• বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

মরুসিংহ উমর মুখতার

  মুনীরুল ইসলাম ইবনু যাকির

১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৪:১৯
Umar_Mukhtar
মরুসিংহ খ্যাত বীর উমর মুখতার; ছবি : সংগৃহীত।

আজ ‘মরুসিংহ’ খ্যাত মহান বীর উমর মুখতারের শাহাদাতবার্ষিকী। ১৯১২ সাল থেকে শুরু করে প্রায় বিশ বছর তিনি লিবিয়ায় ইতালীয় ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেন। ১৯৩১ সালে ইতালীয়দের হাতে গ্রেপ্তার হন এবং মাত্র চারদিনের প্রহসনমূলক বিচারিক কার্যক্রম শেষে ১৬ সেপ্টেম্বর তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। এ মহান প্রতিরোধযোদ্ধার ৮৮তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আজ থাকছে তার জীবনীর উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত।

জন্ম ও প্রাথমিক জীবন

উমর মুখতার উসমানি খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের তবরুক শহরের নিকটবর্তী জাওইয়াত জাঞ্জুর নামক গ্রামে, মানফি নামক এক আরব বেদুইন ধার্মিক গোত্রে ১৮৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। নিজ পরিবার ও গোত্রেই ঐতিহ্যগতভাবে শিক্ষালাভ করেন। ১৬ বছর বয়সে হজের সফরে গিয়ে তার বাবা ইন্তেকাল করেন। বাবার ইচ্ছানুযায়ী তৎকালীন সানুসি আন্দোলনের এক শাইখের কাছে থেকে বিভিন্ন বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। সানুসি আন্দোলনের মূলকেন্দ্র জাগবুবের সানুসি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ৮ বছর শিক্ষালাভ করেন।

সানুসি আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ততা

জীবনের শুরুতেই তিনি চরম দুঃখ-দুর্দশার শিকার হন। বাবার ইন্তেকালের পর তিনি পুরোপুরি ওই সানুসি শাইখের তত্ত্বাবধানে থাকেন। মূলত সানুসি আন্দোলন ছিল বিশুদ্ধ আকিদাভিত্তিক নাজদি-সালাফি আন্দোলন ও আধ্যাত্মিক সুফি আন্দোলনের সমন্বয়ে গঠিত একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংস্কারমূলক আন্দোলন। উমর মুখতার সেসময় সানুসি আন্দোলন দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন এবং একপর্যায়ে এ আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। গভীর প্রজ্ঞা ও সাহসিকতার কারণে ধীরে ধীরে সবার প্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।

প্রতিরোধ যুদ্ধ

আঠার শতকের শেষের দিকে ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তি যখন চাদ দখল করে আরো উত্তরে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করতে থাকে, তখন সানুসি মুজাহিদরা তাদের বিরুদ্ধে মহান প্রতিরোধ জিহাদ শুরু করে। উমর মুখতার ১৮৯৯ সালে তৎকালীন সানুসিদের প্রধান মুহাম্মদ আল-মাহদির নির্দেশে সানুসি যোদ্ধাদের সাথে যোগ দিয়ে চাদে যান। চাদের প্রধান নেতা রাবিয়া আয-যুবায়রের পতনের পূর্ব পর্যন্ত দু’বছর চাদে ফরাসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। উমর মুখতার ও তার সহযোদ্ধারা পরবর্তীতে কিছুদিন মিসরে ব্রিটিশদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেন।

‘মরুসিংহ’ উপাধী লাভ

উমর মুখতারের ‘আসাদুস সাহারা’ বা মরুসিংহ উপাধি লাভের চমৎকার একটি ঘটনা আছে। তার মুজাহিদ কাফেলা যখন সুদানের পথে রওয়ানা করে ওই সময়কার ঘটনা। আসলে এই যাত্রাটা ছিল বিপদের আশঙ্কায় পরিপূর্ণ। কারণ এটি ছিল একটি ভয়ঙ্কর সিংহের গমনপথ। উমর মুখতার এই সফরে বিপদজ্জনক সিংহের মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি শর্টগান কাঁধে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বের হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে ওই ভয়ঙ্কর সিংহটির পিছু নেন এবং সেটিকে হত্যা করেন। এই সাহসিকতার জন্যে এরপর থেকে তাকে ‘মরুসিংহ’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। 

দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

২৯ সেপ্টেম্বর ১৯১১। ঔপনিবেশিক ইতালি লিবিয়া দখল করতে বাহিনি প্রেরণ করে। এদিকে উমর মুখতার তাঁর গেরিলা বাহিনি নিয়ে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেন। ইতালিয়ানদের অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, নওজোয়ান সৈন্য আর ট্যাঙ্ক-অ্যারোপ্লেনের বিরুদ্ধে উমরের সক্রিয় অশ্বারোহী যোদ্ধার সংখ্যা ছিল মাত্র ১০০০ থেকে ৩০০০। অধিকাংশই হালকা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। বয়সও বেশিরভাগই চল্লিশোর্ধ্ব। 

মরুভূমিতে একধরনের পরিখার মতো খনন করে সেখান থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যান মুজাহিদরা। অপরদিকে দখলদার ইতালিয়ানদের মরুভূমিতে যুদ্ধের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। বস্তুগত দিক থেকে দুর্বলতম, অথচ ঈমানের বলে বলিয়ান, এই বাহিনিই কাঁপন ধরিয়ে দেয় শত্রুদের হৃৎপিন্ডে। এক বছরে ২৫০টিরও বেশি সংঘর্ষ হয়। দক্ষতা, শক্তিমত্তা, সাহস এবং উদ্দীপনার কারণে এই বাহিনি সেই সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গেরিলা বাহিনি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। 

শত্রুদের লক্ষবস্তুতে সাধারণ জনগণ

সম্মুখসমরে না পেরে সাধারণ মুসলিম নাগরিকদেরকে লক্ষ্যবস্তু বানায় ফ্যাসিস্ট ইতালি। গঠন করে ‘কনসেন্ট্রেশান ক্যাম্প’। ১৯৩০ সালে ইতালিয়ান সরকার ১ লাখ বেসামরিক পুরুষ, মহিলা এবং ছেলেমেয়েকে মরুভূমির ক্যাম্পে একত্রিত করে- যা ছিল সেই সময়ে সেখানকার বেদুইন জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। তারা সাধারণ জনগণ এবং তাদের গবাদিপশুর উপর বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করত, লোকালয়ে বিষাক্ত গ্যাস ছিটিয়ে দিত, পানির কূপগুলোতে বিষ ঢেলে দিত, বন্দীদেরকে নির্যাতন করার পর প্লেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিত এবং রাজবন্দীদেরকে জনসমক্ষে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করত। ইতালিয়ানরা যুদ্ধে যতবার পর্যুদস্ত হত, আক্রোশে সাধারণ জনগণের উপর ততবেশি কঠোর নিপীড়ন চালাত।

সন্ধি প্রস্তাব ও প্রলোভন

ততদিনে সানুসি আন্দোলনের অনেক নেতৃস্থানীয়, এমনকি উমর মুখতারের প্রধান শায়খ শরিফ গারিয়ানিও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের লক্ষ্যে দেশত্যাগ করেছিলেন। শত্রুবাহিনি তাকেও শান্তিপূর্ণভাবে দেশত্যাগের আহ্বান জানায়। তিনি এতে মোটেই ভ্রুক্ষেপ করলেন না। আরও দৃঢ়তার সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার ঘোষণা দিলেন। যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হল, কেন তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন? তিনি বললেন, ‘আমি যুদ্ধ করছি আমার দীনের জন্য, আমার ভূখন্ডকে যালিমদের থেকে রক্ষার জন্য।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ করা যখন ফরয, তখন ফলাফলের দিকে মনযোগ না দিয়েই তা করে যেতে হয়। কারণ বিজয় আসে কেবলমাত্র আল্লাহর নিকট থেকে। আমরা এক আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে আত্মসমর্পণ করি না। আমরা হয় বিজয় লাভ করি, না হয় শাহাদাত বরণ করি।’

এছাড়াও তাকে মাসিক বেতন-ভাতা, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পদ-পদবি ও সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখানো হয়। তিনি সগর্বে সব প্রত্যাখ্যান করেন। 

শাহাদাতের সোনালি মূহুর্ত

১৯৩১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর এক অভিযানে ইতালিয়ান ঔপনিবেশিক বাহিনীর হাতে আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার হন। বন্দি অবস্থায়ও দখলদাররা তাকে নানাভাবে প্রলোভন দেখায়। সন্ধির প্রস্তাব করে। কিন্তু শিকলাবদ্ধ অবস্থায়ও তিনি আপোস করতে রাজি হননি। তিনি বলেছিলেন, 

‘যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি দুই সর্বোচ্চ স্তরের মর্যাদার (শাহাদাত অথবা বিজয়) যে কোন একটি লাভ করব, ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাব। আল্লাহর শপথ, যদি এই মূহুর্তে আমার হাত-পা বাঁধা না থাকত, তাহলে আমি খালি হাতেই তোমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তাম।’

১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। হাজার হাজার মানুষের সামনে এ মহান প্রতিরোধযোদ্ধার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।  এধরনের জমায়েতের উদ্দেশ্য ছিল, মুসলিমদের ভয় দেখানো; যাতে আর কোনো প্রতিরোধ সংগ্রামের উত্থান না ঘটে। কিন্তু ইতালিয়ানরা বিজয়ী হয়েও পরাজিত হয়ে গেল। উমর মুখতারের ফাঁসি মুসলিম বিশ্বকে আলোড়িত করল এবং আরও বহুসংখ্যক প্রতিরোধশক্তি গড়ে উঠল। তার বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য আজও গোটা মুসলিম উম্মাহ তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। তার জীবন থেকে সকল সাম্রাজ্যবাদিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধের অনুপ্রেরণা লাভ করে। 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড