• রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩১ ভাদ্র ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

সর্বশেষ :

নিজ দেশে ফিরে যেতে রোহিঙ্গাদের দুই শর্ত||এ পি জে আব্দুল কালামের স্মৃতিতে ভূষিত প্রধানমন্ত্রী  ||উদ্বেগ থাকলেও ভারতের ওপর বিশ্বাস রাখতে চাই : পররাষ্ট্রমন্ত্রী ||ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি ঢাকতেই ছাত্রদলের কাউন্সিল বন্ধ : রিজভী ||কাশ্মীরে জঙ্গি অনুপ্রবেশের অভিযোগে সীমান্তে‌ হাই অ্যালার্ট||ভারতের পর এবার বিশ্বকে পরমাণু যুদ্ধের হুঁশিয়ারি পাকিস্তানের||সোমবার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নেবেন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক||মেক্সিকোয় কুয়া থেকে ৪৪ মরদেহ উদ্ধার করল বিজ্ঞানীরা||অন্যায় করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না : কাদের    ||সৌদির তেল স্থাপনাতে হামলায় ইরানকে দায়ী করল যুক্তরাষ্ট্র

‘মায়াবতী’-এর দ্বিতীয় পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস : মায়াবতী

  রিফাত হোসেন

০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:৪৬
গল্প
ছবি : প্রতীকী

হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে গেল নিশুর। তড়িঘড়ি করে শোয়া থেকে ওঠে বসল। আশেপাশে তাকিয়ে দেখে কয়েদিদের মধ্যে সবাই ঘুমিয়ে থাকলেও একজন বসে আছে। মধ্যরাতের ঘন অন্ধকারছন্ন কারাগারে থাকা ৬০ ওয়াটের ছোট্ট বাল্বের দিকে তাকিয়ে আছে ছেলেটা। ছেলেটা আজই এখানে এসেছে। তবে কোনো খুনের আসামি হিসেবে নয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য প্রতিপক্ষের প্রভাবশালী বাবা ওর নামে মামলা করেছে। কঠোর এক মামলা। যার জন্যে ছেলেটার এক বছরের জেল হয়ে গেছে। হঠাৎ নিশুর অতীতের কথা মনে পড়ে গেল। কত আনন্দেই না কাঁটছিল দিনগুলো। কিন্তু হঠাৎ একটা ধমকা ঝড় এসে সব তচনচ করে দিয়ে গিয়েছিল। সেই দিনগুলোর কথা আজও স্পষ্টভাবে মনে আছে নিশুর। 

এইসব ভাবতে ভাবতে অন্য এক জগতে চলে গেল নিশু। হঠাৎ কারোর স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠল। পাশে তাকিয়ে দেখে সেই ছেলেটা ওর হাত ধরেছে। স্পর্শটা মুগ্ধতা নিয়ে অনুভব করল নিশু। ছেলেটা ওর দিকে একমনে তাকিয়ে আছে। ছেলেটার প্রতি বেশ মায়া হলো নিশুর। তাই যথাসম্ভব নিচু স্বরে বলল, ‘কিছু বলবে ভাই?’

- তোমার জীবনের গল্পটা অর্ধেক শোনার পর থেকে আমার ঘুম গভীর এক অন্তরালে চলে গেছে। যা গল্পের সমাপ্তি ছাড়া ফিরিয়ে আনা কখনোই সম্ভব নয়।

নিশু নিশ্চুপ। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না ও। একজন কনস্টেবল আসছে দেখে নড়েচড়ে বসল নিশু আর পাশে বসে থাকা ছেলেটা। নিশু কনস্টেবল লোকটাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘এখন কয়টা বাজে?’

- মধ্যরাত। আনুমানিক দু’টো বাজে।

নিশু শুধুমাত্র অস্ফুটস্বরে ‘ওহ্’ বলল। কনস্টেবল লোকটা চলে গেল। নিশু পাশে বসে থাকা ছেলেটির কাধে হাত রেখে বলল, ‘তুমি গল্পটা শুনতে চাও?’

- হ্যাঁ।

- ওকে বেশ। শোন তাহলে..।

অদ্ভুতভাবে মায়া ওই নোংরা ঘরটাকে আপন করে নিলো মুহূর্তের মধ্যেই। অপরিষ্কার ঘরটা গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল মায়া। ওকে দেখে বুঝার উপায় নেই যে, ও ক্লান্ত। সারারাত  রাস্তায় হেঁটেছে, শুয়েছে। ক্ষুধায় নিশুর অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে রীতিমতো। গতকাল রাতে কিছু খেতে পারেনি। তাই ভেবেছিল সকালে ওঠে কোনো কাজ করবে। এরপর খাওয়ার টাকা পাবে। কিন্তু আজ আর সেটা হলো মায়াকে নিয়ে এই বাড়িতে আসার কারণে৷ এদিকে মায়া অনবরত কাজ করেই যাচ্ছে। কখনো মেঝে ঝাড়ু দিচ্ছে, তো কখনো শক্ত কাঠের বিছানাটা ঠিক করে বসাচ্ছে। নিশু শুধু পেটে হাত দিয়ে এইসব দেখছে। মায়া যে খুব দায়িত্বশীল একটা মেয়ে, তা এতক্ষণে বেশ ভালো করেই বুঝতে পেরেছে নিশু। যে মেয়ে কিছুক্ষণ আগেই অচেনা - অজানা একটা জায়গায় এসে নিজেকে এভাবে মানিয়ে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে, সেই মেয়ে তো দায়িত্বশীল একজন হবেই। মৃদু হাসি দিলো নিশু৷ ও কখনো ভাবেনি হুট করে এত ভালো একটা বোন পেয়ে যাবে। ছোটবেলা থেকে নিশুর ইচ্ছে ছিল, ওর একটা বোন থাকবে। যে ওকে আদর করবে। খাইয়ে দিবে। নানান জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যাবে। হাত ধরে হাঁটতে। ও দুষ্টুমি করলে মাঝে মাঝে একটু শাসন করবে। কিন্তু ওর ইচ্ছে তখন পূরণ হয়নি। তবে আজ মনে হচ্ছে, সেই ইচ্ছেগুলো একটু একটু করে পূরণ হচ্ছে। 

হঠাৎ মায়ার কথায় ফিরে তাকালো নিশু। মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিছু বলছিলেন?’

মায়া কিছু না বলে নিশুর পেটের দিকে তাকিয়ে হাসছে। নিশু তৎক্ষণাৎ নিজের পেটের উপর থেকে হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘আসলে আপনি যা ভাবছেন ঠিক তা না।’

মায়া নিশুর কাছে এসে নিশুর চুলগুলো ঠিক করে দিয়ে বলল, ‘ক্ষিধে পেয়েছে সেটা বললেই তো হয়। বোনের কাছে লজ্জা পাচ্ছ।’

নিশু মাথায় হাত দিয়ে চুলগুলো আবারও এলোমেলো করে ফেলল। মায়া কিছুটা রাগ দেখিয়ে বলল, ‘চুলগুলো বারবার এলোমেলো করছ কেন? এভাবে দেখতে কেমন লাগে বল তো?’

- যার জীবনটাই এলোমেলো। তার আবার চুল গুছিয়ে কী হবে বলেন?

- প্রতিটি মানুষের জীবন'ই এলোমেলো থাকে। জন্ম থেকেই কেউ পরিপাটি হয়ে আসে না। আস্তে আস্তে নিজেকে গুছিয়ে নিতে হয়। হয়তো আশেপাশের মানুষজন তোমাকে দেখিয়ে দিবে। কিন্তু কেউ তোমার জীবনটা গুছিয়ে দিবে না। সুতরাং তোমার নিজের জীবন, নিজেকেই সাজিয়ে- গুছিয়ে নিতে হবে।

নিশু অবাক হয়ে তাকালো মায়ার দিকে। মায়া আবার বলল, ‘আমি তোমার সাহায্যকারী হতে পারি। কিন্তু তাই বলে তুমি আমার উপর নির্ভরশীল হতে পারবে না। তোমাকে নিজের উপর নির্ভরশীল হতে হবে।’

নিশু মুগ্ধতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘ আপনি অসাধারণ আপু! আপনি এত সুন্দর করে আর এত গুছিয়ে কীভাবে কথা বলতে পারেন? আমার কল্পনার শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিতের মধ্যে আপনি একজন। আর আপনি কিনা বলেন, আপনার জীবনটা ব্যর্থতায় ভরপুর। এটা অবিশ্বাস্যকর।’

- তোমাকে দেখার আগ-মুহুর্ত পর্যন্ত আমি ভাবতাম, আমার এই জীবনটা শুধুমাত্র ব্যর্থতার। কিন্তু তোমাকে দেখার পর আমার এই ভাবনাটা পাল্টে গেছে। তোমাকে জানার পর থেকে আমি সত্যিটা উপলব্ধি করতে পেরেছি। আমি আগে ভাবতাম, এই পৃথিবীতে একমাত্র আমিই অবহেলিত। একমাত্র আমিই মূল্যহীন। আমার জীবনেই শুধুমাত্র সুখ নেই। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তোমাকে জানার পর আমি বুঝতে পারলাম যে, আমার থেকেও তুমি অনেক অসুখী। এই পৃথিবীর কাছে অবহেলিত এবং মূল্যহীন তুমি। তাই আমি নতুন করে নিজেকে নিয়ে ভাবতে শিখেছি। আমি নতুন করে বাঁচতে চাই। কাল তুমি বলেছিলে না, আমার ব্যর্থতার চরিত্রটা শেষ হয়ে গিয়েছে। তখন তোমার ওই কথাটার অর্থ বুঝতে না পারলেও আমি এখন বুঝতে পারছি। সত্যিই, আমার ব্যর্থতার চরিত্র শেষ। এবার আমার জীবনে সফলতা আনতে হবে। তবে সফলতা তো আর একা একা আসবে না। আমাকে নিয়ে আসতে হবে। আমি জীবনটাকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে চাই।

নিশু ‘হা’ করে তাকিয়ে আছে মায়ার মুখের দিকে। মায়া বলল, ‘কী দেখছ?’

 চোখের পলক না ফেলেই নিশু বলল, ‘আমার একটা কথার এতবড় অর্থ খুঁজে বের করলেন আপনি? আমার একটা কথায় আপনি জীবনটাকে নতুন করে ভাবতে শিখেছেন? সত্যি বলছি, নিজেকে কেন জানি জ্ঞানী মানুষ ভাবতে ইচ্ছে করছে।’

শব্দ করে হেসে উঠল মায়া। কিছুক্ষণ পর হাসি থামিয়ে নিশুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমরা নিজেরা-ও জানি না আমরা ঠিক কতটা জানি। সবার মাঝেই জ্ঞান আছে। শুধু একটু ভাবতে হবে। নিজের স্বপ্নগুলো পূরণ করতে হবে৷’

- আমিও আমার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।

মায়া কৌতূহলী হয়ে বলল, ‘কী স্বপ্ন তোমার?’

নিশু চোখ দু'টো বন্ধ করে হারিয়ে গেল অন্য এক জগতে। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি। চোখেমুখে একরাশ মুগ্ধতা। আর দৃষ্টিতে আছে  প্রেমাতাল ভাব। নিশুর দিকে "হা" করে তাকিয়ে আছে মায়া। হঠাৎ নিশুর এইরকম পরিবর্তন দেখে বেশ অবাক হলো মায়া। তবুও কিছু না বলে তাকিয়েই আছে নিশুর দিকে। নিশু বলল, ‘নিস্তব্ধ এক রাতে আমার সমবয়সী এক মেয়ের সাথে দেখা হবে। আমি তার সাথে ভাব জমানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়ব। কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াবে না আমাদের দু'জনের মাঝে। আমরা একে অপরের কাছাকাছি আসব। একে অপরকে নিজেদের মনের না বলা কথাগুলো ইশারায় বুঝাবো। নির্লজ্জের মতো মধ্যরাতে ফুটপাতের রাস্তায় হাত ধরে হাঁটব আমরা। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা বলে পরিচয় দিবো। সাধারণ নয়, অসাধারণ কিছু ভালোবাসার মুহূর্ত থাকবে আমাদের মাঝে। সে নিজের আকর্ষণীয় ঠোঁট দু’টো নাড়িয়ে আমাকে ‘ভালোবাসি’ বলতে। প্রতিউত্তরে আমি তার কপালে আলতো করে চুমু দিবো।’

কথাগুলো বলে আবারও মুচকি হাসি দিলো নিশু। মায়া ওকে ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে তোমার? এইসব কী বলছ?’

নিশু কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও তা প্রকাশ করা করে বলল, ‘তেমন কিছু না।’

- আমি তো সবটাই শুনলাম। এইটুকু বয়সে এতবড় স্বপ্নের কথা অনায়েসে বলে ফেললে তুমি।

- সঠিক মতো পড়াশোনা করতে পারলে আমি এখন কলেজে থাকতাম। মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করার পর টাকার অভাবে আর কলেজে ভর্তি হতে পারিনি। তারপর তো মা-ও চলে গেলেন৷ পড়াশোনা আর হলো না। কিন্তু তাই বলে বয়স তো কমে যায়নি। সুতরাং আমাকে ছোট বলবেন না।

মায়া হাসতে হাসতে বলল, ‘হুম বুঝলাম। অনেক বড় মানুষ তুমি। তবে তোমার এই স্বপ্নটা কে কতটা মূল্য দিবে আমি জানি না। তবে জগতের অধিকাংশ প্রেমিক-প্রেমিকা ঠিক এইরকমই স্বপ্ন দেখে। অন্যদের কাছে মূল্যহীন হলেও তরুণ-তরুণীদের কাছে এই স্বপ্নের মূল্য অনেক।’

নিশু পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘আপনার কাছে কতটা মূল্য আমার এই স্বপ্নের?’

মায়া বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য রাগী কণ্ঠে বলল, ‘এত পাকনামি না করে কিছু একটা কিনে আনো। আমারও ক্ষিধে পেয়েছে।’

- এখন তো আনতে পারব না। আপনি এখানেই অপেক্ষা করেন। আমি কাজ করে দুপুরের দিকে কিছু একটা নিয়ে আসবো আপনার জন্য।

মায়া নিশুর দিকে কিছু টাকা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘আপাতত এটা দিয়ে বাজার করে আনো। পরেরটা পরে দেখা যাবে। আর আমার ফোনটা বিক্রি করার একটা ব্যবস্থা করে দাও।’

মায়া ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে নিশুর হাতে দিলো। হাতে ফোন হাতে নিয়ে বলল, ‘ফোন বিক্রি করে দিলে আপনি নিজের পরিবারের মানুষদের সাথে যোগাযোগ করবেন কীভাবে?’

- তাদের সাথে যেন যোগাযোগ না করতে হয়, সে-জন্যই তো ফোনটা বিক্রি করে দিবো।

- আর আপনার বয়ফ্রেন্ড?

দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো মায়া। নিশু জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। মায়া বলল, ‘যে একা একটা মেয়েকে রাস্তায় রেখে চলে যেতে পারে, তার কাছে ভালোবাসার মূল্য ঠিক কতটা তা বুঝতে পেরেছি আমি।’

- আপনি চাইলেই তো নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে পারেন। কেন এত কষ্ট করে এখানে থাকবেন?

- আমাকে একটু সময় দাও। আমি নিজেকে সামলে নিই একটু। তারপর তোমাকে সবটা বলব।

- পরিবারের সাথে যাই হোক না কেন? আপনি উচিত তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বাড়িতে ফিরে যাওয়া।

মায়া করুণ কণ্ঠে বলল, ‘আমি তোমাকে বুঝাতে পারছি না ভাই। গ্রামে যাওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে আমার জন্য। তুমি এখন এই বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করো না প্লিজ। সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তগুলোর কথা ভাবলেই আমার সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়।’

- আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি বিশ্রাম নিন। আমি একটু পরই আসছি।

নিশু বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। মায়া শুয়ে পড়ল শক্ত বিছানায়। 

-  কী ছিল মায়ার সেই ভয়ঙ্কর অতীত? যার জন্য ওকে বাড়ি ছাড়তে হয়েছে।

চোখ মেলে তাকালো নিশু। চারিদিকে তাকিয়ে ও থতমত খেয়ে গেল। নিশুর সাথে থাকা সকল কয়েদি ওর দিকে তাকিয়ে আছে। সবার চোখেই কৌতূহল। তাদের মধ্যে থেকেই কেউ একজন জিজ্ঞেস করেছে কথাটা। নিশু সামনে তাকিয়ে দেখে জেলার সাহেব দাঁড়িয়ে আছে। অতীত বলতে গিয়ে অদ্ভুত এক গভীরতায় চলে গিয়েছিল নিশু। সে-জন্য আশেপাশে কী হচ্ছে? বা কারা আছে? তা দেখার মতো অবস্থায় ছিল না ও।

জেলার সাহেব নিশুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘এরপর কী হয়েছিল? আর মায়ার ভয়ঙ্কর অতীতটা কী ছিল?’

কয়েদি নিশু আবারও চোখ দু'টো বন্ধ করে বলতে শুরু করল, ‘এভাবেই বেশ কয়েকটা দিন চলে গেল মায়ার আর নিশুর। আস্তে আস্তে মায়া স্বাভাবিক হতে থাকে। মায়ার কাছে যা টাকা ছিল, সেসব প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এবার বেশ চিন্তায় পড়ে যায় ওরা দু'জন। ওদের দু'জনের সম্পর্কটা আরো গভীর হয়। একে অপরের রক্তের না হলেও আত্মার ভাই-বোন হয়ে ওঠে পড়া। নিশু মায়াকে তুমি করে বলতে থাকে।  নিশুর ছোটবেলার স্বপ্নগুলো মায়া পূরণ করে দেয়। নিজের হাতে খাইয়ে দেওয়া, মাঝে মাঝে শাসন করা। সবই করে মায়া। নিশু কোনো দ্বিধাবোধ না করে মায়াকে নিজের বোনের মতো ভালোবাসতে শুরু করে। সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। ছিদ্র টিন ভেদ করে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়তে থাকে মায়া আর নিশুর শরীরে। নিশু শীতে কাঁপছিল রীতিমতো। মায়া বুঝতে পারে নিশুর জ্বর এসে গেছে। যতটা সম্ভব নিশুকে আকড়ে ধরে রেখেছে মায়া। নিশুর কাঁপুনি বাড়তে বাড়তে একসময় খারাপ অবস্থায় চলে যায়। এদিকে বিকেলে পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। মেঘের কারণে খুব তাড়াতাড়িই চারিদিকটা অন্ধকার হয়ে যায়। বাড়িওয়ালার সাথে কখনোই কথা বলেনি মায়া। তেমন ভালো করে চিনে-ও না ও। বেশ বিপাকে পড়ে যায় মায়া। বৃষ্টি চলে গেলেও মেঘেদের ডাক আর বজ্রপাতের বিকট শব্দ এক ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে তুলেছে। নিশুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে মায়া। বিছানা, জামা-কাপড় সহ প্রায় সব কিছুই কাক ভেজা হয়ে গিয়েছে ওদের ঘরে। নিশু কাঁদোকাঁদো কণ্ঠে বলল - " আমার খুব কষ্ট হচ্ছে আপু।’

- আর একটু সহ্য কর ভাই৷ সকাল হলেই কোনো একটা ব্যবস্থা করব আমি। আপাতত তোর মাথায় জলপট্টি দিয়ে দেই।

নিশু কষ্টে কাতরাচ্ছিল আর কাঁদছিল। এর আগেও অসংখ্যবার বৃষ্টিতে ভিজেছে নিশু। কিন্তু কখনো এইরকম জ্বর হয়নি। হঠাৎ করেই এত পরিমাণে জ্বল এসে গেল। এদিকে নিশুর করুণ কণ্ঠস্বর আর কান্না মায়াকে ক্ষত বিক্ষত করে তুলছিল। নিজের প্রিয়জনদের হারিয়ে একমাত্র এই ভাইকে আকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিল ও। সেই ভাই আজ এত কষ্ট পাচ্ছে, অথচ ও কিছুই করতে পারছে না। এর থেকে বড় ব্যর্থতা আর কী হতে পারে? মায়ার আজ খুব করে মনে হচ্ছে, ওর জীবনে ব্যর্থতার চরিত্র এখনো শেষ হয়নি। হয়তো তা কখনোই শেষ হওয়ার নয়। সেজন্য স্রষ্টা ওকে বারবার ব্যর্থতার মুখে ফেলে দিচ্ছে। 

নিশু কাঁদছে, সেই সাথে মায়া-ও কাঁদছে। তবে দু'জনের কান্নার কারণ ভিন্ন। নিশু কষ্টে কাঁদছে, আর মায়া নিজের ব্যর্থতার জন্য কাঁদছে। এই ব্যর্থতার জন্যই আজ ওর ভাইকে কষ্টে কাতরাতে হচ্ছে। এভাবেই সময় পেরিয়ে যায়। রাত আস্তে আস্তে গভীর হতে থাকে। ভোরের দেখা মিলে না ওদের কাছে। মায়া অসহায়ের মতো শুধু নিশুর কপালে জলপট্টি দিচ্ছে। একসময় নিশুর জ্বর কমতে থাকে। সেই সাথে নিশ্চিন্ত হতে থাকে মায়া। আধো-আধো দৃষ্টিতে মায়ার দিকে তাকায় নিশু। নিশু তখন মায়ার কোলে মাথা রেখে শুয়ে ছিল। নিশু চোখে মেলে তাকিয়েছে দেখে মায়া নিশুর কপালে হাত দেয়। জ্বর প্রায় কমে এসেছে। মায়া নিশুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘একটা ছোট্ট গল্প শুনবি ভাই?’

নিশু মাথা নাড়িয়ে ‘হ্যাঁ’ বললেও ওর চোখেমুখে ছিল অদ্ভুত এক বিস্ময়। ও বুঝতে পারছিল না, এইরকম পরিস্থিতিতে মায়া ওকে কী গল্প শোনাতে চাইছে। ও নিশ্চয় বাচ্চা ছেলে নয়। যে ওকে গল্প বলে ঘুম পাড়াবে। 

নিশু এইসব ভাবলেও মুখে কিছুই বলল না। মায়া নিজের গল্প শুরু করবে এবার। গল্পটা কাল্পনিক, নাকি বাস্তব। তা জানার কোনো চেষ্টা-ও করল না নিশু। ও মনোযোগ দিয়ে বোনের মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। এত পরিশ্রমের পরে-ও মায়ার মধ্যে ক্লান্তির কোনো আভাস নেই। সেই প্রথমদিনের মতোই মায়াবী লাগছে ওকে। নিশু মায়ার দিকে তাকিয়েই অস্ফুটস্বরে বলল, ‘তুমি এত মায়াবী কেন আপু?’

মায়া হেসে দিয়ে বলল, ‘কারণ আমার নাম মায়াবতী। এখন চুপ কর তুই। আমাকে গল্পটা বলতে দে।’

নিশু নড়েচড়ে আবারও মায়ার কোলে মাথা রাখল। মায়া নিশুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলতে শুরু করল, ‘আজকের মতো সেদিন-ও ছিল বৃষ্টি। সেই সাথে মৃদু বাতাস। বৃষ্টি হলে আমার আনন্দের যেন শেষ নেই। বাইরে বেরোতে না পারলেও ঘরে বসে বৃষ্টিকে স্পর্শ করতে পারতাম। টিনের চালের উপর বৃষ্টি পড়ার অদ্ভুত সব শব্দ শুনতে পেতাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল। বৃষ্টি কমে গিয়ে তখন খুবই কম হচ্ছিল। তবুও আমি জানালার পাশে বসে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছিলাম। অদ্ভুত এক শিরশির অনুভব করছিলাম আমি। তখন হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে। জানালার পাশ থেকে সরে এসে ফোনটা হাতে নিলাম। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে ফোন রিসিভ করার সাথে সাথেই ওপাশ থেকে প্রিয় মানুষটার কণ্ঠ শুনতে পেলাম। ওইরকম একটা মুহূর্তে প্রিয় মানুষটার কণ্ঠ শুনে প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম আমি। আমি অবশ্য তখনও চুপ করেই ছিলাম। 

(চলবে...)

‘মায়াবতী’-এর ১ম পর্ব- ধারাবাহিক উপন্যাস : মায়াবতী

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড