভালো থেকো নানীয়ার চর। ভালো থেকো আলোকিত মানুষ গুলো। ভালো থেকো আবীর মাখা আকাশ। ভালো থেকো দিদিভাই...

চলবে ...

ওডি/এসএম 

দেশ কিংবা বিদেশ, পর্যটন কিংবা অবকাশ, আকাশ কিংবা জল, পাহাড় কিংবা সমতল ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা অথবা পরিকল্পনা আমাদের জানাতে ইমেইল করুন- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড