• বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

নগরের গাঁথুনিতে আটকে গেছে শৈশব আর কৈশোর

১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:১০
মিঠাই
শৈশবের আনন্দগুলো হয়ে যাচ্ছে ধূসর; (মডেল- মিঠাই)

‘আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা, তোমরা এ যুগে সেই বয়সেই লেখাপড়া কর মেলা’। সুফিয়া কামালের এই কবিতা দিয়ে শুরু করাটাই উত্তম বলে মনে হলো। প্রথম নিজে যখন এই কবিতা পড়েছিলাম তখন অবশ্য এর ভাবার্থ মাথায় অতটা যায়নি। আজ এত বছর পর আঁচ করতে পারি। 

ক্লাস ওয়ানের ছাত্রী মানতাকা। ব্যাগের ভারে সোজা হয়ে হাঁটতে পারে না শিশুটি। কর্মব্যস্ততা জীবন। সকালে ঘুম থেকে উঠেই স্কুলে দৌড়। স্কুল থেকে ফিরে গোসল, খাওয়া আর একটু ঘুম। ঘুম থেকে উঠেই পড়া... তারপর আরও পড়া এবং রাতে খেয়ে ঘুম। পরদিন আবার এই একই চক্র চলতে থাকে।

ওর বয়সে আমি বা আমরা বিকালগুলো কাটাতাম সমবয়সীদের সঙ্গে কানামাছি, ফুলটোক্কা, বরফ-পানি, ছোঁয়াছুঁয়ি আরও নাম ভুলে যাওয়া অনেক খেলা। মানতাকার মতো অধিকাংশ শহুরে শিশুই খেলার নামও বলতে পারবে না, খেলা বলতে কম্পিউটার গেমস আর খেলার সময় কাটানো মানে টেলিভিশনে ভিনদেশি কার্টুন দেখা- এভাবেই সময় কাটে ওদের। নগরের নিম্নবিত্তের ফুটপাথে বেড়ে ওঠা কিশোর-কিশোরী আর ধন কুবেরের সন্তানেরা একই বৃত্তে বাঁধা শৈশব আর কৈশোর নিয়ে চলে।

এক সময় বাড়ির পাশের মাঠে সবাই মিলে বিকালবেলা খেলা করা। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, এইতো বছর ১৫ আগেও এলাকার যে মাঠটা সরগরম হয়ে থাকতো আমাদের কোলাহলে, তা এখন হকারদের দখলে। আগে নিচতলা বাড়িগুলোর ভেতরে ছোট্ট উঠান ছিল, এখন অবশ্য কে কত বড় দালান করতে পারবে সেটিই মুখ্য। প্রকৃতির মনন হারিয়েছে অর্থনীতির জটিল সমীকরণে। সব চিন্তাই যেন ঘুরপাক খাচ্ছে বাণিজ্যিক যোগ-বিয়োগে।

শহরের বুকে নগরায়নের গাঁথুনিতে বন্দি হয়ে গেছে সব শিশু কিশোরের স্বাধীনতা। হারিয়ে গেছে খেলার মাঠ, স্বস্তিতে শ্বাস নেওয়ার জায়গা। এলাকার কিশোররা আজকাল ফুটবল, ক্রিকেট খেলে রাস্তাতেই। এছাড়া উপায় কী? এলাকার মাঠগুলো যে পিষে গেছে নগরায়নের যাঁতাকলে।

অবশ্য রাস্তায় খেলা শিশু-কিশোরদের সংখ্যাও হাতেগোনা। বাকিরা অবিরাম ছুটছে গোল্ডেন এ প্লাসের পেছনে। প্রথম হতে হবে, এ প্লাস পেতে হবে, কোচিং করতে হবে, এতকিছুর পর নিজের মতো করে কাটানোর সময় কই? প্লাস আর প্লাস যেন জীবনের সব সফলতা।

একটু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাতা আওড়াচ্ছিলাম। সেখানে একজন নাগরিকের সামাজিক অধিকারগুলো হলো- জীবন ধারণের অধিকার, চলাফেরার অধিকার, সম্পত্তি ভোগের অধিকার, চুক্তি করার অধিকার, ধর্মীয় অধিকার, পরিবার গঠনের অধিকার, খ্যাতিলাভের অধিকার প্রভৃতি।

অন্য অধিকারগুলো বাদই দিলাম। জীবন ধারণের অধিকার নিয়েই একটু কথা বলি। একজন ব্যক্তির জীবন ধারণের অধিকার বলতে নিজের মতো জীবন কাটানোর কথাই বুঝি আমি। একজন পিতা কি সত্যিই তার সন্তানদের সঠিক জীবনযাপনের পরিবেশ দিতে পারছেন? 

নগরের নিন্মবিত্ত পরিবারগুলোর দিকে তাকাই। ৭/৮ বছরের শিশুগুলো কাজ করছে লেগুনার হেল্পার হিসেবে, টানছে ভারী বোঝা। বন্ধুর কাঁধে হাত দিয়ে যে বয়সে বেলা কাটানোর তার সে বয়সে কাঁধে বইছে পরিবারের বোঝা। মেয়ে শিশুগুলো কাজ করছে মানুষের বাসায় কিংবা করছে অন্য কোনো শিশুশ্রম।

মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে অবশ্য জীবনধারণ বলতে কোনরকমে টিকে থাকাটাই বোঝায়। এত অধিকার নিয়ে ভাবার মতো সময় তাদের নেই।

ভাবছেন হয়তো উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতে শিশুরা নিজেদের অধিকার ঠিকমতো পাচ্ছে। তাও কিন্তু নয়। তাদের অবস্থান থেকে তারাও বেড়ে উঠছে না সঠিকভাবে।

কঠিন অবকাঠামোর এই নগরে শিশুগুলোর প্রাণ টিকে রয়েছে ঠিকই কিন্তু হয়তো প্রাণশক্তি হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে! পরিবার, সমাজ আর অবস্থানের উপর ভিত্তি করে বেড়ে উঠছে তারা। নিজেদের মতো একটু খেলা, একটু চঞ্চলতায় সময় কাটানো, একটু নিজের শখ পূরণ-সব ধীরে ধীরে অধরা হয়ে যাচ্ছে হয়তো। একদিন ও যুগের শৈশব আর কৈশর থাকবে কেবল লেখায় লেখায়।

এইতো এখনকার ট্রেন্ড হচ্ছে লুডু স্টার। এন্ড্রোয়েড মোবাইলে ক্লিকেই এগিয়ে চলে গুটির আগানো আর কাটাকুটি খেলা। অথচ, একটা সময় এই সামান্য খেলাকে ঘিরে ছিল কত উত্তেজনা! পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে পড়ার আনন্দ এখনকার শিশুরা আর অনুধাবন করতে পারে না। তাদের কাছে সুইমিংপুলে সাঁতার কাটানোই আনন্দের বিষয়। মাঠের ঘোরাঘুরি এখন গিয়ে ঠেকেছে টিকিট কেটে ঢোকা পার্কে। ফুল টোক্কা খেলার কপালের টোকা নয়, এখন তারা টোকা দেয় পুলের বোর্ডে। রাত জেগে ভূতের গল্প শোনার চেয়ে মোবাইলে বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাট করতেই ভালোবাসে তারা।

এভাবে চলতে থাকলে আমাদের আগামী প্রজন্ম হয়তো খোলা মাঠে খেলতে যাওয়া কিংবা পুতুল খেলার কথা শুনলে অবাকই হবে, আর তা আমাদের জন্য মোটেও শুভকর কিছু হবে না। সেই প্রজন্ম হয়তো তথ্য প্রযুক্তির আধুনিক ছোঁয়ায় আরও এগিয়ে যাবে আবেগহীন পৃথিবীতে। কিন্তু চাপা পড়বে মানবিকতার চিরন্তন অনুষঙ্গগুলো।

ওডি/এনএম 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড