• রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বিশ্ব জয়ের পথে তুরস্কের ‘অ্যাটাক ড্রোন’

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

৩১ আগস্ট ২০২১, ১৩:২৭
বিশ্ব জয়ের পথে তুরস্কের ‘অ্যাটাক ড্রোন’
তুরস্কের বায়রাকতার আকিনজি ‘অ্যাটাক ড্রোন’ (ছবি : দ্য ডেইলি সাবাহ)

ইউরোপের মুসলিম রাষ্ট্র তুরস্কের নবনির্মিত অত্যাধুনিক অস্ত্রের নাম ‘বায়রাকতার আকিনজি’। গোটা বিশ্বের মধ্যে এটি অন্যতম সেরা ‘অ্যাটাক ড্রোনগুলোর’ মধ্যে একটি। এয়ার লঞ্চড ক্রুজ মিসাইল বহনে সক্ষম ড্রোনটি এখন বাজারে বিক্রির জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত। এই ড্রোনের উইংস্প্যান ৬৫ ফুট এবং এর এন্ডুরেন্স প্রায় ২৪ ঘণ্টা। ৩০০ মাইল রেঞ্জের ড্রোনটি প্রায় ৪০ হাজার ফুট উচ্চতা দিয়ে উড়তে সক্ষম। ইন্টারনাল বে’তে ৪০০ কেজি এবং এক্সটারনাল বে’তে ৯৫০ কেজি অস্ত্র বহন করতে পারে এই আকাশযান। মূলত ইউক্রেনে নির্মিত দুইটি এআই-৪৫০ টার্বোপ্রোপ ৪৫০ হর্স পাওয়ারের ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক এই ড্রোনে।

গেল রবিবার দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় টেকিরদাগ প্রদেশে বিশেষ এই ড্রোনের উদ্বোধন উপলক্ষে এক জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান বলেছিলেন, আমাদের ড্রোনটি এরই মধ্যে বিশ্বজয় করেছে। এর মাধ্যমে তুরস্ক যুদ্ধ ড্রোন প্রযুক্তিতে বিশ্বের শীর্ষ তিন নম্বরে উঠে এসেছে।

এরপর সেই অত্যাধুনিক যুদ্ধ ড্রোনটি দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- বায়রাকতার আকিনসির প্রধান প্রযুক্তি বিষয়ক কর্মকর্তা (সিটিও) সেলসুক বায়রাক্তার, ভাইস প্রেসিডেন্ট ফুয়াত ওকতে, পার্লামেন্টের স্পিকার মোস্তফা সেনটপ, তুরস্কের শিল্প ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী মোস্তাফা ভারঙ্ক, দেশের জাতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুলুসি আকর, তুর্কি চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল ইয়াসার গুলার প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেছেন, আমাদের লক্ষ্য এখন কেবল শক্তিশালী সশস্ত্র ড্রোন তৈরি করা। অত্যাধুনিক বায়রাকতার আকিনজি এই অঞ্চলের শান্তি, বিশ্বাস ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে সমৃদ্ধ করবে।

তুরস্ক সব সময়ই যুদ্ধ ড্রোনে অগ্রণী হওয়ার বিষয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, আমাদের এখন আরও নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটাতে হবে।

তুর্কি প্রেসিডেন্টের মতে, এই সশস্ত্র ড্রোনগুলো যে কোনো মিশনে ব্যবহারের জন্য সংক্ষিপ্ত রানওয়েসহ বিমানবাহী জাহাজে অবতরণ করতে সক্ষম। এ সময় তিনি তুরস্কের হোম-সোর্স প্রতিরক্ষা পণ্যগুলোরও ভূয়সী প্রশংসাও করেন।

আরও পড়ুন : কাবুলে আমাদের উপস্থিতি থাকবে : এরদোগান

দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে সাফল্যের কথা উল্লেখ করে এরদোগান জানান, তুরস্ক মানববিহীন আকাশযান প্রযুক্তিতে বর্তমানে যে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে তা আমাদের প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতাকে বিশ্ব দরবারে শীর্ষ স্থানে তুলে এনেছে। তুরস্কের নীতি হলো- বিশ্বের সামনে নিজেদের সব প্রযুক্তিকে উপস্থাপন করা, যা কেবল মানবতার সুবিধার জন্য বিকশিত হয়।

তুর্কি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ড্রোনের বিশ্বব্যাপী ব্যাপক চাহিদা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ন্যাটো সদস্য পোল্যান্ডসহ ১০টিরও বেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে এরই মধ্যে নতুন রফতানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যার মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ তুর্কি ড্রোন ক্রয়ের জন্য অপেক্ষাতেও রয়েছে। এটি ভীষণই গুরুত্বপূর্ণ যে, আমাদের জাতীয় প্রযুক্তি মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তায় ব্যাপকভাবে অবদান রাখছে। এরপরও আমরা আমাদের নিজস্ব কৌশলগত অগ্রাধিকার অনুযায়ী নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

বিশ্লেষকদের মতে, বায়রাকতার আকিনসি চলতি বছরের ৮ জুলাই আকাশের ৩৮ হাজার ৩৯ ফুট (১১ হাজার ৫৯৪ মিটার) উচ্চতায় আরোহণ করে তুরস্কের জাতীয় বিমান চলাচলের ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। যার মাধ্যমে তুর্কি প্রশাসন বিশ্বব্যাপী নতুন একটি রেকর্ডও স্থাপন করে। এটি তখন দীর্ঘ ২৫ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট উড়ে প্রায় ৭ হাজার ৫০৭ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে।

অত্যাধুনিক এই ড্রোনটির সফটওয়্যার, ডিজাইন, এভিওনিক্স এবং মেকানিক্স সবই বায়রাকতারের তৈরি। বায়রাকতার টিবি২ ইউসিএভির চেয়েও অনেক উন্নত। যা আজারবাইজান, ইউক্রেন, কাতার এবং পোল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে বিক্রি হয়েছে। গেল মে মাসে পোল্যান্ড সর্বপ্রথম ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং ন্যাটোভুক্ত সদস্য দেশ হিসেবে তুরস্কের কাছ থেকে ড্রোনগুলো সংগ্রহ করে।

এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামিক রাষ্ট্র সৌদি আরব পর্যন্ত এই তুর্কি ড্রোন কিনতে আগ্রহী বলে জানা গেছে। এছাড়া লাটভিয়াও এরই মধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা তুরস্কের ইউসিএভি কেনা দ্বিতীয় ইইউ এবং ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে। আর আলবেনিয়াও বায়রাকতার টিবি২ ড্রোন ক্রয়ের চুক্তি করতে আগ্রহী।

তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এরই মধ্যে একটি রফতানি চুক্তি হয়েছে। ফলে অনেক দেশই এখন আমাদের ইউসিএভিগুলোর জন্য অপেক্ষায় রয়েছে।

আরও পড়ুন : ‘মার্কিন নেকড়ে আফগান ভূমিতে ধূর্ত শিয়াল হয়েছে’

বায়রাকতারের চিফ টেকনোলজি অফিসার (সিটিও) সেলসুক বায়রাকতার জানান, তুর্কি প্রশাসন বায়রাকতার টিবি২ এর জন্য ইতোমধ্যে ১০টি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তিনি বলেছিলেন, যা আমাদের রফতানি আয়ের ৭০ শতাংশ সুরক্ষিত করবে। বায়রাকতার আকিনজি টিবি২-এর চেয়ে প্রশস্ত, দীর্ঘ ও কৌশলগত কাজগুলো সম্পন্ন করবে। এর ২০ মিটার (৬৫ ফুট) উইংস প্যানও রয়েছে।

সেলসুক বায়রাকতার আরও বলেন, ড্রোনটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ফ্লাইট কন্ট্রোল এবং ট্রিপল-রিডান্ডেন্ট অটো পাইলট সিস্টেমের জন্য উচ্চ ফ্লাইট নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করে। এতে দুটি ৪৫০-হর্স পাওয়ার ইঞ্জিন রয়েছে। যদিও এটিকে ৭৫০-হর্স পাওয়ার ইঞ্জিন বা স্থানীয়ভাবে ২৪০-হর্স পাওয়ার ইঞ্জিন দিয়ে সজ্জিত করা যেতে পারে।

তার মতে, আকিনসি বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র বহন করবে, যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র যেমন- স্মার্ট মাইক্রো মিউনিশন (এমএএম-এল) তুর্কি ঠিকাদার রোকেটসানের তৈরি। এটি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সক্রিয় বৈদ্যুতিকভাবে স্ক্যান করা অ্যারে রাডার এবং বায়ু থেকে বায়ু ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত হবে।

সেলসুক বায়রাকতার জানিয়েছেন, ড্রোনটি স্থানীয়ভাবে তৈরি আরও বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধাস্ত্র উৎক্ষেপণ করতে সক্ষম। যেমন : রোকেটসান-নির্মিত স্ট্যান্ড-অব মিসাইল, দূরপাল্লার এয়ার-টু-সারফেস ক্রুজ মিসাইল (যা ১৫০ মাইল বা ২৪০ কিলোমিটার) দূর পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।

বায়রাকতারের দাবি, আকেনসি বাতাসে এবং মাটিতে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে সফলতার সঙ্গে আক্রমণ চালাতে পারে। এটি যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি কাজ করতেও সক্ষম। ড্রোনটি সহজেই উড়তে পারে এবং তুরস্কের বিদ্যমান ড্রোনগুলোর চেয়ে এটি বেশি সময় যাবত বাতাসে ভেসে থাকতে পারে।

তুর্কি কর্মকর্তাদের মতে, পশ্চিমা অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে আঙ্কারা দেশীয় উৎপাদনের নেতৃত্ব গ্রহণের পর থেকে তুরস্ক বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ড্রোন উৎপাদনকারী দেশ পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন : কাবুল বিমানবন্দরে ভাত-পানির দাম ১২ হাজার টাকা

এরদোগানের ভাষায়, আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী মানববিহীন বিমান (ইউএভি) যুদ্ধ দেখেছে এবং সেখানে নিজেদের শক্তির প্রমাণও দিচ্ছে। লিবিয়া, সিরিয়া এবং সবশেষ আজারবাইজানে নিজের সাফল্য দেখানোর পর বায়রাকতার টিবি২ বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছে। যা আমাদের রফতানি চুক্তির পথকে আরও সুগম করে।

সূত্র : আনাদোলু এজেন্সি

ওডি/কেএইচআর

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড