• রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬  |   ১৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

রাবির সাবেক ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ

শিবিরের সঙ্গে অধ্যাপক মাহবুবরের সংশ্লিষ্টতা ছিল না

দৈনিক অধিকারের অনুসন্ধান

  আবু সালেহ শামীম

২০ নভেম্বর ২০১৯, ২২:২৮
ইবি
ইবি উপাচার্যের কার্যালয়ে শিক্ষকবৃন্দ, ইনসেটে অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান (ছবি : সম্পাদিত)

ছাত্রজীবনে শিবিরের সঙ্গে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সাবেক প্রক্টর এবং প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী শিক্ষক সংগঠক অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমানের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না বলে নিশ্চিত করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ। দৈনিক অধিকারের অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে আসে।

প্রসঙ্গত, গত সোমবার (১৮ নভেম্বর) একটি বেসরকারি টেলিভিশনে অধ্যাপক মাহবুবের শিবির সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ওই প্রতিবেদনের রেশ ধরে মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) ইবি ছাত্রলীগের বিদ্রোহী ও পদ বঞ্চিত নেতাকর্মীরা অধ্যাপক মাহবুবরের বিরুদ্ধে মিছিল করে এবং তার কুশপুত্তলিকা দাহ করে। 

এদিকে একজন প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী শিক্ষক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদককে শিবির তকমা দিয়ে অপদস্থ করায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ। সেই সঙ্গে তারা উপাচার্য অধ্যাপক ড. রাশিদ আসকারীর কাছে এর সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানান। 

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার দুপুরে ইবি শাখা ছাত্রলীগের পদ বঞ্চিত নেতাকর্মীদের একটি গ্রুপ ছাত্রলীগের টেন্ট থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ডায়না চত্বরে জড়ো হয়ে কুশপুত্তলিকা দাহ করে। তাদের দাবি ড. মাহবুবর রহমান ছাত্র জীবনে শিবির মতাদর্শী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদপত্র পাঠক ফোরামের সদস্য ছিলেন। তিনি শিবির করতেন। কিন্ত ওই সময়ের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ ও অধ্যাপক মাহবুবরের সহপাঠীবৃন্দ এর তীব্র বিরোধিতা করেন এবং বলেন যে পাঠক ফোরাম সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক একটি সংগঠন, এই সংগঠনের সঙ্গে শিবিরের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টানসহ সকল ধর্ম ও দলের শিক্ষার্থীরা এই সংগঠনের সদস্য ছিল। 

তারা বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল খালেক মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ। তিনি এই সংগঠনের প্রধান পৃষ্ঠপোষকের কাজ করেছেন, এটি সম্পূর্ণ একটি অরাজনৈতিক সংগঠন।’ 

এদিকে তাকে শিবির আখ্যা দেওয়ায় ক্যাম্পাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বুধবার সকালে উপাচার্য ড. রাশিদ আসকারীর কাছে বিভিন্ন বিভাগের সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এই অপবাদের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলনকারীদের বিচার দাবি করেন। 

এ সময় বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুধাংশু কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদপত্র পাঠক ফোরামের সদস্য ছিলাম সেজন্য আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি। যেখানে অধ্যাপক ড. আব্দুল খালেক স্যারের মত মানুষ প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ছিলেন সেখানে এই অরাজনৈতিক সংগঠনকে শিবিরের সংগঠন আখ্যা দেওয়া খুবই দুঃখজনক। এখানে থেকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য আমি নিজেকে দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলাম।’ 

এ সময় আরও অনেক শিক্ষকরা বলেন, ‘এ রকম একজন প্রগতিশীল শিক্ষককে অপদস্থ করা খুবই দুঃখজনক, এভাবে শিক্ষক সমাজকে অপমান অপদস্থ করা কখনই মেনে নেয়া যায় না।’ প্রগতিশীল একটি শিক্ষক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদককে এ রকম মানহানি করায় তারা তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং এহেন কাজের মদদদাতা ও আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের জন্য উপাচার্যের কাছে দাবি জানান।

পরে সাধারণ শিক্ষকরা প্রগতিশীল শিক্ষক সংগঠন শাপলা ফোরামের সভাপতি ড. রেজওয়ানুল ইসলামের কাছে গিয়ে ফোরামের পক্ষ থেকে এ রকম একজন প্রগতিশীল শিক্ষককে শিবির আখ্যা দেওয়াকে প্রগতিশীলতা চর্চার বিরুদ্ধে কুঠারাঘাত করার শামিল বলে উল্লেখ করেন। এছাড়াও ফোরামের পক্ষ থেকে অতি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান। 

একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রক্টর থাকাকালীন ২০১৭ সালের ১৪ আগস্ট অধ্যাপক মাহবুবরের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ ও পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় শিবিরের দুর্গ খ্যাত ইবির হলগুলো শিবির মুক্ত হয়েছিলো। বিনা রক্তপাতে হলসমূহ শিবির মুক্ত করে হলগুলো হল বডি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।’ 

এছাড়া আরও অনেকে জানান, বঙ্গবন্ধু হলের প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব নেওয়ার পরে ২০০৯ সালে বিভিন্ন মহলের প্রবল বাধার মুখে, ইসলামী ছাত্রশিবির লেখা মুছে হল গেট সম্মুখে তিনি বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল এবং বাংলাদেশের ম্যাপ স্থাপন করেছিলেন।’

অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান যখন সংবাদপত্র পাঠক ফোরামের সদস্য ছিলেন তখন ফোরামটি নাকি শিবির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। ইবি শাখা ছাত্রলীগের বিদ্রোহী নেতাকর্মীরা এমন অভিযোগই করেছেন। আর এ সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত থাকায় অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমানকে শিবির আখ্যায়িত করে তাঁর কুশপুত্তলিকা দাহ করেন বিদ্রোহী নেতাকর্মীরা। 

এ বিষয়ে জানতে দৈনিক অধিকারের পক্ষ থেকে রাবি শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘পাঠক ফোরাম কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়, এটা সামাজিক সংগঠনের মধ্যে পড়ে। মাহবুবুর রহমানকে আমি আগে থেকে চিনি, তিনি কোনো শিবির করতেন না। কেউ যদি এটা বলে থাকে তবে তারা অন্যায় করছে। তিনি কখনো জামাত-শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না বরং তিনি আমাদের সঙ্গে মিশতেন।’ 

বিশ্ব ব্যাংকের প্রজেক্ট কনসালটেন্ট ও রাবির সাবেক শিক্ষার্থী মো. নাজমুল বলেন, ‘আমি অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমানকে চিনি। আমি সে সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক ফোরামের সদস্য ছিলাম এবং অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমানও এ ফোরামের সদস্য ছিলেন। সে সময় পাঠক ফোরামের সঙ্গে শিবিরের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিলো না তবে পরবর্তীতে সংগঠনটি শিবির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠন ‘‘পাঠক ফোরাম’’ একটি সেচ্ছাসেবী সংগঠন। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো দলের সম্পর্ক নেই। এটি একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। এখানে প্রগতিশীল শিক্ষক, বিভিন্ন দলের শিক্ষক বিভিন্ন সময় উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। এখানে উপাচার্য প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এটা লার্নারদের একটি প্লাটফর্ম। এখানে সব ধরনের ছাত্ররা অংশগ্রহণ করে থাকে। সংগঠনটি বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান করে যেখানে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, প্রক্টর এসে থাকেন। এর আগে ইউজিসির চেয়ারম্যান, জাফর ইকবাল, সুলতানা কামালের মত ব্যক্তিবর্গও সংগঠনটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। আমার মনে হয় এর সঙ্গে কোনো দলের সংশ্লিষ্টতা নেই।’ 

সাবেক কেন্দ্রীয় কৃষকলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়ের শিক্ষার্থী আতিকুল হক আতিক বলেন, ‘ড. মাহবুবর রহমান কখনো ছাত্রশিবির করে নাই। মাহবুব কখনোই ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলো না। সে মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সন্তান, মুক্ত চিন্তার মানুষ। সে যে ছাত্রলীগের নেতা ছিলো তাও নয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত বার্ষিকীতে তারা অংশগ্রহণ করত। ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চ, ২১ ফেব্রুয়ারিতে আমরা তাদের র‍্যালিতে পেয়েছি। যখন মুক্তচিন্তার মানুষের বড়ই অভাব ছিলো। ছাত্রশিবির করার কোনো প্রশ্নই আসে না। যারা পড়ালেখা ভালো করতো তারা পাঠক ফোরাম করত। পাঠক ফোরামের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল খালেক স্যার। তারপর এখন গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের যিনি উপাচার্য তিনিও পাঠক ফোরামের সদস্য ছিলেন। বরিশালের উপাচার্য উনিও পাঠক ফোরামের সদস্য ছিলেন। এ রকম বিভিন্ন জজ, সচিব অনেকেই পাঠক ফোরামের সদস্য ছিলেন। এ রকম যারা ভদ্র ছেলে পেলে বেশি পড়ালেখা করতো তাদের অনেকেই পাঠক ফোরামের সদস্য ছিলেন।’ 

এদিকে বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসিকে সাক্ষাৎকার প্রদানকারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়ের শিক্ষার্থী ও মাদার বক্স হলের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিলন বলেন, ‘আমি ডিবিসি নিউজের সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক মাহবুব যে শিবির করতেন, সে কথা বলিনি। আমি বলেছি সে সময় পাঠক ফোরাম শিবির নিয়ন্ত্রিত ছিল।’ 

এ বিষয়ে আন্দোলনকারী ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল সিদ্দিকী আরাফাত বলেন, ‘তিনি শিবির করতেন এমন কিছু আমার জানা নেই, একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের নিউজের ভিত্তিতে আমরা এ আন্দোলন করেছি।’ 

এ বিষয়ে ড. মাহবুবর রহমান বলেন, ‘শিবিরের দুর্গ ছিন্ন করে ইবিকে শিবির মুক্ত করাতে যারা আঘাত পেয়েছিল, আজ তারা ধুম্রজাল সৃষ্টি করে প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করছে। যা অসম্ভব। সততা ও আদর্শ হতে আমাকে এক চুল নড়াতে পারবে না।’ 

প্রগতিশীল শিক্ষক সংগঠন শাপলা ফোরামের সভাপতি ড. রেজওয়ানুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং শাপলা ফোরামের সভাপতি হিসেবে এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। আমরা শনিবারে আমাদের নির্বাহী কমিটির একটি মিটিং ডেকেছি।’ 

ইবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি পত্রিকায় দেখেছি, আমরা আমাদের পক্ষ থেকে পরে আলোচনা করবো।’ শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিসেবে কোনো পদক্ষেপ নিবেন কিনা এমন প্রশ্ন করলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন উর রশিদ আসকারী বলেন, ‘একজনের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় আগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে নিন্দা করা অনাকাঙ্ক্ষিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষকবৃন্দ আমার কাছে এসেছিলেন তারা এর বিচার দাবি করেছেন। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবো।’

ওডি/এমএ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড