• মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

‘জল জোছনায় বৃষ্টি’-এর চতুর্থ পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস : জল জোছনায় বৃষ্টি

  এম. ফজলে রাব্বী

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:০১
গল্প
ছবি : প্রতীকী

কিছুদিন থেকে পাড়ায় বেশ চাঞ্চল্য চলছে। শুমারি হত্যা মামলাকে কেন্দ্র করে পুলিশের আনাগোনা চলছেই। সকাল বিকাল পুলিশ আসছে হাতে হাতকড়া নিয়ে। পাড়ার আকবর আলীর চায়ের দোকানে এসে বসে থাকে। পাড়ার লোকজনের সাথে কথাবার্তা বলে। বিভিন্ন জিজ্ঞাসাবাদ করে। আকবর আলীর দোকানের ঊপর ছাতার মত ছায়া বিস্তার করে থাকা বড় আমগাছটার পাতা ভেদ করে আসা সূর্যের আলোয় সেন্ট্রির হাতে থাকা হাতকড়াটা চকচক করে ওঠে। চকচকে হাতকড়ার উপর চোখ পড়তেই বুকটা ধুকধুক করে ওঠে আক্কাস আলীর। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রেখে নিজেকে নির্ভার দেখানোর চেষ্টা করে দোকানের এক কোণায় বসে নাশা বানায় সে। 

আকবর আলীর চায়ের চূলা থেকে নাশাটা জ্বালিয়ে বড় করে টান মারে সে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের অল্প অল্প জবাবও দেয়। মূলত সে বসে থাকে পুলিশের কথা শোনার জন্য। সকাল বিকাল ছাড়াও পুলিশ আসে সিভিল পোশাকে। লোকজনের সাথে কথা বলে, অকারণে শাসায়। তারপর চলে যায়। কাছুয়ার কোনো খোঁজ তারা পায় না। লোকে বলে কাছুয়া ভারতে চলে গেছে। অমাবস্যার যে রাতে শুমারির জবাই করা মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল সে রাতের পরে আর তাকে দেখা যায় নি। শুমারির লাশটা পাওয়া গিয়েছিল পাড়া থেকে একটু দূরে, নিরিবিলি তিন রাস্তার মোড়ে। সে লাশের কথা মনে পড়লে এখনো লোকের শরীরের লোম শিউরে ওঠে। বীভৎস একটা ছবি চোখের পাতায় ভেসে ওঠে। রাতবিরাতে ছেলে বুড়োরা একা বাড়ি থেকে বেড়োতে সাহস পায় না। মেয়ে, বউরা বাড়ির ছেলেদের সন্ধ্যার আগেই ঘরে ফিরতে বলে দেয় পইপই করে। 

কিন্তু শুমারিকে কেন খুন করলো কাছুয়া? সেটাই একটা বড় গবেষণার বিষয় পুলিশের। গরীব ঘরের এই মেয়েটিকে হত্যার পেছনের রহস্য এখনো অজানা অনেকের কাছেই। কেউ কেউ বলে, কাছুয়ার কাছে টাকা পেত শুমারি। কাছুয়া ধার করেছিল সেই টাকা। কিন্তু কাছুয়া সে টাকা শোধ করেনি। শুমারি উপর্যুপরি টাকার জন্য তাগাদা দিচ্ছিলো। কিন্তু কাছুয়া তাতে মাথা ঘামায় নি। শেষে বাধ্য হয়ে শুমারি কমিশনারের কাছে বিচার দেয়। এতেই ক্ষুদ্ধ হয়ে পুশুরার রাতে টাকা দেওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে এসে নিরিবিলি একটা বটগাছের পাশে হত্যা করে। তারপর লাশটাকে তিন রাস্তার মোড়ে ফেলে রেখে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। 

পুলিশ কাছুয়াকেই খুঁজতে আসে এ কথা সবার জানা, তবু আক্কাস আলীর মনটা দুরুদুরু করে। পুলিশের আসেপাশে ঘুরঘুর করে সে। লোকজনের কাছে জিজ্ঞাসা করে পুলিশ কি বলে গেল। সারাটা দিন ভয়ে তটস্থ থাকে সে। রাতে ভালো ঘুম হয় না। বিছানায় এপাশ ওপাশ করে। খেতে বসলে খেতে পারে না। বউ বলে হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের কাছে যেতে তবু সে যায় না। উল্টো বউকে ধমকে উঠে বলে, ‘হোমোপতি খাইয়া কি অইবো?’ আসলেই তো, হোমিওপ্যাথি দিয়ে কিছুই হবে না। মনের জমিনে মোড়ক লাগলে কি টিকটিকির ডিমে চিকিৎসা হয়। 
 
পুলিশ চলে গেলে আকবর আলী একদিন বলেই বসেছিল, ‘শুমারি তো তোমার কাছেও টাকা পাইত, তাই না?’ সেই থেকে আক্কাস আলীর মনের ভূতটা জেগে উঠেছে। সে ভূত আর ঘুমাতেই চাইছে না। সারাক্ষণ সে শুধু মনে করিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, ‘শুমারি তর কাছে টাকা পাইত। খালি টাকা না। সুদের টাকা। সে টাকা বাড়তে বাড়তে কত টাকা হইছে তার হদিস আছে তর কাছে? পুলিশ যদি এখন বলে, তুই টাকার জন্যে শুমারিরে খুন করছস, তাইলে কি করবি?’
আসলেই কিছু করার থাকবে না আক্কাস আলীর। শুমারি যে টাকা পেত তা নেহায়েত কম না। কাজেই পুলিশের সন্দেহটাও অযৌক্তিক হবে না। আর যেহেতু বিষয়টা আকবর আলী জানে সেহেতু তা সাত কান হয়ে গেছে। দোকানদার মানুষকে বিশ্বাস করা যায় না। শত শত লোকের সাথে প্রতিদিন এদের লেনদেন চলে। কখন কাকে মনের ভুলে কি বলে ফেলে আর সেই কথা দশজন ঘুরে পুলিশের কাছে কি কথা হয়ে পৌঁছায় তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই! 

আক্কাস আলীর ভয়টা তাই জোয়ারের পানির মত ফুলে ফেঁপে বাড়তেই থাকে। তার ভাবনায় আর ভাঁটার টান লাগে না। 
নাসির আলীও ইদানিং বাড়ি থেকে তেমন বের হয় না। মাঝে কয়েকদিন সে তার কটকটির ভাঁড় নিয়ে বের হয়েছিল। এখন তার শরীরে জাগতিক আলস্য এসে ভর করেছে। ঘরের ভিতরে সোনার কলসি লুকিয়ে রেখে কেউ কি গরীবী হালে চলতে পারে? শুয়ে বসে দিন কাটায় সে। বাড়ির সামনের ছোট্ট পুকুরটাতে পুঁটি মাছে ধরে বড়শি দিয়ে। বড়শির মাথায় পান্তা ভাত লাগিয়ে টোপটাকে সে ছুড়ে মারে পানিতে। পুঁটি মাছ অল্প অল্প করে ঠোকর মারে, টোপটাকে একেবারে গিলে ফেলে না। নাসির আবার টোপ লাগায়। কিন্তু মাছ সে পায় না মোটেই। তবু বসে থাকে। বসে থাকতে তার ক্লান্তি লাগে না। জীবনে কি এতটা অবসর সে পেয়েছে কখনো? সেই ছোটবেলা থেকেই বাবার সাথে দিন মজুরের কাজ করতে হয়েছে তাকে। কি রোদ, কি বৃষ্টি- এসবের ধার ধারতে গেলেই পেটে ভাত পড়বে না! তারপরে সে শুরু করেছিল এই বাদাম, কটকটির ব্যবসা। এ কাজও কম কঠিন নয়। ধূলা, ক্লান্তি মাথায় নিয়ে গ্রামকে গ্রাম ঘুরে বেড়াতে হয় ডুগডুগি বাজিয়ে। কিন্তু আর কত? জীবনে সৎ থেকে কি লাভ? সুযোগ যখন এসেছেই তখন তা কাজে লাগানোই বুদ্ধিমানের কাজ। হ্যাঁ, সেটাই করেছে তারা বাপ-বেটা মিলে। তবে আর দেরি কেন? সোনা ঘরে পুষে লাভ কি? সোনা তো আর মোল্লা নাসির উদ্দীনের বাচ্চা দেওয়া কড়াই না। সে সিদ্ধান্ত নেয়, আজ রাতেই বিষয়টা বাবার সাথে শেয়ার করবে সে। হ্যাঁ, আজ রাতেই। আর দেরি করা সম্ভব নয় তার পক্ষে। 
 
রাতের খাওয়া শেষে কেবল শুতে যাবে গফুর আলী। বালিশে হেলান দিয়ে সে আয়েশ করে বিড়িতে টান দিচ্ছে। সালেহা বানু অঘোরে ঘুমাচ্ছে। তার ঘুম খুবই হালকা। কথা বলতে বলতে হুট করেই ঘুমিয়ে পড়ে আবার আস্তে কোনো শব্দ শুনলেও সে আচমকা জেগে ওঠে। শীতের রাত। এরই মধ্যে বাইরে কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। বৃষ্টির ফোঁটার মত টুপটুপ শব্দে কুয়াশা পড়ছে টিনের চালে। উত্তরের শীত বলে কথা। একে তো মরুভাবাপন্ন আবহাওয়া, অন্যদিকে হিমালয়ের শীতল বাতাসে হাড় কাঁপিয়ে ওঠে। লেপের নিচেও দেহটা ঠকঠক করে কাপতে থাকে। 

এই শীত উপেক্ষা করে বিছানা থেকে নিজের ময়লা চাদরটা গায়ে জড়িয়ে গফুর আলীর ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো নাসির। কাঠের দরজায় আস্তে করে টোকা দিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় সে ডাকলো, ‘ আব্বা, জাইগা আছাও না?’ 
গফুর আলী পাল্টা প্রশ্ন করে, ‘ক্যারা? নাসির না?’
- হ, আব্বা। দরজাঠা খুলো, কতা আছে’-জবাব দেয় নাসির।
এই মুহূর্তে বিছানা উঠতে থেকে মোটেই ইচ্ছে করছিল না গফুর আলীর। শীতের রাতে কাঁথা মুড়িয়ে আরাম করে বসেছিল সে। তবু তাকে উঠতে হলো। সালেহা বানু জেগে থাকলে অবশ্য তাকে এই কষ্টটা করতে হত না। দরজা খুলে দিতেই ঘরের ভেতর ঢুকে গেল নাসির। বাইরের শীতে তার নাক-কান-হাত অবশ হওয়ার জো। বাঁশের মাচাঙ্গের বিছানায় উঠে সে কাঁথা জড়িয়ে নিল বেশ করে। গফুর আলীও উঠে বসলো বিছানায়। 

কিছুটা কাচুমাচু করে বিষয়টা তুললো নাসির। সে ব্যবসা বড় করতে চায়। বড় মানে বেশ বড়। যেমন ভাঙ্গারি জিনিসের দোকান বা গালামালের দোকান। কথাটা শুনে একটু গভীর চিন্তায় ডুবে গেল গফুর আলী। অন্য যেকোনো সময় হলে সে রেগে উঠত। মুখ দিয়ে কিছু অশ্রাব্য শব্দও বেড়িয়ে পড়ত তৎক্ষণাৎ। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। সম্পদ যেহেতু আছে সেটা পরিকল্পিত উপায়ে ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু এই মুহূর্তে কি এসব ভাবা ঠিক হবে? গফুর আলীর মন সায় দেয় না। বিশেষ করে শুমারির মামলাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করা উচিৎ। 
সিগারেটের একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে গফুর আলী ছেলেকে আন্তরিকতার সুরে বলে, ‘আর কয়ডা দিন দেরি কর। দেরি যহন করছস তহন আর দুইডা দিন দেরি করা পারবি না?’ 
হুম, নাসির পারবে। তবে বাদাম কটকটির ব্যবসাটা সে আর করবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। রংপুরে তার এক বন্ধুর ঘড়ির দোকান আছে। সে সেখানে মেকানিকস এর কাজ শিখবে। তারপর ফিরে এসে যা হয় একটা কিছু করবে। গফুর আলীর এতে আপত্তি থাকবার কথা নয়।

নাসিরকে বিদায় দিয়ে ঘরের কোনাটায় গিয়ে দাঁড়ায় গফুর। মাটি খুঁড়ে গয়নার কলসির মুখটা খুলে। কলসির ভেতরের সোনার গয়নাগুলো নেড়েচেড়ে দেখে। কুপির আলোয় ঝলমল করে ওঠে ওগুলো। সেখান থেকে একটা ছোট্ট নাকফুল নিয়ে পকেটে রাখে গফুর। কাল দূরের কোনো স্বর্ণকারের কাছে সেটা পরিক্ষা করাবে। আসল নকলের ভিড়ে চোড়াবালিতে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখার চেয়ে সত্য জেনে নিশ্চিন্তে নিদ্রাযাপনই অধিক সুখকর। এমন সময় মসজিদে ফজরের আজান দেওয়া শুরু করে শমসের মুহুরি। গফুরের কলিজাটা কেঁপে ওঠে প্রথমে। তারপর বিস্ময়ের সুরে নিজেকে প্রশ্ন করে, এত তাড়াতাড়ি ফজরের আজান দেয় কেন? 

আসলেই এখন ফজরের আজান দেওয়ার কথা নয়। এককালে দুনিয়াদারিতে আসক্ত শমসের মুহুরি এখন পরকালের চিন্তায় ডুবে থাকে সর্বদা। এই সেই মুহুরি, গফুরের নিজের মামা হয়েও দুর্ভিক্ষের সময়ে যে কিনা এক কেজি আঁটার বিনিময়ে এক শতাংশ করে জমি লিখে নিয়েছিল গফুরের মায়ের কাছ থেকে!

(চলবে..) 
আরো পড়ুন ‘জল জোছনায় বৃষ্টি’-এর তৃতীয় পর্ব-
ধারাবাহিক উপন্যাস : জল জোছনায় বৃষ্টি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড