• সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৫ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

দেশের সমস্যার সমাধানে দরকার সামাজিক নিরাপত্তা

রহমান মৃধা
সুইডেন প্রবাসী রহমান মৃধা

দেশের বাইরে থাকলেও দেশের নানা ধরনের সমস্যা প্রতিনিয়ত চোখে পড়ে। ওই সব সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে আগে খুঁজি সমস্যার কারণগুলো। এ পর্যন্ত যতো বিষয়ের ওপর লিখেছি তাতে পরিষ্কার যে একটি সমস্যার সাথে আরেকটির ভালো লিংক রয়েছে। 

যেমন দুর্নীতির পেছনে শিক্ষার অবনতি। বন্দুকযুদ্ধ বা খুন খারাপির পেছনে বিবেকের অবক্ষয় এবং অভাব-অনটন জড়িত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনব্যবস্থার অবনতি, ন্যায়বিচারের অভাব বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে সমস্যা সৃষ্টির জন্য দায়ী। 

উপরের সমস্যাগুলো শুধু যে বাংলাদেশে তা নয়। এ ধরণের সমস্যা যে সব দেশে লক্ষণীয় তার মধ্যে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভারত, সাউথ আমেরিকার বেশ কিছু দেশ এবং আফ্রিকার অনেক দেশ জড়িত রয়েছে। যে সমস্ত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের মিল দেখছি তার মধ্যে একটি জিনিস বেশ পরিষ্কারভাবে লক্ষণীয় তা হলো জাতীয় জীবনে সামাজিক নিরাপত্তার অভাব। এখন প্রশ্ন সামাজিক নিরাপত্তা কী এবং তা কীভাবে পাওয়া যেতে পারে? যে সব দেশে সামাজিক নিরাপত্তা রয়েছে তার স্বরূপ কেমন?

সামাজিক নিরাপত্তা মানে জাতির ন্যূনতম একটি আয়ের ব্যবস্থা, চিকিৎসার ব্যবস্থা, শিশু পুষ্টির ব্যবস্থা, বেকার ভাতা, ছেলেমেয়ের স্কুলের ব্যবস্থা, বৃদ্ধের ভাতা, শান্তি এবং স্বস্তিতে বসবাস করা, জীবনের সব ধরণের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। 

যে সমস্ত দেশে ন্যূনতম সুযোগ সুবিধা রয়েছে যেমন নিকটতম দেশ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া। যে সমস্ত দেশে উচ্চতম সুযোগ সুবিধা রয়েছে যেমন সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড।  

আবার যে সমস্ত দেশে বলতে গেলে এর কিছুই নেই যেমন বাংলাদেশ, পাকিস্তান,  আফ্রিকার বেশির ভাগ দেশ এবং সাউথ আমেরিকার অনেক দেশ এর মধ্যে পড়ে। 

ক্রাইম কম বেশি পৃথিবীর সব জায়গায় রয়েছে। তবে বাংলাদেশের মতো যে সব দেশে দিনে দুপুরে মানুষ খুন, বন্দুক যুদ্ধের নামে সত্যকে ঢাকতে ক্রিমিনাল খুন, দুর্নীতি, প্রশিক্ষণের অধঃপতন, চিকিৎসায় ফাঁকি, খাবারে ভেজাল এবং সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বললে গুম এসব চলছে। এর মূল কারণ একটাই তা হলো এসব দেশের মানুষের জীবনে সামাজিক নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেই। আর নেই বিধায় সবাই লুটপাট করা থেকে শুরু করে যতো ধরণের অপকর্ম করার করছে। 

এবং এই অপকর্মের সঙ্গে সারাদেশের সরকারি, বেসরকারি সব ধরণের মানুষ জড়িত। দেশের আইন ব্যবস্থার অধঃপতন, পুলিশ বাহিনীর স্বেচ্ছাচারিতা, প্রশাসন এবং সচিবালয়ের অরাজকতা, সংসদ ভবনে অশ্লীল কথাবার্তা  আর পরনিন্দা চর্চা এর জন্য দায়ী। ধর্মীয় কথা, জেল হাজতের ভয় দেখিয়ে এমন কি বন্দুক যুদ্ধে হত্যা করেও কোনো ভালো পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করাও ভুল হবে। 

জাতির অন্ন, বস্ত্র,বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং সর্বোপরি তাদের বাকশক্তির উপর স্বাধীনতার নিরাপত্তা দিতে না পারলে দেশের সমস্যার পরিবর্তন হবে না। মুখে মুখে বললে হবে না যে জনগণ ক্ষমতার মালিক তাকে হাতেনাতে প্রমাণ করে দেখাতে হবে। 

সরকারি, বেসরকারি কর্মচারীদের দেশের জনগণের কাছে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং সর্বোপরি জনগণ যে ক্ষমতার মালিক তা প্রমাণ করে দেখাতে হবে। বাংলাদেশের পরিবর্তন আনতে হলে জনগণের ভালোবাসা, বিশ্বাস যদি সরকার অর্জন করতে না পারে তবে দেশের আইন শৃঙ্খলা থেকে শুরু করে সামাজিক নিরাপত্তা, দুর্নীতি মুক্ত, খুন খারাপি, কুশিক্ষা এর কিছুরই পরিবর্তন হবে না। 

বাংলাদেশের মানুষের কাছে গণতন্ত্রের চাবি ফিরিয়ে দিতে হবে। প্রত্যেকটি নাগরিককে সম্মানের সাথে তাদের সামাজিক মৌলিক অধিকার এবং তাঁরাই যে মাস্টার অফ দি আর্ট তা প্রমাণ করে দেখাতে হবে। তাহলে সম্ভব বাংলার মানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা। 

প্রশ্ন, আমরা কি প্রস্তুত এমন একটি চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে? আমি সুইডেনে থাকি, দেখছি এরা কিভাবে বেকার ভাতা দিয়ে বেকারত্বের সমস্যার সমাধান করছে। এখানে যদি কেউ লেখাপড়া করতে চায় তাকে সে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এখানে ভেজাল খাদ্যের কোনো উৎস নেই। এখানে দুর্নীতির জায়গা নেই। এখানে গণতন্ত্রের বেস্ট প্রাকটিস হচ্ছে প্রতিক্ষণ। সরকার দায়বদ্ধ তার মাস্টারের কাছে জবাবদিহি করতে এবং করছে। সমস্ত প্রশাসন জনগোষ্ঠীর জন্য ২৪ ঘণ্টাই তাদের সেবায় নিয়োজিত। তাই স্বাভাবিকভাবে জনগণই দেশের ভালোমন্দের জন্য দায়ী। 

জনগণের দায়ভার প্রশাসন নিলে কি করবে তারা? ধর্ষণ, দুর্নীতি, মানুষে মানুষ খুন, নীতিতে অনীতি ঢুকানো, খাবারে ভেজাল মেশান এসব হয়েছে বর্তমানে দেশের বেশীরভাগ জনগণের কাজ। জনগণকে তার ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে হবে এবং প্রশাসনকে জনগণের পাশাপাশি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেশকে সুইডেন বা নিউজিল্যান্ড করার স্বপ্ন দেখতে হবে এবং তাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। প্রথম কাজ করতে হবে তা হলো সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। 
তবে শুরু করতে গেলে নতুন ধরণের বাঁধার সম্ভাবনা আসতে পারে তাই একটি কথা মনে করিয়ে দিতে চাই, সেই একাত্তরের রক্তের দাগ এখনও অনেকের হাতে লেগে আছে এবং সেটা তারা কোনোদিন মুছে ফেলতে পারবে না। সেই রক্তের দাগ দুই ধরনের মানুষের মাঝে এখনও বিরাজ করছে। যারা বাংলাদেশ চেয়েছিল এবং রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করে গেছে।

আর যারা বাংলাদেশ চায়নি, তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করেছে, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে, লেখকের হাত কেটেছে, মানুষের চোখ তুলে নিয়েছে, মানুষের বুক চিরে হৃৎপিণ্ড বের করে নিয়েছে। তারা এবং তাদের বংশধর এখনও বেঁচে আছে।

এত বছর পার হয়ে গেছে; কিন্তু তারা একবারও নিজেদের দোষ স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চায়নি। একাত্তরের ঘটনা আমরা যারা বেঁচে আছি,  আমাদের কাছে পুরনো ঘটনা নয়, একাত্তরের ঘটনা আমাদের শরীরের রক্তক্ষরণ। আমি অনেক কিছু ভুলে যেতে চেষ্টা করি কিন্তু এই একটি ব্যাপার আমি কখনও ভুলিনি। সব কিছু জেনে শুনে, নতুন করে একত্র হয়ে, দেশের স্বার্থে, অতীতের কথা ভুলে, আর পুরনো স্মৃতি মনে রেখে, সম্ভব হবে কী আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়া দেশ গড়ার কাজে!

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড