• বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কম বয়সে উচ্চ রক্তচাপ হলে কী করবেন

  স্বাস্থ্য ডেস্ক

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:৫৫
চিকিৎসা
(ছবি : প্রতীকী)

তানভীনের বয়স এখন মাত্র আঠারো বছর। সে এইচএসসি পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ইতোমধ্যে শুরু হওয়া বিভিন্ন ভার্সিটিতে পরীক্ষা দিচ্ছে। নিম্ন মধ্যবিত্ত মা-বাবার পক্ষে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেলে তাদের পক্ষে তানভীনের পড়াশোনার খরচ চালানো কষ্ট হয়ে যাবে। তাই পরিবারের সবাই এটা নিয়ে খুব বেশ টেনশনে রয়েছে। রাতে পরিমিত ঘুম হচ্ছে না ভানভীনের। এছাড়া বেশ মাথা ব্যথা করছে। বিশেষ করে ঘুম থেকে ওঠার পর ব্যথা বেশি হচ্ছে তার। মাথার পেছনের দিকে একটু বেশি ব্যথা অনুভূত হয়।

এত অল্প বয়সের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক চাপ। এ দিকে, পরিবারের সবাই ধরে নিয়েছে টেনশনে মাথা ব্যথা হচ্ছে। এটা যৌক্তিক চিন্তা-ভাবনা। কয়েকদিন প্যারাসিটামল ট্যাবলেট, ঘুমের ওষুধ খেতে দেওয়া হয়েছে। তবে তানভীনের উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি আর হয়নি। 

শেষ পর্যন্ত তানভীন চিকিৎসকের কাছে গিয়ে রক্তচাপ পরীক্ষা করাল। ডানবাহুতে ১৮০/১১০, বামবাহুতে ১৭৫/১০৮ মিলিমিটার মারকারি। ডাক্তার তো অবাক, এটা দেখে কয়েক বার পরীক্ষা করল। কিন্তু প্রায় একই রকম প্রেসার। তানভীনের পা নগুলো অপেক্ষাকৃত কম পেশিবহুল এবং পায়ের পালস অপেক্ষাকৃত দুর্বল তার। হাতের পালস ও পায়ের পালস ফের পরীক্ষা করল ডাক্তার। তখন দেখা গেল পায়ের পালস শুধু দুর্বলই নয়, তা হাতের পালসের তুলনায় কিছুটা বিলম্বে অনুভূত হচ্ছে। এরপর তানভীনের বুকে স্টেথোস্কোপ লাগাতেই একধরনের মার্মার সহজেই শোনা গেল।

মেডিকেলের ভাষায় যাকে বলে সিওএ, যা কি না মহাধমনীর একটি জন্মগত ত্রুটি। বুকের ভেতরে মহাধমনীর একটি স্থান মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফলে সংকুচিত স্থানের উপরিভাগের প্রেসার হার্টের নিকটবর্তী হওয়ায় অত্যধিক মাত্রায় বেড়ে যায়। শুধু তাই নয় শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গে রক্তপ্রবাহ বেশি থাকায় স্বভাবতই তার পুষ্টি নিম্নাংশের চেয়ে বেশি হয়। তাই নিম্নাংশ অপেক্ষাকৃত কম পেশিবহুল বলে দৃশ্যমান হয়।

সিওএ যদি চিকিৎসাবিহীন চলতে থাকে তাহলে শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গের প্রেসার বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, ওষুধ প্রয়োগ করে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ফলে পরবর্তী সময়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, রেটিনোপ্যাথী হয়ে অন্ধত্ববরণ, নাকমুখ দিয়ে ঘন ঘন রক্তক্ষরণ, হার্টের মাংসপেশি মোটা হয়ে হার্ট ফেইল্যর এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

রক্তচাপ আসলে কী?

রক্তস্রোত রক্তনালীর দেওয়ালে যে চাপ সৃষ্টি করে সেটিই রক্তচাপ। স্বাভাবিক অবস্থায় এর পরিমাপ ১২০/৮০। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে রক্তচাপ খানিক বাড়তে থাকে। তখন এই পরিমাপের থেকে আর একটু বেশি চাপকেও স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। কিন্তু ওপরের চাপ ১৪০-এর বেশি বা নিচের চাপ ৯০-এর বেশি হয়ে গেলে সমস্যা। রক্ত চাপ দুইভাবে বাড়তে পারে। অ্যাকিউট আর ক্রনিক। হঠাৎ কোনো উত্তেজনার বশে বা অন্য কোনো কারণে দুম করে রক্তের চাপ খুব বেশি বেড়ে গিয়ে বিপত্তি ঘটতে পারে। এটি অ্যাকিউট হাই ব্লাড প্রেসার। এতে আচমকা হার্ট ফেলিওর হতে পারে। স্ট্রোকও হতে পারে। ক্রনিক হাই ব্লাড প্রেসারের ক্ষেত্রে চাপের পরিমাপ হয়তো হঠাৎ করে খুব বেশি থাকে না। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে রক্তের উচ্চচাপ পুষে রাখার জন্য হার্টের পেশির ক্ষতি হতে পারে। কারণ, বেশি রক্ত পাম্প করতে হার্টের ওপর বেশি চাপ পড়ে। তা ছাড়া অনেক দিন ধরে রক্তচাপে ভুগলে রক্তনালীগুলো শক্ত হয়ে যায়। সেগুলোর স্থিতিস্থাপকতা কমে যায়। রক্তনালীর ভেতরের দেওয়াল মোটা হয়ে যায়। ফলে ব্লক তৈরি হয়। সব মিলিয়ে হার্ট ফেলিওর বা হার্ট অ্যাটাক হয়ে যায়। আবার রক্তনালীতে ‘ব্লক’ তৈরি হওয়ার জন্য বা বেশি রক্তচাপের কারণে নালীর মধ্যে রক্ত দলা পাকিয়ে যেতে পারে। সেই দলা বা ক্লট মাথায় পৌঁছে স্ট্রোক হতে পারে। আবার রক্তের চাপ সহ্য করতে না পেরে কোনো ধমনি ছিঁড়ে গিয়েও স্ট্রোক হতে পারে। তাই, রক্তচাপ পুষে রাখলে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে!

উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ

এমনতি এর তেমন কোনো লক্ষণ নেই। তাই ধীরে ধীরে যে রক্তের চাপ বেড়ে গেছে, এটা অনেকেই টের পান না। এ জন্য ৩৫ বছরের পর থেকে মাঝে মাঝেই ব্লাডপ্রেসার মাপা দরকার। আর দীর্ঘ দিন ধরে রক্তচাপের সমস্যায় ভুগলে ফি-হপ্তায় এক বার প্রেসার মেপে দেখা উচিত। বাড়িতেই রাখতে পারেন প্রেসার মাপার যন্ত্র।

প্রেসার কেন বাড়ে 

১. বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। বয়সের সঙ্গে রক্তচাপ সমানুপাতিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংখ্যা জানাচ্ছে, ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে প্রতি তিন জনের মধ্যে এক জন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। বয়স ২০ থেকে ৩০-এর মধ্যে হলে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হন প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জন। আর পঞ্চাশের কোঠায় বয়স হলে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হন প্রতি ১০ জনে ৫ জন। বয়স ৭০ বা তার বেশি হলে প্রতি দুই জনের মধ্যে এক জনের উচ্চ রক্তচাপ থাকবে।

২. খাবারে বেশি নুন খাওয়ার জন্য প্রেসার বাড়তে পারে।

৩. ওজন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রেসার বাড়ে।

৪. শারীরিক পরিশ্রম না করে বসে বসে থাকলে ওজন বাড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে রক্তচাপ।

৫. মানসিক চাপ বা উত্তেজনা বাড়লে অ্যাড্রেনালিন গ্রন্থি থেকে নরঅ্যাড্রিনালিন হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়, যা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়।

চিকিৎসা কী?

অতিরিক্ত প্রেসারের প্রভাবে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসমূহের অপূরর্ণীয় ক্ষতি সাধিত হবার আগেই সঠিক চিকিৎসা করতে হবে। প্রথমত প্রচলিত ওষুধ প্রয়োগ করে শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গের প্রেসার নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে হবে। তারপরে মহাধমনীর সংকুচিত অংশটি অপারেশন করে বা বেলুন দিয়ে প্রসারিত করে দিতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এটি পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়।

ভানভীনের জন্মগত এই সমস্যা ধরা পড়ে। চিকিৎসক পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে পরের সপ্তাহে আসতে বলেন। রিপোর্ট দেখে ডাক্তার সিদ্ধান্ত নিলেন বেলুনের মাধ্যমেই এটির চিকিৎসা করা যাবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপারেশন করে এই সমস্যার সমাধান করতে হয়। তবে ভানভীনের সিটি স্ক্যান বলছে যে, বেলুন দিয়ে প্রসারিত করলেই চলবে।

পরে নির্দিষ্ট দিনে স্বাভাবিক খাবার খাওয়ার পর সজীব হাসপাতালে ভর্তি হলো। সাধারণ এনজিওগ্রামের মত পায়ের ধমনী দিয়ে একটি বিশেষ বেলুন ঢুকিয়ে তা মহাধমনীর সংকুচিত অংশে স্থির করে উচ্চ চাপে সেটিকে প্রসারিত করে দেয় চিকিৎসক। তারপর সেটি যাতে পুনরায় সংকুচিত না হতে পারে সে জন্য সেখানে একটি ধাতব জাল (stent) স্থাপন করে দেওয়া হয় তার। সব মিলিয়ে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে ২০ মিনিট সময় লাগে। তারপর একদিন বিশ্রামে রেখে ডাক্তার তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড় দিল।

পরে একদিন ফলোআপ ভিজিটে দেখা গেল তানভীনের দেহের ঊর্ধ্বাঙ্গ ও নিম্নাঙ্গের রক্তচাপের পার্থক্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। তার মাথা ব্যথাসহ অন্যান্য উপসর্গ দ্রুত কমে এসেছে।

সতর্কবার্তা

বাস্তব কারণ নির্ধারণ করে সঠিক সময়ে চিকিৎসা দিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগী ভালো হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে।

ওডি/টিএএফ

স্বাস্থ্য-ভোগান্তি, নতুন পরিচিত অসুস্থতার কথা জানাতে অথবা চিকিৎসকের কাছ থেকে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরামর্শ পেতেই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার পরামর্শ দেবার প্রচেষ্টা থাকবে আমাদের।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড