• মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

‘মায়াবতী’-এর তৃতীয় পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস : মায়াবতী

  রিফাত হোসেন

১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৭:২১
গল্প
ছবি : প্রতীকী

ফোনের ওপাশের মানুষটা বলল, ‘তুমি কী এখন বাড়ি থেকে বের হতে পারবে? আমি তোমার বাড়ির খুব কাছাকাছি আছি।’

ওর কথা শুনে তো আমি রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। কারণ ও থাকে ঢাকায়। আর আমি গ্রামে। অদ্ভুতভাবে একটা অনুষ্ঠানে আমাদের পরিচয় হয়েছিল। এরপর কথা বলতে বলতে সম্পর্কটা গভীর হয়। তো আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে ওকে বললাম, ‘এইসব কী বলছ? তুমি আমার বাড়ির কাছাকাছি আছ মানে? তুমি তো ঢাকায়।’

আমার কথা শুনে সে উচ্চস্বরে হেসে ওঠে বলল, ‘আমি আজই তোমাদের গ্রামে এসেছি। শুধুমাত্র তোমার সাথে দেখা করার জন্য। প্লিজ একবার এসো।’

- এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। তার উপর বৃষ্টি। আমাকে বাড়ি থেকে বেরোতে দিবে না এখন।

আমি সঠিক জানি না। তবুও আমার মনে হয়েছিল, আমার কণ্ঠে ‘না’ শব্দটা শুনে ও কষ্ট পেয়েছে। তাই কিছুক্ষণ চুপ করেই ছিল ও। এরপর যখন আমি বললাম, ‘কী হলো?’

ও তখন করুণ কণ্ঠে বলল, ‘তোমাকে দেখার জন্য এতদূর ছুটে এলাম আমি। আর তুমি আমার সাথে দেখা করতে চাইছ না। তাহলে কী ফিরে যাবো আমি?’

আমি তখন কী বলব? আর কী করব? ঠিক ভেবে পাচ্ছিলাম না। এদিকে সন্ধ্যাবেলা বাড়ি থেকে বের হতেও চাচ্ছিলাম না। আবার ওদিকে ওকে ‘চলে যা-ও’ ও বলতে পারছিলাম না। তাছাড়া সত্যি কথা বলতে কী? ওকে দেখার লোভটা আমিও সামলাতে পারছিলাম না। অনুষ্ঠানের দিন শুধুমাত্র কয়েকবার দেখা হয়েছিল আমাদের। এরপর আর হয়নি। ওকে একবার দেখার জন্য আমার মনটা ছটফট করছিল। তাই আর কোনোকিছু না ভেবে ফোনটা রেখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। ওর বলা জায়গা অনুযায়ী বাড়ি থেকে কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল ও। তো আমি খুব সাবধানে ওর কাছে চলে গেলাম। ওকে দেখে এক অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করছিল মনের মধ্যে। একে অপরের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। 

কিছুক্ষণ পর হঠাৎ শুরু হলো ঝড়। অনেকটা কাল-বৈশাখী ঝড়ের মতো।  ওইরকম একটা পরিস্থিতিতে ওকে ফেলে বাড়িতে চলেও আসতে পারছিলাম না। আমাদের গ্রামের কৃষকদের আশ্রয় স্থান হিসেবে একটু পরপর ছাউনির ব্যবস্থা করা আছে। এটা কৃষকরাই করেছে। কারণ দুপুরের রৌদ্রের মধ্যে কাজ করে তাদের একটু বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন হয়। এছাড়াও দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য তারা ছাউনিটা’ই ব্যবহার করে। তো ঝড় থেকে বাঁচতে আমরা ছাউনির দিকে দৌড় দিই। বৃষ্টি ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে। দু’জনেই ভিজে গেছি ইতিমধ্যেই। সেভাবেই ভিজে একাকার হয়ে ছাউনিতে গিয়ে আশ্রয় নিলাম আমরা। চারিদিকে অন্ধকার থাকলেও বিদ্যুৎ চকমকানোর আলোয় আমি লক্ষ্য করলাম ও আমার দিকে লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি ওর থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ালাম। কিন্তু ও আমার কাছে চলে এলো আবার। হুট করেই জড়িয়ে ধরল আমাকে। আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব হয়ে গেলাম আমি। 

মুখ গিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছিল না। আমি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিলাম যে, ও আমার শরীরের অশ্লীল সব স্থানে স্পর্শ করছে। আমি শুধু হা করে দাঁড়িয়েই আছি। হাত পা কেমন যেন অবশ হয়ে গিয়েছে আমার। আমি ইচ্ছে করলেও ওকে সরিয়ে দিতে পারছিলাম না। ওর অশ্লীলতা আস্তে আস্তে বেড়ে যেতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যেই ওর স্পর্শ আমাকে আকৃষ্ট করে তুলল। ওর নেশায় আসক্ত হয়ে গেলাম আমি। তখনই হঠাৎ কোত্থেকে যেন কয়েকটা টর্চ লাইটের আলো আমাদের উপর পড়তে থাকে। ও তখনও আমাকে জড়িয়ে ধরে অশ্লীল স্থানে স্পর্শ করছিল। একটু পরেই গ্রামের কয়েকজন লোক আমাদের সেই ছাউনির কাছে চলে আসে। তারা আমাদের আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলে। আশ্চর্যজনক ভাবে তারাও আমার দিকে লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আমি তখন ওকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিই। কোত্থেকে যেন গ্রামের কয়েকজন মুরুব্বিরা-ও সেই ঝড়ের মধ্যে ছাউনিতে হাজির হয়। খুব ভয় পেয়ে যাই আমি। কয়েকজন আমার দিকে অশ্লীল দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। আর কয়েকজন ছি. ছি: করছিল আমাকে। আমার সম্পর্কে আর আমার পরিবারের সম্পর্ক খারাপ খারাপ সমালোচনা করতে শুরু করে তারা। আমি তখন কেঁদে ফেলেছিলাম। এদিকে সবাই যখন আমার শরীরে কলঙ্কের দাগ লাগাচ্ছিল। সবাই যখন আমার নামের পাশে কলঙ্কিনী পদবি দিচ্ছিল, সেই সুযোগে আমার সেই ভালোবাসার মানুষটা উধাও হয়ে গেল। কীভাবে যেন সবার চোখের আড়ালে চলে গেল ও। 

কয়েকজন গিয়ে আমার বাবা-মাকে ডেকে নিয়ে এলো। ঝড় বৃষ্টির রাতেই ছাউনিটার কাছে চলে এলো আমার বাবা-মা। আমাদের মাঝে যা হয়েছে, গ্রামের লোকজন তার থেকেও কয়েকগুণ বাড়িয়ে আমার বাবা-মাকে সব বলল। আমার কলঙ্কিনী রূপটা আমাদের পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল মুহূর্তের মধ্যেই। অথচ ছেলেটাকে নিয়ে কেউ কোনো কথা বলেনি। সবাই আমাকে কলঙ্কিত করায় ব্যস্ত ছিল তখন। গ্রামের মানুষদের মুখের ভাষা-ও তখন অশ্লীল হয়ে গিয়েছিল। সবাই যেন সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেতাই করে ছাড়ছে আমার বাবাকে। নিজেদের ইচ্ছেমতো অপমান করছিল। আমার বাবা কোনো প্রতিবাদ না করে শুধু চিৎকার করে কাঁদছিল তখন। সত্যি বলছি, বাবার সেই চিৎকারের শব্দ এখনো আমার কানে এসে আঘাত করে। আমার ব্যক্তিত্ব ভেঙে তচনচ করে দেয় বাবার আর্তচিৎকার। আমার গ্রামের বন্ধুরা আমাকে সেখান থেকে নিয়ে চলে আসে বাড়িতে। বাবা-মা কেউ আমার সাথে কথা বলেনি। আমার ঘরের পাশের ঘর ছিল বাবার। সারারাত বাবার আর্তচিৎকারের শব্দ ছাড়া কিছুই শুনতে পাইনি আমি। খুব ইচ্ছে করছিল বাবার কাছে যাই। কিন্তু এই কলঙ্কিত শরীর নিয়ে কারোর সামনে যাওয়ার সাহস পাইনি। ভোর হতেই জমানো কিছু টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম আমি। এরপর সোজা ঢাকায় চলে এলাম। শেষ দুপুরের দিকে ঢাকায় পৌঁছেছিলাম আমি। 

ভেবেছিলাম অন্তত আমার ভালোবাসার মানুষটা আমাকে মেনে নিবে। আমাকে বুঝবে সে। কারণ সে জানে আমি খারাপ মেয়ে নই। আমি কলঙ্কিত নই। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সে-ও আমাকে মেনে নিলো না। উল্টো আমার কাছে ৫ লাখ টাকা চাইলো। আমি কখনোই ভাবিনি আমার জীবনটা এইরকম হবে। খুব সুন্দর একটা জীবন চেয়েছিলাম আমি। প্রিয় মানুষদের সাথে নিয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার কোনো ইচ্ছা-ই পূরণ হয়নি। আমার এই ব্যর্থ জীবনটা নিয়ে বাঁচতে হচ্ছে।

কথাগুলো খুবই করুণ কণ্ঠে বলল মায়া। মাঝে মাঝেই কথা আটকে আসছিল। তবুও নিজের কষ্টের মুহূর্তগুলো নিশুর কাছে প্রকাশ করল। কিন্তু এবার আর নিজের আর্তনাদ আটকাতে সক্ষম হলো না মায়া। হু হু করে কেঁদে উঠল ও। মায়ার কোল থেকে মাথা তুলে বসল নিশু৷ এতক্ষণ বোনের কণ্ঠে খুব মনোযোগ দিয়ে গল্পটা শুনলেও এবার বোনের কান্নার শব্দে ওর বুকটা হাহাকার করে উঠল। মায়ার গলা জড়িয়ে ধরে নিশু বলল - " কেঁদো না আপু। এই পৃথিবীতে আমাদের আর কেউ না থাকলেও তুমি আমার আছ, আর আমি তোমার আছি। যদিও আমাদের দু'জনের আকাঙ্খা এক নয়। কারণ তোমার সব কিছু থেকেও যেন কিছুই নেই। সবাইকে ফিরে পাওয়ার একটা ইচ্ছে, বা আকাঙ্খা তোমার মধ্যে আছে। আর আমার এমনিতেই কিছু নেই। তাই আকাঙ্খা বা ইচ্ছে, কোনোটাই আমার নেই। তবুও আমরা দু’জনেই এখন প্রিয়জন হারা। আমরা একে অপরের যন্ত্রণাটা বুঝতে পারি আপু। তুমি কোনো চিন্তা করো না। একদিন তোমার প্রিয়জনদের আমি ফিরিয়ে দিবো তোমার কাছে। কীভাবে সম্ভব,  তা আমি জানি না। তবে নিজের প্রতি আমার আত্মবিশ্বাস খুবই দৃঢ়।"

মায়া কিছু বলল না নিশুকে। রাতটা এভাবেই পেরিয়ে গেল। নিশুর জ্বর-ও কমে গেছে। 

এর পরেরদিন মায়া জীবিকার জন্য বেরিয়ে পড়েছিল। সাথে ছিল নিশু। নিশু প্রথমে একটা চায়ের দোকানে কাজ করতো। মায়া আশেপাশের মানুষদের সাহায্য নিয়ে টিউশনি জোগাড় করল। গরীব মানুষরা টাকা না দিলেও দায়িত্বের সাথে ওদের পড়াতো মায়া। সেজন্য অল্প দিনেই সবার পছন্দের মেয়ে হয়ে ওঠেছিল ও। এভাবেই আস্তে আস্তে অনেক জায়গায় টিউশনি করানো শুরু করল মায়া। নিশুকে আর চায়ের দোকানে কাজ করতে হয়নি। খুব নামি-দামি না হলেও মোটামুটি ভালো একটা কলেজে নিশুকে ভর্তি করায় মায়া। নিজের টিউশনির টাকা দিয়েই নিশুর পড়াশোনার খরচ সহ যাবতীয় খরচ বহন করে মায়া। এভাবেই দিনগুলো খুব আনন্দের সাথে পাড় করছিল মায়া আর নিশু। এদিকে নিশু ইন্টার পরিক্ষা দিয়ে ভালো রেজাল্ট করেছে। এবার একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়া এবং পড়াশোনার পাশাপাশি আর্থিক ভাবে বোনকে সাহায্য করাই নিশুর এরমাত্র দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াল। মায়া সবসময় নিশুকে বলে, ‘আমার ব্যর্থতার জীবনকে অগ্রাহ্য করে হলেও তোর জীবনে সফলতা নিয়ে আসব আমি।’

নিশু শুধু নির্বাক হয়ে বোনের মায়াবী মুখটা দেখতে। আর মায়া হাসতো। এতে মায়ার মুখটা আরো মায়াবী হয়ে উঠত। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন আগের ঘটনা। একদিন নিশু মায়াকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘তোমাকে একটা অনুরোধ করব আপু?’

মায়া বিছানায় বসে ছিল। তখনই কথাটা বলল নিশু। মায়া নিশুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হেয়ালি না করে বলে ফেল। কিছু লাগবে?’

নিশু ইতস্ততবোধ করলেও দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘একবার চলো না তোমার গ্রামের বাড়িতে।’

মায়া তাকালো নিশুর দিকে। নিশুর দৃষ্টি নিচু হয়ে গেল। মায়া বলল, ‘এর আগেও এই একই কথা বলেছিস তুই। আর আমি প্রতিবারই বলেছি ‘না’। তুই কেন বুঝতে পারছিস না যে, আমি গ্রামে যেতে পারব না। এর কারণ নিশ্চয়ই তোর অজানা নয়।’

- আমার বিশ্বাস তোমার বাবা-মা নিজেদের দুর্ব্যবহারের জন্য অনুতপ্ত। তারা বুঝতে পেরেছে যে, সবক্ষেত্রে শুধুমাত্র মেয়েদের দোষ দিলে চলবে না। কলঙ্কের দাগ শুধুমাত্র মেয়েদের শরীরে লাগে না।

মায়া প্রথমে রাজি হচ্ছিল না।শেষে নিশু অনেক অনুরোধ করার পর মায়া বলে, ‘ঠিক আছে। তবে দুই একদিনের মধ্যেই আমরা আবারও ফিরে আসবো এখানে।’

নিশু মৃদু হাসি দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে আপু।’

পরেরদিন খুব সকালে বেরিয়ে পড়ল নিশু আর মায়া। মায়ার পরনে শাড়ি। আর নিশুর পরনে আকাশী-নীল রঙের শার্ট। বাসে বসে দু'জনেই ঘুমিয়ে পড়ল। গন্তব্যে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গেল ওদের। গ্রামের মাটিতে পা দিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে মায়া বলল, ‘ইচ্ছে করছে আবারও সেই শৈশবে ফিরে যেতে।’

নিশু মুচকি হাসি দিলো শুধু। বাড়ির দিকে হেঁটেই যাচ্ছিল মায়া আর নিশু। গ্রামের অনেকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখছিল ওদের। তবে মায়া আর নিশু সেদিন না তাকিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু ওরা কল্পনা-ও করতে পারেনি। ওদের জন্য কতবড় বিপদ অপেক্ষা করে আছে সামনে। হয়তো এই যাওয়াটাকে কেন্দ্র করেই ভাই-বোনের সম্পর্ক ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। কিংবা আরো ভয়ঙ্কর কিছু। বিশাল এক বিপর্যয় নেমে আসবে ওদের জীবনে।

(চলবে...)

‘মায়াবতী’-এর ২য় পর্ব- ধারাবাহিক উপন্যাস : মায়াবতী

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড