• বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২০, ১৯ চৈত্র ১৪২৬  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

লোহাগাড়ার ত্রাস ভয়ংকর কালো মিজান

  লোহাগাড়া প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:৫৩
ত্রাস
লোহাগাড়ার ত্রাস খ্যাত মিজানুর রহমান ওরফে কালো মিজান (ছবি : দৈনিক অধিকার)

মিজানুর রহমান ওরফে কালো মিজান (২২)। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার অপরাধ জগতে সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত একটি নাম। ইতোমধ্যেই নানা অপকর্মের মূল হোতা কালো মিজান এলাকার ত্রাস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কালো মিজান ও তার সহযোগীরা প্রতিবেশীর জমি দখল করে গোয়ালঘরের নামে গড়ে তুলেছে ‘টর্চার সেল’। রাতে সেই টর্চার সেলে বিভিন্ন এলাকার মানুষসহ পথচারীদের ধরে এনে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের চাঁদা। দলবল নিয়ে সেখানে রাতভর চলে ইয়াবা সেবন, মাদক বিক্রি ও জুয়ার আসর।

কিছুদিন আগে অভিযান চালিয়ে পুলিশ দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করলেও কালো মিজানকে ধরা সম্ভব হয়নি। ওই অভিযানে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কৌশলে পালিয়ে যায় সে।

এলাকায় হত্যা, চুরি, মাদক কারবার ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগের সঙ্গে জড়িত রয়েছে কালো মিজান ও তার বাহিনী। প্রতিবেশীর জমি দখল, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তারসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে রয়েছে একাধিক মামলাও।

স্থানীয়দের অভিযোগ- এলাকায় নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে পরিচয় দেয় কালো মিজান। জনশ্রুতি রয়েছে, ছাত্রলীগের দক্ষিণ জেলা কমিটির কথিত এক ছাত্রনেতার মদদে সে লোহাগাড়ায় গড়ে তুলেছে এই অপরাধ সাম্রাজ্য ও ইয়াবা কারবার। মানুষকে মারধর করা কালো মিজানের নিত্যদিনের কাজ। হাতে সবসময় বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরাও করে সে। এ কারণে এলাকায় কেউ তার ভয়ে কথা বলে না।

লোহাগাড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মিজানুর রহমান মিজান বলেন, ‘সে একজন ইয়াবা কারবারি। কালো মিজানের বাড়ি থেকে কিছুদিন আগে তার দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এলাকার মেয়েদের বিভিন্ন সময় ইভটিজিংও করে সে। আমরা যুব সমাজ তাকে অনেকবার প্রতিহত করতে চেয়েছি। কিন্তু তার গডফাদারদের মদদে সে বারবার রক্ষা পায়। এ কারণেই সে নবজাতক হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করেছে। আমরা তার কঠোর শাস্তি চাই, যেন ভবিষ্যতে এমন কাজ সমাজে কেউ না করে।’।

স্থানীয় ইউপি সদস্য হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম দৈনিক অধিকারকে জানান, মাদক কারবার থেকে শুরু করে নবজাতক হত্যা পর্যন্ত নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কালো মিজানের নাম বারবার উঠে এসেছে। ভূমি দখল ও চাঁদাবাজিসহ তার নানা অপকর্মে বর্তমানে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় তার অত্যাচারের প্রতিবাদে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার আরকান সড়কে মানববন্ধন করে এলাকাবাসী। এতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে শিগগিরই কালো মিজানকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানান।

কে এই কালো মিজান? 

মিজানুর রহমান ওরফে কালো মিজান লোহাগাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মুন্সিপাড়া এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে। ২০১৭ সালে প্রতিবেশী প্রবাসী মোজাফফরের মেয়ে মুক্তাকে ফুসলিয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে সে। বছর না যেতেই তার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে মুক্তা মারা যায় বলে দাবি করে তার পরিবার।

এলাকায় তার রয়েছে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। যারা এলাকার বিভিন্ন অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। অভিযোগ রয়েছে- এলাকার বিভিন্ন বিল্ডিং মালিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করে কালো মিজান ও তার বাহিনী। চাঁদা না দিলে নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ।

অতি সম্প্রতি তার লাথিতে প্রেমিকার গর্ভপাতের ঘটনায় আবারও আলোচনায় উঠে আসে সেই কালো মিজান ও তার সহযোগীরা। প্রথমে সেই নবজাতককে জীবিত অবস্থায় বাথরুমের ট্যাংকিতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পরে কান্না করায় ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয় সেই নবজাতককে। এরপর গভীর রাতে তিন সহযোগীসহ মিজান স্থানীয় একটি পুকুরপাড়ে নবজাতকের লাশ মাটি চাপা দেয় বলেও জানা যায়। এর তিন দিন পর পুকুরপাড়ে মাটি চাপা দেওয়া সেই নবজাতকের লাশ আদালতের নির্দেশে উত্তোলন করা হয়।

ওই মামলার এজাহারে জানা যায়, মিজানুর রহমান ওরফে কালো মিজানের সঙ্গে সাতঘরিয়া পাড়া এলাকার এক মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে মিজান ওই মেয়েকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এতে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে ভিক্টিমের বাড়িতে যায় কালো মিজান। এ সময় মেয়েটি তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটিও হয়। একপর্যায়ে মিজান মেয়েটির পেটে লাথি মারে। এতে ঘটনাস্থলেই ওই অন্তঃসত্ত্বার গর্ভপাত ঘটে।

ঘটনার পরপরই বাচ্চাটি মেরে গোপনে মাটিচাপা দেয় কালো মিজান ও তার সহযোগীরা। পরে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া সামাজিক ব্যাধি প্রতিরোধ ফোরামের সভাপতি ও এমপিপত্নী রিজিয়া রেজা চৌধুরীর দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি এ ব্যাপারে তৎপর হয়ে উঠলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়।

পরে আদালতের নির্দেশে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পদ্মাসন সিংহের উপস্থিতিতে পুকুরপাড় থেকে সেই নবজাতকের লাশ উত্তোলন করা হয়। ডিএনএ পরীক্ষা ও ময়না তদন্তের জন্য ওই দিনই লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) পাঠানো হয়।

আরও পড়ুন : খোকসা ইউএনওর আশ্বাসে ভাইরাল শিক্ষকদের বহিষ্কার আন্দোলন স্থগিত

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও স্থানীয় এমপিপত্নী রিজিয়া রেজা চৌধুরী বলেন, ‘এ ধরনের অমানবিক ও অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সামাজিক অপরাধ এবং অপরাধীদের ব্যাপারে কোনো ধরনের ছাড় নেই। এ ধরনের নিষ্ঠুরতম কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করতে সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।’

এ ব্যাপারে লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকের হোসাইন মাহমুদ জানান, ওই ঘটনার ভিকটিম বাদী হয়ে মিজানকে আসামি করে থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করেছেন। বর্তমানে মিজান গা ঢাকা দিয়েছে। তাকে ধরতে পুলিশ জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানিয়েছেন ওসি জাকের হোসাইন মাহমুদ।

ওডি/আইএইচএন

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড