• মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ইসলামি প্রবন্ধ

নবী মুহাম্মদ সা.

  আবদুল হান্নান জুলফিকার

০৭ জানুয়ারি ২০২০, ১১:০৩
ছবি
ছবি : মক্কা নগরী

মানব জাতির ইতিহাস খুঁজলে পাওয়া যাবে আদম আলাইহিস সালামই তাঁদের আদি পিতা। আর তাঁরই হতে হাওয়া আ.-কে সৃষ্টি করে আল্লাহ তা‘আলা অগণিত বনি আদম পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন। যখন মানুষ স্বীয় দায়িত্ব-কর্তব্য ভুলে বিপথগামী হতে বসেছে, তখনই অসীম দয়ালু আল্লাহ তাদেরকে সত্য পথ দেখানোর জন্য যুগে যুগে নবী ও রাসূলদেরকে এ ধরাপৃষ্ঠে পাঠিয়েছেন। আর যখন নবী রাসূলগণ দুনিয়া ছেড়ে চলে যান উম্মতদেরকে রেখে, তখন তারা পরকালের কথা ভুলে নবীদের কথা ভুলে দুনিয়ামুখি হয়ে পড়ে। শুরু করে অপকর্ম, যে যুগটাকে এখনো মানুষ আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগ বলে চিনে। জাহেল অর্থ অন্ধকার, যে যুগে ইসলাম তথা আলোর পথ ভুলে অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল তখনকার লোকেরা তাই তাদের জাহেলী যুগ বলে আখ্যায়িত করা হয়।

সেই জাহেলী (অন্ধকার) যুগে আরবগণ কন্যাসন্তানকে হত্যা করত এবং তাদেরকে জীবন্ত কবর দিত। অনাথ শিশুদেরকে দয়া-মায়া দেখানো হতো না। লুটতরাজ করা হতো এবং কাঠ ও পাথরের প্রতিমাসমূহের পূজা করা হতো। তখন এক-অদ্বিতীয় আল্লাহর ব্যাপারে বিন্দুমাত্রও চিন্তা-ভাবনা করা হতো না। (অথচ ইসলামোত্তর যুগে এ সব কুসংস্কার ও কুপ্রথা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায়)।

এবং সমাজে নারীদেরকে পণ্যের মতো কেনা-বেচা করা হতো। তারা সব ধরনের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অধিকার, এমনকি উত্তরাধিকার থেকেও বঞ্চিত ছিল। আরব বুদ্ধিজীবীরা নারীদেরকে পশু বলে মনে করত। আর এ কারণেই তাদেরকে দৈনন্দিন জীবনের পণ্য-সামগ্রী ও আসবাবপত্রের মধ্যে গণ্য করা হতো।

প্রধানত দুর্ভিক্ষের ভয়ে এবং কখনো কখনো কলুষতা ও অশুচিতার ভয়ে আরবরা মেয়েদেরকে জন্মগ্রহণের পরপরই হত্যা করে ফেলত। কখনো পাহাড়ের ওপরে তুলে সেখান থেকে নিচে ফেলে দিত এবং কখনো কখনো পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করত।

যখন তাদের কোন এক ব্যক্তিকে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণের সুসংবাদ দেয়া হতো তখন তার বর্ণ কালো হয়ে যেত এবং বাহ্যত সে যেন তার ক্রোধকে চাপা দিত। আর এই জঘন্য সংবাদ শোনার কারণে সে (লজ্জায়) তার সম্প্রদায়ের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াত। আর সে জানত না যে, সে কি অপমান ও লাঞ্ছনা সহকারে তার এ নবজাতক কন্যাসন্তান প্রতিপালন করবে, নাকি তাকে মাটির নিচে জীবন্ত পুঁতে ফেলবে? সত্যিই তাদের ফয়সালা কতই না জঘন্য!

সবচেয়ে দুঃখজনক ছিল আরবদের বৈবাহিক ব্যবস্থা। পৃথিবীতে এর কোন নজির বিদ্যমান নেই। যেমন আরবদের কাছে স্ত্রীর কোন সুনির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না। স্ত্রীর মোহরানা যাতে আদায় করতে না হয় সেজন্য তারা স্ত্রীদেরকে নির্যাতন ও উৎপীড়ন করত। কোন মহিলা চারিত্রিক সততার পরিপন্থী কোন কাজ করলেই তার মোহরানা সম্পূর্ণরূপে বাতিল হয়ে যেত। কখনো কখনো আরবরা এ নিয়মের অপব্যবহার করত। মোহরানা যাতে আদায় করতে না হয় সেজন্য তারা নিজেদের স্ত্রীদের ওপর অপবাদ আরোপ করত। পুত্রসন্তানগণ পিতার মৃত্যুর পর বা পিতা তালাক দিলে পিতার স্ত্রীদেরকে নিজের স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে পারত এবং এতে কোন অসুবিধা ছিল না। এমন এমন অনেক ছিল কাফিরদের ভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট প্রথা যা এই ক্ষুদ্রতম বইয়ে তুলে ধরা সম্ভব নয়।

এই অন্ধকার যুগে জাহেলিয়াতকে দূর করতে এরই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হিসেবে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.কে এমন এমন উত্তম চরিত্রে সাজিয়ে পাঠিয়েছেন, যে জন্য মহান রাববুল আলামীন নিজেই ঘোষণা দিলেন যে, চারিত্রিক এমন কোনো গুণ অবশিষ্ট ছিল না যা তাঁর চরিত্রে অনুপস্থিত। 
যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আপনি অবশ্যই মহত্তম চরিত্রে অধিষ্ঠিত।’

যাকে বিশ্ব জগতের মালিক আল্লাহ তালা উত্তম চরিত্রের সনদ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, কেমন হবেন তিনি জেনে নিন তাঁর জীবনী থেকে।

জন্ম তারিখ:
হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্তমান সৌদি আরবে অবস্থিত মক্কা নগরীর কুরাইশ গোত্রের বনি হাশিম বংশে জন্মগ্রহণ করেন। প্রচলিত ধারনা মোতাবেক, উনার জন্ম ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে। প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা মন্টগোমারি ওয়াট তার পুস্তকে ৫৭০ সনই ব্যবহার করেছেন। তবে তাঁর প্রকৃত জন্মতারিখ বের করা বেশ কষ্টসাধ্য। তাছাড়া হযরত মুহাম্মাদ সা. নিজে কোনো মন্তব্য করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, এজন্যই এ নিয়ে ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে। তেমন ভাবে তাঁর জন্মমাস নিয়েও ব্যাপক মতবিরোধ পাওয়া যায়। যেমন, এক বর্ণনা মতে তাঁর জন্ম ৫৭১ সালের ২০ বা ২২ শে এপ্রিল। সাইয়্যেদ সুলাইমান নদভী, সালমান মনসুরপুরী এবং মুহাম্মদ পাশা ফলকীর গবেষণায় এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তবে শেষোক্ত মতই ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বেশি নির্ভরযোগ্য। যাই হোক, নবীর জন্মের বছরেই হস্তী যুদ্ধের ঘটনা ঘটে এবং সে সময় সম্রাট নরশেরওয়ার সিংহাসনে আরোহণের ৪০ বছর পূর্তি ছিল এ নিয়ে কারো মাঝে কোনো দ্বিমত নেই।

নবী মুহাম্মাদ সা. এর বংশ পরিচয় ও পরিবার:
নাম: মুহাম্মাদ সা. (আসমানে আহমাদ নামেই প্রসিদ্ধ)
উপনাম: আবুল কাসেম।
পিতা: আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব (আবদুল মুত্তালিবের দশ সন্তানের সর্বকনিষ্ঠ)।
মাতা: আমিনা বিনতে ওহ্হাব।
দুধ মা: হালিমা বিনতে সাদিয়া।
দাদা: আবদুল মুত্তালিব বিন হাশেম।
দাদি: ফাতেমা বিনতে আমর।
নানা: ওহ্হাব বিন আবদে মানাফ।
নানি: বোররা বিনতে ওমজা।

বংশলতিকা:
মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব বিন হাশেম বিন আবদে মানাফ বিন কুসাই বিন কিলাব বিন মোররা বিন কা’আব বিন লুয়াই বিন গালেব বিন ফেহের;
(তাঁর উপাধি ছিল কোরাইশ, এখান থেকেই কোরাইশ বংশের প্রচলন) বিন মালেক বিন নজর বিন কানানাহ বিন খোজাইমা বিন মোদরাকা বিন ইলিয়াস বিন মুজার বিন নেজার বিন মা’আদ বিন আদনান। (এ পর্যন্ত সমস্ত ঐতিহাসিকের মতে ঐক্য ও সমতা রয়েছে।
এ বংশলতিকা হজরত ইসমাঈল ও ইবরাহীম আ. হয়ে হজরত আদম আ. পর্যন্ত পৌঁছেছে।

বংশ, গোত্র ও জন্মের সময়:
তৎকালীন সময়ে মক্কায় আরব সমাজে সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রভাবশালী গোত্র ছিল কুরাইশ গোত্র। সে সময়ে কুরাইশ গোত্রকে সকলেই শ্রদ্ধা করতো এবং সম্মান দিত। তবে কুরাইশ গোত্রের কোনো সদস্য রাষ্ট্র ক্ষমতা বা দেশ পরিচালনায় নিয়জিত ছিল না। মক্কার সেই বিখ্যাত কুরাইশ গোত্রেই পৃথিবীতে আগমন করেন নবী মুহাম্মাদ সা.।

বংশ:
সে সময়ে মক্কার বুকে মানুষ সর্বজনীন হিসেবে যে বংশকে বেশি প্রাধান্য দিত যা গৃহীত ছিল তা হচ্ছে হাশেমি বংশ আর এই সুপ্রসিদ্ধ হাশেমি বংশেই জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

জন্ম সময়:
রাত অতিবাহিত হয়ে প্রত্যুষের সময়টাতে হযরত মুহাম্মাদ সা. জন্মগ্রহণ করেন, অর্থাৎ পুরোপুরি রাতও নয় আবার দিনও নয় মধ্যবর্তী সময়ে তিনি পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। জন্মের পূর্বেই মোহাম্মাদ সা. তাঁর পিতাকে হারিয়ে এতিম হয়েছেন। ছয় বছর বয়সে মা আমিনা এবং আট বছর বয়সে দাদা আবদুল মুত্তালিব এর মৃত্যুর পর এতিম শিশু মুহাম্মাদ এর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তাঁর আপন চাচা আবু তালিব।

শৈশব ও কৈশোর কাল:
তৎকালীন আরবের রীতি ছিল যে, তারা মরুভূমির মুক্ত আবহাওয়ায় বেড়ে উঠার মাধ্যমে সন্তানদের সুস্থ দেহ এবং সুঠাম গড়ন তৈরির জন্য জন্মের পরপরই দুধ পান করানোর কাজে নিয়োজিত বেদুইন মহিলাদের কাছে দিয়ে দিতেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর আবার ফেরত নিতেন। এই রীতি অনুসারে মুহাম্মাদ সা.-কেও বিবি হালিমা বিনতে আবু জুয়াইবের (অপর নাম হালিমা সাদিয়া) হাতে দিয়ে দেয়া হয়। শিশু মুহাম্মাদকে ঘরে আনার পর দেখা যায় বিবি হালিমার সংসারে সচ্ছলতা ফিরে আসে এবং তারা শিশুপুত্রকে সঠিকভাবে লালনপালন করতে সমর্থ হন।

তখনকার একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য–শিশু মুহাম্মাদ কেবল হালিমার একটি স্তনই পান করতেন এবং অপরটি তার অপর দুধভাইয়ের জন্য রেখে দিতেন। দুই বছর লালনপালনের পর দুধমা হালিমা শিশু মুহাম্মাদকে নিজের মা আমিনার কাছে ফিরিয়ে দেন। কিন্তু এর পরপরই পুরো মক্কা জুড়ে আকস্মিক মহামারী দেখা দেয় যার ফলে মা আমিনা নিজে অতটা যত্নবান হতে পারবেন না বলে পুনরায় শিশু মুহাম্মাদকে হালিমার কাছে ফিরিয়ে দেন। এদিকে বিবি হালিমাও মনে মনে চাচ্ছিলেন শিশু মুহাম্মদকে আবার ফিরে পেতে। এতে তার আশা পূর্ণ হল।

ইসলামী বিশ্বাসমতে, এর কয়েকদিন পরই একটি কালজয়ী অলৌকিক ঘটনা ঘটে তার সাথে। একদিন বিবি হালিমার পুত্র ও শিশু মুহাম্মদ মাঠে মেষ চড়াচ্ছেন এতে কয়েকজন মিলে খেলছেন কিন্তু শিশু মুহাম্মদ খেলছেন না বসে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছেন। কিছুক্ষণ পর অপরিচিত কয়েকজন লোক এসে শিশু মুহাম্মদকে জমিনে শুয়িয়ে বুক চিরে কলিজার একটি অংশ বের করে তা জমজম কূপের পানিতে ধুয়ে আবার যথাস্থানে স্থাপন করে দেয়া হয়। এই দেখে অন্যান্য শিশুরা ভয়ে দৌড়ে গিয়ে পুরো ঘটনা হালিমা সাদিয়াকে বলল, সাথে সাথে হযরত হালিমা রা. ঘটনাস্থলে পৌঁছান কিন্তু এসেই দেখেন শিশু মুহাম্মদ সুস্থভাবে বসে আছেন। ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে সক্কে সিনা বা সিনা চাকের ঘটনা হিসেবে খ্যাত।

এই ঘটনার পরই হযরত হালিমা শিশু মুহাম্মাদকে মা আমিনার কাছে ফিরিয়ে দেন। ছয় বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তিনি মায়ের সাথে কাটান। এই সময় একদিন মা আমিনার ইচ্ছা হয় ছেলেকে নিয়ে মদিনায় যাবেন। সম্ভবত কোনো আত্মীয়ের সাথে দেখা করা এবং স্বামীর কবর জিয়ারত করাই এর কারণ ছিল। মা আমিনা ছেলে, শ্বশুর এবং দাসী উম্মে আয়মনকে নিয়ে ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মদিনায় পৌঁছেন। তিনি মদিনায় একমাস সময় অতিবাহিত করেন। একমাস পর মক্কায় ফেরার পথে আরওয়া নামক স্থানে এসে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই দাফন করা হয়। মাতার মৃত্যুর পর দাদা আবদুল মুত্তালিব শিশু মুহাম্মাদকে নিয়ে ধীরে ধীরে মক্কায় পৌঁছেন। এর পর থেকে দাদাই মুহাম্মাদের দেখাশোনা করতে থাকেন। মুহাম্মদের বয়স যখন ৮ বছর ২ মাস ১০ দিন তখন তার দাদাও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মৃত্যুর আগে তিনি তার পুত্র আবু তালিবকে ডেকে নাতি শিশু মুহাম্মদের দায়িত্বভার দিয়ে যান।

চাচা আবু তালিব ব্যবসায়ী ছিলেন এবং আরবদের নিয়ম অনুযায়ী বছরে একবার সিরিয়া সফরে যেতেন। মুহাম্মাদের বয়স যখন ১২ বছর তখন তিনি চাচার সাথে সিরিয়া যাওয়ার জন্য বায়না ধরলেন। প্রগাঢ় মমতার কারণে আবু তালিব আর নিষেধ করতে পারলেন না। যাত্রাপথে বসরা পৌঁছার পর কাফেলাসহ আবু তালিব তাঁবু ফেললেন। সে সময় আরব উপদ্বীপের রোম অধিকৃত রাজ্যের রাজধানী বসরা অনেক দিক দিয়ে সেরা ছিল। শহরটিতে জারজিস নামে এক খ্রিস্টান পাদ্রী ছিলেন যিনি বুহাইরা বা বহিরা নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি তার গির্জা হতে বাইরে এসে কাফেলার মুসাফিরদের মেহমানদারী করেন। এ সময় তিনি বালক মুহাম্মাদকে দেখে শেষ নবী হিসেবে চিহ্নিত করেন। ফুজারের যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন নবীর বয়স ১৫ বছর। এই যুদ্ধে তিনি স্বয়ং অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের নির্মমতায় তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন। কিন্তু তাঁর কিছু করার ছিল না। সে সময় থেকেই তিনি কিছু একটি করার চিন্তাভাবনা শুরু করেন।

বিবাহ ও নবীপত্নীগণ:
মক্কা থেকে মদিনায় ইতিহাসখ্যাত হিজরতের মাত্র তিন বছর আগে হযরত খাদিজা রা. এর ইন্তেকাল হয়। এ সময় নবী করিম সা. এর বয়স ছিল ৪৯ বছর। হযরত খাদিজা রা. এর মৃত্যু পর্যন্ত তিনিই ছিলেন নবীজি সা. এর একমাত্র স্ত্রী। হযরত খাদিজা রা. এর মৃত্যুর পর তিনি একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করেন। এঁদের অনেকেই ছিলেন বিধবা বা যুদ্ধে স্বামীহারা অথবা স্বামী পরিত্যক্তা কিংবা দুস্থ। আবার কোনো কোনো বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় আল্লাহর সরাসরি নির্দেশে। উম্মাহাতে মু’মিনিনরা হলেন-

এক.
হযরত খাদীজা মাইছারার মুখে মুহাম্মাদের সততা ও ন্যায়পরায়ণতার ভূয়সী প্রশংসা শুনে অভিভূত হন। এছাড়া ব্যবসায়ের সফলতা দেখে তিনি তার যোগ্যতা সম্বন্ধেও অবহিত হন। এক পর্যায়ে তিনি মুহাম্মাদকে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি স্বীয় বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনব্বিহরের কাছে বিয়ের ব্যপারে তার মনের কথা ব্যক্ত করেন। নাফিসার কাছে শুনে মুহাম্মাদ বলেন যে তিনি তার অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানাবেন। মুহাম্মাদ তাঁর চাচাদের সাথে কথা বলে বিয়ের সম্মতি জ্ঞাপন করেন। বিয়ের সময় খাদীজার বয়স ছিল ৪০ আর মুহাম্মাদের বয়স ছিল ২৫। তিনিই ছিলেন নবী করিম সা.-এর প্রথম স্ত্রী। তিনি বিধবা তবে বিদুষী ও অভিজাত নারী ছিলেন। পবিত্র মক্কায় তিনি ‘ত্বাহেরা’—অর্থাৎ পবিত্র নারী বলে পরিচিত ছিলেন। নবী করিম সা.-এর চেয়ে কমপক্ষে ১৫ বছরের বড় ছিলেন তিনি। নবুয়তের প্রথম জীবনে নবী সা.-এর দাওয়াতের কাজে তিনি বিশেষভাবে পাশে দাঁড়ান।

দুই.
হযরত সাওদা বিনতে জামআ রা. প্রথমে সাকরান ইবনে আমরের স্ত্রী ছিলেন। সাকরানের মৃত্যুর পর নবী সা.-এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

তিন.
হযরত আয়েশা রা. যিনি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর রা.-এর কন্যা। কেবল হযরত আয়েশা রা.-ই কুমারী মেয়ে ছিলেন, যাঁদের সঙ্গে মহানবী সা.-এর বিয়ে হয়েছিল। নবী সা.-এর ওফাতের সময় হযরত আয়েশা রা.-এর বয়স ছিল মাত্র আঠারো বছর। নবী সা.-এর বহু হাদিস হযরত আয়েশা রা.-এর মাধ্যমে মানবজাতির কাছে পৌঁছেছে। তাঁর প্রখর মেধা ও স্মরণশক্তি এ কাজে সহায়ক হয়েছিল।

চার.
হযরত হাফসা রা. ছিলেন মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় খলিফা এবং অর্ধ জাহানের বাদশা হযরত ওমর রা.-এর কন্যা। হযরত হাফসা রা. প্রথম জীবনে হযরত উনাইস ইবনে হুজাইফা রা.-এর স্ত্রী ছিলেন। হযরত উনাইস রা. যুদ্ধে শহীদ হওয়ার পর নবী সা. তাঁকে স্ত্রী হিসেবে বরণ করেন।

পাঁচ.
হযরত জয়নব বিনতে খুজাইমা রা.। তিনি মদিনায় নিঃস্বদের জননী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রথম জীবনে তাঁর বিয়ে হয়েছিল তোফায়েল ইবনে হারিছের সঙ্গে। তালাকপ্রাপ্ত হয়ে তোফায়েলেরই ভাই উবায়দাকে বিয়ে করেন তিনি। উহুদের যুদ্ধে উবায়দা শহীদ হন। পরে অসহায় জয়নবকে বিয়ে করেন নবী করীম সা.। কিন্তু বিবাহিত জীবনের ছয় মাসের মধ্যেই তাঁর ইন্তেকাল হয়ে যায়।

ছয়.
হযরত উম্মে সালামা রা.। প্রথম জীবনে তাঁর বিয়ে হয়েছিল আবু সালামা রা.-এর সঙ্গে। উহুদের যুদ্ধে আবু সালামা রা. শহীদ হন। বিধবা উম্মে সালামাকে অবশেষে নবী সা. স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে নেন। ইতিহাসবিদরা বলেন, নবী সা.-এর স্ত্রীদের মধ্যে তিনিই সবার শেষে মৃত্যুবরণ করেন।

সাত.
হযরত জয়নাব বিনতে জাহাশ রা.। তিনি ছিলেন নবী সা.-এর ফুফাতো বোন। নবী সা. প্রথমে তাঁর এই বোনকে তাঁর পালকপুত্র হযরত জায়েদ রা.-এর সঙ্গে বিয়ে দেন। এই বিয়েতে গোড়া থেকেই জয়নাব রা.-এর আপত্তি ছিল। ফলে তাঁদের দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। পরে তাঁদের পারিবারিক জীবনে বিচ্ছেদ ঘটে। হযরত জয়নাব রা.-এর আপত্তিতে এ বিয়ে সংঘটিত হওয়ায় এবং পরে বিচ্ছেদ ঘটায় নবী সা.-এর মনে কিছুটা অনুশোচনা আসে। এ থেকে জয়নাব রা.-কে নিজে বিয়ে করার প্রস্তুতি গ্রহণ করলেও তৎকালীন আরবের কুসংস্কারের জন্য তা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। পরে পবিত্র কুরআনের সুরা আহযাবে আয়াত নাজিল হয়। সেখানে পালক ছেলে ও ঔরসজাত সন্তান সমতুল্য নয় বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে কুসংস্কার নির্মূল করার উদ্দেশ্যে নবী সা.-এর মাধ্যমে সেই বিধান বাস্তবায়ন করে দেখানোর প্রয়োজন অনুভূত হয়। তখনই হযরত জয়নাব রা.-এর সঙ্গে নবী সা.-এর বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

আট.
হযরত জুয়াইরিয়া রা.। তিনি একজন আরব গোত্রের সরদার হারিছের কন্যা ছিলেন। যুদ্ধে বন্দিনী হয়ে আসেন। মহানবী সা. যুদ্ধবন্দির সঙ্গে বিবাহে আবদ্ধ হন। উপহার হিসেবে গোত্রের সব বন্দি মুক্তি লাভ করে। তাঁর পিতা হারিছও ইসলাম গ্রহণ করেন।

নয়.
হযরত উম্মে হাবিবা রা.। মহানবী সা.-এর চাচা আবু সুফিয়ানের কন্যা তিনি । প্রথমে উবায়দুল্লাহ বিন জাহালের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। দু’জনই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আফ্রিকার হাবশায় হিজরত করেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে উবায়দুল্লাহ খ্রিস্টান হয়ে যান। উবায়দুল্লাহ থেকে উম্মে হাবিবাকে মুক্ত করতে তিনি হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশির মাধ্যমে চাচাতো বোন উম্মে হাবিবা রা.-কে বিয়ে করেন।

দশ.
হযরত সাফিয়া রা.। তিনি ছিলেন নবীদেরই বংশধর। হযরত মুসা আ.-এর ভাই হযরত হারুন আ.-এর অধস্তন বংশধারার কন্যা। প্রথমে কিনানা ইবনে আবিলের স্ত্রী ছিলেন তিনি। কিনানার মৃত্যুর পর মহানবী সা.-এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।

এগারো.
হযরত মায়মুনা রা.। তিনি প্রথমে মাসউদ বিন ওমরের স্ত্রী ছিলেন। সে তালাক দিলে আবু রিহামের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। আবু রিহাম মারা যাওয়ার পর মহানবী সা.-এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর এত বেশি বিয়ে আজকের যুগে অস্বাভাবিক মনে হলেও তৎকালীন আরব জগতে এটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। এ ছাড়া আগের নবীদের ইতিহাসে দেখা যায়, হযরত সুলায়মান আ.-এর ৭০০ স্ত্রী ছিল, হযরত দাউদ আ.-এর ৯৯ জন এবং হযরত ইবরাহীম আ.-এর তিনজন ও হযরত ইয়াকুব আ.-এর চারজন অবশেষে হযরত  মুসা আ.-এর চারজন স্ত্রী ছিলেন।

হযরত মুহাম্মদ সা. -এর বিয়ে প্রায় সবগুলোই মানবিক রূপে, এবং কুরআনের একটি আয়াতের বাস্তবায়ন, অথবা ইসলামী শরীয়ায় দু-একটি হুকুম বাস্তবায়ন। এঁদের কেউ কেউ ছিলেন মহানবী সা.-এর বৃহত্তর পরিবারের সদস্য, ফুফাতো বোন অথবা চাচাতো বোন। অনেক বিধবা-অসহায় নারীকে তিনি নিজ স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করেছেন। একজন বাদে কেউই কুমারী ছিলেন না, বরং মহানবী সা.-এর সঙ্গে অনেকের বিয়ে হয়েছিল, যাঁদের অনেক সন্তান ছিল, তা নিয়েই।

নবী সা.-এর এসব বিয়ের মধ্যে কোনো শারীরিক চাহিদাও ছিল না। বরং বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে তিনি বিয়ের মাধ্যমে একটি শক্তি সমাবেশও করে থাকবেন, যা দেখে তৎকালীন কাফের-মুশরিকরাও সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল। ইসলামী শরীয়ায় এ জন্য শারীরিক প্রয়োজনে অধিক স্ত্রী রাখার প্রবণতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সীমারেখায় অনধিক চার স্ত্রী থাকলেও সবার অধিকার আদায় না করতে পারলে তাকে অন্যায় ও জুলুম বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে।

নবীজির সন্তান সমূহ:
নবী মুহাম্মদ সা. এর সন্তান মোট সাতজন মতান্তরে আটজন। হযরত খাদিজার রা.-এর গর্ভে ছয়জন সন্তান আবার কেউ কেউ বলেছেন সাতজন জন্মগ্রহণ করেন এঁদের মধ্যে চার জন মেয়ে এবং দুইজন বা তিনজন ছেলে। আর হযরত মারিয়া কিবতিয়া রা.-এর গর্ভজাত একজন পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেন তিনি হচ্ছেন, ইবরাহীম। 

তাঁদের নাম:
পুত্র এক. হযরত কাসেম (তাঁর নামানুসারে মহানবী সা.-এর উপনাম রাখা হয়েছিল আবুল কাসেম)।
দুই. তাহের (অনেক ঐতিহাসিকগণ বলেছেন, তাঁর নাম ছিল আবদুল্লাহ)।
তিন. ইবরাহীম। (তিনি ছিলেন মারিয়া কিবতিয়া রা.-এর গর্ভজাত সন্তান)।

কন্যা:
এক. ফাতিমা, দুই. জয়নাব, তিন. রুকাইয়া, চার. উম্মে কুলছুম।
ইবরাহীম ছাড়া উল্লিখিত সন্তানদের সবাই ছিলেন খাদিজা রা.-এর গর্ভজাত। মুহাম্মদ সা.-এর এই তিন পুত্রসন্তানের সবাই শৈশবে মারা যান। তবে কাসেম সওয়ারিতে আরোহণ করতে পারতেন, এমন বয়সেই মৃত্যুবরণ করেন।

নবুয়ত-পূর্ব জীবন:
আরবদের মধ্যে বিদ্যমান হিংস্রতা, খেয়ানতপ্রবণতা এবং প্রতিশোধস্পৃহা দমনের জন্যই হিলফুল ফুজুল নামক একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। মোহাম্মাদ এতে যোগদান করেন এবং এই সংঘকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তিনি বিরাট ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় তরুণ বয়সে মোহাম্মাদের তেমন কোন পেশা ছিলনা। তবে তিনি বকরি চড়াতেন বলে অনেকেই উল্লেখ করেছেন। সাধারণত তিনি যে বকরিগুলো চড়াতেন সেগুলো ছিল বনি সা’দ গোত্রের। কয়েক কিরাত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তিনি মক্কায় বসবাসরত বিভিন্ন ব্যক্তির বকরিও চড়াতেন। এরপর তিনি ব্যবসা শুরু করেন। মোহাম্মাদ অল্প সময়ের মধ্যেই একাজে ব্যাপক সফলতা লাভ করেন। এতই খ্যাতি তিনি লাভ করেন যে, তার উপাধি হয়ে যায় আল আমিন এবং আল সাদিক যেগুলোর বাংলা অর্থ হচ্ছে যথাক্রমে বিশ্বস্ত এবং সত্যবাদী। ব্যবসা উপলক্ষ্যে তিনি সিরিয়া, বসরা, বাহরাইন এবং ইয়েমেনে বেশ কয়েকবার সফর করেন। মোহাম্মাদের সুখ্যাতি যখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ তা অবহিত হয়েই তাকে নিজের ব্যবসার জন্য সফরে যাবার অনুরোধ জানান। যুবক মোহাম্মাদ এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং খাদীজার পণ্য নিয়ে সিরিয়ার অন্তর্গত বসরা পর্যন্ত যান।

যুবক মোহাম্মাদের বয়স যখন ৩৫ বছর তখন কা’বা গৃহের পুনর্নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বেশ কয়েকটি কারণে কাবা গৃহের সংস্কার কাজ শুরু হয়। পুরনো ইমারত ভেঙ্গে ফেলে নতুন করে তৈরি করা শুরু হয়। এভাবে পুনর্নির্মাণের সময় যখন হাজরে আসওয়াদ (পবিত্র কালো পাথর) পর্যন্ত নির্মাণ কাজ শেষ হয় তখনই বিপত্তি দেখা দেয়। মূলত কোন গোত্রের লোক এই কাজটি করবে তা নিয়েই ছিল কোন্দল। নির্মাণকাজ সব গোত্রের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু হাজরে আসওয়াদ স্থাপন ছিল একজনের কাজ। কে স্থাপন করবে এ নিয়ে বিবাদ শুরু হয় এবং চার-পাঁচ দিন যাবত এ বিবাদ অব্যাহত থাকার এক পর্যায়ে এটি এমনই মারাত্মক রূপ ধারণ করে যে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এমতাবস্থায় আবু উমাইয়া মাখজুমি একটি সমাধান নির্ধারণ করে যে পরদিন প্রত্যুষে মসজিদে হারামের দরজা দিয়ে যে প্রথম প্রবেশ করবে তার সিদ্ধান্তই সবাই মেনে নেবে। পরদিন মোহাম্মাদ সবার প্রথমে কাবায় প্রবেশ করেন। এতে সবাই বেশ সন্তুষ্ট হয় এবং তাকে বিচারক হিসেবে মেনে নেয়। আর তার প্রতি সবার সুগভীর আস্থাও ছিল। যা হোক এই দায়িত্ব পেয়ে মোহাম্মাদ অত্যন্ত সুচারুভাবে ফয়সালা করেন। তিনি একটি চাদর বিছিয়ে তার উপর নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ রাখেন এবং বিদ্যমান প্রত্যেক গোত্রের নেতাদের ডেকে তাদেরকে চাদরের বিভিন্ন কোণা ধরে যথাস্থানে নিয়ে যেতে বলেন এবং তারা তা ই করে। এরপর তিনি পাথর উঠিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করেন।

নবুওয়ত প্রাপ্তি:
চল্লিশ বছর বয়সে নবী মুহাম্মাদ সা. নবুয়ত লাভ করেন, অর্থাৎ এই সময়েই স্রষ্টা তার কাছে ওহী প্রেরণ করেন। নবুয়ত সম্বন্ধে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় আজ-জুহরির বর্ণনায়। জুহরি বর্ণিত হাদীস অনুসারে নবী সত্য দর্শনের মাধ্যমে ওহী লাভ করেন। ত্রিশ বছর বয়স হয়ে যাওয়ার পর নবী প্রায়ই মক্কার অদূরে হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কাটাতেন। তাঁর স্ত্রী খাদিজা নিয়মিত তাঁকে খাবার দিয়ে আসতেন। এমনি এক ধ্যানের সময় ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল আ. তাঁর কাছে আল্লাহ প্রেরিত ওহী নিয়ে আসেন। জিবরাঈল তাঁকে এই পঙক্তি (কুরআনের আয়াত, সুরা আলাক্ব-এর) কটি পড়তে বলেন:
যার অর্থ-
‘পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।’
উত্তরে নবী জানান যে তিনি পড়তে জানেন না, এতে জিবরাঈল আ. তাকে জড়িয়ে ধরে প্রবল চাপ প্রয়োগ করেন এবং আবার একই পঙক্তি পড়তে বলেন। কিন্তু এবারও মোহাম্মাদ নিজের অপারগতার কথা প্রকাশ করেন। এভাবে তিনবার চাপ দেয়ার পর মোহাম্মাদ পঙক্তিটি পড়তে সমর্থ হন। অবতীর্ণ হয় কুরআনের প্রথম আয়াত গুচ্ছ; সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত। প্রথম অবতরণের পর নবী এতই ভীত হয়ে পড়েন যে কাঁপতে কাঁপতে নিজ গৃহে প্রবেশ করেই খাদিজাকে কম্বল দিয়ে নিজের গা জড়িয়ে দেয়ার জন্য বলেন। বারবার বলতে থাবেন, “আমাকে আবৃত কর”। নওফেল তাঁকে শেষ নবী হিসেবে আখ্যায়িত করে। ধীরে ধীরে আত্মস্থ হন নবী। তারপর আবার অপেক্ষা করতে থাকেন পরবর্তী প্রত্যাদেশের জন্য। একটি লম্বা বিরতির পর তাঁর কাছে দ্বিতীয় বারের মত ওহী আসে। এবার অবতীর্ণ হয় সূরা মুদ্দাস্‌সির-এর কয়েকটি আয়াত। এর পর থেকে গোপনে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন মোহাম্মাদ সা.। এই ইসলাম ছিল জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়ার জন্য প্রেরিত একটি আদর্শ ব্যবস্থা। তাই এর প্রতিষ্ঠার পথ ছিল খুবই বন্ধুর। এই প্রতিকূলতার মধ্যেই নবীর মক্কী জীবন শুরু হয়।

মক্কী জীবন তথা ইসলাম প্রচার লগ্ন:
প্রত্যাদেশ অবতরণের পর নবী সা. বুঝতে পারেন যে, এটি প্রতিষ্ঠা করতে হলে তাকে পুরো আরব সমাজের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়াতে হবে, কারণ তৎকালীন নেতৃত্বের ভীত ধ্বংস করা ব্যতীত ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার অন্য কোনো উপায় ছিল না। তাই প্রথমে তিনি নিজ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের মাঝে গোপনে ইসলামের বাণী প্রচার শুরু করেন। মুহাম্মাদ সা.-এর আহ্বানে ইসলাম গ্রহণকারী সর্বপ্রথম ব্যক্তি ছিলেন হযরত খাদিজা রা. এরপর মুসলমান হন মোহাম্মাদের চাচাতো ভাই এবং তার ঘরেই প্রতিপালিত কিশোর আলী রা.। হযরত আলী রা. ইসলাম গ্রহণের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। ইসলামের বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য নবী সা. নিজ বংশীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সভা করেন, এই সভায় কেউই তাঁর আদর্শ মেনে নেয়নি, এ সভাতে শুধু একজনই ইসলাম গ্রহণ করে, সে হলো হযরত আলী রা.। ইসলাম গ্রহণকারী তৃতীয় ব্যক্তি ছিল নবীর সা.-এর অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং মুসলিম জাহানের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.। এভাবেই প্রথম পর্যায়ে তিনি ইসলাম প্রচারের কাজ করতে থাকেন। এবং এই প্রচারকাজ চলতে থাকে সম্পূর্ণ গোপনে।

প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত:
তিন বছর গোপনে দ্বীনে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার পর মুহাম্মাদ সা. প্রকাশ্যে ইসলামের প্রচার-প্রসার শুরু করেন। এ ধরণের প্রচারের সূচনাটা বেশ নাটকীয় ছিল। নবী সা. সাফা পর্বতের ওপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করে সকলকে সমবেত করেন। এরপর প্রকাশ্যে বলেন যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্‌র রাসূল। কিন্তু এতে সকলে তার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ক্ষেপে যায় এবং এই সময় থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অত্যাচার শুরু হয়।

মক্কায় নবীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপবাদ:
মক্কার কাফির-মুশরিকরা যখন নবী করীম সা.-কে আদর্শিক দিক দিয়ে মুকাবিলা করতে পারছিল না, তখন তারা ভিন্ন পথ খুঁজতে থাকে। তারা ভাবতে থাকে ইসলামের উত্তাল তরঙ্গ কিভাবে স্তব্ধ করা যায়। সে লক্ষ্যে তারা বেছে নেয় গাল-মন্দের পথ ও কুৎসা রটনাসহ বিভিন্ন অশালীন কথার দ্বারা তাঁর নির্মল চরিত্রে কালিমা লেপনের ঘৃণ্য পথ। তাদের বিশ্বাস এ অস্ত্রের আঘাতেই তাঁকে ধরাশায়ী করা সম্ভব। ভিনদেশী লোকেরা দ্বীন গ্রহণ করতে এসে তাঁর বদনাম শুনে ইসলাম গ্রহণ না করে নিজ দেশে ফিরে যাবে। আর যদি তারা যাচাই-বাছাই করতে আসে তাহলে ঘুরে ফিরে তাদের কাছেই তো আসতে হবে। তখন তারা তাদের মগজ ধোলাই করেই ছাড়বে। কাফির-মুশরিক কর্তৃক রাসূলুল্লাহ সা. কে দেয়া গালি ও মিথ্যা অপবাদসমূহ নিম্নে তুলে ধরা হলো।

পাগল এবং কবি:
তারা রাসূলুল্লাহ সা.-কে পাগল বা কবি হিসাবে প্রচার করতে থাকে। যেন মানুষ তার কাছে না যায় এবং তাঁর নিকট অবতারিত ওহী তথা কুরআনুল কারীম থেকে দূরে থাকে। কেননা পাগলের কথায় কেউ কান দেয় না। আর যদি পবিত্র কুরআন কবির কবিতা হয় তাহলে অহির ভিন্ন কোন মর্যাদাও থাকে না। তাই তারা এ নোংরা পথ বেছে নেয়।

যাদুকর ও মিথ্যাবাদী:
নবী করীম সা.-কে তারা জাদুকর ও মিথ্যাবাদী হিসাবে প্রচার করে। কেউ যেন তাঁর কথা না শুনে। পবিত্র কুরআনের বাণী শুনে সকলেই মুগ্ধ হয়ে যেত। আর এটাকেই তারা জাদুকরী প্রভাব বলে সমাজে প্রচার করতে থাকে। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ সা.-কে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করতে পারলে তাঁর প্রচারিত দ্বীন ‘ইসলাম’ কেউ গ্রহণ করবে না। এই ভেবে তারা তাঁকে মিথ্যাবাদী অপবাদ আরোপ করে।

পূর্বকালের উপাখ্যান বর্ণনাকারী:
তাঁর উপর অবতীর্ণ কুরআনুল কারীমকে তারা পূর্ববর্তী লোকদের কল্পকথা বলে প্রচার চালিয়ে ছিল। তারা বলে, এসব আগেকার মানুষের অলিক কাহিনী। পবিত্র কুরআনের ‘আহসানুল কাছাছ’ তথা সর্বোত্তম শিক্ষণীয় ঘটনাগুলোকে তারা অতীতের রূপকথার কাহিনী বলে চালিয়ে দিয়েছিল। যেন পবিত্র কুরআন থেকে মানুষ অনেক দূরে অবস্থান করে। কেউ যেন এর ধারে কাছেও যেতে না পারে। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘তাদেরকে যখন আমার আয়াত সমূহ পাঠ করে শুনানো হয় তখন তারা বলে, আমরা শুনেছি, ইচ্ছা করলে আমরাও এর অনুরূপ বলতে পারি, নিঃসন্দেহে এটা পূর্ববর্তীদের মিথ্যা রচনা (উপকথা) ছাড়া আর কিছু নয়’ (আনফাল ৮/৩১)। আল্লাহ আরো বলেন, ‘তারা বলে, এগুলো তো সেকালের উপকথা, যা সে লিখিয়ে নিয়েছে; এগুলো সকাল-সন্ধ্যায় তার নিকট পাঠ করা হয়’ (ফুরক্বান ২৫/৫)।

অন্যের সাহায্যে মিথ্যা রচনাকারী:
তারা নবী করীম সা.-কে অন্যের সহযোগিতায় মিথ্যারোপকারী বলে প্রচার করতে থাকে। তারা দাবী করে যে, রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রচারিত ধর্ম মিথ্যা। তিনি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকদের সাহায্যে এ মিথ্যা বাণী প্রস্তুত করেছেন।

মিথ্যা রটনাকারী:
রাসূল সা.-কে মিথ্যা রটনাকারী বলে অভিহিত করেছিল। ক্ষেত্র বিশেষে মহান আল্লাহ কখনও কোনো বিধানের পরিবর্তে ভিন্ন কোনো বিধান নাযিল করলে তারা বলত, তিনি মিথ্যা উদ্ভাবনকারী না হলে এরূপ পরিবর্তন কেন হচ্ছে। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আমি যখন কোন এক আয়াত পরিবর্তন করে তার স্থলে অন্য এক আয়াত উপস্থিত করি আর আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেন তা তিনিই ভাল জানেন, তখন তারা বলে, তুমি তো শুধু মিথ্যা উদ্ভাবনকারী; কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না’ (সুরা-নাহাল ১৬/১০১)।

ভবিষ্যদ্বক্তা:
তারা নবী করীম সা.-কে গণক বা ভবিষ্যদ্বক্তা হিসাবে চিত্রিত করতে থাকে। আর এসবের উদ্দেশ্য ছিল মানুষ যেন তাঁর প্রচারিত দ্বীন তথা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। অনেক সময় তাদের মনের মধ্যে লুকিয়ে রাখা কথাগুলো আল্লাহ তা’য়ালা জিবরাঈল আ.-এর মারফতে রাসূলুল্লাহ সা.-কে জানিয়ে দিতেন। তখন তারা বলতো এ তো দেখছি ভবিষ্যদ্বক্তা বা জ্যোতিষী! অথচ নবী সা. যে গণক বা জ্যোতিষী নয় এমর্মে মহান আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই বলেন, ‘অতএব তুমি উপদেশ দিতে থাকো, তোমার প্রভুর অনুগ্রহে তুমি গণক নও, উন্মাদও নও’ (সুরা-তূর ৫২/২৯)।’

ফেরেশতা নয়, এতো সাধারণ মানুষ:
তারা নবী সা.-কে সাধারণ মানুষ বলে তাঁর নবুওয়াতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলে। কেননা তিনি নবী হলে তাঁর সাথে কোন ফেরেশতা নেই কেন, যে তাঁর সত্যায়নকারী হত? তারা মনে করত নবী কোন সাধারণ মানুষ হতে পারে না। তিনি ফেরেশতাদের মধ্যে কেউ একজন হবে।

পথভ্রষ্ট:
তারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হওয়া সত্ত্বেও উল্টো তারাই নবী করীম সা.-কে পথভ্রষ্ট বলে গালি-গালাজ করতো। তাদের দৃষ্টিতে তারাই হক্ব পন্থী এবং নবী করীম সা. ও মুমিনরাই বিপথগামী।

বেদ্বীন:
রাসূলুল্লাহ সা.-কে বেদ্বীন বা ধর্মত্যাগী বলে তাদের প্রচারণা চালাত। ফলে তারা স্বীয় ধর্মীয় লোকদের ক্ষিপ্ত করে তোলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কারণ হিসাবে তারা বলত মুহাম্মাদ সা. পূর্বপুরুষদের ধর্ম ত্যাগ করে নতুন ধর্ম তথা ইসলাম গ্রহণ করে বেদ্বীন হয়ে গেছে। যখন রাসূলুল্লাহ সা. মক্কায় হাজীদের নিকট ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছিলেন, তখন আবু লাহাব তাঁর পিছনে পিছনে বলছিল, ‘তোমরা তাঁর কথা শুনবে না, সে হচ্ছে মিথ্যাবাদী বেদ্বীন’ (আর-রাহীকুল মাখতূম, ১৭তম সংস্করণ ২০০৫ইং, পৃঃ ৮৬)। জাহেলী যুগের মানুষদের প্রচারণায় অবাক না হয়ে পারা যায় না। যিনি বেদ্বীন মানুষকে সঠিক দ্বীন তথা ইসলামে ধর্মে দীক্ষিত করার জন্য নিরলসভাবে দাওয়াতি কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁকেই শুনতে হয়েছে ধর্মত্যাগী নামক নোংরা গালি। এই সব আজগুবি কথা সমাজে কিছু নাস্তিক্যবাদীদের কণ্ঠে বা শ্লোগানে শোনা যায়, তারা কখনো সফল হবে না।

পিতৃধর্ম বিনষ্টকারী এবং জামা’আত বিভক্তকারী:
তারা পূর্ব পুরুষদের ধর্ম বিনষ্টকারী ও ঐক্য বিনষ্টকারী হিসাবে সমাজের মাঝে প্রচারণা চালায়। জাহেলী যুগে কুরাইশ নেতারা রাসূলুল্লাহ সা.-এর চাচা আবু তালিবের নিকট গিয়ে তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন অভিযোগ করে। এ সব অভিযোগ করে ইসলামের দাওয়াতি মিশন নিস্তব্ধ করতে চেয়েছিল। প্রকারান্তরে তারা নবী করীম সা.-কে নিয়ে হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তারা চাচার কাছে অভিযোগ করে যে, আপনার পিতা-পিতামহের বিরোধিতা করছে, আপনার জাতির ঐক্য ছিন্নভিন্ন করছে এবং তাদের বুদ্ধিমত্তাকে নির্বুদ্ধিতা বলে অভিহিত করছে। (তাকে আমাদের হাতে তুলে দিন) আমরা তাকে হত্যা করবো। (আর-রাহীকুল মাখতূম, ১৭তম সংস্করণ ২০০৫ইং, পৃঃ ৯৪)।

যাদুগ্রস্ত:
তারা নবী করীম সা.-কে যাদুগ্রস্ত হিসাবে সমাজে প্রচার করতে থাকে। যেন তার কথায় কেউ কর্ণপাত না করে। কেননা যাদুগ্রস্ত মানুষের কথায় কেউ কর্ণপাত করে না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘যখন তারা কান পেতে তোমার কথা শুনে তখন তারা কেন কান পেতে তা শুনে তা আমি ভাল করে জানি এবং (এটাও জানি) গোপনে আলোচনাকালে যালিমরা বলে, তোমরা তো এক যাদুগ্রস্ত ব্যক্তির অনুসরণ করছো মাত্র’ (সুরা-বনী ইসরাঈল ১৭/৪৭)।

শুধু এই নয় তারা নবীর বিভিন্ন নাম বিকৃত করে বা অস্পষ্ট নাম ব্যবহার করে মনের ঝাল মিটাতে থাকে। কোনো ব্যক্তিকে কষ্ট দেয়ার জন্যই সাধারণত যেভাবে তার নাম বিকৃত করা হয়। এক্ষেত্রে তারাও রাসূলুল্লাহ সা.-কে বিকৃত নাম ধরে ডেকে কষ্ট দিত। আর এভাবেই বিভিন্ন দিকে বিরুদ্ধবাদীরা কয়েকটি স্তরে নবীজি সা.-এর উপর নির্যাতনী কর্মকাণ্ড শুরু করে: প্রথমত উস্কানি ও উত্তেজনার আবহ সৃষ্টি, এরপর অপপ্রচার, কূটতর্ক এবং যুক্তি। এক সময় ইসলামী আন্দোলনকে সহায়হীন করার প্রচেষ্টা শুরু হয় যাকে সফল করার জন্য একটি নেতিবাচক ফ্রন্ট গড়ে উঠে। একই সাথে গড়ে তোলা হয় সাহিত্য ও অশ্লীল গান-বাজনার ফ্রন্ট, এমনকি এক পর্যায়ে মুহাম্মাদ সা.-এর সাথে আপোষেরও প্রচেষ্টা চালায় কুরাইশরা। কিন্তু মুহাম্মাদ সা. তা মেনে নেননি, কারণ আপোষের শর্ত ছিল নিজের মত ইসলাম পালন করা, সেক্ষেত্রে তাঁর ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যই ভেস্তে যেতো।

গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ইসলাম গ্রহণ:
এরপর ইসলামের ইতিহাসে যে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে তা হল উমর ইবনুল খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ। নবী সা. সবসময় চাইতেন যেন আবু জেহেল ও উমরের মধ্যে যেকোনো একজন অন্তত ইসলাম গ্রহণ করে। তার এই ইচ্ছা এতে পূর্ণতা লাভ করে। আরব সমাজে উমরের বিশেষ প্রভাব থাকায় তার ইসলাম গ্রহণ ইসলাম প্রচারকে খানিকটা সহজ করে, যদিও কঠিন অংশটিই তখনও মুখ্য বলে বিবিচেত হচ্ছিল। এরপর একসময় নবীর চাচা হামযা ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণে আরবে মুসলিমদের আধিপত্য কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়।

দুঃখের বছর ও তায়েফ গমন:
কিন্তু মুক্তির পরের বছরটি ছিল মুহাম্মাদ সা. জন্য দুঃখের বছর। কারণ এই বছরে খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তার স্ত্রী খাদিজা ও চাচা আবু তালিব মারা যায়। দুঃখের সময়ে নবী মক্কায় ইসলাম প্রসারের ব্যাপারে অনেকটাই হতাশ হয়ে পড়েন। হতাশ হয়ে তিনি মক্কা বাদ দিয়ে এবার ইসলাম প্রচারের জন্য তায়েফ যান (অবশ্য তায়েফ গমনের তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে)। কিন্তু সেখানে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তিনি চূড়ান্ত অপমান, ক্রোধ ও উপহাসের শিকার হন। এমনকি তায়েফের লোকজন তাদের কিশোর-তরুণদেরকে মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পিছনে লেলিয়ে দেয়, তারা ইট-প্রস্তরের আঘাতে নবীকে রক্তাক্ত করে দেয়। কিন্তু তবুও তিনি হাল ছাড়েননি, নব নব সম্ভাবনার কথা চিন্তা করতে থাকেন।

মি‘রাজ তথা উর্দ্ধারোহন:
এমন সময়েই কিছু শুভ ঘটনা ঘটে। ইসলামী ভাষ্যমতে এ সময় মুহাম্মাদ সা. এক রাতে মক্কায় অবস্থিত মসজিদুল হারাম থেকে জেরুজালেমে অবস্থিত মসজিদুল আকসায় যান, এই ভ্রমণ ইতিহাসে ইসরা নামে পরিচিত। মসজিদুল আকসা থেকে তিনি একটি বিশেষ যানে করে উর্দ্ধারোহণ করেন এবং মহান স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করেন, এছাড়া তিনি বেহেশত ও দোযখসহ মহাবিশ্বের সকল স্থান অবলোকন করেন। এই যাত্রা ইতিহাসে মি’রাজ নামে পরিচিত। 

মদিনায় হিজরত ও মাদানী জীবন:
এরপর আরও শুভ ঘটনা ঘটে। মদিনার বেশকিছু লোক ইসলামের প্রতি উৎসাহী হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। তারা মূলত হজ করতে এসে ইসলামে দাওয়াত পেয়েছিল। এরা আকাবা নামক স্থানে মুহাম্মাদ সা.-এর কাছে শপথ করে যে তারা যে কোন অবস্থায় নবীকে রক্ষা করবে এবং ইসলামে প্রসারে কাজ করবে। এই শপথগুলো ‘আকাবার শপথ’ নামে সুপরিচিত। এই শপথগুলোর মাধ্যমেই মদীনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং একসময় মদীনার বারোটি গোত্রের নেতারা একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণের মাধ্যমে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মদীনায় আসার আমন্ত্রণ জানায়। মদীনা তথা ইয়াসরিবে অনেক আগে থেকে প্রায় ৬২০ সাল পর্যন্ত গোত্র গোত্র এবং ইহুদীদের সাথে অন্যদের যুদ্ধ লেগে থাকে। বিশেষত বুয়াছের যুদ্ধে সবগুলো গোত্র যুদ্ধে অংশ নেয়ায় প্রচুর রক্তপাত ঘটে। এ থেকে মদীনার লোকেরা বুঝতে সমর্থ হয়েছিল যে, রক্তের বিনিময়ে রক্ত নেয়ার নীতিটি এখন আর প্রযোজ্য হতে পারে না। এজন্য তাদের একজন নেতা দরকার যে সবাইকে একতাবদ্ধ করতে পারবে। এ চিন্তা থেকেই তারা মুহাম্মাদ সা.-কে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, যদিও আমন্ত্রণকারী অনেকেই তখনও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। এই আমন্ত্রণে মুসলিমরা মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় চলে যায়। সবশেষে মুহাম্মাদ সা. ও আবু বকর সিদ্দীক রা. ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদীনায় হিজরত করেন। তাদের হিজরতের দিনেই কুরাইশরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল যদিও তা সফল হয়নি। এভাবেই মক্কী যুগের সমাপ্তি ঘটে।

মাদানী জীবন:
নিজ গোত্র ছেড়ে অন্য গোত্রের সাথে যোগদান তৎকালীন এবং বর্তমান আরবেও অসম্ভব হিসেবে পরিগণিত। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সেরকম নয়, কারণ এক্ষেত্রে ইসলামের বন্ধনই শ্রেষ্ঠ বন্ধন হিসেবে মুসলিমদের কাছে পরিগণিত হত। এটি তখনকার যুগে একটি বৈপ্লবিক চিন্তার জন্ম দেয়। ইসলামী পঞ্জিকায় হিজরতের বর্ষ থেকে দিন গণনা শুরু হয়। এজন্য ইসলামী পঞ্জিকার বর্ষের শেষে AH উল্লেখিত থাকে যার অর্থ: After Hijra।

স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও শাসননীতি প্রণয়ন
মুহাম্মাদ সা. মদিনায় গিয়েছিলেন একজন মধ্যস্থতাকারী এবং শাসক হিসেবে। তখন বিদ্যমান দুটি মূল পক্ষ ছিল আওস ও খাযরাজ নামে। তিনি তার দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করেছিলেন। মদীনার সকল গোত্রকে নিয়ে ঐতিহাসিক মদীনা সনদ স্বাক্ষর করেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে রচিত সর্বপ্রথম শাসননীতি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। এই সনদের মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে সকল রক্তারক্তি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এমনকি এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নীতির গোড়াপত্তন করা হয় এবং সকল গোত্রের মধ্যে জবাবদিহিতার অনুভূতি সৃষ্টি করা হয়। আওস ও খাযরাজ উভয় গোত্রই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এছাড়াও প্রধানত তিনটি ইহুদী গোত্র (বনু ক্বাইনুকা, বনু ক্বুরাইজা এবং বনু নাদির)। এগুলোসহ মোট আটটি গোত্র এই সনদে স্বাক্ষর করেছিল। এই সনদের মাধ্যমে মদীনা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হন তার প্রধান।

মক্কার সাথে বিরোধ ও যুদ্ধ:
মদিনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই মক্কার সাথে এর সম্পর্ক দিন দিন খারাপ হতে থাকে। মক্কার কুরাইশরা মদিনা রাষ্ট্রের ধ্বংসের জন্য যুদ্ধংদেহী মনোভাব পোষণ করতে থাকে। মুহাম্মাদ সা. মদিনায় এসে আশেপাশের সকল গোত্রের সাথে সন্ধি চুক্তি স্থাপনের মাধ্যমে শান্তি স্থাপনে অগ্রণী ছিলেন। কিন্তু মক্কার কুরাইশরা গৃহত্যাগী সকল মুসলিমদের সম্পত্তি ক্রোক করে। এই অবস্থায় ৬২৪ সালে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৩০০ সৈন্যের একটি সেনাদলকে মক্কার একটি বাণিজ্যিক কাফেলাকে বাঁধা দেয়ার উদ্দেশ্যে পাঠায়। কারণ উক্ত কাফেলা বাণিজ্যের নাম করে অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করছিল। কুরাইশরা তাদের কাফেলা রক্ষায় সফল হয়। কিন্তু এই প্রচেষ্টার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য যুদ্ধের ডাক দেয়। এই যুদ্ধে মুসলিমরা সৈন্য সংখ্যার দিক দিয়ে কুরাইশদের এক তৃতীয়াংশ হয়েও বিজয় অর্জন করে। এই যুদ্ধ বদর যুদ্ধ নামে পরিচিত যা ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৫ মার্চ তারিখে সংঘটিত হয়। ঐতিহাসিকদের মতে এই যুদ্ধে আল্লাহ তা’য়ালা ফেরেশতার মাধ্যমে মুসলিমদের সহায়তা করেছিলেন। যাহোক, এই সময় থেকেই ইসলামের সশস্ত্র ইতিহাসের সূচনা ঘটে। এরপর ৬২৫ সালের ২৩ মার্চে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিতে হয়। এতে প্রথম দিকে মুসলিমরা পরাজিত হলেও শেষে বিজয়ীর বেশে মদীনায় প্রবেশ করতে সমর্থ হয়। কুরাইশরা বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও চূড়ান্ত মুহূর্তের নীতিগত দূর্বলতার কারণে পরাজিতের বেশে মক্কায় প্রবেশ করে। ৬২৭ সালে আবু সুফিয়ান কুরাইশদের আরেকটি দল নিয়ে মদীনা আক্রমণ করে। কিন্তু এবারও খন্দকের যুদ্ধে মুসলিমদের কাছে পরাজিত হয়। যুদ্ধ বিজয়ে উৎসাহিত হয়ে মুসলিমরা আরবে একটি প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়। ফলে আশেপাশের অনেক গোত্রের উপরই মুসলিমরা প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়।

মদীনার ইহুদিদের সাথে সম্পর্ক:
কিন্তু এ সময় মদীনার বসবাসকারী ইহুদীরা ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দেয়। মূলত ইহুদীরা বিশ্বাস করতনা যে, একজন অ-ইহুদী শেষ নবী হতে পারে। এজন্য তারা কখনই ইসলামের আদর্শ মেনে নেয়নি এবং যখন ইসলামী রাষ্ট্রের শক্তি বুঝতে পারে তখন তারা এর বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিটি যুদ্ধের পরে একটি করে ইহুদী গোত্রের উপর আক্রমণ করেন। বদর ও উহুদের যুদ্ধের পর বনু ক্বাইনুকা ও বনু নাদির গোত্র সপরিবারে মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়, আর খন্দকের পর সকল ইহুদীকে মদিনা থেকে বিতাড়ন করা হয়। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই ইহুদী বিতাড়নের দু’টি কারণের উল্লেখ পাওয়া যায়, একটি ধর্মীয় এবং অন্যটি রাজনৈতিক। ধর্মীয় দিক দিয়ে চিন্তা করলে আহলে কিতাব হয়েও শেষ নবীকে মেনে না নেয়ার শাস্তি ছিল এটি। আর রাজনৈতিকভাবে চিন্তা করলে, ইহুদীরা মদীনার জন্য একটি হুমকি ও দুর্বল দিক ছিল। এজন্যই তাদেরকে বিতাড়িত করা হয়।

মক্কা বিজয়:
দশ বছর মেয়াদি হুদাইবিয়ার সন্ধি মাত্র দু’বছর পরেই ভেঙ্গে যায়। খুযাআহ গোত্র ছিল মুসলমানদের মিত্র, অপরদিকে তাদের শত্রু বকর গোত্র ছিল কুরাইশদের মিত্র। একরাতে বকর গোত্র খুযাআদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। কুরাইশরা এই আক্রমণে অন্যায়ভাবে বকর গোত্রকে অস্ত্র দিয়ে সহয়োগিতা করে। কোনো কোনো বর্ণনামতে কুরাইশদের কিছু যুবকও এই হামলায় অংশগ্রহণ করে। এই ঘটনার পর মুহাম্মাদ সা. কুরাইশদের কাছে তিনটি শর্তসহ পত্র প্রেরণ করেন এবং কুরাইশদেরকে এই তিনটি শর্তের যে কোন একটি মেনে নিতে বলেন। শর্ত তিনটি হলো, কুরাইশ খুযাআ গোত্রের নিহতদের রক্তপণ শোধ করবে। অথবা তারা বকর গোত্রের সাথে তাদের মৈত্রীচুক্তি বাতিল ঘোষণা করবে।

অথবা এ ঘোষণা দিবে যে, হুদায়বিয়ার সন্ধি বাতিল করা হয়েছে এবং কুরাইশরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। উত্তরে কুরাইশরা জানালো যে, তারা শুধু তৃতীয় শর্তটি গ্রহণ করবে। কিন্তু খুব দ্রুত কুরাইশ তাদের ভুল বুঝতে পারলো এবং আবু সুফিয়ানকে সন্ধি নবায়নের জন্য দূত হিসেবে মদিনায় প্রেরণ করলো। কিন্তু মুহাম্মাদ সা. কুরাইশদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন এবং মক্কা আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করলেন।

৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মাদ সা. দশ হাজার সাহাবীর বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কাভিমুখে রওয়ানা হলেন। সেদিন ছিল অষ্টম হিজরীর রমজান মাসের দশ তারিখ। বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘর্ষ ছাড়া মোটামুটি বিনাপ্রতিরোধে মক্কা বিজয় হলো এবং মুহাম্মাদ সা. বিজয়ীবেশে সেখানে প্রবেশ করলেন। তিনি মক্কাবাসীর জন্য সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিলেন। তবে দশজন নর এবং নারী এই ক্ষমার বাইরে ছিল। তারা বিভিন্নভাবে ইসলাম ও মুহাম্মাদ সা. এর কুৎসা রটাত। মক্কায় প্রবেশ করেই মুহাম্মাদ সা. সর্বপ্রথম কাবাঘরে আগমন করেন এবং সেখানকার সকল মূর্তি ধ্বংস করেন। মুসলমানদের শান-শওকত দেখে এবং মুহাম্মাদ সা. এর ক্ষমাগুণে মুগ্ধ হয়ে অধিকাংশ মক্কাবাসীই ইসলাম গ্রহণ করে। কুরআনে এই বিজয়ের ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

বিদায় হজ ও ঐতিহাসিক ভাষণ:
দশম হিজরি। জিলহজ মাস। ২৩ বছর আগে হেরাগুহায় জ্বলে উঠেছিল সত্যের আলো। আজ তা পূর্ণতায় উপনীত। এক কঠিন দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন এ পৃথিবীতে। ২৩ বছর কঠিন পরিশ্রম, সংগ্রাম, অপরিসীম কোরবানি ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল। তা আজ সমাপ্তির পথে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি প্রেরিত হয়েছিলেন মানুষের কাছে দূত হিসেবে তা আজ পূর্ণতার পথে। দীর্ঘ ২৩ বছর তিনি সাধনা করে একটি রাষ্ট্র গঠন করলেন। গঠন করলেন শোষণমুক্ত জুলুমহীন ন্যায়বিচারের সমাজ। গড়ে তুললেন তাওহীদ ভিত্তিক নব সভ্যতার এক নতুন জাতি­ মুসলিম উম্মাহ।
তাই নবী করীম সা. সঙ্গীসাথীসহ হজের উদ্দেশ্যে মক্কা নগরীতে গমন করেন এবং হজ সম্পাদন করেন। আজ লাখো কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে হযরত ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ. যেখানে দাঁড়িয়ে কাবার প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন সেখানে দাঁড়িয়ে এক মুসলিম উম্মাহ গঠনের জন্য মহান আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে দোয়া করেছিলেন। মুসলমানরা আজ মাকামে ইবরাহীমে সমবেত। ৯ জিলহজ রাসূল সা. সব মানুষের সামনে দাঁড়ালেন। মহানবী সা. প্রথমে আল্লাহ তা’য়ালার প্রশংসা করলেন। নবীজির এই ঐতিহাসিক ভাষণ কেয়ামত পর্যন্ত উম্মাহর জন্য পথ ও পাথেয় এবং তা স্বর্ণাক্ষরে খুদাই করে রেখে দেয়া অতীব প্রয়োজন। নিন্মে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণটি পেশ করা হলো। তিনি বললেন, সমবেত জনতা­!

এক.
আজ সকল প্রকার কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস এবং সকল প্রকার অনাচার আমার পদতলে দলিত-মথিত হয়ে গেল।

দুই.
তোমরা তোমাদের দাসদাসীদের সাথে ভালো ব্যবহার করো। তাদের সাথে তোমরা খারাপ ব্যবহার কোরো না। তাদের ওপর নির্যাতন করবে না। তোমরা যা খাবে তাদেরকে তোমরা তা-ই খেতে দিবে। তোমরা যে বস্ত্র পরিধান করবে তাদেরকে তাই পরিধান করতে দিবে। মনে রেখো তারাও মানুষ তোমরাও মানুষ। এরাও একই আল্লাহর সৃষ্টি।

তিন.
সাবধান! নারীদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে। তাদের ওপর কখনো অন্যায়-অত্যাচার করবে না। কেননা তাদের দায়িত্ব তোমাদের ওপরই। তোমাদের যেমন নারীদের ওপর অধিকার আছে। তেমনি তোমাদের ওপরও নারীদের অধিকার আছে। দয়া ও ভালোবাসার মাধ্যমে তাদের সাথে আচরণ করবে।

চার.
আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে না। কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করে সে কুফুরি করল।

পাঁচ.
সুদ, ঘুষ, রক্তপাত, অন্যায়, অবিচার, জুলুম, নির্যাতন করো না। কারণ এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই। আর মুসলমান পরস্পর ভ্রাতৃসমাজ।

ছয়.
তোমরা মিথ্যা বলো না। আর মিথ্যা সব পাপ কাজের মূল। কারণ মিথ্যাই বিপদ ডেকে আনে।

সাত.
চুরি করো না। ব্যভিচার করো না। সর্বপ্রকার মলিনতা হতে দূরে থেকো। পবিত্রভাবে জীবনযাপন করো। সাবধান! শয়তান থেকে তোমরা দূরে থেকো। তোমরা কোনো একটি কাজকে খুব সামান্য মনে করবে, কিন্তু শয়তান এসবের মাধ্যমে তোমাদের সর্বনাশ করিয়ে ছাড়বে।

আট.
তোমরা তোমাদের আমীরের আদেশ অমান্য করবে না। যদিও হাবশি এবং নাক-কান কাটা গোলাম হয়। তোমরা তার আনুগত্য করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত সে আল্লাহর দ্বীনের ওপর অটল থাকবে।

নয়.
ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। কারণ তোমাদের পূর্ব-পুরুষেরা এই কারণে ধ্বংস হয়েছে।

দশ.
বংশের গৌরব করো না। যে ব্যক্তি নিজ বংশকে হেয়প্রতিপন্ন করে অপর বংশের পরিচয় দেয় তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ।

একাদশ.
তোমরা তোমাদের প্রভুর এবাদত করবে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে। রোজা রাখবে, তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলবে, তবেই তোমরা জান্নাতি হতে পারবে।

দ্বাদশ.
আমি আমার পরে তোমাদের জন্য যা রেখে যাচ্ছি তা তোমরা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে রাখবে। তার ওপর আমল করবে। তাহলে তোমাদের পতন ঘটবে না। আর তা হচ্ছে আল্লাহর কুরআন ও নবীর সুন্নত।

ত্রেয়দশ.
তোমরা ভালোভাবে জেনে রাখো আমিই সর্বশেষ নবী আমার পরে আর কোনো নবী আসবে না। আমিই আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। আমার এই সকল বাণী তোমরা যারা শুনেছ তারা যারা অনুপস্থিত তাদের নিকট পৌঁছে দিবে।

মহানবী সা. তাঁর ভাষণ শেষ করলেন। এবং তাঁর চেহারা মোবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি করুণ স্বরে করুণভাবে আকাশ পানে তাকালেন এবং তিনি বললেন, ‘হে মহান প্রভু! হে পরওয়ার দিগার! আমি কি তোমার দ্বীনের দাওয়াত পরিপূর্ণভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছি।’ তখন উপস্থিত জনতা সবাই সম্মিলিতভাবে বললেন, নিশ্চয়ই আপনি আপনার দ্বীন পরিপূর্ণভাবে পৌঁছাতে পেরেছেন। তখন তিনি আবার বললেন যে, ‘হে প্রভু! আপনি শুনুন, আপনি সাক্ষী থাকুন, এরা বলেছে আমি আপনার দ্বীনকে লোকদের নিকট পৌঁছাতে পেরেছি। আমি আমার কর্তব্য পালন করতে পেরেছি। ভাবের অতিশয্যে নবী নীরব হলেন। জান্নাতি নূরে তাঁর চেহারা আলোকদীপ্ত হয়ে উঠল। এই মুহূর্তে কুরআনের শেষ আয়াতটি নাজিল হয়। ‘আজকের এই দিনে তোমাদের দীনকে পূর্ণ করে দিলাম। তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত পূর্ণ করে দিলাম। ইসলামকেই তোমাদের ওপর দীন হিসেবে মনোনীত করলাম। অতঃপর হযরত মুহাম্মাদ রাসূল সা. কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। সকল সাহাবারা নীরব। কিছুক্ষণ পর হযরত নবী করীম সা. জনতার দিকে তাকালেন এবং করুণ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন­ বিদায় বন্ধুগণ, বিদায়।

নবীজি সা.-এর ওফাত:
বিদায় হজ থেকে ফেরার পর হিজরী ১১ সালের সফর মাসে হযরত মোহাম্মদ সা. ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হন। জ্বরের তাপমাত্রা প্রচণ্ড হওয়ার কারণে পাগড়ির ওপর থেকেও উষ্ণতা অনুভূত হচ্ছিল। অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি এগারো দিন নামাজের ইমামতি করেন। ধীরে ধীরে অসুস্থতা তীব্র হওয়ায় তিনি হযরত আবু বকর রা. কে ইমামতি করার জন্য নির্দেশ দেন আবু বকর রা. নবীজির জীবদ্দশায় প্রায় অনেক দিন নামাজের ইমামতি করেন। অতঃপর যখন রাসুল সা. এর আয়ুকাল সমাপ্তির সন্নিকটে পৌঁছায় তখন নিজের মধ্যে কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন তাই তিনি সকল স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে হযরত আয়েশা রা.-এর কামরায় অবস্থান করেন। সেদিন হযরত আয়েশা রা.-এর নিকট সাত কিংবা আট দিনার মওজুদ ছিল নবী সা. মৃত্যুর একদিন পূর্বে এগুলোও দান করে দেয়ার হুকুম দেন। বলা হয় এই অসুস্থতা ছিল খাইবারের এক ইহুদি নারীর তৈরি বিষ মেশানো খাবার গ্রহণের কারণে। অবশেষে এগারোতম হিজরী সনের রবিউল আউয়াল মাসের বারোতম তারিখ সন্ধ্যায় তিনি মৃত্যবরণ করেন। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। নবীজির জামাতা হযরত ফাতেমা হযরত আলী রা. তাঁকে গোসল দেন এবং কাফন পরান। হযরত আয়েশা রা.-এর কামরার যে স্থানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, জানাযার পর সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।

প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ব্যখ্যা, সমাজের কোন অমীমাংসিত বিষয়ে ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, কোরআনের আয়াতের তাৎপর্য কিংবা অন্য যেকোন ধর্মের কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সর্বপরি মানব জীবনের সকল দিকে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে লিখুন আপনিও- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড