• রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৫ আশ্বিন ১৪২৭  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বাংলাদেশ পুলিশকে সুনাম ধরে রাখতে হবে

  মীর আব্দুল আলীম

০৭ আগস্ট ২০২০, ২২:৪২
মীর আব্দুল আলীম
মীর আব্দুল আলীম

বিরাজমান করোনাকালে সম্মুখযোদ্ধার ভুমিকায় পুলিশ সদস্যরা। বাংলাদেশ পুলিশের অনবদ্য ভূমিকায় সারা দেশে এবার বেশ প্রসংশা পেয়েছে। নানা কারনে নেতিবাচক খবরের বিষয়বস্তু হওয়ায় জনমানসে পুলিশ সম্পর্কিত যে ভীতিপপ্রদ ভাবমূর্তি ছিল মাত্র তিন/চার মাসেই এই দু:সময়ে পুলিশ মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছে তা বলা যায়। এ দুর্যোগে বাংলাদেশ পুলিশের বহুমুখী মানবিক ভূমিকা মুগ্ধতা জাগানিয়া, বিস্ময়কর এবং অনুপ্রেরণাদায়ীও। একারনে আন্ত:র্জাতিকভবেও বাংলাদেশে পুলিশের প্রশংসা করা হচ্ছে। বিদেশী মিডিয়ায় পুলিশের ভালো কাজগুলো স্থান পাচ্ছে। শত দুর্নাম ঘুচিয়ে জীবন বাজি রেখে, জীবন দিয়েপুলিশ যে জনগনের বন্ধু তা প্রমান করেছে।আমাদেও প্রধানমন্ত্রীও পুলিশের প্রসংশা করেছেন। সত্যিই করোনাকালে পুলিশ’এর বিচিত্র ও চমৎকার সব কার্যক্রমে পুলিশের সব দুর্নাম যেন ঘুচতে চলেছে। পুলিশ জনবান্ধব হচ্ছে। আর তা হওয়া খুব জরুরী বটে।

কথা হলো বাংলাদেশ পুলিশের এ সুনাম ধরে রাখা যাবে কিনা? যখন করোনা থাকবে না, তখন কী হবে? পুলিশ কি আগের অবস্থায় ফিরে যাব? পুুলিশের নয়া আইজিপি বলেছেন- পুলিশ যেখানে গিয়েছি সেখান থেকে আর ফিরে আসব না। সেখান থেকে আরও এগিয়ে যাব পুলিশ। মানুষের ভালোবাসা, সম্মান, শ্রদ্ধার যে জায়গা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশতা ধরে রাখবেই। আইজিপির কথায় আমরা আস্বস্থ্যও হতে পারি। পুলিশ জনবান্ধব না হলে জনগনের জন্য তা কষ্টের, দেশের জন্যতো বটেই। করোনাকালে পুলিশ জনগনের যে বন্ধন তৈরি হয়েছে তা যেন অটুট থাকে এই প্রত্যাশা এখন সবার।

একটু পেছনে ফিরে যাই। পুলিশ দু:সময়ে দেশের জন্য জনগনের জন্য যে কাজ করে তার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধেও পুলিশ তাঁদের দেশ প্রেমের প্রমাণ দিয়েছে। পাকিস্তাানি বাহিনীকে প্রতিহত করতে প্রথম জীবন দিয়ে ছিল এই পুলিশবাহিনীর সদস্যরা। কতক দুর্নীতিবাজের কারনে ভাল কাজগুলো ¤øান হয় সব সময়। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ পুলিশে সৎ, নিষ্ঠাবানএবং দেশপ্রেমী সদস্য রয়েছেন। উর্দ্ধতন পুলিশে এখন পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তারা স্থান পাচ্ছেন। যার সুফল মিলতে শুরু করেছে। আমার জানা মতে একজন ডিআইজি মর্যাদার কর্মকর্তা নিজের জন্য একটি ভালো বাড়ি পর্যন্ত করতে পারেননি। তিনি সততার সাথে পুলিশ বিভাগের দুর্নাম ঘুচাতে এবং পুলিশকে জনবান্ধব করতে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশে এখন এমন অনেক কর্মকর্তা খুঁজে পাওয়া যায়।যার কারনে পুলিশ জনবান্ধব হচ্ছে। দেশের স্বার্থে যে কোন মূল্যে পুলিশকে আস্থার জায়গায় ফিরে আসতেই হবে।

বলছিলাম পুলিশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা। হলিআর্টিজানে জঙ্গি হামলাকে পরাস্ত করতে একাধিক পুলিশ অফিসারকে জীবন দিতে হয়েছিল। বাংলাদেশের জঙ্গি দমনে পুলিশের ভূমিকা সারা বিশ্বে নন্দিত। বাংলাভাই থেকে শুরু কওে সকল জঙ্গি দমনে সফলতা দেখিয়েছে পুলিশ। ৫ মে হেফাজতের তান্ডবকে প্রতিহত করে ঢাকা মহানগরীর শান্তি বজায় রাখতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। তারপরও কিছু অপেশাদার অসৎ পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকায় গৌরব প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তবে এবার করোনাযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা সারা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশকে এই জায়গাটা ধরে রাখতেই হবে।

২০২০ এর পুলিশ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য বিষয়টা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। তা ছিল 'মুজিববর্ষে অঙ্গীকার, পুলিশ হবে জনতার'। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, আসলে পুলিশকে জনতারই হতে হবে। জনগণ যেন আস্থা পায়, বিশ্বাস পায়, পুলিশের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারে। সেই কাজটি করতে হবে। বর্তমানে করোনাভাইরাসের সংকটকালে বাংলাদেশ পুলিশ এখন জনতার পুলিশের ভূমিকায় কাজ করে যাচ্ছে। পুলিশ বিভাগ যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয় জয় করতে সক্ষম হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই পুলিশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম, সরকার ঘোষিত লকডাউন নিশ্চিতকরণ, লাশ দাফনসহ বিভিন্ন জরুরি সেবা প্রদানে বাংলাদেশ পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। যাই বলিনা কেন, এদেশে চাইলেও সব কিছু পুরোপুরি সঠিকভাবে করা যায়না। লকডাউনের প্রথম দিকে পুলিশ এবং জনপ্রশাসন ছিলো হার্ড লাইনে। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পুলিশের হার্ডনেসকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে পুলিশ তথা প্রশাসনের ভাবমূতি নষ্টের পায়তারায় নামে কতক মানুষ। মানুষকে ঘরে রাখার জোরপূর্বক বা নিবর্তনমূলক পুলিশিং কার্যক্রম পরিচালনার ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে সমালোচনা হলে বাংলাদেশ পুলিশ সেই স্ট্যাটেজি থেকে সরে আসে। এতে দেশের বেশ ক্ষতিও হয়েছে। ঐসময় লগডাউনটা সঠিকভাবে পালন করা গেলে করোনা পরিস্থিতি অনেক আগেই হয়তো নিয়ন্ত্রণে চলে আসতো। এটা বলতেই হয় করোনাকালে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে যথেষ্ট সচেষ্ট ছিলো। আর তা করে তারা প্রসংশিতও হয়েছে। আগে বলা হতো পুলিশ জনগণের বন্ধু। অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত কথাটির প্রমাণ মিলতো না। পুলিশ কখনো কখনো জনআতংকের কারণ ছিলো। বর্তমান সময়ে তা বাস্তবে পরিণত হয়েছে। পুলিশ জনগনের বন্ধু হতে শুরু করেছে। কেবল এই ধারাবাহিকতাটা ধরে রাখা গেলেই পুলিশ জনগনের বন্ধু হয়েই থাকবে সব সময়।

পুুলিশ কিভাবে এলো। ব্রিটিশরা তাদের উপনিবেশ এলাকায় পুলিশি ব্যবস্থা চালু করে, তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এ দেশীয় মানুষকে দমন করা। তাদের শাসন ব্যবস্থাকে মজবুত করা। দুইশ বছরের ব্রিটিশ শাসন, চব্বিশ বছরের পাকিস্তানি শাসন, স্বাধীন বাংলাদেশে জিয়া, এরশাদ, খালেদা এমনকি বর্তমান সরকারও যেভাবে পুলিশকে দলীয় লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ভিন্নমতকে প্রতিহত করতে অপব্যবহার করেছে। সেই ট্র্যাডিশন থেকে বের হতে একটু সময়তো লাগবেই বটে। তবে আশার কথা বর্তমানে বাংলাদেশ পুলি কে মানবিক পুলিশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নিস্বার্থভাবে তা অব্যহত রাখতে পারলে দেশের জন্য মঙ্গল হবে বৈকি!

আধুনিক নগরায়িত পুলিশের আঁতুরঘর হিসেবে ইংল্যান্ডকে বিবেচনা করা হয়। পুলিশের উৎপত্তি যেখানেই হোক না কেন, আইনিকাঠামো অনুযায়ী পুলিশ হল এমন একটা সরকারি আইনপ্রয়োগকারী বাহিনী যারা জনগণের স্বাস্থ্য, সম্পদ এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধ এবং সমাজিক বিচ্যুতি প্রতিরোধ করে। অপরাধ বিশ্লেষণ, গ্রেফতার এবং টহলের বাইরেও পুলিশ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে থাকে যেমন জাতিসংঘে। বাংলাদেশ পুলিশের আরেকটু ভিন্নতা আছে। তারা অপরাধ ব্যবস্থাপনার বাইরেও আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সামাজিক দায়িত্ব পালন করে থাকে যা বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে অনেক বেশি দৃশ্যমান আছে। আইনের বাইরে থেকে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ রোধ, ছেটখাটো বিষয়গুলো যা আদালতে গড়ালে হয়তো বড় আকার ধারন করবে সেসব বিষয়ের সমাধান অন্তরালে থেকে পুলিশকেই দিতে হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের সবার কাছে পুলিশের নানাবিধ কর্মকান্ড চোখে পড়ে। অনেকে পুলিশের এই কর্মকান্ডের জন্য ‘মানবিক পুলিশ’ শব্দটিও ব্যবহার করছে যা জনগণের কাছে পুলিশকে প্রশংসিত করেছে। আবার এর উল্টোটাও কিন্তু আছে। কতক অমানবিক পুলিস সদস্যের কারনে পুলিশের ভাবমূতি নষ্ট হওয়াতো মামুলি বিষয়। তারপরও বলব প্রচলিত ধারণার বিপরীতে করোনাকালে পুলিশের সকলক্ষেত্রে অংশগ্রহণ ও বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অগ্রণী ভূমিকা পুলিশের ভাবমূর্তি সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে।

পুরো বিশ্বেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে মানুষের ধারণা সুখকর নয়। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা রকম ধারণা, ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। স¤প্রতিকালের দু’টি বিষয় সামনে আনছি। করোনাকালে আমাদের দেশের পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা কয়েক মাসে পুলিশ সম্পর্কে ধারনাই বদলে দিয়েছে। বিশ্বের প্রচার মাধ্যমগুলোতে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে তা। অতিত নিকটে তার ঠিক উল্টোটা ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ কর্তৃক। একজন কৃষাঙ্গ নাগরিক হত্যার পর শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, একই সঙ্গে পুরো বিশ্বকে চরম ভাবে নাড়া দিয়েছিল। প্রশ্নবিদ্ধ করেছে পুলিশবাহিনীর ভুমিকা নিয়ে। এমন সময় আমাদের পুলিশ মানবিক হয়ে মানুষের পাশে থেকে যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে তা কখনই ভুলার নয়।

করোনাকালের শুরুতে যখন হাসপাতালে ডাক্তার মিলছিলোনা; দাফন করার মানুষ পাওয়া যাচ্ছিলো না। ছেলে বাবা-মার, বাবা-মা ছেলের কাছে যেতে ভয় পেতো পুলিশ তখন মানুষের পাশে ছিলো। তাই এসময় পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাই বেশি আক্রান্ত হন। বিশেষ করে করোনাকালে আমাদের পুলিশের মানবিক এই ভূমিকায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তাান হিসেবে পুলিশ বাহিনী বীর সদস্যদের স্যালুট জানাই। এটাও আশা করি তাঁরা যেন তাদের এই সাফল্য, এই সুনাম ধরে রাখে। পুলিশের ওপর যে দ্বায়িত্ব অর্পিত হয়েছে তা পালনে যেন আগামী দিনে মানুষের সুখে-দুখে পাশে থাকবেন এই প্রত্যাশা করছি আমরা। এই চাওয়াটা কিন্তু দেশের আপামর জনতারও।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও গবেষক।

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড