• মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

অ্যামাজন ধ্বংসে দায়ী ব্রাজিলিয়ান সরকার

অ্যামাজন ছাড়া মানবসভ্যতা টিকবে না কেন?

  এস এম সোহাগ

২৩ আগস্ট ২০১৯, ১৪:৫৯
অ্যামাজন রেইনফরেস্ট
মানুষকে টিকে থাকতে হলে অ্যামাজনকে আগলে রাখা জরুরি, কারণ এটাই বৈশ্বিক উষ্ণতার ভারসাম্য রক্ষা করে। ছবি : সংগৃহীত

জ্বলছে পৃথিবীর ফুসফুস, হুমকিতে মানবসভ্যতা। একটাবার ভাবুন তো, আপনি সব বিলাসিতা কিনে পায়ের কাছে রাখলেন, দামি বাড়ি-গাড়ি, পোশাক, খাবার, গেজেট সবই আপনার হাতের মুঠোয়, কিন্তু আপনি প্রাণখুলে শ্বাস নিতে পারছেন না, কী অর্থ দাঁড়াবে তখন এই আধুনিকতার? 

আধুনিক হতে গিয়ে আমরা প্রকৃতির যে ক্ষতিসাধন করে ফেলেছি, তার প্রভাব বিশ্ববাসী গ্রীষ্মে টের পাচ্ছে। মানুষের সৃষ্ট কার্বনডাইঅক্সাইড শুধু বৈষ্ণিক উষ্ণতাই বাড়ায়নি, এই উষ্ণতা জ্বালিয়ে দিচ্ছে কার্বনডাইঅক্সাইড শোষণকারী গাছকে, ছারখার করে দিচ্ছে বিস্তির্ণ বনভূমি। যা মানুষকে দীর্ঘকালীন সংকটে ভোগাবে। সবচেয়ে আতঙ্কের কথা হলো, বিশ্বের উষ্ণতাকে গ্রাস করে মানুষকে শীতল করার দায়িত্বে থাকা অ্যামাজন বনভূমি জ্বলছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে নিদারুণ অগ্নিকাণ্ড বিশ্বের এই এয়ার কন্ডিশনকে অকেজো করে দিচ্ছে। 

উত্তর-পশ্চিম ব্রাজিলের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে অবস্থিত অ্যামাজন রেইনফরেস্ট পৃথিবীর বৃহত্তম গ্রীষ্মমন্ডলীয় রেইনফরেস্ট। একে পৃথিবীর এয়ার কন্ডিশন বলা হয় কারণ এটি বিশ্ব তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করে। এই সপ্তাহে, জাতীয় মহাকাশ গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইএনপিই) নামে ব্রাজিলিয়ান গবেষণা কেন্দ্র অ্যামাজনের অস্তিত্বের হুমকির কথা জানিয়েছে। 

মহাকাশ থেকে অ্যামাজনের নির্মম চিত্র। ছবি : নাসা, এপি 

২০১৮ সালের একই সময়ের তুলনায় বর্তমানে অ্যামাজনে দাবানলের পরিমাণ ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একাধিক সংবাদ মাধ্যম জানায়, গত সপ্তাহের মধ্যেই ৯ হাজারেরও বেশি আগুন লেগেছে। এই অগ্নিকাণ্ডের শিখা ও ধোয়া এত বিশাল যা মহাকাশ থেকেও দেখা যাচ্ছে বলে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা জানায়।

দাবানলের জন্য পরিচিত ক্যালিফোর্নিয়া, যেখানে দাবানলগুলোর বেশিরভাগই বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থার কারণে এবং মরা গাছের জ্বালানি বৃদ্ধির কারণে ঘটে থাকে। তবে অ্যামাজনের দাবানল প্রাকৃতিক কারণে নয়, মানব-প্ররোচিত, স্থানীয় আদিবাসী কৃষকরা এই দুর্ঘটনার জন্যে অনেকটা দায়ী। 

অ্যামাজনে আদিবাসী অধিকারের পক্ষে কাজ করা দাতব্য সংস্থা অ্যামাজন ওয়াচের ব্যাখ্যা অনুসারে, জলবায়ু সম্পর্কিত সংশয়ী ব্রাজিলের ডানপন্থী রাষ্ট্রপতি জায়ের বলসোনারো দ্বারা উৎসাহিত হয়েই কৃষকরা এসব আগুনের সূত্রাপাত ঘটায়। শুধু জুলাই মাসেই বন উজাড়ের কারণে অ্যামাজন ৫১৯ বর্গ মাইল হারিয়েছে, যা ঢাকার (১১৮ দশমিক ২৯ বর্গমাইল) আয়তনের থেকে ৪ গুণেরও বেশি।

অ্যামাজন উজাড়ের ভয়াবহ অবস্থা। ছবি : সংগৃহীত 

অ্যামাজন ওয়াচের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ক্রিশ্চিয়ান পোইরিয়ের এক বিবৃতিতে বলেন, 'এই ধ্বংসযজ্ঞটি সরাসরি রাষ্ট্রপতি বলসোনারোর পরিবেশবিরোধী মতবাদ সম্পর্কিত, যা বন রক্ষা এবং মানবাধিকারকে ভ্রান্তভাবে ব্রাজিলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিবন্ধক হিসাবে চিহ্নিত করে। কৃষক এবং খামারিরা ক্রমবর্ধমানভাবে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য অযৌক্তিকভাবে রাষ্ট্রপতির বার্তাকেই রেইনফরেস্টে অগ্নিসংযোগ করার লাইসেন্স হিসেবে নিয়েছে।'

নজিরবিহীন এই অগ্নিকাণ্ড দক্ষিণ আমেরিকার নিজস্ব কোনো ইস্যু নয়। এই গ্রীষ্মে যে আগুন লেগেছে তা ভয়াবহভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন করতে পারে, কারণ অ্যামাজন রেইনফরেস্টই আমাদের টিকে থাকা একমাত্র গ্রীষ্মমন্ডলীয় রেইন ফরেস্ট।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিপজ্জনক প্রভাব রোধ করতে বৈশ্বিক উষ্ণতাকে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারটি বজায় রাখতে হবে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ২ ডিগ্রির মধ্যে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদিও জলবায়ু বিজ্ঞানীরা এই অর্ধ ডিগ্রি বৃদ্ধিতে ধ্বংসের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য আনতে পারে বলে সতর্ক করেছেন। আর এই কারণেই অ্যামাজনের মতো বিশাল রেইনফরেস্টকে সংরক্ষণ জরুরি।

২০১৩ সাল থেকে অ্যামাজনের দাবানলের ক্রমবর্ধমান হার। ছবি : বিবিসি 

জীবাশ্ম জ্বালানি, কয়লা, তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের মাধ্যমে মানুষের ক্রিয়াকলাপ বাতাসে প্রচুর পরিমাণে কার্বন মিশিয়ে ফেলেছে, যা পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। বৃক্ষ অবশ্যই পৃথিবীর ক্ষতিকারক কার্বনডাইঅক্সাইড নির্গমনকে ফিল্টার এবং পুনঃপ্রসারণ উদ্ভিদে পরিণত করার একটি প্রাকৃতিক উপায়।

সালোকসংশ্লেষণের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াতে, বৃক্ষ এবং গাছপালা বায়ু থেকে কার্বন অপসারণ করে এটি শুষে নেয় এবং অক্সিজেনকে ফের বাতাসে ছেড়ে দেয়। বিশ্বের বনভূমি প্রতি বছর ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বন শুষে ফেলে, অ্যামাজন একাই এর এক চতুর্থাংশ শোষণ করে।

ব্রাজিলের গ্রিনপিসের বন প্রচারকারী রোমোলো বাতিস্তা গণমাধ্যম স্যালোনকে ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, অ্যামাজনের প্রতিটি গাছই 'আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করতে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপ বিনিময় নিয়ন্ত্রণে' সাহায্য করে। এটি বিশ্বের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

তবে, গত কয়েক দশক ধরে অ্যামাজন রেইনফরেস্টে গাছের ক্ষয়জনিত কারণে কার্বন শোষণের ক্ষমতা হারাচ্ছে বলে বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন। ২০১১ সাল থেকে তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ২০১৫ সালে করা একটি প্রতিবেদন অনুসারে, অ্যামাজন বনে গাছের বৃদ্ধির হার গত বেশ কয়েক বছরে স্থির রয়েছে, তবে প্রতিবছরই গাছের মৃত্যুর হার বাড়ছে।

ছবি : সংগৃহীত 

অ্যামাজন রেইনফরেস্টের গাছগুলো বাতাসে জলীয় বাষ্প ছেড়ে দিয়ে এমন একটি প্রক্রিয়া তৈরি করে যা বায়ুমণ্ডলের 'উড়ন্ত নদী' নামে পরিচিত। এই উড়ন্ত নদীগুলো বিশ্বজুড়ে জল ছড়িয়ে বেড়ায় এবং আবহাওয়ার ধরনগুলো স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ব্যাখ্যা অনুসারে, বনাঞ্চল যখন বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের সরবরাহকে পরিপূর্ণ করে তারই ফল হচ্ছে এই উড়ন্ত নদীগুলোর বাষ্পীভবন প্রক্রিয়াজাতকরণ।

জাতিসংঘ দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে, 'ভূমি অঞ্চলগুলোতে যে পরিমাণ বায়ুমণ্ডলীয় আর্দ্রতা উৎপন্ন হয় তার প্রায় ৭০ শতাংশই উদ্ভিদ থেকে আসে, যা প্রকৃতিতে জলের প্রাপ্যতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বনাঞ্চল দ্বারা উৎপন্ন বায়ুমণ্ডলীয় আর্দ্রতা কেবল স্থানীয় পানির প্রাপ্যতাকেই প্রভাবিত করে না, এটি প্রচলিত বাতাসের মাধ্যমে অন্যান্য অঞ্চল বা এমনকি মহাদেশেও স্থানান্তরিত হয়।'

যখন অ্যামাজন রেইনফরেস্ট এর প্রকৃতি অনুযায়ী কাজ করবে তখন এটি একটি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া লুপ তৈরি করে। দুর্ভাগ্যক্রমে, বর্তমানে এর বিপরীতটিই ঘটছে, যা বৃষ্টিপাতকে এমন একটি অপরিবর্তনীয় অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যার ভবিষ্যদ্বাণী বিজ্ঞানীরাও করতে পারছেন না।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট  জায়ের বলসোনারো। ছবি : সংগৃহীত 

বাতিস্তা স্যালোনকে বলেন, 'সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো যখন একবার অ্যামাজনে জলবায়ুর এই পরিবর্তনটি আরও বেশি হবে তখন তা আরও কঠিন, শুষ্ক, আরও দাবানলের এমন একটি চক্র তৈরি করবে, যা ঐ অচিন্তনীয় অবস্থার সৃষ্টি করবে।'

এমন অবস্থার কিছু মডেলে দেখাচ্ছে যে, ২০৫০ সাল নাগাদ, অ্যামাজনের তাপমাত্রা ২ থেকে ৩ সেন্টিগ্রেডের মধ্যে বৃদ্ধি পাবে। বৃষ্টিপাত হ্রাস এবং বন উজাড়ের সাথে মিলিত হয়ে অ্যামাজন রেইনফরেস্টকে একটি শুষ্ক প্রান্তরে রূপান্তরিত করবে। এবং মানুষের বন উজাড়ের মাধ্যমে গাছের এমন মৃত্যু কেবল এই প্রক্রিয়াটিকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাবে আশা করা যায়।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ড ফর ন্যাচারের ব্যাখ্যা মতে, 'বনভূমি কাটা, জলাবদ্ধতা এবং সেটেলমেন্টের মতো মানব সৃষ্ট কাজগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্পষ্টতই যুক্ত এবং এসব শুকনো প্রভাবকে বাড়ায় যা বনকে দাবানলের দিকে ঠেলে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, আগুনের জ্বালানি বোঝা বাড়িয়ে দেয় এমন গাছের মৃত্যুহার শুকনো অবস্থার মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে যা জমি খালি করার এবং বন কাটার থেকে অ্যামাজোনিয় বনাঞ্চলকে নবগঠিত এক শুষ্ক প্রান্তরে রূপান্তর করবে। 

এমন অবস্থায় মানুষের পক্ষে যতদূর করা সম্ভব তা হলো, অ্যামাজনকে রক্ষা করে এমন দাতব্য আউটলেটকে অনুদান দেয়া। কিন্তু অ্যামাজন ওয়াচ বলছে, বনভূমি কেটে ফেলার বিষয়টি হলো দেশ এবং সংস্থাগুলোর রেইনফরেস্ট ধ্বংসকে কেন্দ্র করে মুনাফা লাভ।

ছবি : সংগৃহীত 

অ্যামাজন ওয়াচের ফিনান্স ক্যাম্পেইন ডিরেক্টর ময়রা বিরস এক বিবৃতিতে বলেছন, 'অ্যামাজনের আদিবাসী মানুষ বছরের পর বছর ধরে রেইনফরেস্টের ঝুঁকির বিষয়ে বিপদাশঙ্কা প্রকাশ করে আসছে এবং এই ধ্বংসকে প্রতিরোধ করে চলেছে- কখনো কখনো তাদের নিজের জীবন দিয়েও।' 

'অবশেষে, এখন যেহেতু বিশ্ব এ দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, তখন এটা বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ যে, বিশ্বজুড়ে সরকার এবং সংস্থাগুলো যখন ব্রাজিল সরকারের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করবে বা অ্যামাজনে পরিচালিত কৃষিব্যবসায় সংস্থাগুলোতে বিনিয়োগ করবে, তখন তারাই বলসোনারোর বিষাক্ত নীতিগুলোকে উৎসাহিত করছে' বলে বিরস যোগ করেন।

ব্রাজিলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যে সরকার যে নীতি গ্রহণ করেছে তা শুধু দেশটির নিজস্ব বনভূমিকেই ধ্বংস করছে না, তার এই নীতি বিশ্বের ফুসফুসটাকেও অকেজো করে দিচ্ছে। অ্যামাজন শুধু ব্রাজিলের একার নয়, এটা বৈশ্বিক অঙ্গ, সম্ভব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। 

ছবি : সংগৃহীত 

কোনো যুদ্ধে যে ক্ষতি হয়, তা পরে অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পারা যায়। তবে, অ্যামাজনকে ধ্বংসের যুদ্ধ যে মানব সভ্যতাকে চিরকালের জন্য হারিয়ে দেয়ার পরিণতি বয়ে আনবে তা প্রতিরোধ বা সংস্কারের কোনো সুযোগ থাকবে না। মানুষ আধুনিকতার নামে প্রকৃতিকে রোজ শেষ করে দিচ্ছে, অ্যামাজনের মতো বনভূমিগুলো সেই ক্ষতি পুষিয়ে মানবজীবনকে স্বাভাবিক রাখছে। মানুষের নিজেদের স্বার্থে অ্যামাজনের ক্ষতি করছে না, ক্ষতিটা আসলে নিজের হচ্ছে, এই সাধারণ বোধটুকু মানুষের মধ্যে সব কিছু শেষ হওয়ার আগে আসুক। 
 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড