• রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন

বৈচিত্র্যতার চাদরে মোড়ানো 'জায়া'র ঘর

২৯ মে ২০১৯, ১২:২৭
জায়া
জায়ার পোশাকে মৃণালিনী মৃন্ময়ী (ছবি কৃতজ্ঞতা : জায়া)

'আমার মা শিক্ষকতা করেছেন বহুদিন। আমি তখন খুবই ছোট। মা যখন স্কুলে যেত আমি বাসায় একলা সময় কাটাতাম। স্কুল থেকে ফেরার পথে আমার মান ভাঙাতে কিছু না কিছু নিয়ে ফিরতেন। এই যেমন একঠোঙা বাদাম, চানাচুর মাখা, আট আনার ২টা লজেন্স, বারো ভাজা কিংবা মালাই (আইসক্রিম)। কখনো বা রাস্তার ধারের গাছ থেকে ছিঁড়ে কিংবা কুড়িয়ে আনতেন এক থোকা ফুল। আমার ফুল বাতিকের শুরু বোধহয় এখান থেকেই। সময়ের চাকা ঘুরে আমার মা এখন রিটায়ার্ড গৃহিণী আর আমি এক স্কুলে পড়াই- ঠিক যেভাবে তিনি আমায় রেখে চলে যেতেন রোজ, আমিও এখন রোজ সকালে চলে যাই। আমার মা বারান্দা থেকে হাত নাড়ে। আমিও রোজ তার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে ফিরি। তার মুখে কপট রাগ থাকলেও চোখে থাকে খুশির ঝিলিক। যে মানুষটি আমার শৈশবকে এতটা রঙিন করেছেন তার বার্ধক্যও আমি রঙিন করে তুলতে চাই।'  

কথাগুলো বলছিলেন পোশাক প্রতিষ্ঠান জায়ার প্রতিষ্ঠাতা সোনিয়া শারমিন। ছোটবেলাটা রঙিন ছিল বলেই হয়ত তার তৈরি করা প্রতিটি পোশাকেই কেমন যেন একটা শৈশবের গন্ধ লেগে আছে। কখনো বাগানবিলাস, কখনো বা পলাশ, কখনো পোশাক ছেয়ে আছে জবাতে অথবা রঙিন হয়েছে ভাঁটফুলে। রয়েছে শিউলি, কদমও। আমাদের শৈশব রঙিন করা এই ফুলগুলো তার পোশাকের মূল আকর্ষণ। প্রতিটি পোশাকে রয়েছে ভিন্নতা। মেয়েদের পোশাক নিয়েই মূলত কাজ করছে জায়া। তবে পাশাপাশি আছে ছেলেদের পাঞ্জাবি আর শিশুদের পোশাকও। বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি ২০১৬ সালে ছোট পরিসরে শুরু করা অনলাইনে শুরু করা ব্যবসাটি আজ রূপ নিয়েছে দোকানে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের ভালোবাসায় জায়া ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখে জায়া শপের যাত্রা শুরু হয়। 

জায়া

জায়ার স্বত্বাধিকারী সোনিয়া শারমিন 

'জায়া'কে নিয়ে কথা শুরু করলে যেন ফুরোতেই চায় না। আমি নিজেই জায়ার প্রেমে পড়েছিলাম গত বছর। মুগ্ধ হয়েছিলাম তাদের তোলা ছবিতে। পোশাক নিয়ে ভিন্ন ধারার একটা ভাবনা দেখে ভালো লেগেছিল বেশ। চাদর, সালোয়ার কামিজ, শাড়িতে দেখেছিলাম অর্ণবের গান, ছিল রবীন্দ্রনাথ। সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছিল শাড়িতে চর্যাপদের অক্ষর। সবকিছুকে ছাপিয়ে মুগ্ধতার রেশ বেড়ে গিয়েছিল যখন শাড়িতে লেখা দেখলাম, 'বেলা বোস... এটা কি ২৪৪১১৩৯'। এক কথায় জায়ার প্রতিটা কাজ অনবদ্য। দিন দিন জায়ার কাজের পরিধি বাড়ছে, সাথে বাড়ছে গ্রাহকদের ভালোবাসাও। 

জায়া'র শুরু, বর্তমান আর ভবিষ্যত নিয়ে অনেক কথা হচ্ছিল সোনিয়া শারমিন আপুর সাথে। প্রথমেই জিজ্ঞাসা ছিল, প্রতিষ্ঠানের নাম 'জায়া' কেন? 

স্মিত হেসে সোনিয়া আপুর উত্তর, 'জায়া' শব্দের অর্থ স্ত্রী/বউ। এই বউ ডাকটা কিন্তু ভীষণ আদরের। কেউ শাড়ি পরলেই আমরা কিন্তু বলেই বসি বউ বউ লাগছে। যেহেতু শাড়ি নিয়েই মূল কাজ তাই নাম 'জায়া'। যদিও আমাদের ইচ্ছে একজন নারীর নিজেকে সাজাতে যা কিছু প্রয়োজন সবকিছুর একদিন সমাহার হবে 'জায়া'।

'জায়া'র শুরুর গল্পটা জানতে চাই। ঠিক কখন মনে হলো উদ্যোক্তা হবেন?

শাড়ির প্রতি ভালোবাসা ছেলেবেলা থেকেই। বিশেষত মা যখন শাড়ি পরতেন তখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম। এছাড়া আমার পড়ালেখা 'ভারতেশ্বরী হোমসে'। সেখানেও শিক্ষিকাগণ ভীষণ সুন্দর ও যত্ন করে শাড়ি পরতেন। সেখান থেকেই শাড়ির ভূত মাথায় গেঁথে গেছে বলা যায়। তখন থেকেই নিজ নকশায় শাড়ি করব এই স্বপ্ন নিয়ে ঘুরতাম। অনলাইন এই স্বপ্নটা বাস্তবায়নের পথ সহজ করে দিলো। ৬টা শাড়ি নিয়ে ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর 'জায়া'র পথ চলা শুরু হয়। তখনকার শাড়িগুলো নিজ ডিজাইনে ছিল না। কেননা সেই পরিমাণ মূলধন আমার ছিল না। তারপর আস্তে আস্তে নিজ নকশায় শাড়ি করা শুরু করি। মানুষের ভালোবাসা পেতে থাকি। যারা একবার শাড়ি নিয়েছেন তারা পরবর্তীতে আবার নিয়েছেন। এভাবেই ৬টি শাড়ি নিয়ে শুরু করা 'জায়া' আজ হাজার শাড়ির ঘর। 

জায়া

জায়ার শাড়ি (ছবি কৃতজ্ঞতা: জায়া) 

অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এলেন। কেমন সহযোগিতা ছিল পরিবার আর বন্ধুদের?

আমি আসলে একজন ভীষণ ভাগ্যবতী নারী কেননা আমার জন্ম এমন এক পরিবারে যে পরিবার আর কিছু পারুক না পারুক প্রচুর সাপোর্ট দিতে পারে। আমার বাবা, মা, ভাই, বোন সবসময় সাপোর্ট দিয়ে গেছে। মন খারাপ হলেই বাবার সাথে কথা বলে নিয়েছি। হতাশায় ডুবে গেলে মাকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে গেছি। দুজনে হেঁটে বেড়িয়ে গল্প করে ফিরে আবার কাজে মন দিয়েছি। 

জায়া

জায়ার নকশা করা বিভিন্ন শাড়ি (ছবি কৃতজ্ঞতা: জায়া) 

আর এছাড়াও আমার বন্ধুমহল খুবই সীমিত কিন্তু অসাধারণ কিছু মানুষের সমন্বয়। আমার 'জায়া'র জন্য এদের ভূমিকা অসামান্য। আমি হাসতে থাকলেও অনেকে হুট করে জিজ্ঞাসা করে বসে কী নিয়ে মনে ব্যথা বলো তো! এমন বন্ধু কয়জনের হয়? তাও একটা না, চার পাঁচটা! 

এ তো গেল সব ভালো কথা।

প্রকৃতি সবকিছুর ব্যালেন্স করে। ঠিক তেমনই খারাপ অনেক কিছুই ঘটেছে। যা সবার সাথেই হয়। খুব কাছে এসে ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক ক্ষতিও করেছে অনেকেই। তবে এসব কিছু থেকে আমি বেরিয়ে আসতে পারি আমার বন্ধু-পরিবার তো বটেই সেই সাথে নিজের মানসিক জোরের কারণে। আমি মনে করি সব মানুষেরই এই মনের জোরটা থাকা উচিত।

এত সুন্দর সব কাজের জন্য অনুপ্রেরণা কে বা কারা? 

আমি মানুষের কাজ দেখে প্রচুর অনুপ্রেরণা পাই। এই যেমন যে মানুষটি জুতা সেলাই করে কত দক্ষতার সাথে সে সেই কাজটি করে। মূলকথা যে তার নিজের কাজটি নিজের শতভাগ চেষ্টায় সৎভাবে করে তারাই আমাকে অনুপ্রেণিত করে। ধরুন সাকিব আল হাসান কী সুন্দরভাবে আমাদের দেশটাকে পরিচিত করছেন! প্রথমত বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার তারপর আবার এত বছর ধরে নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন। এমন কিছুই করতে চাই যেখানে আমিই হবো বাংলাদেশ। এছাড়া ফোয়ারা ফেরদৌস আপু তো আছেনই। তার কাজ আমাকে অনুপ্রেরণা যোগায়।

জায়া

জায়ার কালেকশনে রয়েছে ছেলেদের পাঞ্জাবিও (ছবি কৃতজ্ঞতা : জায়া) 

'সেন্ট যাকোব স্কুল' নামে একটি স্কুলে আমি শিক্ষকতা করি। এই স্কুলের সাথে আমার আত্মা জড়িয়ে আছে। শুধু পাঠ্যবই পড়ানো নয়, ছোট ছোট শিশুদের প্রত্যেককে এক একটি বাংলাদেশ তৈরি করার কাজ করি আমরা। এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াটসন হালদার আমার একজন অনুপ্রেরণার নাম। মাথায় অমানবিক চাপ নিয়ে একমাত্র সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা করে কীভাবে স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে হয় সেটা শিখেছি তার কাছ থেকে।

জায়ার মূল কাজ কী নিয়ে? 

প্রিয় বাংলাদেশ, দেশের সংস্কৃতি, প্রিয় ভাষা বাংলা এবং এদেশের প্রকৃতিকে পোশাকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টাই করি মূলত। দেশীয় পণ্য নিয়েই 'জায়া'র কাজ।

জায়া

জায়ার কালেকশনে নকশা করা শিশুদের পোশাক (ছবি কৃতজ্ঞতা: জায়া) 

নিজেকে উদ্যোক্তা ভাবেন?

আসলে 'উদ্যোক্তা ' শব্দটি আমার কাছে বিশাল একটা অর্থ তৈরি করে। ভারতেশ্বরী হোমসে পড়ার কারণে আমার উদ্যোক্তা শব্দটির সাথে পরিচয় অনেক আগে। আমি উদ্যোক্তা বলতে বুঝি আমাদের জ্যাঠামণি রণদা প্রসাদ সাহা- যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। তার উদ্যোগগুলো বিশ্বদরবারে সমাদৃত।

জায়া

জায়ার নকশায় নানা পোশাক (ছবি কৃতজ্ঞতা: জায়া) 

তিনি মানব কল্যাণের জন্য এত কিছু করেছেন যে বলে শেষ করা যাবে না। তাই 'উদ্যোক্তা' শব্দটি আমার কাছে শুধুমাত্র ব্যবসায়িক একটি শব্দ নয়, এর সাথে ব্যাপকভাবে মানবসেবার একটি যোগ রয়েছে। যেদিন সঠিকভাবে এই দুটো জিনিস করতে পারব সেদিনই নিজেকে উদ্যোক্তা বলতে পারব।

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কোনো পরামর্শ? 

আসলে আমি নিজেও এখনো অনেক কিছু শিখছি। জানি না বলার মত জায়গা তৈরি হয়েছে কিনা। তবু যদি পরামর্শ বলতে হয় তবে বলব আমি আসলে একসাথে বেড়ে ওঠাতে বিশ্বাসী। কাউকে দাবিয়ে নিজে বড় হওয়ায় কোনো কৃতিত্ব নেই। আমার মনে হয় একসাথে বেড়ে ওঠার মানসিকতা তৈরি হলে আমাদের ব্যবসা এবং আত্মা দুটোই লাভবান হবে। আর ব্যবসা টিকিয়ে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এত এত পেইজ তৈরি হচ্ছে আবার বন্ধও হয়ে যাচ্ছে রোজ। 

এখন যে সমস্যাটা বেশি দেখতে পাচ্ছি সেটি হচ্ছে অনেকে বাজার নষ্ট করছে। পণ্যের মূল্য সঠিকভাবে নির্ধারণ না করে অন্যদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পণ্যমূল্য নির্ধারণ করার আগে এর উপর একটু পড়াশোনা করা উচিত। সর্বশেষ, সবার সাথে আন্তরিক হওয়া এবং নিজের পণ্যে বৈচিত্রতা ও ভিন্নতা তৈরি করা।

এত চমৎকার একজন মানুষের সাথে কথা বললে আসলে শেষ হবে না। তার ভালোবাসার কাজের কথাগুলো শুনে ভালো লাগছিল ভীষণ। কিন্তু সময় তো ফুরোয়। আপুর সাথে কথা বলার সময়েরও শেষ হলো।  

শুভকামনা জায়ার জন্য। অনেক দূর প্রসারিত হোক জায়ার পথচলা। 

'জায়া' পেইজের লিংক: Jaya জায়া

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড