• মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২০, ১৭ চৈত্র ১৪২৬  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ভারতীয়দের শোষণের জন্য কাঁটাযুক্ত গাছপালার প্রাচীর

১১ মার্চ ২০২০, ১২:২৮
প্রাচীর
ছবি : প্রতীকী

চীনের গ্রেট ওয়াল বা মহাপ্রাচীর সম্পর্কে নিশ্চয়ই শুনেছেন। পাথর ও মাটি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে সেই প্রাচীর। ৮ হাজার ৮৫২ কিলোমিটার লম্বা প্রাচীরটি চীনের সীমান্ত রক্ষার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল।

উনিশ শতকে পূর্ব ভারতকে পশ্চিম ভারত থেকে আলাদা করা হয়েছিল। আলাদা করার জন্য একটি প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রাচীরটি ইট, কাঠ ও পাথর নির্মিত ছিল না। প্রাচীরটি নির্মাণ করা হয়েছিল কাঁটাযুক্ত গাছপালা দ্বারা।

প্রাচীরটি নির্মাণে ভারতীয় বরই গাছ, নাশপাতি গাছ, বাঁশ ও বাবলাগাছ ব্যবহার করা হয়েছিল। মানুষের তৈরি এই জীবন্ত প্রাচীর এক হাজার কিলোমিটারের অধিক দীর্ঘ ছিল। প্রচীরটি নর্মদা নদীর তীর দিয়ে পাঞ্জাবের লাইয়াহ থেকে বুরহানপুর পর্যন্ত সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছিল। পাঞ্জাব প্রদেশটি বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত।

জীবন্ত প্রাচীর নির্মাণের জন্য ব্রিটিশরা ১৮৪০ সালে সবুজ গাছপালা রোপণ করেছিল। জীবন্ত প্রাচীরটি ছিল মানব নির্মিত খুবই অদ্ভুত একটি কাজ। প্রাচীরটি যেমন ছিল অদ্ভুত কাজ তেমনই তার নির্মাণের উদ্দেশ্যও ছিল খুবই অদ্ভুত।

বর্তমান সময়ের মতো তৎকালেও ভারতীয়দের খাদ্যে লবণ ছিল অত্যাবশ্যকীয় একটি উপাদান। যা ছাড়া খাবারের স্বাদ কল্পনাও করা যায় না। এই লবণের ওপর শুল্ক আরোপ করা এবং তা আদায়ের জন্যই প্রাচীরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এছাড়াও ঔপনিবেশিক শাসকদের শোষণের চিত্রও প্রাচীরের ইতিহাস থেকে বোঝা যায়।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে ও আরব সাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে প্রচুর লবণ উৎপন্ন হতো। এছাড়াও উড়িশ্যা অঞ্চলেও প্রচুর লবণ উৎপন্ন হতো। এসব অঞ্চল ছাড়া অন্যান্য অঞ্চলে চন্দ্র মৌর্যগুপ্তের শাসনামলে লবণ উৎপাদন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। যার জন্য সে সময় ভারত লবণ আমদানী করত।

অষ্টাদশ শতকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের লবণ ব্যবসা কঠোরভাবে দমন করেছিল। এর ফলে ভারতে এই কোম্পানি একচেটিয়া লবণের ব্যবসা করতে থাকে। এছাড়াও যদি কেউ লবণ বিক্রি করতে চাইতো তবে তাকে কোম্পানির নির্ধারণ করা মূল্যে বিক্রি করতে হতো।

এতসব কৌশলের দ্বারা মূলত কোম্পানিটি ভারতের লবণের ব্যবসা নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল। এরপর তারা খোলা বাজারে উচ্চমূল্যে লবণ বিক্রি করার সুযোগ পেয়েছিল। লবণের অভাবে পড়ে এক সময় মানুষ গুদামজাত লবণ চুরি করা শুরু করেছিল। এছাড়াও আশপাশের কিছু রাজ্য অর্থাৎ যে রাজ্যগুলোতে সরাসরি ব্রিটিশদের শাসন প্রচলিত ছিল না সেখান থেকে লবণ চোরাচালান শুরু করেছিল।

যাই হোক, অভ্যন্তরীণ শুল্ক বিভাগের কমিশনার অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউমের মাথায় প্রথম চিন্তা আসে প্রাচীর নির্মাণের। তিনি ছিলেন একজন উদ্ভিদবিদ। তিনি বিভিন্ন ধরনের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। তার পরীক্ষালদ্ধ জ্ঞানকে কাজে লাগিয়েই জীবন্ত প্রাচীর তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন। 

প্রথমে কাঁটাযুক্ত গুল্মজাতীয় গাছের ডালপালা ফেলে ঝোপ তৈরি করা হয়েছিল। সেগুলোরই কোনো কোনো ডাল মাটিতে পড়ে গজাতে থাকে। এভাবে ১৮৬৮ সালে ২৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ জীবন্ত প্রাচীর তৈরি হয়েছিল। 

জীবন্ত বেড়া ১২ ফুট উঁচু ও ১৪ ফুট পুরু হয়েছিল। যা মানুষের জন্য অভেদ্যও হয়েছিল। যেসব স্থানে গাছপালা জন্মাতো না সেসব স্থানে পাথরের দেয়াল তৈরি করা হয়েছিল। এভাবেই জীবন্ত বেড়া এক হাজার কিলোমিটারের অধিক দীর্ঘ হয়েছিল। কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, ১৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ হয়েছিল।

প্রাচীরটি অভেদ্য হলেও চোরাকারবারিরা কিন্তু ভেদ করার চেষ্টা বাদ রাখেনি। তারা উট ও গরুর পিঠে লবণের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে প্রাচীর ভেদ করার জন্য প্রাণীগুলোর ওপর বল প্রয়োগ করত। বল প্রয়োগের মাধ্যমে জোর করে প্রাচীরের ভেতর দিয়ে প্রাণীগুলোকে চালাতো। এছাড়াও অনেকে লবণের বস্তা গাছপালার ওপর ছুঁড়ে মারত। অতিরিক্ত লবণের কারণে গাছপালা মরে যেত। জানা যায়, ১৮৭৭ সাল থেকে ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত ৬ হাজারের অধিক চোরাকারবারিকে অবৈধভাবে প্রবেশকালে ধরা হয়েছিল।

এক সময় এই জীবন্ত প্রাচীর সকলের কাছে উপদ্রপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। যার ফলে ব্রিটিশরাই তাদের ব্যবসায়িক কৌশলের নানারূপ পরিবর্তন নিয়ে আসে এবং প্রাচীরটি বিলুপ্ত করার চেষ্টা করে। প্রাচীরটি থাকার সময় ভারতীয়দের লবণ খাওয়ার পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অনেক কমে গিয়েছিল। এর ফলে তারা বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। ১৮৭৯ সালে অভ্যন্তরীণ শুল্ক প্রথা বিলোপ হলে লবণ খাওয়ার পরিমাণ দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল।

এক সময় জীবন্ত প্রাচীর বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে লবণের উপর আরোপিত শুল্ক কিন্তু চালুই ছিল। সমালোচিত শুল্ক প্রথাটি ভারতের স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। লবণের ওপর কর পুরোপুরি বন্ধ হয়েছিল ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে ভারতের স্বাধীনতার দশ মাস পূর্বে।

ভারতের জীবন্ত প্রাচীর সম্পর্কে এক সময় মানুষ ঠিকমতো জানত না। লেখক রায় মোক্ষম তার ‘গ্রেট হেজ অব ইন্ডিয়া’ নামক বইয়ে জীবন্ত প্রাচীর সম্পর্কে যখন লিখেছিলেন তখনই মানুষ এটি নিয়ে অনেক কিছুই জানতে পারে। 

আরও পড়ুন : এই গ্রামে নেই কোনো রাস্তা!

সেই সঙ্গে জানতে পারে ব্রিটিশদের অত্যাচার, নির্যাতন ও তাদের জেদী শাসনের পরিচয়। যে শাসনে প্রতিনিয়ত ভারতীয়দের জীবন নিষ্পেষিত হয়েছিল। একজন ব্রিটিশ সরকারি কর্মচারীর মতে, চীনের মহাপ্রচীর ব্যতিত ভারতের জীবন্ত প্রাচীরের সাথে কোনো প্রাচীরেরই তুলনা করা চলে না।

সূত্র- অ্যামিউজিং প্লানেট, অ্যাটলাস অবসকিউরা, ওয়াসিংটন পোস্ট

ওডি/এনএম
 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড