• বুধবার, ২২ জানুয়ারি ২০২০, ৯ মাঘ ১৪২৭  |   ১৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

যিনি প্রথম রোপন করেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ

  অধিকার ডেস্ক

১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:২৪
ছবি
ছবি : মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী

‘স্বাধীনতার প্রথম বীজ রোপিত হয়েছিলো তোমার
কঠোর সম্ভাষণে। একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা 
জাতি একটি স্বপ্নের কাঠামো উপহার পেয়েছিলো।
দিনিদিনে গাছটি এসে দাঁড়িয়েছে ’৭১
           ভালোবাসি আসসালামু আলাইকুম’
- খোরশেদ মুকুল

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে দেখতে পাবো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথেসাথে যিনি এক অনবদ্য অবদান রেখেছিলেন তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। বলা যায় স্বাধীন বাংলাদেশের সূত্রপাত তারই হাত ধরে। আজ এই মানুষটির জন্মদিন।

তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জনগণকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় জাগরিত করেছেন। জমিদারদের নির্যাতন-অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষক-মেহনতি শ্রেণীকে ঐক্যবদ্ধ হতে শিখিয়েছেন। তাদের নিয়ে করেছেন জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন। তিনি ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের ‘ওয়ালাইকুমুসসালাম’ বলে সর্বপ্রথম পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার ঐতিহাসিক ঘণ্টা বাজিয়ে ছিলেন।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ব্রিটিশ ভারতের ঔপনিবেশিক অত্যাচার-অনাচার জর্জরিত সময়ে আনুমানিক ১৮৮৫ সালে বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার ধানগড়া গ্রামে ১২ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল হাজী শরাফত আলী খান। হাজী শারাফত আলী ও বেগম শারাফত আলীর পরিবারের ৪টি সন্তানের মধ্যে ভাসানী ছিলেন সবার ছোট। তার ডাক নাম ছিল চেগা মিয়া। ১৮৮৪-৮৫ সালে সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মহামারী ওলাওঠা দেখা যায়। এতে তার পরিবারের মা, দাদাসহ সবাইকে হারান। শুধুমাত্র তিনিই বেঁচে থাকেন।

ভাসানী কিছুদিন চাচা ইব্রাহিমের আশ্রয়ে থেকেছেন। সে সময় ইরাকের আলেম ও ধর্ম প্রচারক নাসির উদ্দিন বোগদাদী সিরাজগঞ্জে আসেন। ভাসানী তার আশ্রয়ে কিছুদিন কাটান। তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছুদিন পূর্বে জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার জমিদার শামসুদ্দিন আহম্মদ চৌধুরীর বাড়িতে যান এবং সেখানে তিনি মাদ্রাসার মোদাররেসের কাজ করেন এবং জমিদারের ছেলে-মেয়েকে পড়ানোর দায়িত্ব নেন। পরে ১৮৯৭ সালে পীর সৈয়দ নাসীরুদ্দীনের সাথে আসাম গমন করেন। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে আসামে স্থানীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। এসময় তিনি আবারও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইসলামি শিক্ষার উদ্দেশ্যে ১৯০৭-এ দেওবন্দ যান। 

দুই বছর সেখানে অধ্যয়ন করে আসামে ফিরে আসেন। এই সময়ই রাজনীতির প্রতি ঝুঁকেন তিনি। ১৯১৭ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ময়মনসিংহ সফরে গেলে তার ভাষণ শুনে ভাসানী অনুপ্রাণিত হন। তার ধারাবাহিকতায় ১৯১৯ সালে কংগ্রেসে যোগদান করে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। এমনকি তিনি ব্রিটিশদের কারাগারে ১০ মাস কারাদণ্ড ভোগও করেন।

কারামুক্তির পর ভাসানী খেলাফত আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের পর কৃষক-প্রজাদের মাধ্যমে জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন এবং ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে আসামের ধুবড়ী জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে প্রথম কৃষক সম্মেলন আয়োজন করেন। এই সম্মেলনেই তার নাম রাখা হয় ‘ভাসানী’র মওলানা’। তারপর থেকেই তার নামের শেষে যুক্ত হয় ভাসানী শব্দ।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মওলানা ভাসানী নিজেকে বহুবার একা করে ফেলেছেন বটে কিন্তু কখনো থেমে থাকেননি। স্রষ্টা এবং সৃষ্টির সেবায় নিজেকে যেমন বিলীন করেছেন সারাজীবন তেমনি তার আসল নামটাও ঢাকা পড়েছে মওলানা এবং ভাসানী টাইটেলের মাঝে। মূলত তখনকার সময়ে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির নামের আগে মওলানা বসানো হতো। জীবনে অনেকেই তাকে জিজ্ঞেস করেছেন তার নামের আগে মওলানা কেন, ব্যক্তি বুঝে তিনি জবাব দিতেন। যেমন, একবার মাদ্রাসা থেকে ডিগ্রি প্রাপ্ত একজন মওলানা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হুজুর, আপনিও মওলানা, আমরাও মওলানা; আমাদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? তিনি মুহূর্তের মধ্যে বললেন, ‘তোমরা সেই মওলানা যারা দূরে শয়তান দেখলে ‘লা হাওলা ওলা’ পড়, আমরা সেই মওলানা যারা শয়তানকে আগে কাছে ডাকি তারপর শয়তানের ঘাড়ের ওপর সওয়ার হয়ে শয়তানকে দিয়ে আমাদের কাজ করায়ে নেই।’ অন্যদিকে ভাসান চরে জীবনের প্রথম সম্মেলন করে পরিচয় পেলেন ভাসান চরের মওলানা, ভাসানীর মওলানা, অতপর মওলানা ভাসানী। পরবর্তী সময় তার নামের আগে যুক্ত হয়েছে মজলুম জননেতা, আপোষহীন নেতা, Prophet of Violence, The Red Mawlana, The Fire-eater Mawlana, Prophet of Independence ইত্যাদি। 

ভাসানী ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী গণআন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ এ মামলার সকল আসামির নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলনসহ মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন দেন। ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি দেখেছেন ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশের জন্ম হতে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার অবদান অবিস্মরণীয়।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন জাতীয়তাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শ-চেতনার সংমিশ্রণে একজন মানুষ। তিনি আজীবন মেহনতি মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য লড়াই-সংগ্রামে কখনো পিছু হটেননি। ক্ষমতাবিমুখ রাজনীতির এক মহান পুরুষ ছিলেন তিনি। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর এই দেশ বরেণ্য নেতা ৯৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড