• বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

প্রবন্ধ

নিগৃহীত নারী জীবন ও তার উত্তরণ

  নাসিম আহমদ লস্কর

২৯ জুলাই ২০১৯, ০৯:০০
কবিতা
ছবি : প্রতীকী

সৃষ্টির সূচনালগ্নে স্রষ্টা মানুষকে ‘নারী’ ও ‘পুরুষ’ এ দু’ভাগে বিভক্ত করে সৃষ্টি করেছেন। একে অপরের ভোগ্য সম্পত্তি নয়; বরং পরিপূরক হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা (পুরুষরা) তাঁদের ভূষণ, তাঁরাও (নারীরা) তোমাদের ভূষণ।’ মহান আল্লাহ নারী-পুরুষকে পরস্পরের প্রয়োজনে সৃষ্টি করেছেন। অথচ আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় দেখা যায় সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন, কুসংস্কারাচ্ছন্ন যুগের মতো এখনো পুরুষেরা নারীদের উপর তাঁদের প্রভাব খাটায়। চাপিয়ে দিতে চায় সব দোষ। একজন নারী যখন মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয় তখন থেকেই তার প্রতি একধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অনেক বাবা-মা পুত্র সন্তানের আশায় সন্তান গ্রহণ করে যখন দেখে যে কন্যাসন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে তখন তারা একধরনের মানসিক হতাশায় ভোগে। এটি বর্তমান শিক্ষিত সমাজ ব্যবস্থায় কমে আসলেও এখনো গ্রামাঞ্চল তথা প্রান্তিক অঞ্চলে অনেকটাই পরিলক্ষিত হয়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যার গৃহে কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করল, অতঃপর সে তাকে (কন্যাকে) কষ্টও দেয়নি, তাহলে ঐ কন্যার কারণে আল্লাহ তালা তাঁকে বেহেশতে প্রবেশ করাবেন।’ (মুসনাদে আহমদ, ১: ২২৩)

অনেক বাবা-মা আছে যারা মনে মনে প্রায় সংকল্প করে থাকেন যে, নিজের কন্যাকে বেশি লেখাপড়া করাবেন না। অনেককে এরকম বলতে শোনা যায় যে, ‘মেয়েটার পড়ালেখা নিয়ে টেনশন নাই। দুদিন পর তো স্বামীর বাড়ি চলে যাবে। ছেলেটা পড়ালেখা করলেই হলো।’ এসব বাবা-মায়েরা একবারও ভাবেন না যে, নিজের মেয়েকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত না করে পাঠালে বিয়ের পরে স্বামীর সংসারে গিয়েও তাঁকে হয়তো শুনতে হয় নানা গঞ্জনা।

একটা মেয়ে যদি একটু সুন্দরী হয়ে যায় তাহলে দেখা যায় যে, মেয়েটি বয়ঃসন্ধিকাল অতিক্রম করতে না করতেই অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসতে থাকেন। একরকম প্রতিযোগিতা লেগে যায়, কে আগে মেয়েটিকে নিজের ঘরের বৌ করে তুলে নেবেন। অনেক বাবা-মা কিংবা ভাইয়েরা রয়েছেন যারা জোরপূর্বক মেয়েটিকে বিয়ের পিঁড়িতে বসান। যেন এখুনি মোক্ষম সুযোগ। এই সুযোগ হারালে মেয়েটির জীবনের ঘানি যেন সারাজীবন তাকেই টানতে হবে। এসব হাবাগোবা অভিভাবক কিংবা তথাকথিত শুভাকাঙ্ক্ষীরা এতটুকু ভাবেন না যে, মেয়েটিকে সুশিক্ষিত করে তুললে জগতে পাত্রের অভাব হবেনা। অদূর ভবিষ্যতে দেশ, সমাজ, বিশ্ব ও পরবর্তী প্রজন্মই সুফল ভোগ করবে। এরা এটাও বুঝেন না যে, জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া অবৈধ। এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস উল্লেখ করা হল: আয়েশা (রা:) একবার রাসুলুল্লাহ (সা:) কে প্রশ্ন  করেছিলেন, একজন যুবতি নারীর ক্ষেত্রে যখন তাকে তার পিতা-মাতা বিবাহ দেয়, তার অনুমতি নেয়া উচিত কি? রাসূল (সা:) উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই তাকে (কনেকে) তার (নিজের) মতামত দিতে হবে।’ আয়েশা (রা:) আবার প্রশ্ন করলেন, ‘কিন্তু একজন কুমারী তো লাজুক থাকে, হে আল্লাহর রাসূল?’ রাসূল (সা:) উত্তর দিলেন, ‘তার নীরবতাই সম্মতি বলে বিবেচিত হবে।’  (বুখারী, মুসলিম)

বিয়ে পরবর্তী জীবনেও অনেক মেয়েকে স্বামী কিংবা শ্বশুর-শাশুড়ির কাছ থেকে গঞ্জনা শুনতে হয়। যেন এখানে তাঁর কোন অধিকার নেই; উড়ে এসে জুড়ে বসছে। অনেক সময় তাঁকে যৌতুকের জন্য চাপ দেয়া হয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। একসময় মেয়েটি হয়তো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে নয়তো তালাকপ্রাপ্ত নারী হিসেবে বাপের বাড়ি পাড়ি জমায়। মরে গেলে বাপের বাড়ির সকলে কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। আর কোনরকম আধমরা হয়ে বেঁচে বাপের বাড়িতে পাড়ি জমালে সকলে তাঁকে সান্ত্বনা দেয়। অথচ, মেয়েটিকে পরিপূর্ণ শিক্ষিত না করে তাঁর অমতে বিয়ে দেওয়ার জন্য কেউ বিন্দুমাত্র অনুশোচনা পর্যন্ত করেনা। বরং, দ্বিতীয় বিয়ের প্রস্তাব আসলে পাত্রপক্ষের কোন কিছু বিবেচনা না করে দ্বিগুণ উৎসাহে উঠেপড়ে লেগে যায় বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার নিমিত্তে।

হুমায়ূন আজাদ নারী সম্পর্কে কয়েকটি অপ্রিয় সত্য উক্তি করেছেন। যেমন: ‘ছেলেটি তার বিছানা গুছিয়ে না রাখলে মা খুশি হয়, দেখতে পায় একটি পুরুষের জন্ম হয়েছ; কিন্তু মেয়েটি বিছানা না গোছালে একটি নারীর মৃত্যু দেখে মা আতংকিত হয়ে পড়ে।’ আমাদের বর্তমান সমাজটা এভাবেই চলছে। ফলে, জীবনযাত্রার উন্নয়ন কিংবা দেশের উন্নয়ন হলেও প্রান্তিক পর্যায়ে আমরা এখনো ঐভাবে নারীর উন্নয়ন দেখি না। নারীকে সমাজের শিরে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আমাদের মনমানসিকতাকে আরো পরিবর্তন ও উদার করতে হবে। ‘পৃথিবীতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার’ এ সত্য আমাদের মনে ও মননে সেটআপ করতে হবে এবং বিশ্বজগতে বিশেষত প্রান্তিক জগতে তা প্রচার করতে হবে। নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত আইনগুলো আরো যুগোপযোগী করে তুলতে হবে। পাঠ্যবইগুলোতে নারী অধিকার সম্পর্কিত পাঠ আরো বেশি আনতে হবে। নারী অধিকার নিয়ে আরো বেশি করে সভা, সেমিনার ও লেখালেখি করতে হবে। এভাবে যদি আমরা প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত নারীর অধিকারগুলো পৌঁছাতে পারি তবে একদিন পৃথিবী হবে নারী-পুরুষে পরিপূর্ণ স্বর্গ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড