• মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৬ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

দৈনিক অধিকার ঈদ সংখ্যা-১৯

মনের মানুষ

  ড. শ্যামলী রক্ষিত

০৪ জুন ২০১৯, ০৯:৫১
ছবি
ছবি : মনের মানুষ

মনের মানুষ অন্বেষণ বাউল ফকির দর্শনের মূল কথা। মানব জীবন তো তাই, সারাটা জীবন সে শুধু কি এক তাড়নায় বয়ে নিয়ে চলে জীবনকে। যে জীবন সে ভোগ করছে, যে জীবন সে পেয়েছে, তা আসলে কি? কিসে তার আনন্দ, কিসে তার মুক্তি এই থাকে তার ভাবনার গভীরে। যে স্তরেরই মানুষ হোক না কেন প্রত্যেক মানুষেরই মনের মধ্যে চঞ্চল বালক বাস করে। ‘আমি চঞ্চল হে সুদূরের পিয়াসী’ এ কথা সবাই বলতে পারে না। হৃদয়ের এই ব্যাকুলতা সবাই ব্যক্ত করতে পারে না, এমন স্পষ্ট ভাষায়। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে থাকে সেই আকুতি। আর কে না জানে বাহ্যিক সম্পদ মানুষকে সেই আনন্দ দিতে পারে না। মনের মধ্যেই থাকে সেই আনন্দের উৎস ধারা। বাউল সম্প্রদায় সেই মূল দর্শনকে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই শান্ত স্নিগ্ধ দরিদ্র অথচ পরিতৃপ্ত জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে তারা।

বাউল দর্শনের এই মূল দিকটি গড়ে ওঠার পিছনে বাউল দর্শনের যিনি প্রাণপুরুষ, সেই লালন ফকিরের জীবন সংগ্রাম বিশেষভাবে কার্যকরী ছিল বলেই মনে হয়। আমরা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মনের মানুষ’ উপন্যাসে লালন ফকিরের জীবন যেভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে তা পর্যালোচনা করে দেখতে পারি, আমাদের বক্তব্যের সমর্থনের ইঙ্গিত। এই উপন্যাসে বাউল ধর্ম দর্শন সমাজ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে লেখক বিশ্লেষণ করেছেন। তৎকালীন সমাজ এবং বাউল সমাজ সমান্তরালভাবে চিত্রিত হয়েছে এই উপন্যাসে। কায়স্থ সন্তান লালমোহনের লালন ফকির হয়ে ওঠার ঐতিহাসিক পটভূমিকা, এখানে দক্ষতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। লালন দীর্ঘদিন পর সুস্থ হয়ে বেঁচে, নিজের বাড়িতে ফিরে এসেছে। আসার পর মুসলমান রমণীর সেবা গ্রহণের জন্য তাকে পরিত্যাগ করেছে তার পরিবার। সামাজিক অনুশাসনের ভয়ে, তাকে ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে তার মা বউ। লালন সংসার ত্যাগ করে পথে নেমেছে। ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে গাছ তলায় বসেছে। লোকে তাকে পাগল ভেবেছে। শেষমেষ পথেই পেয়েছে কালুয়াকে। জঙ্গলে বাসা বেধেছে তারা। এমনি করে ধীরে ধীরে একদিন একটা আস্ত সমাজ গড়ে উঠেছে তাদের। নির্যাতিত ছন্নছাড়া সর্বহারা নিপীড়িত মানুষের সমাজ। প্রচলিত সমাজ সংসার থেকে দূরে, গভীর জঙ্গলে গড়ে উঠেছে এই ছন্নছাড়া মানুষের সমাজ। তারা যা পায় ভাগ করে খায়।তাদের ধর্ম নেই, জাত নেই, শ্রেণি নেই। তারা শুধু না খেতে পাওয়া বঞ্চিত মানুষ। গান গেয়ে তাদের অন্তরের আকুতি ব্যক্ত করে। জীবন সুন্দর শুধু জীবনেরই জন্যে। কষ্ট লাঞ্ছনা সব ম্লান হয়ে যায় যদি সেই পরম সখার অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারা যায়। তাই তাদের রিক্ত জীবনে কখনো অসুখ অশান্তি হানা দিতে পারে নি। লালনের নেতৃত্বে এমন মানবতাবাদী ধর্ম বিশ্বাসী সমাজ করে উঠেছে। সারাটা জীবন লালনকে দেখে, মানুষের মনে নানা প্রশ্ন জেগেছে। লালনকে বারবার একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তার জাত ধর্ম কি? এই প্রশ্ন সংবেদনশীল লালনের মনে করাঘাত করেছে। জীবন সম্পর্কে সুগভীর উপলব্ধি জেগেছে তার। জাতপাতহীন সামাজিক বন্ধনহীন সমাজ পতিদের চোখ রাঙানিকে অগ্রাহ্য করে বিচিত্র বর্ণে রঞ্জিত প্রাণের আনন্দে বেঁচে থাকার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, লালনের এই জীবন সংগ্রাম থেকে। লালনের দর্শন উপলব্ধি তাই  অনেকটা জীবনমুখী বলা যেতে পারে। তার গানে তার স্পষ্ট প্রভাব আমরা দেখেছি।
‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে
লালন ভাবে- - - জাতির কীরূপ
দেখলাম না এই নজরে।
কেউ মালা কেউ তসবি গলায়
তাইতো জাত ভিন্ন বলায়
যাওয়া কিংবা আসার বেলায়
জাতের চিহ্ন রয় কার রে ?’

সমগ্র উপন্যাস জুড়ে লালনের এই বাউল হয়ে ওঠা এবং বাউল সমাজ গড়ে ওঠার সুনিপুণ চিত্র অঙ্কন করেছেন লেখক। সমাজের অবহেলিত পতিত হতদরিদ্র নিম্ন বর্ণের নিম্ন শ্রেণির দলছুট হতভাগারা, এক জোট হয়ে বঞ্চিতদের সমাজ গড়ে তুলেছে। শ্রদ্ধেয় শক্তিনাথ ঝা তার ‘বস্তুবাদী বাউল’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বাউল পরিবারে কেউ জাতিভেদ মানেন না। নর এবং নারী এই দুই জাতি আছে বলে মনে করেন।’ যে সমাজ প্রথাগত সমাজ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সব ধর্মের সব বর্ণের সব শ্রেণির অসহায় মানুষ এসে একটা সমাজ গড়েছে, যাদের অন্বেষণ মনের মানুষ। গভীর সাধনার দ্বারা অর্জন করা যায় সেই মনের মানুষের অনুভব। যিনি থাকেন তার নিজেরই মধ্যে। বাইরে খুঁজে মরে গেলেও তার দেখা মিলবে না। নিজেকে ভালোবাসো, বিশ্ব জগত তোমার ভালোবাসার পাত্র তাকে ভালোবাসো, এই হল বাউল ধর্মের মূল কথা-
‘শুনি মানবের উত্তম কিছুই নাই
দেব_ দেবতাগণ
করে আরাধন
জন্ম নিতে মানবে।
কত ভাগ্যের ফলে না জানি
মন রে পেয়েছ এই মানব-তরণী’

লালন হিন্দু ঘরে জন্মেছিলেন কিন্তু তার মধ্যে ধর্মীয় কোন গোঁড়ামি ছিল না। লালন বলতেন, ‘তুমি তোমার ধর্মের সবকিছু মান্য করেও শান্তি পেতে পারো আবার কোন কিছু না মেনে পুজো আচ্চা নামাজ সব বাদ দিয়ে, শুধু মানুষকে ভালোবেসেও একটা সুন্দর জীবন পাওয়া যেতে পারে।’ ‘লালন হিন্দু ঘরে জন্মালেও হিন্দু ধর্মে তার আস্থা ছিল না, মুসলমান ঘরে জন্মালে বা ধর্মান্তরিত মুসলিম হলেও ইসলামি নির্দেশ মানতেন না। তিনি কোনো অর্থেই ছিলেন না আউলিয়া সুফি সাধক । বাংলার বহু দিনের পরম্পরিত লোকায়ত মতের গভীর নির্জন পথে তিনি ছিলেন এক সাহসী ও প্রতিভাশালী পদাতিক ।তার গান সেই করুন রঙিন পথপরিক্রমার শিল্পিত পদাবলী।’ (সুধীর চক্রবর্তী: ব্রাত্য লোকায়ত লালন)

আধুনিক বাংলা কথা সাহিত্যের ইতিহাসে মনের মানুষ উপন্যাসটি এক অনন্য সৃষ্টি নিদর্শন । এখানে লেখক, দক্ষতার সঙ্গে বাউল মনের নির্যাস টিকে তুলে ধরেছেন। বিশ্বকে আপন করে নেবার মনোভাব এবং তৎকালীন সমাজ, বাউল সমাজ গড়ে ওঠার মুহূর্তটি নিপুন ভাবে চিত্রিত করেছেন লেখক। লালনের মানবতাবাদি দর্শন ভাবনায় উন্নীত হবার ক্রমপর্যায়টি খুব সুন্দর ভাবে এই উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে। বাউল সমাজ এবং ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ সমকালীন পৃথিবীতে সমাধিক পরিচিতি লাভ করেছে। সমাদৃত হয়েছে মানুষের কাছে। বাউল গান আজ সমগ্র পৃথবীর মানুষের কাছে কৌতুহলের বিষয়। বাউলদের নিয়ে কত গবেষণা হচ্ছে। বিশ্বের দরবারে বাউল দর্শন এখন ভীষন ভাবে সমাদৃত বলা যেতে পারে।

আরও পড়ুন- কবিতার পরতে পরতে ঈদের বার্তা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড