• রবিবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ১২ মাঘ ১৪২৬  |   ২১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

নারী শিক্ষার প্রজ্বলনের নাম বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন

  সাহিত্য ডেস্ক

০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:৩০
ছবি
ছবি : বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া

ঘর এবং ঘরের বাহিরে পুরুষের সাথে নারীরা সমান তালে পড়া-লেখার পাশাপাশি চাকরি করছে, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিটি পদে। নারীদের এই এগিয়ে যাওয়া বর্তাস সময়ে যতটা সাধারণ মনে হয় ঠিক ততটা কঠিন ছিলো ১৯ শতকেও। নারীরা ঘরের বাহিরে পা রাখবে, সেটা ছিলো চিন্তাতীত। তবে সময়ের সাথে সাথে এই চিন্তাধারার যেমন বদল হয়েছে তেমনি সেই সাথে বদলেছে সমাজব্যবস্থাও। নারীদের প্রতি চিন্তাধারা ও সমাজব্যবস্থার এই আকস্মিক পরিবর্তনে রয়েছে একজন মহীয়সী নারীর অবদান। তিনি হচ্ছেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, যাকে আমরা সবাই ‘বেগম রোকেয়া’ নামেই জানি। অন্যদিকে যাকে বলা হয় ‘বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত’। 

তিনি  ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার পায়রাবন্দের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের ছিলেন দিনাজপুর জেলার সবচাইতে প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং মা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। রোকেয়ারা ছিলেন তিন বোন ও তিন ভাই। রোকেয়ার দুই বোন করিমুন্নেসা এবং হুমায়রা। তিনি ছিলেন মেঝ। আর তিন ভাইয়ের মধ্যে আবুল আসাদ শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেন। বাকি দু’ভাইয়েরা হলেন ইব্রাহীম সাবের এবং খলিলুর রহমান আবু জাইগাম সাবের।

রোকেয়ার সময় কালে মুসলিম সমাজে ছিল কঠোর পর্দা ব্যবস্থা। বাড়ির মেয়েরা পরপুরুষ তো দূরে থাক, অনাত্মীয় নারীদের সামনেও নিজেদের চেহারা দেখাতে পারতো না। এমনকি তাদের কণ্ঠস্বর যাতে কেউ না শুনতে পায়, এ জন্য তাদেরকে অন্দরমহলের ভেতরে লুকিয়ে রাখা হতো। যদিও বেগম রোকেয়ার পরিবার ছিল খুবই উচ্চ শিক্ষিত এবং সমাজসচেতন, তবুও এই পরিবারে খুব কঠোরভাবে পর্দাপ্রথা মেনে চলা হতো। এমনকি রোকেয়া ও তার বোনদের কখনোই বাড়ির বাইরে পড়াশুনা করার জন্য পাঠানো হয়নি। তারা ছিলেন পুরো গৃহবন্দী। বাড়ির ভেতরেই আবদ্ধ অবস্থায় চলতো আরবি ও উর্দু ভাষার পাঠ। 

তবে বেগম রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহীম সাবের ছিলেন আধুনিক চিন্তা ধারার মানুষ। তিনি কখনোই চাননি অন্যদের মতো তার বোনগুলো পিছিয়ে থাকুক। তাই তিনি রোকেয়া ও করিমুন্নেসাকে ঘরেই গোপনে বাংলা ও ইংরেজি শিখিয়েছেন। তিনি সর্বদাই রোকেয়াকে ইংরেজি শেখার জন্য উৎসাহিত করতেন এবং বলতেন, ‘বোন, এই ইংরেজি ভাষাটা যদি শিখে নিতে পারিস, তা হলে তোর সামনে এক রত্নভাণ্ডারের দ্বার খুলে যাবে।’

বেগম রোকেয়া তার ‘পদ্মরাগ’ উপন্যাসটি বড়ভাই ইব্রাহীম সাবেরকে নামে উৎসর্গ করে লিখেছিলেন, ‘দাদা! আমাকে তুমিই হাতে গড়িয়া তুলিয়াছ।’

১৮৯৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে বেগম রোকেয়ার বিয়ে হয় ভাগলপুরের উর্দুভাষী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সাথে। যিনি ছিলেন অত্যন্ত আধুনিকমনস্ক। যার হাত ধরেই বেগম রোকেয়া পেয়েছিলেন স্বাধীনতার স্বাদ, নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করার অফুরন্ত সুযোগ। বেগম রোকেয়াকে তিনি প্রতিনিয়ত উৎসাহ দিয়েছেন লেখালিখি করার জন্য। বিয়ের পর রোকেয়ার আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় পড়ালেখা পুরোদমে শুরু হয় এবং সাহিত্যচর্চার পথটাও মসৃণ হয়ে যায়।

বেগম রোকেয়া ‘পিপাসা’ নামক একটি গল্প লিখে বাংলা সাহিত্যের পথে হাঁটতে শুরু করেন ১৯০২ সালের দিকে। তার উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর মধ্যে প্রসিদ্ধ ‘Sultana’s Dream’, যার অনূদিত নাম ‘সুলতানার স্বপ্ন’। তার অন্যান্য গ্রন্থগুলো মধ্যে পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী, মতিচুর গ্রন্থে রয়েছে ১৯ শতকের নারী অবরোধের কাহিনী। নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী ইত্যাদি পত্রিকায় তার লিখা নিয়মিত প্রকাশিত হতো।

এছাড়াও তিনি রচনা করেছেন ব্যঙ্গধর্মী গল্প, ছোট গল্প এবং ৭টি কবিতা। বেগম রোকেয়া প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসের মধ্য দিয়ে নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গসমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। হাস্যরস, কটাক্ষ ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসম অবস্থান ফুটিয়ে তুলেছেন। তার রচনা পড়লেই বোঝা যায়, তিনি কতটা সমাজ সচেতন ছিলেন।
        
১৯০৯ সালে সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যুর পর বেগম রোকেয়া মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লেও হাল ছাড়েননি। কারণ তিনি সচেতন ছিলেন নিজ কর্তব্য সম্পর্কে। স্বামীর মৃত্যুর মাত্র ৫ মাস পর বেগম রোকেয়া ভাগলপুরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ নামে একটি মেয়েদের স্কুল। তবে বেগম রোকেয়াকে কিছুদিন পর ১৯১০ সালে সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় স্কুল বন্ধ করে দিতে হয়েছিলো এবং তাকে কলকাতায় চলে আসতে হয়ে ছিলো।

কলকাতায় তিনি নতুন উদ্যমে ১৯১১ সালের ১৫ মার্চ ১৩ নম্বর ওয়ালীউল্লাহ্ লেনের একটি বাড়িতে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ আবার চালু করেন। প্রাথমিক অবস্থায় এখানে ছাত্রী ছিল ৮ জন। চার বছরের মধ্যেই ছাত্রীসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪-তে। ১৯৩০ সালের দিকে এটি হাইস্কুলে পরিণত হয়। শুরুতে তার এ সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। তিনি কলকাতার বেথুন ও গোখেল মেমোরিয়াল প্রভৃতি স্কুলে যেয়ে প্রথমে স্কুল কীভাবে চালাতে হয়, সে সম্পর্কে ধারণা অর্জন করেন।

১৯৩০ সালে তার হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে সেটি একটি উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। তার এই অসামান্য কাজের প্রশংসা করেন ব্রিটিশ- ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিশিষ্ট নেত্রী সরোজিনি নাইডু। তিনি বেগম রোকেয়াকে একটি চিঠিতে লেখেন, ‘কয়েক বছর ধরে দেখছি সে আপনি কি দুঃসাহসের কাজ করে চলছেন। মুসলিম বালিকাদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য আপনি যে কাজ হাতে নিয়েছেন এবং তার সাফল্যের জন্য দীর্ঘকালব্যাপী যে কাজ হাতে নিয়েছেন, তা বাস্তবিকই বিস্ময়কর।’

এই মহীয়সী নারী আজন্ম নারীশিক্ষার প্রসারে কাজ করেছেন আমৃত্যু। তিনি ১৯৩২ সালের আজকের দিনে (৯ ডিসেম্বর) মৃত্যুবরণ করেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড