• বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

দৈনিক অধিকার ঈদ সংখ্যা-১৯

নিতুর ঈদ পরিকল্পনা

  শাফিউল কায়েস

০৫ জুন ২০১৯, ১১:৪৩
ছবি
ছবি : নিতুর ঈদ পরিকল্পনা

সেলাই মেশিনের গরগর আওয়াজ, ব্যস্তসমস্ত রাজপথ, ব্যস্ত বস্ত্র ব্যবসায়ীরা, সেমাই-চিনির দোকানে কম ভিড় জমেনি! ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় উপচে পড়া ভিড়। সরকারি -বেসরকারি চাকরিজীবীরা এসেছে ঈদ বোনাস ও গত মাসের মাসিক বেতন নিজেদের পকেট ভরাতে।

ব্যাংকের সামনে।
- স্যার,কিছু টাকা দেন।
- এখন, নেই যা এখান থেকে।
ব্যর্থ হয়ে সেখান থেকে ফিরে এসে, অন্য আরেক জনের কাছে গিয়ে হাত বাড়িয়ে বলে,‘স্যার, কিছু টাকা দেন।’
- এই নে।
হাতের মুঠো খুলে দেখে দুই টাকার একটা নোট। এতেই তার চোখে-মুখে হাসি মৃদু ফুটে। এতেই সে খুশি। শুধু খুশি কী মহা খুশি। যত্রতত্র ঘুরে যা পায় তা দিয়ে ওর এক-দু বেলা খেয়ে না খেয়ে দিন-রাত অনায়াসে পার হয়ে যায় কীভাবে সে নিজেই জানে না। কথায় আছে, ‘যার কেউ নেই তার সৃষ্টিকর্তা আছে’। আসলে কথাটি একশত ভাগে একশত ভাগ সত্যি।

ওর নাম নিতু। বয়স দশ-বারো বছর হবে। গাঁয়ের রং শ্যামলা। পড়নে যত্রতত্র ছেড়া জামা। অযত্নে অযত্নে চেহারা আরো খারাপ হয়েছে।বাপ মরা মেয়ে। বাবা মারা গেছে মায়ের অন্তগর্ভে থাকা অবস্থায়, ওর বয়স তখন আট মাস। বাবার শ্রী মুখখানা ওর আর দেখা হয়ে ওঠে নি। 

আর একটু পরে যদি বাপটা  মারা যেতো  তাহলেই তার সাথে একবারের জন্য হলেও স্বাগতিক সাক্ষাতকারটা হয়ে যেত।
কপালে লিখন খণ্ডানোর ক্ষমতা কারও নেই। ভাগ্যের পরিহাস মেনে নিতেই হবে। নিতু আর ওর মা জরিনা বেগম মিলে ওদের ছোট ছেড়া স্বপ্নের সংসার।

স্বামী'র মৃত্যুর পর দ্বিতীয় স্বামীর কথা চিন্তা করেনি জরিনা শুধু নিতুর কথা ভেবে; যদি দ্বিতীয় স্বামী নিতুকে না দেখে তাহলে বাপ মরা মেয়েটার দেখ ভাল কে করবে? ছেলে হলেও না হয় একটা কথা ছিল।

জরিনা, এ বাড়ি ও বাড়ি কাজ করে। নিতু ছুটে অপরিচিত লোকের পিছনে শুধু কিছু পাওয়ার আশায়। ওর, মা সুস্থ থাকাতে ওকে কোন কিছুর অভাব বুঝতে দিতো না। এখন কারো বাড়িতে কাজে যায় না, যাবে কি করে গত তিন মাস ধরে বিছায় শুয়ে আছে অর্ধ মৃত লোকের মত। মায়ের চিকিৎসার খরচ, ঘরের অন্নজল জোগান দিতে হয় এখন ওকে। এসব কিছুর জন্য ভিক্ষার পথ খুঁজে নিয়েছে! এছাড়া কোন উপায়ও নেই। মেয়ে মানুষ তার থেকে বড় কথা ছোট একটা মেয়ে কেউ কাজ দিতে চায় না। আর যারা কাজ দিতে চায়, অমানুষগুলো ওর দিকে লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকায়।

তাই সে আজ নিরুপায় হয়ে বেছে নিয়েছে ভিক্ষার । ভিক্ষা করা ওর চাকরি বলা যেতে পারে, নিত্যদিন ভিক্ষার কাজ করতে হয়। ত
হয়তো আর একটু বড় হলে ওর পেশাটা পাল্টে যাবে তখন সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখবে। অন্যের কাছে আর হাত পেতে চলতে হবে না। মা, অসুস্থ বিছানায় পড়ে আছে। ভালো চিকিৎসা দিতে পারছে না, আর দিবে বা কি করে! ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার সাহেব বলে এর জন্য অনেক টাকা খরচ হবে।

টাকার অভাবে অনেক সময় জরিনার ঔষধ খাওয়া বন্ধ থাকে। গ্রামের কবিরাজের ঔষধ দিয়ে দিন-রাত পার করতে হয় অসুখের সাথে যুদ্ধ করে। দিন দিন এ যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে নিতু। হয়তো বেশি দিন নেই, ওর যে টুকু আছে হয়তো সে টুকু হারাতে বসেছে সে।

ওর না খেয়ে থাকা, রোজা থাকা শামিল। আর কয়েক দিন পর ঈদ।
সকলে নতুন নতুন জামা কিনতেছে। শুধু নিতু, দূর থেকে শুধু লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার নিজের কাপড়ের দিকে তাকিয়ে দেখে, অনেক কয়েক জায়গায় ছিঁড়া। আর মায়ের গায়ে পরা শাড়িটা চলছে প্রায় ৩ বছর থেকে। অশ্রু সিক্ত ওর চোখ। কোন দিন ওর চোখ অশ্রু সিক্ত দেখা মেলেনি। হঠাৎ আজ যেনো ওর জীবনে জমে থাকা কালো  মেঘগুলো ভারী হয়ে গেছে, তাই আর ধরে রাখতে না পেরে ছেড়ে দিয়েছে, অশ্রু ধারা।

সে ভাবে, 'মাকে যদি একটা শাড়ি কিনে দিতে পাড়তুম, তাহলে মা অনেক খুশি হতো। মায়ের মুখে একটুখানি হাসির ঝলক দেখতে পেতাম। শুনেছি বাপজান মারা যাবার পর থেকে মা মোর হাসে নাই।'

আমার জামা না হলেও হবে, কিন্তু মা'র জন্য একটা শাড়ি কিনতেই হবে! কি করি? শাড়ি কিনতে তো অনেক টাকা লাগবে! কম করে হলেও দুইশত থেকে আড়াইশত টাকা। আজ পর্যন্ত কোন কানাকড়ি জমাতে পারি না। যাই হোক ঈদ বাকী এই ক’টা রাত-দিন ভিক্ষা করবো। এ থেকে খেয়ে না খেয়ে যা থাকে, কষ্ট করে জমিয়ে মা'কে একটা শাড়ি কিনে দিতেই হবে। আমার এই ছেড়া জামা দিয়ে কিছু যায় আসে না কারণ আমি ভিক্ষা করি, ভিক্ষুক।

ঈদের আগের দিন, নিতু মাটির ব্যাংক ভেঙ্গে দেখে তিনশত টাকা জমা হয়ে গেছে। সে রাতে বাজারে যায়। রাস্তার পাশের দোকান থেকে নিজের পছন্দমত একটা শাড়ি কিনে সাথে আধা কেজি চিনি-আর এক কেজি সেমাই কিনে সে বাড়ি ফেরে।

- মা,মা....মা!
নিতু, আনন্দে আত্মহারা। কে দেখে ওর আনন্দ।
- কিরে নিতু! কি হইছে তোকে আজ এত খুশি খুশি লাগতেছে।
- মা! তোমার জন্য একটা জিনিস আনছি।
- কি আনছোস মা!
- তোমার লগে আমি একটা শাড়ি আনছি।
- এত টাকা তুই কোনে পালি মা।
- ভিক্ষার টাকা জমিয়েছিলাম। বাদ দাও ওসব কথা। এই যে মা এটা তোমার জন্য। মা!শাড়ি তোমার পছন্দ হয় নাই।

মায়ের চোখ বেয়ে বেয়ে অশ্রু ঝরে।
- তোর বাপ এই রকম ঈদের আগের দিন একটা শাড়ি আনি দিছিলো। তোর বাপের কথা মনে পড়তাছে মা। আনন্দে কোঁতাচ্ছিরে মা। হ, খুব পছন্দ হয়ে। তোর জন্য কি নিছোস?
- এই যে মা, চিনি আর সেমাই। এগুলা তোমার আর আমার জন্য। তুমি শুয়ে থাকো মা, আর শুনো আমার জন্য কিছু চিন্তা করো না।আমার ছেঁড়া জামা পড়ে ঘুরতে কোন অসুবিধে হয় না। আমি রাতে খাবার তৈরি করি। আর আগামীকাল সকালে, মানে ঈদের দিন। আমরা দুজনে মিলে সেমাই খামু। আর আমি পাড়ায় পাড়ায় টই টই করে ঘুরমু। অনেক মজা হবে কাল, খুব মজা হবে।আর কাল তুমি এই শাড়ি পড়বে কিন্তু বলে দিলাম।
-ঠিক। আছে রে মা। আমি কাল এই শাড়িটা পড়বো।

-আয়! শুয়ে শুয়ে গল্প করি। জীবনের বিভ্রান্তিজনক যাত্রাভিনয়ের গল্প!

আরও পড়ুন- শাহনুর ও দুটি কাক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড