• বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ (৮ম পর্ব)

  রিফাত হোসেন

২২ অক্টোবর ২০১৯, ১৪:৪১
গল্প
ছবি : প্রতীকী

ফাহাদ আর মিসেস সাহানা বসে আছে খাবার টেবিলে। তাদের সামনে খাবার সাজানো থাকা স্বত্ত্বেও কেউ স্পর্শ করতে পারছে না। ক্ষুধার্ত পেটে বসে আছে দু'জনে। ফাহাদ পেটে হাত দিয়ে চেপে ধরেছে। যদি ক্ষুধা কিছুটা কমে, এই আশায়। এভাবে অবশ্য কখনোই পেটের ক্ষুধা কমে না। তবে অনেকেরই এটা বিশ্বাস, যে পেটে হাত দিয়ে রাখলেই ক্ষুধা কমে যায়, কিংবা কিছু মুহূর্তের জন্য ক্ষুধার যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। প্রকৃত ভাবে প্রতিটি মানুষের জীবনে ‘বিশ্বাস’ শব্দটা এবং এর অর্থ বিশাল এক ভূমিকা রাখে। মানুষ হতাশায় পড়ে গিয়ে নিজের উপর থেকে যখন ভরসা হারিয়ে ফেলে, তখন স্রষ্টার উপর ভরসা করে। এটা তাদের বিশ্বাস, যে স্রষ্টা তাকে হতাশা থেকে ফিরিয়ে আনবে। আমাদের ইচ্ছে যেখানে শেষ, স্রষ্টার ইচ্ছে সেখানেই শুরু। এই কথাটা আমার প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করতে পারছি। 

ফাহাদের বাবা গ্রাম থেকে ঢাকা শহরে এসেছিলেন। তার পূর্বপুরুষেরা-ও গ্রামে থাকতেন। ফলে তাদের পারিবারিক রীতি অনুযায়ী বাড়িতে উপস্থিত সবাই একসাথে সকালের খাওয়া শুরু করতে হবে। পারিবারিক এই রীতি আজ-ও অক্ষরে-অক্ষরে মেনে চলছেন মিসেস সাহানা। এটা তার বিশ্বাস যে, এই রীতি অমান্য করলে তাদের উপর নেমে আসবে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। ফাহাদ এইসব বিশ্বাস না করলেও কখনো অবাধ্যতা করেনি। যাই হোক, রাফার জন্য অপেক্ষা করতে করতে অধৈর্য হয়ে উঠল ফাহাদ। মিসেস সাহানা গলা উঁচু করে ‘রাফা’ বলে ডাক দিলেন। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও কোনোরকম সাড়াশব্দ এলো না রাফার ঘর থেকে। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ফাহাদ বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল, ‘উফ্, এই মেয়েটা দিনদিন এতটা বেপরোয়া কীভাবে হয়ে যাচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না। ছোট থেকে দেখে আসছে সকালের খাবার শুরু করা হয় একদম সঠিক নিয়মে আর ঘড়ির কাটায় কাটায় মিলিয়ে। তবুও প্রতিদিন দেরি করে খাবার টেবিলে আসে ও।’

- আজ ইচ্ছেমতো কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিবো ওকে।
চেয়ার থেকে উঠে রাফার ঘরের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলল ফাহাদ। যদিও খুব ভালো করেই জানে রাফার সামনে গেলে এই গর্জন আর থাকবে না। একদম চুপসে যাবেও। ছোট বোনের মায়াময় চাহনি দেখে ফাহাদের ক্ষিপ্ততা মুহূর্তের মধ্যেই হারিয়ে যাবে। 

তবুও ফাহাদ মনে মনে বলল, ‘নাহ, এভাবে আর হয় না। ওর ভালোর জন্যই আমাকে কঠোর হতে হবে। আমাকে রাগ দেখাতে হবে। ওকে বুঝাতে হবে যে, ওর কর্মকাণ্ডে আমি বিরক্ত এবং ওর অবাধ্যতায় আমি ক্ষিপ্ত।’

মিসেস সাহানাকে অপেক্ষা করতে বলে উপরের দিকে যেতে লাগল ফাহাদ। সিড়ি দিয়ে উপরে ওঠে প্রথম ঘরটাতেই রাফা থাকে। ফাহাদ ঘরের সামনে গিয়ে দরজায় টোকা দিলো। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। আবারও টোকা দিলো ফাহাদ।

- কে? ঘরের ভিতর থেকে অদ্ভুত এক কণ্ঠে কথাটা বলল রাফা। ফাহাদের বুকটা কেমন যেন করে উঠল। বুকটা হাত দিয়ে চেপে ধরল ফাহাদ। ক্ষিপ্ত ভাবটা মুহূর্তের মধ্যেই করুণ হয়ে গেল।
কৌতূহলবশত বিড়বিড় করে বলল, ‘রাফা কী কাঁদছে? ওর কণ্ঠ এইরকম শোনাচ্ছে কেন? মনে হলো যেন অজস্র যন্ত্রণা প্রকাশ পেলো রাফার কণ্ঠ দিয়ে।’

ফাহাদ দরজাটা ধাক্কা দিয়ে একটু জোরেই বলল, ‘আমি এসেছি রাফা। দরজাটা খোল প্লিজ।’

রাফা কিছু বলল না। ফাহাদ আবার দরজা ধাক্কা দিতে গিয়েও থেমে গেল রাফাকে দেখতে পেয়ে। রাফা ঘরের ভিতরে থেকে সেই করুণ কণ্ঠে বলল, ‘কী হয়েছে ভাইয়া? আমাকে ডাকছ কেন?’

ফাহাদ কিছু বলল না। ও পলকহীন চাহনিতে তাকিয়ে আছে রাফার দুই চোখের দিকে। লাল টকটকে আকৃতির হয়ে আছে রাফার চোখ দু'টো। তা দেখে ফাহাদের বুকটা ধুক্ করে উঠল। বুকটা শক্ত করে খামচে ধরল ফাহাদ। ওর পুরো শরীর কাঁপছে। বুকের ভিতর অসহ্য এক যন্ত্রণা হচ্ছে ওর। নিজেকে স্বাভাবিক রেখে যন্ত্রণা সহ্য করে রাফার হাতের দিকে তাকালো ফাহাদ। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। ফাহাদের অবস্থা দেখে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে রাফা বলল, ‘আত্মহত্যা করা এত সহজ না ভাইয়া, যে আমি চাইলেই আত্মহত্যা করতে পারব।’

ফাহাদ বলল, ‘আমি খুব ভালো করেই জানি, আমার বোন কখনোই এইরকম ভুল করবে না। এছাড়াও আমার বোন এমন কিছু করবে না, যার দ্বারা আমরা কষ্ট পাবো।’

রাফা মৃদু হাসি দিয়ে বলল, ‘তাহলে আমার হাতের দিকে তাকিয়ে কী খুঁজছিলে?’

ফাহাদ আমতাআমতা করে বলল, ‘তেমন কিছু না৷ ভেবেছিলাম কোনো কাজে ব্যস্ত আছিস বলে খাবার টেবিলে যেতে পারছিস না। সেজন্য হাতের দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম কী কাজ করছিস?’

ফাহাদের কথা শুনে ফিক করে হেসে দিলো রাফা। এরপর বলল, ‘আমাকে আজগুবি কথা বলছ ভাইয়া। তুমি কী জানো না, মিথ্যে আর সত্যির পার্থক্য আমি বুঝতে শিখেছি?’

ফাহাদ কিছু বলল না। রাফা আবারও বলল, ‘আমার লাল টকটকে চোখ, আর সেই চোখে জল দেখে তুমি ভেবেছিলে আমি নিজের ক্ষতি করছি। কিংবা সেইরকম কিছু করার চেষ্টা করছি। সেজন্য প্রথমেই আমার হাতের দিকে তাকালে। কিন্তু ভাইয়া, আমি যে এতটাও বোকা নই, যে এত সহজে নিজের সব চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছা, আকাঙ্খা বিসর্জন দিয়ে মরে যাবো। আমার যে আরো অনেক কিছু পাওয়ার আছে। এমনি এমনি না পেলে জোর করে আদায় করে নিবো। তবুও এভাবে অন্তত হার মেনে আত্মহত্যা করব না।’

ফাহাদ রাফার দুই গালে হাত রেখে বলল, ‘তোকে কীভাবে বুঝাবো রাফা, জোর করে কিছু পাওয়া যায় না। আর পেলেও সেখানে আর যাই হোক, শান্তি থাকে না।’

ফাহাদের হাত দু'টো সরিয়ে দিলো রাফা। দরজার কাছ থেকে সরে এসে বিছানায় বসল। ফাহাদ এক পা বাড়িয়ে দিয়ে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করল। নিজের অজান্তেই চারিদিকটাতে চোখ বুলিয়ে নিলো একবার। ঘরের চারিদিকে ‘হা’ করে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ফাহাদ। ফাহাদের বিস্মিত মুখটা দেখে রাফার হাসি পেয়ে গেল। 
- কিন্তু না, এভাবে হেসে দিয়ে ভাইয়াকে আরো বিস্ময়ের জগতে ঠেলে দেওয়া ঠিক হবে না। পরে দেখা যাবে, সেখান থেকে আর বেরোতে পারবে না।
 হাসিটা চেপে রেখে নিজের মনে মনে কথাটা বলল রাফা।

ফাহাদ অনেকক্ষণ এদিক-ওদিক তাকানোর পর বিছানার কাছে এসে রাফার পাশে বসল। কিন্তু কিছু না বলে কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে রইলো রাফার দিকে। হাসিটা আর চেপে রাখতে পারল না রাফা। ফিক করে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। ফাহাদ যেন কেঁপে উঠল রাফার এইরকম রূপ দেখে। লাল টকটকে চোখের গভীরে ছলছল পানি। সেই সাথে এই অদ্ভুত হাসি৷ অজানা এক আশঙ্কায় ফাহাদের বুকটা ধুকপুক করতে লাগল। রাফা হাসি কিছুটা থামিয়ে বলল, ‘অবাক হতে হতে আবার অজ্ঞান হয়ে যেও না ভাইয়া।’

রাফার কথায় ফাহাদ নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ব্যর্থ হলো। কিছুটা তোতলানোর মতো করে বলল, ‘সত্যি করে বলতো তোর কী হয়েছে? এইরকম অদ্ভুত আচরণ করছিস কেন?’

- আমি অদ্ভুত আচরণ করছি না ভাইয়া। আসলে তুমি আমাকে নিয়ে একটু বেশি টেনশন কর৷ যার কারণে আমার স্বাভাবিক কাজ গুলোকেও তোমার কাছে অস্বাভাবিক লাগছে৷ অদ্ভুত ভাবে আমাকে দেখছ তুমি।

- উঁহু। তোর কিছু একটা হয়েছে তা আমি নিশ্চিত। নাহলে তোর পুরো ঘরে সায়েমের এত ছবি কোত্থেকে এলো। আর তোর চোখ এত লাল হয়ে আছে কেন? নিশ্চয়ই সারারাত জেগেছিলি।

রাফা চুপ করে মাথা নিচু করে ফেলল। ফাহাদ আবার বলল, ‘কিরে বল?’

- হ্যাঁ ভাইয়া। আমি সারারাত জেগে ছিলাম। আর এই ছবিগুলো সব আমিই লাগিয়েছি।

ফাহাদ অবাক কণ্ঠে বলল, ‘কিন্তু সায়েমের এত ছবি কোথায় পেলি তুই? সায়েম তো নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে খুব বেশি ছবি আপলোড দেয় না। আমার তো মনে হয় এত ছবি সায়েমের কাছেও নেই৷ আর ছবিগুলো দেখে মনে হচ্ছে কেউ লুকিয়ে লুকিয়ে তুলেছে।’

- হ্যাঁ লুকিয়ে লুকিয়ে তুলেছে।

ফাহাদ অস্থির কণ্ঠে বলল, ‘কিন্তু কেন? আর কে তুলেছে?’

-  আমি চেয়েছি বলেই তুলেছে কেউ একজন।

- কে সে?

- সেটা বলতে পারব না আমি।

- মানে?

- সব কথার মানে খুঁজতে যেও না ভাইয়া। শুধু এটাই যেনে রাখ, এমন একজন আছে, যে চায় আমি যেন সায়েমকে সারাজীবনের জন্য নিজের করে পাই৷ আমার ভালোবাসা পূর্ণতা পাক সে চায়।

ফাহাদ নড়েচড়ে বসল। কড়া গলায় রাফাকে বলল, ‘কে সেটা, যে তোকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে? ভুল কাজ করতে তোকে সাহায্য করছে।’

- বললাম তো বলা যাবে না।

- প্লিজ বোন, এইরকম করিস না। যে তোকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে, সে মোটেও ভালো মানুষ না। তোর ভালো চায় না সে। হয়তো এর পিছনে তার বড় কোনো স্বার্থ লুকিয়ে আছে। সেজন্যই তোকে ভুল কাজ করতে সাহায্য করছে।

- আমি এত কিছু বুঝতে চাই না ভাইয়া। সে যেকারণেই এইসব করে থাকুক, এতে আমার উপকারই হচ্ছে। সায়েমকে সামনাসামনি দেখতে না পেলেও এখন থেকে ওর ছবি দেখতে পাবো আমি। কারণ ঘরের চারিদিকে সায়েমের ছবি লাগানো আছে।

- প্লিজ রাফা, এগুলো থেকে বের হয়ে আয়৷ এইসব ঠিক করছিস না তুই। শুধু শুধু নিজের ক্ষতি করছিস। তোকে ছোট থেকে আদর-যত্ন দিয়ে বড় করেছি আমি আর মা। আমাদের কথা কী একটুও ভাববি না? কী এমন আছে সায়েমের মধ্যে, যে সেখান থেকে বেরোতে পারছিস না? সায়েম শুধুমাত্র তোমার মোহ। যা একসময় কেটে যাবে। কিন্তু আমরা তো তোকে খুব ভালোবাসি। আমাদের কেন কষ্ট দিচ্ছিস এভাবে? তোকে এই অবস্থায় দেখে আমাদের কতটা কষ্ট হয় একটু ভেবে দেখ। তুই তো আমার জীবনের একটা অংশ। আমি জীবনে তোকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছি, এই পৃথিবীর অন্য কাউকে ততটাও গুরুত্ব দিইনি। তোর কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচবো কীভাবে বল?" ফাহাদের কণ্ঠ থেকে চাপা কান্নার আওয়াজ বেরিয়ে এলো। ওর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছে। চোখ থেকে জল বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। 

রাফা হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠল। ফাহাদের হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল, ‘আমি তোমাকে যতটা ভালোবাসি, সায়েমকেও ততটা ভালোবাসি ভাইয়া। সায়েম যে আমার হৃদয়ে গেঁথে গেছে। ওকে কীভাবে মুছে ফেলব আমি? সত্যি বলছি ভাইয়া, আমি অনেকবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি। বারবার শুধু এটাই মনে হয়েছে, সায়েমকে অন্য একটা মেয়ে স্পর্শ করবে, অন্য একটা মেয়ে ওর বুকে ঘুমাবে, ওর সাথে একই ঘরে থাকবে, তা কীভাবে মেনে নিবো আমি? যেখানে প্রতিমুহূর্ত ওর সাথে থাকবো বলে স্বপ্ন দেখেছি আমি। আমি ওকে ভুলতে পারছি না। তোমরা হয়তো ভাবছ আমি বেপরোয়া, আমি খারাপ মেয়ে হয়ে যাচ্ছি৷ কিন্তু না ভাইয়া। আমি খারাপ মেয়ে নই। আমি শুধু সায়েমকে ভালোবাসি। আমি তোমার পায়ে পড়ি ভাইয়া, প্লিজ সায়েমকে আমার জীবনে এনে দাও। আর কিচ্ছু চাই না আমার। বাবার ভালোবাসা আমি না পেলেও তোমার ভালোবাসা পেয়েছি আমি। তাই তোমার ভালোবাসার এই ছোট বোনের শেষ ইচ্ছেটা পূরণ কর ভাইয়া। সায়েমকে আমার জীবনে এনে দাও।’

রাফার কান্নার আওয়াজ যেন ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। সেই সাথে ফাহাদের বুকের ভিতরটা তচনচ হয়ে যাচ্ছে। তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে ওর বুকের ভিতর। চোখের জল কোনোভাবেই আটকাতে পারছে না ফাহাদ। ওর ইচ্ছে করছে এক মুহূর্তের মধ্যেই সায়েমকে রাফার সামনে হাজির করতে। কিন্তু সেটা যে সম্ভব না। ফাহাদ উপরের দিকে তাকালো। নিঃশব্দে চাপা কান্নার আওয়াজ ছেড়ে বলল, ‘আমাকে মাফ করে দিও বাবা। তোমাকে দেওয়া কথা আমি রাখতে পারলাম না। তুমি তো বলেছিলে রাফাকে কখনো কষ্ট না দিতে। ওকে কখনো কাঁদাতে না করেছিলে তুমি। কিন্তু আমি যে তোমার কথা রাখতে পারছি না বাবা। নিজের সবটুকু দিয়ে সবাইকে ভালো রাখারা চেষ্টা করলেও কোথায় যেন আমার ব্যর্থতা ছিল'ই। যা আজ উপলব্ধি করতে পারছি আমি। কীভাবে ওর চোখের জল থামাবো আমি? ও যা চাইছে, সেটা তো সম্ভব নয়।’

রাফার কথায় ভাবনা থেকে বাস্তবে ফিরল ফাহাদ। রাফা কান্না করতে করতে বলছে, ‘চুপ করে আছ কেন ভাইয়া? প্লিজ বলো না সায়েমকে আমার জীবনে এনে দিবে।’

- এটা সম্ভব না বোন।

- কেন সম্ভব না ভাইয়া? সায়েমের থেকে আমি খুব ছোট বলে?

- দেখ বোন, ছোট-বড় বিষয়টা এখানে টেনে আনছি না আমি। কারণ আমাদের দেশে অসংখ্য মেয়ে আছে, যারা বাল্যবিবাহ করে। আর এমন একজনের সাথে বিয়ে করে, যার বয়স মেয়েটার বয়সের থেকেও দিগুণ। কিন্তু তোর বয়স তো ১৮ বছরের উপরে। আর সায়েমও তোর থেকে দিগুণ বড় নয়। সুতরাং বৈধ ভাবেই তোর আর সায়েমের বিয়ে হতে পারে। কিন্তু বিয়ের পরের সম্পর্কটা তো শুধুমাত্র দু'জন মানুষের মধ্যে হয় না। দু'টো পরিবারের মধ্যে হয়৷ সায়েমের পরিবার তোকে কখনোই মেনে নিবে না। সায়েমের বাবা তো একেবারেই না। টাকা-পয়সার কথা বলছি না আমি, কারণ আমাদেরও তেমন কম কিছু নেই৷ কিন্তু আমি অন্যকথা বলছি৷ বাবা-মা সবসময় ছেলের বউ হিসেবে যোগ্য কাউকে চাইবে। কিন্তু তোর সাথে সায়েমের কোনোভাবেই মানাবে না। তারা এত প্রেম-ভালোবাসার গুরুত্ব দিবে না। তুই খুব ছোট এখন। যখন তুই পড়াশোনা শেষ করে একটা ভবিষ্যত তৈরি করবি। অথবা সংসার সামলানোর মতো যোগ্য হয়ে উঠবি। তখন সবাই ছেলের বউ হিসেবে তোর মতো মেয়েকেই চাইবে৷ কিন্তু এখন না, সেই যোগ্যতা তোর হয়নি এখনো। তুই নিজেকেই এখনো সামলাতে পারিস না।

- কিন্তু ভাইয়া, এইসব তো বিয়ের পর-ও করা যায়। কোথাও তো লিখা নেই, যে বিয়ের পর ভবিষ্যতের লক্ষ্যে ছুটে চলা যাবে না, কিংবা সংসার সামলানো মতো যোগ্য হয়ে ওঠা যাবে না।

- সবাই এটা বুঝবে না-রে বোন। তাছাড়া সায়েম যথেষ্ট বড় হয়েছে। ওর একটা নিজস্বতা আছে। ইচ্ছা-অনিচ্ছা সহ নিজ মতামত আছে। ও অন্য একজনকে ভালোবাসে। আমি কীভাবে ওদের ভালোবাসা ভেঙে তোর কাছে সায়েমকে এনে দিবো? তুই যেমন সায়েমকে ভালোবাসিস, সায়েমও তেমন ওই মেয়েটাকে ভালোবাসে। সায়েমের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করতে পারব না আমি। এটা কখনোই সম্ভব না বোন।

রাফা কিছু বলছে না৷ ও কাঁদছে। খুব কাঁদছে। ফাহাদ রাফার কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল, ‘কাঁদিস না বোন। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। আল্লাহর উপর ভরসা রাখ। এখন তুই প্রিয় কিছু পাচ্ছিস না বলে ভেঙে পরিস না। হতাশ হয়ে পড়িস না। আল্লাহ নিশ্চয়ই তোর জন্য আরো ভালো কিছু রেখে দিয়েছেন সামনে।’

রাফা কিছু বলল না। ফাহাদ রাফার হাতটা ধরে বলল, ‘মা অপেক্ষা করছে। চল আমার সাথে।’

রাফা কিছু না বলে ওঠে দাঁড়াল। ফাহাদের হাত ধরে ড্রয়িংরুমে যেতে লাগল। তবে ফাহাদের ভাবনায় এখন আছে অন্যকিছু। ও ভাবছে, ‘কে সেই মানুষটা? যে রাফার অন্যায়ে সায় দিচ্ছে। নিশ্চয়ই আমার কোনো শত্রু সে।’


অফিসে নিজের ডেস্কে বসে কাজ করছে সায়েম। বেশ কিছু ফাইল সাইন করার পর চেয়ার থেকে ওঠে বসের কেবিনের দিকে যেতে লাগল। বাইরে দাঁড়িয়ে দরজায় নক করল সায়েম। কিন্তু ভিতর থেকে কেউ রেসপন্স করল না। সায়েম বুঝতে পারছে না বস ভিতরে আছে, নাকি নেই। কারণ ও অনেক্ষণ ধরেই বসের আনাগোনা দেখেনি অফিসে। দরজাটা খোলাই আছে দেখে ভিতরে ঢুকে গেল সায়েম। বসের চেয়ারের দিকে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। তাই হতাশ হয়ে পিছনে ফিরল। তখনই কেউ একজন ওর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। সায়েম হতভম্ব হয়ে গেল আকস্মিক ঘটনায়। একটা মেয়ে ওর বুকের সাথে একদম মিশে গেছে। মেয়েটার মুখটা এখনো দেখতে পারেনি সায়েম। কী করবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না ও। ভয়ে পা কাঁপছে ওর। ওকে এই অবস্থায় কেউ দেখলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আর সারা দেখতে পেলে তো সব শেষ। মেয়েটা নিজের মাথা সায়েমের বুকের মাঝে রেখে দিয়েছে। গভীর ভাবে সায়েমের পারফিউম এর ঘ্রাণ নিচ্ছে হয়তো। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর সায়েম নিজেকে সামলে নিয়ে মেয়েটাকে সরিয়ে দিলো। মেয়েটা সায়েমকে জড়িয়ে ধরেই মাথাটা তুলে উপরের দিকে তাকালো। মেয়েটার মুখটা দেখে থতমত খেয়ে গেল সায়েম। অবাক, বিস্ময় আর ভয় নিয়ে বলল, ‘রাফা তুমি!’

- ইয়েস মাই ডেয়ার। 
সায়েমকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কথাটা বলল রাফা। সায়েম কিছু বলার আগে দরজার দিকে তাকালো একবার। কিন্তু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল ও। কয়েক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।

(চলবে...)

আরো পড়ুন ৭ম পর্ব- ধারাবাহিক উপন্যাস : মেঘ বর্ষণ 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড