• শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০, ২৭ চৈত্র ১৪২৬  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ফিচার

করোনা ভাইরাস সংকট : ঝুঁকি মোকাবিলায় কতটুকু সক্ষম বাংলাদেশ

  সাঈদ ইবরাহীম রিফাত

১৮ মার্চ ২০২০, ১২:৫৬
করোনা
ছবি : প্রতীকী

করোনা ভাইরাস নামে বহুল পরিচিত কোভিড-১৯ ভাইরাসটি বর্তমান সময়ের ভয়াবহ একটি আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আকস্মিক দাপটে পুরো বিশ্ব যেন নতজানু হয়ে দাঁড়িয়েছে, মুখ থুবড়ে পড়েছে বিশ্ববাসীর স্বাভাবিক জীবনের গতিময়তা।

ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকা এই ভাইরাসটি এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশেও। এ পর্যন্ত আট জন করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী চিহ্নিত হয়েছেন, যার মধ্যে দুজন শিশু। সাম্প্রতিকতম সময়ে দেশে চীন, ইতালী ফেরত প্রবাসীদের নিয়েও তৈরি হয়েছে ভয়াবহ সংকট, করোনা জীবাণু বহন করছেন সন্দেহে বাধ্যতামূলকভাবে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে তাদের। কোয়ারেন্টাইনে রাখা হলেও সঠিক নিয়ম পালন করছেন খুব কম সংখ্যক বিদেশফেরত এসব প্রবাসী ।  

এসব কিছুর মাঝে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন নাড়া দেয়, করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি আসলে এদেশে কতটুকু? আর ঝুঁকি যদি থেকেই থাকে, করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশ কি আদৌ প্রস্তুত?

করোনা টেস্ট করার জন্য যে পদ্ধতি বা সরঞ্জামাদি দরকার, এখন পর্যন্ত তা এ দেশে অপ্রতুল। করোনা টেস্টের যে প্রক্রিয়া এ দেশে বিদ্যমান তা যথেষ্ট দ্রুত নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, তারা চেষ্টা করছে করোনা টেস্টের ফলাফল দ্রুত জানবার জন্য যে সিস্টেমগুলো রয়েছে সেগুলো এদেশে দ্রুত নিয়ে আসার। কিন্তু এখন পর্যন্ত দেশে তা এসেছে বলে জানা যায়নি।

ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষিত নমুনা পদ্ধতি খুব দ্রুত দেশে আনার চেষ্টা চলছে। আমাদের দেশে এই পদ্ধতি আসলে অল্প সময়ের মধ্যে ল্যাব টেস্ট থেকেই করোনা আক্রান্ত রোগী চিহ্নিত করা সম্ভব হবে এবং তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মেনে নেবে। কেননা, দেশের ল্যাবসমূহ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। এই ‘র‍্যাপিড টেস্ট’ দেশে সম্ভবপর হলে খুব অল্প সময়েই নিশ্চিতভাবে করোনা রোগী চিহ্নিত করা সম্ভব হবে এবং তা খুব দ্রুতই দেশে আসছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে। তখন আর নমুনা পরীক্ষার ফলাফল পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আর কোথাও পাঠাতে হবে না। 

এতো গেল শুধু রোগ শনাক্তকরণের কথা। করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবায় কতটুকু প্রস্তুতি আছে আমাদের?

বর্তমান যে প্রেক্ষাপট, তাতে বাংলাদেশ আদতে মোটেও করোনা ঝুঁকিমুক্ত নয়। ঘনবসতিসম্পন্ন এই দেশে মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখনো চলছে সমান তালে। করোনা ঝুঁকি প্রতিরোধে জনগণের মাঝে আছে দায়সারা মনোভাব। এ থেকে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশের ঝুঁকি আসলে অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি।

তবে, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস চীনের মতো হবে এটা মনে করা ভুল হবে। কারণ, পৃথিবীর সব দেশই এখন করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে যথাযথ প্রস্তুতি নেবার সময় পেয়েছে এবং নিচ্ছে। চীন সেটা পায় নি। যদিও তাদের প্রথমে প্রস্তুতিতে যথেষ্ট পরিমাণ ঘাটতি ছিলো, কিন্তু এখন তারা ঝুঁকিপূর্ন এলাকাগুলো সিলগালা করে দিয়েছে। 

সরকারের ভাষ্যমতে, দেশে ইতিমধ্যে প্রতিটি হাসপাতালে কোয়ারেন্টাইন প্রস্তুত করা হয়েছে। সন্দেহভাজনদের কোয়ারেন্টাইনে পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। প্রবাসফেরত কেউ আক্রান্ত হয়ে যাতে অন্যদের কাছে এ ভাইরাস ছড়াতে না পারে, সে ব্যাপারেও সরকারকে কঠোর অবস্থান অনুসরণ করতে দেখা গেছে। এ রোগ প্রতিরোধ এবং চিকিৎসা করতে যেসকল সরঞ্জামাদি এবং সুবিধা দরকার, তা আছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা।

চীন এবং ইতালি ফেরত প্রবাসীদের আশকোনা হজ্ব ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। সেখানে থাকা সাতটি ডর্মিটরিতে ইতালি ও চীনফেরত ৩০২ জন বর্তমানে অবস্থান করছেন। তাদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে নিয়োজিত আছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল সার্ভিস ইউনিট। ত্রিশ শয্যাবিশিষ্ট আইসোলেশন শাখা খোলা হয়েছে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। তাদের যেকোন প্রয়োজনে ওষুধসহ সবকিছু সরবরাহ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করছে মিলিটারি পুলিশ।

পাশাপাশি, সবার খাবার, শিশু খাদ্য সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী সরবরাহ করছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রণালয়। হজ্ব কোয়ারেন্টাইনের সার্বিক ব্যবস্থাপনা করছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়। দেশের সব মেডিকেল কলেজে আইসোলেশন ওয়ার্ড ও কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলকভাবে খোলা হয়েছে।সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীর জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থাপনা ঠিক নেই। যদিও এখন পর্যন্ত খুব কম সংখ্যক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু কোনভাবে যদি তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তবে তা প্রতিরোধের সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। 

তাদের মতে, কোয়ারেন্টাইনগুলোতে যথাযথ ভাবে নিয়ম পালন করা হচ্ছে না। একসাথে এমনভাবে মানুষ রাখা হয়েছে যাতে খুব সহজেই একজন থেকে আরেকজনে করোনা সংক্রমণ ঘটতে পারে। একই টয়লেট ব্যবহার করছেন সবাই। খাবারও খাচ্ছেন একসাথে। অথচ কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থার প্রথম শর্ত হচ্ছে সর্বোচ্চ ছয়জনকে একসঙ্গে একরুমে রাখা যাবে।

সরকার অনেকটাই ভুল পথে এগোচ্ছে জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক জানিয়েছেন, আমেরিকার ২০টি বিমানন্দরে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার আছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে যাত্রীরা আমেরিকায় প্রবেশ করতে পারে। কোয়ারেন্টাইনে সর্বোচ্চ চার থেকে ছয়জনকে একসঙ্গে রাখা যায়। এর বেশি হলে সেটা আর কোয়ারেন্টাইন নয়। 

চীন ও ইতালী থেকে এত মানুষকে এই মুহূর্তে দেশে আনা উচিত হয়নি, তারা সেখানেই ভালো ছিলেন এটা তাদেরই স্বীকারোক্তি। কোয়ারেন্টাইন নিয়ে ব্যবস্থাপনাটাও সঠিক করা জরুরি ছিল। যদিও সরকার বলছে এদের কেউ আক্রান্ত নয়। অস্ট্রেলিয়া তাদের লোক ফিরিয়ে নিয়ে নির্জন দ্বীপে রেখেছে। এদিকে আমরা অনেক জনবহুল একটি দেশ। আর এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মানুসারে এপিডেমিওলজিস্ট, ভাইরোলজিস্ট, এনভায়রনমেন্টাল, মেডিসিন স্পেশালিস্টের সমন্বয়ে একটি টিম করে কাজ করা উচিত।

করোনা আক্রান্ত হলে যেভাবে বুঝবেন :

করোনার মূল উপসর্গের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জ্বরসহ হালকা গা ব্যথা, গলা ব্যথা, মাথা ব্যথা, অনবরত সর্দি,কাশি এবং শেষে শ্বাসকষ্ট। এই সংক্রমণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দূর্বল ব্যক্তিদের জন্য প্রাণহানিকর হতে পারে। অঙ্গ বৈকল্য, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে চুড়ান্ত পর্যায়ের লক্ষণ। বয়স্কদের করোনা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তরুণ ও শিশুদের থেকে বেশি।


করোনা প্রতিরোধে করণীয় :

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে মেডিক্যাল মাস্ক ব্যবহার বিস্তার রোধে সাহায্য করে। নিয়মিত স্যানিটাইজার ব্যবহার, সাবান দিয়ে ৩০ সেকেন্ড সময় নিয়ে হাত ধোয়া, গলা ভিজিয়ে রাখা, জনবহুল স্থান, আক্রান্ত এলাকা, আক্রান্ত মানুষের শারীরিক সংস্পর্শ সম্পূর্নভাবে এড়িয়ে চলা, হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় সাধারণ মানুষের থেকে দূরে অবস্থান করা, অসুস্থ পশুপাখি থেকে যথেষ্ট পরিমাণ দূরত্ব বজায় রাখা, মাছ মাংস ইত্যাদি ভাল করে কয়েকবার ধুয়ে তারপর রান্না করা প্রভৃতি এই ভাইরাসের ঝুঁকি কমানোর সর্বোত্তম উপায়।

শেষ কথা :

লক্ষণ যদি দেখা দেয় তবে প্রচুর পরিমাণ বিশ্রাম নিন, পানি পান করুন এবং আলাদাভাবে বাসায় অবস্থান করুন, নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।

ভাইরাসটি প্রতিরোধকল্পে জরুরি তথ্য ও পরামর্শ পেতে হটলাইন চালু করেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষনা ইন্সটিটিউট আইইডিসিআর। 
করোনা ভাইরাসে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হোন। করোনা সন্দেহ হলে কালতিবিলম্ব না করে ১৬৩৪০ নাম্বারে যোগাযোগ করুন। যে কোন পরামর্শ পেতে হটলাইন নম্বরগুলো হলো- ০১৯৩৭১১০০১১, ০১৯৩৭০০০০১১, ০১৯২৭৭১১৭৮৪ ও ০১৯২৭৭১১৭৮৫ এসব নম্বরে ফোন করলে জানা যাবে করোনাভাইরাসের স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ।

আরও পড়ুন : সোয়েটিং সিকনেস : যে মহামারির রহস্য জানা যায়নি আজও 

করোনা ভাইরাস সম্পূর্নভাবে নিরাময়যোগ্য। ইতিমধ্যে অনেক দেশেই আক্রান্তরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে আরম্ভ করেছেন। পাশাপাশি, কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ কাউকে করোনা প্রতিরোধে পদক্ষেপ না নিতে দেখলে হটলাইনে কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেয়া যেতে পারে। 

ওডি/এসএন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড