• সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৬  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন

ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর—১০

কুরবানির পশু জবাই করার নিয়ম

  মুনীরুল ইসলাম ইবনু যাকির

১০ আগস্ট ২০১৯, ১৫:৩৪
Qurbani_10
ছবি : সংগৃহীত

নিজের কুরবানির পশু নিজেই জবাই করা উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে জবাই করেছেন। আর জবাই করা আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের একটি মাধ্যম। তাই প্রত্যেকের নিজের কুরবানি নিজে যবেহ করার চেষ্টা করা উচিত। এমনকি মহিলারাও কুরবানির পশু জবাই করতে পারে। সাহাবি আবু মুসা আশয়ারি (রা.) নিজের মেয়েদের নির্দেশ দিয়েছেন, তারা যেন নিজ হাতে নিজেদের কুরবানির পশু জবাই করেন।’[1] তার এ নির্দেশ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মেয়েরা কুরবানির পশু জবাই করতে পারেন। তবে অন্যকে দিয়ে জবাই করানোও জায়েয।[2]

জবাই করার সময় যে বিষয়গুলো লক্ষণীয়

১. পশুর প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করা। এমন ব্যবস্থা নিয়ে জবাই করা, যাতে পশুর অধিক কষ্ট না হয় এবং সহজেই প্রাণ ত্যাগ করতে পারে। খুব তীক্ষ্ম ধারালো ছুরি দ্বারা জবাই করা। সাহাবি শাদ্দাদ ইবনু আউস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। নবি (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সকল বিষয়ে সকলের সাথে সুন্দর ও কল্যাণকর আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব, তোমরা যখন হত্যা করবে তখন সুন্দরভাবে করবে আর যখন জবাই করবে তখনও তা সুন্দরভাবে করবে। তোমরা ছুরি ধারালো করে নেবে, যেন খুব সহজেই জবাই হয়ে যায়।[3] বধ্য পশুর সামনেই ছুরি শান দেওয়া উচিত নয়।[4] একইভাবে, একটি পশুকে অন্য একটি পশুর সামনে যবেহ করা এবং ছেচরে যবেহ স্থানে টেনে নিয়ে যাওয়াও মাকরুহ।

২. কুরবানির পশু যদি উট হয় (অথবা এমন কোন পশু হয় যাকে আয়ত্ব করা সম্ভব নয়) তাহলে তাকে বাম পা বাধা অবস্থায় দাঁড় করিয়ে নহর করা হবে।[5]

যদি উট ছাড়া অন্যপশু হয় তাহলে তা বাম কাতে শোয়াবস্থায় যবেহ করা হবে। যেহেতু তা সহজ এবং ডান কাতে ছুরি নিয়ে বাম হাত দ্বারা মাথায় চাপ দিয়ে ধরতে সুবিধা হবে। সম্ভব হলে পশুকে ডানকাতে শুইয়ে জবাই করার চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে পশুকে আরাম দেওয়াই উদ্দেশ্যে। পশুর গর্দানের এক প্রান্তে পা রেখে জবাই করা মুস্তাহাব। যাতে পশুকে অনায়াসে কাবু করা যায়। কিন্তু গর্দানের পিছনদিকে পা মুচড়ে ধরা বৈধ নয়। কারণ, তাতে পশু অধিক কষ্ট পায়।

৩. জবাইকালে পশুকে কিবলামুখী করে শয়ন করানো উচিত। অন্যমুখে শুইয়েও জবাই করা শুদ্ধ হবে।[6]

 

৪. জবাই করার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে হবে। কারণ, এটা বলা ওয়াজিব। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

﴿فَكُلُواْ مِمَّا ذُكِرَ ٱسْمُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ

‘যার উপর আল্লাহর নাম (বিসমিল্লাহ) উচ্চারণ করা হয়েছে তা থেকে তোমরা আহার করো।’[7]

হাদিসে এসেছে—রাসুলুল্লাহ (সা.) দুটি শিংওয়ালা ভেড়া জবাই করলেন, তখন ‘বিসমিল্লাহ’ ও আল্লাহু আকবার’ বললেন।[8]

‘বিসমিল্লাহ’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ পাঠের পরاللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ  ‘হে আল্লাহ এটা তোমার তরফ থেকে তোমারই জন্য।’ বলা যেতে পারে। যার পক্ষ থেকে কুরবানি করা হচ্ছে তার নাম উল্লেখ করে দুয়া করা জায়েয আছে। এভাবে বলা যেতে পারে, ‘হে আল্লাহ তুমি অমুকের পক্ষ থেকে কবুল করে নাও।’

মূলত কুরবানি কেবল নিজের তরফ থেকে হলে বলবে, ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা ইন্না হাযা মিনকা ওয়ালাকা, আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন্নি।’ নিজের এবং পরিবারের তরফ থেকে হলে বলবে, ‘....তাকাবাল্লাহ মিন্নি ওয়ামিন আহলি বাইতি।’ অপরের নামে হলে বলবে, ‘তাকাব্বাল মিন...(এখানে যার তরফ থেকে কুরবানি তার নাম নেবে)’।[9]

৫. রক্ত প্রবাহিত হওয়া জরুরি। আর তা দুই শাহরগ (কণ্ঠনালির দু’পাশে দুটি মোটা আকারের শিরা) কাটলে অধিকরূপে সম্ভর হয়। রক্ত প্রবাহিত ও শুদ্ধ যবেহ হওয়ার জন্য চারটি অঙ্গ কাটা জরুরি— শ্বাসনালী, খাদ্যনালী এবং পার্শ্বস্থ দুটি মোটা শিরা।

৬. প্রাণ ত্যাগ করার পূর্বে পশুর অন্য কোন অঙ্গ কেটে কষ্ট দেওয়া হারাম। যেমন ঘাড় মটকানো, পায়ের শিরা কাটা, চামড়া ছাড়ানো ইত্যাদি জান যাওয়ার আগে বৈধ নয়। একইভাবে, দেহ আড়ষ্ট হয়ে এলে চামড়া ছাড়াতে শুরু করার পর যদি পুনরায় লাফিয়ে ওঠে, তাহলে আরো কিছুক্ষণ প্রাণ ত্যাগ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যেহেতু পশুকে কষ্ট দেয়া বৈধ নয়। পশু পালিয়ে যাওয়ার ভয় থাকলেও ঘাড় মটকানো যাবে না। বরং তার বদলে কিছুক্ষণ চেপে ধরে রাখা যায়।

যবেহ করার সময় পশুর মাথা যাতে বিচ্ছিন্ন না হয় খেয়াল করা উচিত। তা সত্ত্বেও যদি কেটে বিচ্ছিন্ন হয়েই যায়, তাহলে তা হালাল হওয়ার ব্যাপাবে কোন সন্দেহ নেই।

যবাই ছেড়ে দেওয়ার পর (অসম্পূর্ণ হওয়ার ফলে) কোনো পশু উঠে পালিয়ে গেলে তাকে ধরে পুনরায় জবাই করা যায়। নইলে কিছু পরেই সে এমনিতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে।

যবেহ করার জন্য পবিত্রতা বা জবাইকারীকে পুরুষ হওয়া শর্ত নয়। মাথায় টুপি রাখা বা মাথা ঢাকাও বিধিবদ্ধ নয়। তবে ঈমানের পবিত্রতা জরুরি। কাফির, মুশরিক ও বেনামাযির হাতের জবাই শুদ্ধ নয়।

উল্লেখ্য, যবেহকৃত পশুর রক্ত হারাম। অতএব তা কোন ফল লাভের উদ্দেশ পায়ে মাখা, দেওয়ালে ছাপ দেওয়া বা তা নিয়ে ছুড়াছুড়ি করে খেলা করা বৈধ নয়।

 

চলবে...।

 

[1] আসকালানি, ফাতহুল বারি, ১০/১৯

[2] মুসলিম, আসসাহিহ : ১২১৮

[3] মুসলিম, আসসাহিহ : ১৯৫৫

[4] ইবনু মাজাহ, আসসুনান : ৩১৭২

[5] সুরা হজ, ২২ : ৩৬

[6] ইবনু উসাইমিন, আহকামুল উযহিয়্যাহ, পৃ. ৮৮-৯৫

[7] সুরা আনয়াম,  ৬ : ১১৮

[8] দারিমি, আসসুনান : ১৯৮৮

[9] আলবানি, মানাসিকুল হাজ্জ, পৃ. ৩

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড