• বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

দৈনিক অধিকার ঈদ সংখ্যা-১৯

শুঁটকি

  কাজী সাবরিনা তাবাস্‌সুম

০৫ জুন ২০১৯, ১৬:১১
ছবি
ছবি : শুঁটকি

নাকে আঁচল চেপে ধরে শুঁটকি রান্না করছে সোমলতা। শুঁটকির গন্ধ একেবারেই সহ্য করতে পারেনা সে। প্রথম প্রথম তো বমিই করে দিতো। এখন বেশ সয়ে গেছে। তবু রান্নার সময় যখন শুঁটকির গন্ধ তীব্র বেগে ঘরময় ছড়ায়, সবকটি জানালা খুলে দিয়ে নাকে রুমাল চাপতে দেরী করেনা সে। জীবনেও ভাবেনি বিয়ের পর শুঁটকি রান্না করতে হবে তার। কিন্তু তার স্বামী শুভজিৎ শুঁটকি বলতে অজ্ঞান। ব্যাপারটা সোমলতার কাছে শুধু অবিশ্বাস্যই ছিলনা, ছিল বিশাল বড় দুঃস্বপ্ন! 

কারণ শুভজিৎ আর সোমলতা দুইজনের পরিবারই ব্রাক্ষ্মন। সেই সাথে গোঁড়াও বটে। মাছ মাংস খাওয়া তো দূরে থাক, কখনো ছুঁয়ে দেখবে তাও কল্পনার বাহিরে। সোমলতার শাশুড়বাড়ির লোকেরা তো এই ব্যাপারে আরও একধাপ এগিয়ে। জাত চলে যাওয়ার ভয়, আশংকা আর শুচিবাঈ নিয়েই তার শাশুড়ির জীবনযাপন। সেই পরিবারের ছেলে শুঁটকি খায়? কি করে বিশ্বাস করবে সোমলতা? 

তবে শুভজিৎ শুঁটকি খায় বলে যে জগতের সকল মাছ মাংস ভক্ষণ করে তা কিন্তু না। সে নিজেও শুঁটকি ছাড়া অন্য কোন জীবিত কিংবা মৃত মাছ মাংস ছুঁয়ে দেখারও চিন্তা করেনা। সে শুধু শুঁটকির ভক্ত। তার এই শুঁটকি প্রীতির সূচনা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন। ছাত্রজীবনে শুভজিৎ মেসে  থাকতো অনেকগুলো বিভিন্ন ধর্মের ছেলের সাথে। সেখানে শুভজিৎ বাদে  প্রতিটি ছেলে একসাথে রান্না করে খেতো। শুভজিৎ নিজেই নিজের বাজার করে আলাদা রান্না করে খেতো। কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন সে একদিন শুঁটকির ভর্তা খেয়ে ফেলে। দেখে হয়ত বুঝতে পারেনি সেটা কিসের ভর্তা কিংবা অন্য কোন ব্যাপার। কিন্তু খেয়ে তার অসম্ভব মজা লাগে। বন্ধুকে জিজ্ঞেস করায় সে জানতে পারলো সেটা ছিল শুঁটকি মাছ!
 
শুভজিৎ প্রায় একমাস ঠিক মতো খেতেই পারেনি! সেই বন্ধু তাকে অনেক বুঝিয়েছে, কিন্তু সে কোনোভাবেই মাফ করতে পারছিলনা নিজের এই কর্মকাণ্ডের থেকে। কোন এক অজানা কারণে তার এই অপরাধী ব্যাপারটা বেশিদিন স্থায়ী হলোনা। এরপর দেখা গেল মেসে শুঁটকি মাছ রান্না হলে শুভজিৎ খাবেই! বন্ধুরা অবাক হয়েছিল , তাকে নিষেধও করেছিল কয়েকজন। কিন্তু শুভজিৎ এর যে কি হল তা সে নিজেই বুঝতে পারছিলনা। কেমন একটা নেশা কাজ করতো শুঁটকির কথা শুনলেই। 
অতঃপর শুভজিৎ পড়া শেষ করলো। মোটামুটি একটা চাকরি জোটালো। মেস ছাড়লো, ছোট একটা বাসা ভাড়া করলো, বিয়ে করলো কিন্তু তার শুঁটকি প্রীতি কমলোনা একটুও। তবে শুভজিৎ এর গ্রামের বাড়িতে কেউ বিষয় টা জানেনা। মা কে সে যমের মত ভয় পায়। মা যদি জানতে পারে তবে যে কি হবে তা সে ভাবতেও চায়না। সে আরাম করেই ঢাকায় নিজের ছোট্ট বাড়িতে মাঝে মাঝে শুঁটকি রান্না করে খেতো। 

কিন্তু বিয়ের পর সোমলতাকে আনতে হলো ঢাকায়। শুরু হলো ব্যস্ত ঢাকার চিপা গলির বেশ পুরনো একটা বিল্ডিং এর চিলেকোঠায় সোমলতা আর শুভজিৎ এর নতুন সংসার। শুভজিৎ প্রথম দিনই সোমলতা কে বলেছিল তার শুঁটকি প্রীতির কথা! সদ্য নতুন বউ নতুন শহরে সেদিন কি যে ভয় পেয়েছিল স্বামীর কথা শুনে। আজও মনে পড়লে হাসি পায় সোমলতার। পারতপক্ষে সেও মাছ মাংস খায়না একদম। সে অবশ্য অতশত জাতের হিসেব বোঝেনা। ওর ব্যাপারটা হলো অভ্যাসের। জন্ম থেকে দেখেছে তার বাবা মা ভাইয়েরা কেউ এসব খায়না। তাই সেও খায়না। খেতে অবশ্য ইচ্ছা বা সাহস কোনোটাই হয়নি তার কোনোদিন। তার ভেতরে একটা বিশ্বাস জন্মেছিল মাছ মাংসের বিরুদ্ধে। তার বাবা মা এখন আর বেঁচে নেই। ভাইয়েরা দায়িত্ব এড়ায়নি। তাকে বিয়ে দিয়েছে দেখে শুনে গ্রামেরই বেশ নামকরা ব্রাক্ষ্মন পরিবারে। শিক্ষিত ছেলে ঢাকায় চাকরি করে। গ্রামে রয়েছে বেশ কিছু জমি। আর কি চাই? 

শ্বশুড়বাড়িতে সোমলতার দিনও খুব ভাল কাটছিল। সবাই বেশ আদর করে তাকে। কিন্তু শ্বাশুড়ি বললো ছেলে একা একা ঢাকায় থাকবে কেন? বউটাও সাথে যাক। যদিও বিয়ের আগে এরকম কোন কথা হয়নি। ছেলে ঢাকার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়ার শেষ মূহুর্তে শ্বাশুড়ি সোমলতার ব্যাগ গুছিয়ে দিলেন। শুভজিৎ এর একচ্ছত্র স্বাধীনতায়  বউ আঘাত হানতে পারে, একথা মুখ ফুটে বলতে পারেনি সে।কারণ এই পরিবারে শুভজিৎ এর মায়ের উপরে কথা বলার অধিকার কারও নেই। অগত্যা কোনোরকম বাকবিতণ্ডা ছাড়াই  শুভজিৎ নতুন বউ নিয়ে ঢাকা ফিরলো। 

প্রথমবারের মত ঢাকায় প্রবেশ করে এমনিতেই সোমলতা ছিল জড়সড়।গ্রাম, পরিবার সবাই কে ছেড়ে একা একা দুঃখে তার কলিজা ফেটে যাচ্ছিলো। তার উপর স্বামীর শুঁটকির গল্প শুনে তো তার কান্নাই পেয়ে গেল। 
তাকে কাঁদতে দেখে শুভজিৎ বললো, ‘আমি শুঁটকি কিনে এনে নিজেই রান্না করে খেয়ে নিবো। আমার রান্নার সময় তোমার চুলার কাছে যাওয়ারও প্রয়োজন হবে না। কান্নাকাটি বন্ধ করো এবার।’
 
এরপর এটা নিয়ে তাদের মাঝে আর কোনোদিন ঝামেলা হয়নি। সে বছর দুয়েক আগের কথা। এখন তো  সোমলতা দিব্যি শুঁটকি রান্না করে। তার মনে আছে স্বামী যখন শুঁটকি রান্না করতো, সে দরজা আটকে ভেতরের ঘরে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকতো । কিন্ত পরে খেয়াল করে দেখলো এই শখের রান্না করতে গিয়ে তার  স্বামী বেচারা হয় হাত কাটছে, নয়ত হাত পুড়ে ফেলছে, বিশ্রী অবস্থা! সোমলতার তখন বেশ অপরাধ বোধ হলো। তাকে তো তার শ্বাশুড়ি পাঠিয়েছে স্বামী সেবা করতে। তার বর্তমানে শুভজিৎ এইরকম দুর্ঘটনা ঘটাবে তা মেনে নেয় কি করে সে? 

অতঃপর সোমলতা ঠিক করলো স্বামীকে আর রান্না করতেই দিবো না। স্বামীর সামান্য পছন্দের জিনিস যদি রেঁধে না খাওয়াতে পারলো, তো আর এই সংসার করে কি লাভ তার? বলা বাহুল্য যে শুঁটকি খায়না সে শুঁটকি রাঁধতেও জানবে না। আর শুভজিৎও খুব একটা জানে বলে সোমলতার মনে হলোনা। অতঃপর শুভজিৎ এর বন্ধুরা বেড়াতে এলে সোমলতা তাদের কাছ থেকে শুঁটকি রান্নার বেশ কয়েকটা রেসিপি লিখে নেয়। এখন তো মাঝামাঝেই শুঁটকি ভর্তা বানায় সে। শুভজিৎ বাচ্চাদের মত খুশি হয়। সোমলতার কি যে ভাল লাগে। সে নিজে অবশ্য লবণটাও চাখেনা। কিন্তু শুভজিৎ এর জন্য কখনো শুঁটকি ভুনা বা কখনো শুঁটকির তরকারি রাঁধতে তার খুব ভাল লাগে। সে ভুলেই যায় জাতপাতের জটিল বিষয়গুলো। ভালবাসার মানুষটাকে পরম যত্নে কিছু একটা রেঁধে খাওয়ানোর আনন্দের কাছে ঐসব জটিল সমীকরণের হিসেব যে মিলবেনা। সোমলতা তাই ব্যর্থ চেষ্টাও করেনা। 

আজ সে শুঁটকি ভুনা করছে আর বসে বসে এইসব ভাবছে। শুভজিৎ তখনো অফিসেই রয়েছে। হঠাৎ বেল বাজলো। এরকম অসময়ে তো কেউ আসেনা! সোমলতা বেশ বিরক্ত হয়েই চুলার আঁচ কমিয়ে দিয়ে দরজা খুলতে গেল। 

অবাক সোমলতা দরজা খুলে দেখে দাঁড়িয়ে আছে তার শ্বাশুড়ি ও দেবর। সাথে রয়েছে কাপড় বোঝাই করা ব্যাগ ও চটের একটা বাজারের ব্যাগ। বাজারের ব্যাগ থেকে উঁকি দিচ্ছে তার শ্বশুড়বাড়ির ক্ষেতের কচু আর পুকুরের বড় কোন মাছের লেজ।
এভাবে খবর না দিয়ে শ্বাশুড়বাড়ির লোকজন কখনো আসেনা। সোমলতা তাই খুব অবাক হলো। তার দেবরই মুখ খুললো। হঠাৎ ব্যবসার কাজে কাল রাতে ঢাকায় আসার দরকার হলো। সে ভেবেছিল কোন হোটেলে উঠবে তাই আর দাদা বৌদিকে জানায়নি। কিন্তু সকাল বেলা মার নাকি মন কাঁদছিল দাদাকে দেখার জন্য। তাই সে সঙ্গে করে নিয়ে এল। দাদা তো পুজোর ছুটি ছাড়া গ্রামে যাওয়ার সময়ই পায়না। মাই নাহয় থাকুক কিছুদিন। সোমলতার দেবর আরও জানালো, শুভজিৎ কে সকালে ফোন দিয়েছিলো, হয়তোবা ব্যাস্ত থাকার কারণে শুভজিৎ ফোন ধরেনি। তাই আর জানাতে পারেনি। 

সোমলতা এক মূহুর্তে জন্য ভুলেই গিয়েছিল চুলায় রান্না হতে থাকা শুঁটকি মাছ বাতাসে হাসনাহেনার বেগে গন্ধ ছড়ায়। তার মনে পড়ার আগেই শ্বাশুড়ি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞাসা করলো বিশ্রী গন্ধটা কিসের? সোমলতার হৃৎপিণ্ড লাফাতে লাগলো। কি বলবে সে? শ্বাশুড়ি কে যে সেও যমের মত ভয় পায়! কিন্তু সোমলতার শ্বাশুড়ি ছেলের বউ এর উত্তরের আশায় বসে রইলো না। নিজেই ঘরময় খুঁজতে লাগলো গন্ধের উৎস। রান্নাঘরে গিয়ে তো তাঁর চক্ষু চরকগাছ! সোমলতাকে চিৎকার করে ডাকলেন। সে দৌড়ে যেতেই বললেন, ‘তুই এইটা খাস?’ 

এমন প্রশ্নের জন্য সে প্রস্তুত ছিলনা । কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছিলনা। ততক্ষণে দেবরও চলে গেল রান্নাঘরে। সোমলতার শ্বাশুড়ি ছোট ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখ মুখপুড়ির কাণ্ড! আমার শুভজিৎ যখন বাসায় থাকেনা তখন সে এইসব খায়। আমাদের জাত গেল! আমার ছেলের কপাল পুড়লো!’
 
সোমলতা ভাবতেই পারলো না এই অবস্থায় কি বলবে? সে চিন্তা করলো এখন যদি সে বলে সে এগুলো কখনোই খায়নি , শুধু শুভজিৎএর জন্য রান্না করেছে, তার শ্বাশুড়ি কখনোই বিশ্বাস করবেনা। উল্টো শাশুড়ি আর দেবর মিলে তাকে মিথ্যুক বলবে! সোমলতা ভাবলো শুভজিৎ এলেই সে তার মাকে সব বুঝিয়ে বলবে। এই মূহুর্তে চুপ করে থাকাই ভাল। সোমলতার শাশুড়ি ইতোমধ্যেই কান্না জুড়ে দিলেন। দেবর বড় ভাইকে ফোন দিলো। সোমলতা শুধু অপেক্ষা করছিলো কখন শুভজিৎ ফিরবে? ভয়ে লজ্জায় অস্থির হয়ে যাচ্ছিলো সে। 

অবশেষে ঘণ্টা খানেক পর শুভজিৎ বাড়ি ফিরলো। মাকে প্রণাম করেই সে সোমলতার দিকে তাকিয়ে যা তা বলে গালি দিলো! তাকে মিথ্যুক, ধোঁকাবাজ, আরও কত কি যে বললো। সোমলতা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। সে ভেবেই পাচ্ছিলোনা শুভজিৎ এর এই আচরণের কারণ কি? মায়ের প্রতি ভয় নাকি অন্যকিছু? 

সারা রাত সোমলতা কে নিয়ে মা ছেলে বৈঠক করলো। শুভজিৎ এর মা সোমলতাকে কোনোভাবেই আর বাড়িতে রাখবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শুভজিৎ ও একবাক্যে মা কে সায় দিয়ে যাচ্ছিলো। শেষরাতে সমাধান হলো সোমলতা কে তার ভাইদের কাছে দিয়ে দেয়া হবে। যেহেতু তারাও ব্রাক্ষ্মন, তাঁরাই সিদ্ধান্ত নিবে জাত চলে যাওয়া বোনকে কি করা যায়? সোমলতার শ্বাশুড়ি বললেন এই মেয়ে নিশ্চয়ই বিয়ের আগে থেকেই এইসব খায়! জেনেশুনে এমন মেয়েকে তার ছেলের কাছে বিয়ে দেয়ার অপরাধে সোমলতার ভাইদের প্রতিও তিনি ক্ষুদ্ধ। শুভজিৎ বুদ্ধি দিলো গ্রাম্য সালিশে সোমলতার ভাইদের এই দোষ তোলা হবে। বিচার করা হবে।তারা প্রভাবশালী পরিবার, তাদের কথাতেই সব হবে গ্রামে। 

যে পাশে থাকলে সাহস করে সত্যটা বলতে পারতো বলে ভেবেছিল সোমলতা, সেই লোকটার এই আচরণ দেখে সে স্তব্ধ হয়ে গেল! অনেক কথা বলতে চাইলো, কিন্তু কেন যেন গলা দিয়ে কোন শব্দ বেরুলোনা। সে সারাটা সময় স্বামীর দিকে চেয়ে রইলো। তার স্বামী পরম আনন্দে শুঁটকি দিয়ে ভাত খাবার সময় যেভাবে তাকিয়ে থাকতো, ঠিক সেভাবে। তখন তার চোখে কাজ করতো তীব্র ভালবাসা আর একরাশ ভরসা। এখন তার চোখে কি কাজ করছে তা সে নিজেও জানেনা। কেমন একটা ঘোরে চলে গেছে সে। 

অতঃপর সবাই মিলে পরদিন সকালে গ্রামের উদ্দেশ্য যাত্রা করলো। ততক্ষণে গ্রামের সবাই সোমলতার অপরাধ সম্পর্কে অবগত। দলে দলে লোক যোগ দিয়েছে সোমলতার ভাইদের বাড়ির উঠোনে। বাড়ির সামনে যেতেই লজ্জায় সোমলতার মনে হলো সে মরে কেন যায়নি? তাকে নিয়ে কয়েক ঘণ্টা আলোচনা হলো। সব আলোচনা এক পক্ষীয়। এই মেয়েকে কিভাবে শাস্তি দেয়া যায়, কি করে এই মেয়ের দোষমুক্তির পূজা দেওয়া যায় এবং এই মেয়ের দোষের কারণে গ্রামের সকলের জাত যেন না যায় এগুলোই বৈঠকের বিষয়াদি। সোমলতার ভাইয়েরাও গ্রামে থাকতে হলে সালিশের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারবেনা। সোমলতার শাশুড়ি বলেই দিয়েছে, সোমলতা আর ঐ বাড়ির চৌকাঠ মারাতেও পারবেনা। শুভজিৎ কে বলা হয়েছে সে যদি সোমলতার সাথে থাকতে চায় তবে তারও জাত যাবে এবং সে এই গ্রামে আর থাকতে পারবেনা। সাথে পাবেনা পিতৃসম্পত্তির এক কানাকড়ি। বুদ্ধিমান ছেলে শুভজিৎ জাতভ্রষ্টা মেয়ের জন্য পরিবার, গ্রাম এবং সম্পত্তি ত্যাগ করার মানুষ নয়। আর শুঁটকি তো সে অনেক পাবে জীবনে, কিন্তু এই কথা যদি এখন মা জানতে পারে, তবে সোমলতা থেকেও খারাপ পরিণতি হবে তার! সুতরাং সব ভেবে চিন্তে সেও ঘোষণা দিলো মায়ের সিদ্ধান্তে তার কোন অমত নেই।
 
এইকথা বলেতো শুভজিৎ আর তার পরিবার পাপমুক্ত হলো, কিন্তু সোমলতাকে কি করা যায়? সারারাত সালিশ চললো। অতঃপর সিদ্ধান্ত হলো সোমলতাকে চলে যেতে হবে গ্রাম ছেড়ে! সে কোথায় যাবে কি করবে তা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যাথা থাকতে পারবেনা। যে সোমলতা কে নিয়ে চিন্তা করবে সেও গ্রামছাড়া হবে। এমনকি এই সিদ্ধান্ত সোমলতার ভাইদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য! 
সালিশের সিদ্ধান্তে সবাই খুব খুশি হলো। বাহবাকারিদের ভেতরে শুভজিৎএর সমর্থন সোমলতা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলো! সোমলতার ভাইয়েরা লজ্জায় বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। বোনের দোষ, গ্রাম্য সমাজ, জাত যাওয়ার ভয় এবং সর্বোপরি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের বেড়াজালে  তারা কোনো কথা বলার সাহসই পাচ্ছিলোনা। 

ঠিক হলো সোমলতাকে রাতের অন্ধকারে গ্রাম ছাড়তে হবে। কেউ যেন তার মুখ দেখতে না পায়! ঢাকার উদ্দেশ্যে ট্রেনে তাকে তুলে দেওয়া হবে। এরপর তার আর কোনো খোঁজ করা যাবেনা। তাকে যদি আগামীকাল সকালে গ্রামে দেখা যায়, তো তার সাথে সাথে তার ভাইদেরকেও গ্রামছাড়া করা হবে। 

সেই রাতে হইহই করতে করতে ভাটিয়ারচর গ্রামের মানুষেরা সোমলতাকে ঢাকার ট্রেনে তুলে দিলো। ট্রেন প্লাটফর্ম ছেড়ে বাতাসের গতিতে চলতে শুরু করলে সবাই যে যার কাজে ফিরে গেল। সে প্রায় বিশ বছর আগের কথা! ভাটিয়ারচরের মানুষ এখনও প্রতিটা সালিশে সোমলতার ভয়ংকর ঘটনার প্রসঙ্গ  তোলে। নতুন প্রজন্ম আগ্রহ ভরে সোমলতার কাহিনী শোনে। নিজেদের জাত রক্ষায় আরও সোচ্চার হয়। কিন্তু সবাই একটা প্রশ্নই করে। কি হয়েছিল এরপর? কোথায় গিয়েছিল  সোমলতা? এই প্রশ্নের জবাব মেলে বায়েজ্যেষ্ঠ্যদের কাছে। তাঁরা বলেন ,এইরকম পরিস্থিতিতে সোমলতাদের দুটো পরিণতি হতে পারে। হয়তো সে ঐ রাতেই ট্রেন থেকে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করে। নইলে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে কোন এক বেশ্যাপল্লীতে! 

শুঁটকির তরকারীর বড় ডেকচিটা সাবধানে চুলা থেকে নামাতে নামাতে সোমলতার মনে পড়ে যায় বিশ বছর আগের সেই দিনটি, ভাটিয়ারচর গ্রাম, শুভজিৎ এবং তার নিজের ভাইদের কথা। কেমন আছে সবাই? কেউ কি মনে রেখেছে তাকে? মূলত সেদিন রাতে ট্রেনে বসে সে নিজেও ঝাঁপ দেয়ার কথা চিন্তা করছিলো। কিন্তু শেষ মূহুর্তে কেন যেন তার মন সায় দিলোনা। তবে ঢাকাতে সে যায়নি। মাঝপথে মনের অজান্তেই একটা স্টেশনে নেমে পড়ে। কি করবে, কোথায় যাবে ভাবতে ভাবতেই চোখে পড়লো স্টেশনের পাশেই বসে এক মহিলা ভাত তরকারি রাঁধছে আর তার সামনে জড়ো হয়ে লোকজন খাচ্ছে। কুলি আর ফেরিওয়ালাদের খেতে দেখে সোমলতার মনে পড়লো গত দুইদিন ধরে দানাপানি পেটে পড়েনি তার। প্রচন্ড ক্ষুধা জানান দিলো তার পেট। সোমলতার কাছে কোন টাকা ছিলনা। কি মনে করে  সে ঐ মহিলার কাছে গিয়ে বলেছিল, ‘মাসি আমি দুইদিন ধরে কিছু খাইনি।’

মহিলা সোমলতার দিকে তাকিয়ে কি বুঝলো কে জানে? পাতে ডালভাত তুলে তাকে খেতে দিলো। এরপর থেকে সোমলতা তার মাসির সাথেই থাকতে লাগলো। সেই মাসিও কোনরকম জানাশোনা ছাড়াই সোমলতাকে আপন করে নিয়েছিল। সে ভাবে সেই মাসী না থাকলে তার অবস্থান কোথায় থাকতো কে জানে? সেই মাসির কল্যানেই সোমলতার নতুন জীবন শুরু হয়েছিল। কিন্তু বছর যেতে না যেতেই মাসিটি মারা যায়। সোমলতাই তখন মাসির ভ্রাম্যমান রান্নাঘর সামলানো শুরু করে।সেসময় তার পরিশ্রম ও সততার পুরষ্কার সে পেয়েছে। সে এখন সবার প্রিয় লতা দিদি। নিজেই স্টেশনের কাছে একটা দোচালা হোটেল ঘর তুলেছে। বাবুর্চি থাকা সত্বেও নিজেই রান্না তদারকি করে। সমানে মাছ মাংস আর শুঁটকি রান্না হয় তার হোটেলে। দূরদুরান্তের যাত্রীরা খেতে আসে, সোমলতা মনের আনন্দে সবাইকে খাওয়ায়। মাঝে মাঝে শুধু অন্যমনষ্ক হয়ে ছুটে যাওয়া ট্রেনের দিকে তাকিয়ে থাকে।ভাটিয়ারচর থেকে ঢাকার ট্রেনে সেদিন যদি ঝাঁপ দিতো তবে আজ এত সুন্দর সুখী আর আত্মনির্ভর জীবন সে তৈরী করতে পারতোনা। মনে মনে শুভজিৎকেই ধন্যবাদ দেয় সে। জীবনটা খুব ছোট। চাইলে সুন্দর করে সাজানো যায় অথবা নষ্ট করে ফেলা যায়। সুখী জীবনের পরম আনন্দে শুঁটকি দিয়ে ভাত খেতে বসে সোমলতা।

আরও পড়ুন- নিতুর ঈদ পরিকল্পনা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড