• শনিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২২, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

প্রযুক্তি কি কেড়ে নিচ্ছে শিশুর বর্ণিল শৈশব?

  তারিন ফাহিমা

১১ নভেম্বর ২০১৮, ১০:১৪
প্রযুক্তি
শিশুর বর্ণিল শৈশব হারিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় (ছবি: দৈনিক অধিকার)

বাবা-মা স্মার্টফোন দিতে অস্বীকার করায় ৯ বছর বয়সী এক শিশু ছুরি দিয়ে নিজেই নিজের শরীরে আঘাত করেছে। সম্প্রতি এই ঘটনাটি ঘটেছে প্রতিবেশী দেশ ভারতে।

প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও স্মার্টপ্রযুক্তির ফলে প্রতিটি ঘরেই স্মার্ট ডিভাইসের উপস্থিতি রয়েছে। অথচ একটা সময় ছিল যখন মানুষ প্রাপ্ত বয়সেও ফোনের দেখা পেতো না। অথচ এখন হাত বাড়ালেই শিশুরাও পেয়ে যাচ্ছে স্মার্টফোন,ট্যাবসহ আধুনিক সব মোবাইল ডিভাইস। আর সেটি দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় এ ধরনের ঘটনা ঘটছে আমাদের চারপাশেই।

ঢাকা শহরে নগরায়নের থাবায় উধাও হয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠ। ইট,বালু,পাথরের আড়ালে আটকা পড়েছে শিশুদের বর্ণিল শৈশব। গ্রামের শিশুরা খেলাধুলার কিছুটা সুযোগ পেলেও শহুরে শিশুদের সে সুযোগ কম। এমনকি শহরের স্কুলগুলোতেও এখন মাঠ প্রায় নেই বললেই চলে। আর এসব শিশুদের দিনের বেশির ভাগ সময়ই কাটে স্কুলে,আবার মাঠের অভাবে টিফিনের ফাঁকেও খেলার সুযোগ পায় না তারা।

অন্যদিকে যানজট,নিরাপত্তাহীনতার কারণে মা-বাবা শিশুকে বাসা থেকে একটু দূরের মাঠে খেলতে নিয়ে যাওয়া বা বেড়াতে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। স্বভাবতই তার অবসর বিনোদনের একমাত্র স্থান হচ্ছে নানা ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস।

দেশে ১৮ বছরের কম বয়সীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের নিয়ম নেই। অথচ বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করেই উৎসাহী কিছু শিশু-কিশোর ব্যবহার করছে আধুনিক প্রযুক্তির সব মোবাইল হ্যান্ডসেট। স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিশুদের হাতে হাতে এখন মোবাইল সেট। বিস্ময়কর সত্য যে, শিশু শিক্ষার্থীদের মোবাইল হ্যান্ডসেট কিনে দেওয়ার আবদার পূরণ করছেন খোদ অভিভাবকরাই।

প্রযুক্তির ওপর শিশুর প্রভাব

প্রযুক্তির ওপর শিশুর প্রভাব

বাচ্চাদের খাওয়াতে গিয়ে কিংবা বিভিন্ন ধরনের কবিতা শেখাতে গিয়ে বাবা-মাও তাদের সামনে মোবাইল বা কম্পিউটারে মেলে ধরেন গেমস বা ভিডিও। কখনো নিজেদের ব্যস্ততার কারণেও ছেলেমেয়েদের ব্যস্ত রাখেন এভাবে। শিশুদের সামাজিকতার বিকাশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যা চিন্তিত করছে অভিভাবকদেরও।

মিজানুর রহমান বলেন, নগরের সব এলাকায় খেলাধুলার মাঠ নেই, অনেক বিদ্যালয়েও খেলার মাঠ নেই। নাগরিক ব্যস্ততায় আমরাও শিশুদের ঠিকমতো সময় দিতে পারছি না। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই ঘরের মধ্যে বন্দি শিশুরা কম্পিউটারের প্রতি আসক্তি হয়ে পড়ছে।

মারিয়া রহমান। চাকরি করার কারণে বাচ্চাকে তেমন সময় দিতে পারেন না। যার ফলে বাচ্চার সাথে তার এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। ফলে প্রযুক্তিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে তার বাচ্চারা। তিনি বলেন, সারাদিন নিজে কাজের চাপে ওদের দিকে তেমন নজর দিতে পারি না। তাই ওদের আবদার পূরণের জন্যই হাতে তুলে দিয়েছি স্মার্টফোন।

স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে শিশুদের সৃজনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে

স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে শিশুদের সৃজনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে

দেখা গেছে, প্রযুক্তির কারণে বাবা-মা এবং শিশুদের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। এমন কী ছুটির দিনে ও সবার হাতে থাকে মোবাইল আর তা দিয়ে সবাই ম্যাসেজিং বা গেম খেলতেই ব্যস্ত থাকে। ফলে ধীরে ধীরে শিশুদের সৃজনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। তারা এখন কম্পিউটারে কৃত্রিম খেলাধুলা নিয়েই মহাব্যস্ত।

স্মার্টফোন, আইফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ, ডিজিটাল ক্যামেরার প্রতি বড়দের দেখে শিশুদেরও আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। কারও কারও কাছে এসব ব্যবহার করতে পারাও স্মার্টনেসের পরিচয়। শিশুরা বড়দের কাছ থেকে এসব মানসিকতা গ্রহণ করছে। ছেলেমেয়েরা মাঠে গিয়ে খেলাধুলার পরিবর্তে কম্পিউটার-মোবাইল ফোনের ছোট স্ক্রিনেই সময় কাটাচ্ছে বেশি।

মার্কিন জার্নাল ‘পেডিয়াট্রিক্স’-এ প্রকাশিত একটি জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব শিশু প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভি দেখে বা কম্পিউটারে খেলার জন্য স্ক্রিনের সামনে বসে থাকে, তারা অন্য শিশু যারা এসব করে না তাদের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিকভাবে বেশি সমস্যায় ভোগে। তারা বেশি আবেগপ্রবণ হয়, সব কিছুই অতিরিক্ত করে ইত্যাদি।

ব্রিটেনের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত জরিপটির ফলাফল সম্প্রতি ‘পেডিয়াট্রিক্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়। সেখানে ১০ থেকে ১১ বছর বয়সী ১০১৩ জন শিশুর ওপর জরিপটি করা হয়। এদের কেউ কেউ দৈনিক পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত টিভি দেখে অথবা কম্পিউটারে গেম খেলে। আবার কেউ কেউ এক মুহূর্তও টিভি দেখে না বা কম্পিউটারে খেলে না।

ডিভাইস ছাড়া অচল শিশুর জীবন

ডিভাইস ছাড়া অচল শিশুর জীবন

শিশুদেরকে ২৫টি করে প্রশ্ন করা হয়। দেখা গেছে, যেসব শিশু দুই ঘণ্টা বা তার চেয়ে বেশি সময় টিভি দেখে বা কম্পিউটারে খেলাধুলা করে তাদের চেয়ে যেসব শিশু এতো সময় স্ক্রিনের সামনে বসে থাকে না তারা বেশি নম্বর পেয়েছে।

জরিপে আরও দেখা গেছে, যেসব শিশু শারীরিকভাবে সবল অথচ স্ক্রিনের সামনে দিনে ২ ঘণ্টা বা ততোধিক সময় অতিবাহিত করে তারাও মনস্তাত্ত্বিকভাবে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ স্ক্রিনের সামনে বেশি সময় অতিবাহিত করাই প্রধান সমস্যা। কিশোর-কিশোরীরা সাময়িক স্বস্তি খুঁজে পেলেও এটা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে।

এ বিষয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ শুভাশীষ ব্যানার্জী বলেন, দেশে বিশেষ করে শহর এলাকার শিশুদের জীবনে বিনোদন নেই। সে জন্য তারা আকাশ-সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকছে। স্ক্রিন আসক্ত হয়ে পড়ছে। স্কুলে খেলার মাঠ নেই, পাড়ায় খেলার মাঠ নেই। কিন্তু এটাও সত্যি যে নগর জীবনে এ বাস্তবতা আমাদের মেনে নিয়েই এগোতে হবে।

তিনি আরও বলেন, রাজউকের নিয়ম করা উচিত, নতুন বাড়ি তৈরির সময় কমন স্পেস রাখা যেখানে শিশুরা খেলবে। প্রতিটি এলাকার খোলা জায়গায় সরকারি উদ্যোগে শিশু পার্ক গড়ে তোলা দরকার। তবে এ ক্ষেত্রে মা-বাবার দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাইদ ফেরদৌস বলেন, পৃথিবীর সব শহরেই এই সমস্যা রয়েছে। শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ বাধা দূর করতে পারে সরকার। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এ সংকট কমে আসবে। আর পরিবারের সদস্যদের সচেতন হতে হবে সবচেয়ে আগে। তাদের বুঝতে হবে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে তার দায়িত্ব রয়েছে,সব দায়িত্ব শুধু সরকার বা স্কুলের শিক্ষকের নয়।

শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে

শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করেন সাঈদ ফেরদৌস

তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার যেভাবে বাড়ছে ,তাতে অত্যাধুনিক এসব প্রযুক্তির ব্যবহারে নীতিমালা বা আইনের প্রয়োগ না থাকলে সমাজে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এ জন্য আইনের পাশাপাশি সমাজের সচেতনতা দরকার।

মনোবিজ্ঞানী ড.মনোয়ারা পারভীন বলেন, ‘আমাদের ছেলে-মেয়েরা অসামাজিক হয়ে পড়ছে মূলত মা-বাবার কারণে। মা-বাবাকেই সবচেয়ে বেশি সময় দিতে হবে। খেলার সুযোগ না থাকলে প্রতি সপ্তাহে ছুটির দিনে আত্মীয়-বন্ধুদের বাসায় বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে। এটা করলেও বাচ্চারা সামাজিকতা শিখবে। সেখানে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মিশে যেমন তাদের সহ্য ক্ষমতা বাড়বে, তেমনি মা-বাবাদের অন্য বন্ধুদের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার দেখেও তারা শিখবে’।

তিনি আরও বলেন, ‘সহজলভ্য হওয়ায় এই মোবাইলের ব্যবহার এমনভাবে বেড়েছে যে রাস্তার ভিক্ষুক থেকে শুরু করে ৭-৮ বছর বয়সী শিশুদের হাতেও মোবাইল শোভাবর্ধন করে। মোবাইল ও ফেসবুক যুগের আগে ছেলেমেয়েরা রাতে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ত। এখন মোবাইল টিপতে টিপতে ঘুমিয়ে পড়ে। মোবাইলে আকৃষ্ট হয়ে পড়ায় মেধা বিকাশে যে বই পড়া অপরিহার্য সেটা ক্রমশ কমে আসছে’।

প্রযুক্তি প্রভাব নিয়ে কথা বলছেন ড.মনোয়ারা বেগম

প্রযুক্তি প্রভাব নিয়ে কথা বলছেন ড.মনোয়ারা বেগম

ইলেকট্রনিক গেজেটের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের মানসিক বিকাশে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, ‘এই প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে নানা সমস্যা। প্রযুক্তির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার শিশুর মাঝে বিষন্নতা, উদ্বেগ, মনোযোগ ঘাটতি,মনোব্যাধি এবং সন্তানের আচরণগত বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে । অনেক সিনেমা, গেমস এবং টিভি শোতে চুরি, স্পষ্টভাবে যৌনতা, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন বা অঙ্গহানি দেখানো হয় যা শিশুকে সহিংস হতে উদ্বুদ্ধ করে’।

এসব সমস্যা সমাধানের জন্য মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন শিশুকে প্রতি মুহূর্তে দিতে হবে মধুর অভিজ্ঞতা, সুন্দর সাজানো সময়। শিশুকে প্রচুর খেলাধুলার সুযোগ দিতে হবে। শিশুদের আচার-আচরণ ও ব্যক্তিত্ব বিকাশে বড়দের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। বড়রা যদি শিশুদের প্রতি দয়া, সুবিবেচনা ও ভালোবাসা দেখায়, তবে শিশুরাও এসব দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে। এতে তার মানসিকতা ইতিবাচক দিকে প্রবাহিত হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড