• শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

সুদের হার ৬% - ৯ % ধরে রাখা যাচ্ছে না বলেই কি পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হবে ?

  মাইনুল হোসেন আসিফ

১৯ জুন ২০২২, ১৪:৩৭
টাকা

ব্যবসা বান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ত্বরান্বিত করার লক্ষে সরকার গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদের হার এক ডিজিটে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সাথে আলোচনা করে ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে এবং আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশ নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রথমে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে কিছুটা সন্দেহ থাকলেও সকলের সহযোগিতায় সরকার সফলভাবে ৬-৯ নীতি বাস্তবায়ন করতে সমর্থ হয়। ৬-৯ নীতি বাস্তবায়নের সমসাময়িক সময়ে হানা দেয় মাহামারি করোনা যা প্রতিষ্ঠিত সকল অর্থনৈতিক নিয়মনীতিকে অকার্যকর করে দেয়। অর্থনীতি, জীবন-জীবিকাকে টিকিয়ে রখতে সরকারকে ব্যাপক মাত্রায় হস্তক্ষেপ করতে হয়। উৎপাদন কার্যক্রম বজায় রাখার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বিপুল অংকের অর্থ অর্থনীতিতে পুশ করা হয়। ঋণের চাহিদা কমে আসে। বৈদেশিক বাণিজ্য, অভ্যন্তরীণ চাহিদা সবকিছু তলানিতে থাকায় ব্যবসায়ীরাও নতুন করে বিনিয়োগ করেনি। বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির হার কমে আসে। চাহিদা না থাকায় ঋণের সুদহার ৭ শতাংশ পর্যন্ত নেমে আসলেও প্রতিকূল পরিস্থিতি বিবেচনায় তেমন বিনিয়োগ হয়নি দেশে। অর্থাৎ সরকারের ঋণের সুদ এক ডিজিটে নামিয়ে নিয়ে আসার যে প্রকৃত উদ্দেশ্য তা বৈশ্বিক মহামারীর কারণে বাস্তব হয়নি।

এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি পক্ষ প্রচারণা চালাচ্ছে যে সুদহার কমানোর পরও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়নি, যেখানে সুদহার ১২-১৩ শতাংশ থাকাকালীন বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৭-১৮ শতাংশ পর্যন্ত ছিল, সুতরাং সুদহারের সঙ্গে বিনিয়োগ বৃদ্ধির তেমন কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু তারা যে বিষয়টিকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করছেন তা হল করোনার কারণে ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে স্থবিরতা। বিশ্ব অর্থনীতির সাথে তাল মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিও যখন করোনার ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে। আমদানি, রপ্তানী, অভ্যন্তরীন চাহিদা সবকিছুতে গতি সঞ্চার হতে শুরু করেছে ঠিক তখনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দামামা সবকিছুকে একদম ওলটপালট করে দিয়েছে। বিশ্ব বাজারে আমদানি পণ্যের দাম রেকর্ডের পর রেকর্ড ভাঙছে। যার প্রভাব অভ্যন্তরীন বাজারে পড়তে বাধ্য এবং তাই হয়েছে। দেশের মূল্যস্ফীতির পরিমান বিশ্ব বাজারের ন্যায় লক্ষ্য মাত্রার থেকে অনেকখানি ছাড়িয়ে গিয়েছে। অর্থনীতির স্বাভাবিক সূত্র অনুযায়ি আমানতের সুদের হার গড় মূল্যস্ফীতির ওপরে থাকা বাঞ্চনীয়।

সুতরাং আমানতের সুদের হার আর ৬ শতাংশে বেধে রাখা যাচ্ছেনা, আর এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুস্পষ্ট নির্দেশনাতো আছেই যে মেয়াদি আমানতের সুদের হার গড় মূল্যস্ফীতি পর্যায়ের নিচে নামানো যাবেনা। যেহেতু আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে বেধে রাখা যাচ্ছেনা তাই ঋণের সুদহারও আর ৯ শতাংশে বেধে রাখা যাবেনা। এ জন্য দুটোকেই (৬-৯ হার) ছেড়ে দিতে হবে। ইতোমধ্যে আমানত ও ঋণের সুদহারের সীমা তুলে দেওয়া নিয়ে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো বেধে রাখা যাচ্ছেনা বলেই কি পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হবে কি? পশ্চিমা ঘরোনার অর্থনীতিবিদদের তরফ থেকে দাবি এসেছে ঋণের সুদের হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেবার। তারা প্রথম থেকে ঋণের সুদহার বেধে দেবার বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন, যদিও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারের দৃঢ়তার কাছে তাদের এই অবস্থান তেমন সুবিধা করতে পারেনি।

কিন্তু এবার তাদের অবস্থান পূর্বের তুলনায় অনেকবেশি শক্তিশালী এবং সরকারও সম্ভবত কিছুটা নমনীয় তাদের কথা শুনতে। সবাই প্রশ্ন করছেন আমানতের সুদহার নিয়ে, কিন্তু কেউ এই প্রশ্ন করছেন না ব্যাংকের পরিচালনা ব্যয় কেন এত বেশি। আমানতের ও ঋণের সুদহারের পার্থক্য কেন ৩ শতাংশ, কেন ১.৫ বা ২ শতাংশ নয়। আর ব্যাংক ঋণ গ্রহীতার কাছ থেকে কি শুধুমাত্র ঋণের সুদ আদায় করে? ঋণের সুদ ছাড়াও সার্ভিজ চার্জ, প্রসেসিং ফি, স্টেটমেন্টর জন্য ফি বিভিন্ন নামে যে অর্থ আদায় করে তাতে ঋণের প্রকৃত সুদহার আরও দুই শতাংশ বেশি হয়। ব্যাংকগুলোতে পরিচালনা ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা গেলে, এই প্রতিক‚লম্বা সময়ে আমানতের সুদহার গড় মূল্যস্ফীতির ওপর রেখেও ব্যাংকের পক্ষে মুনাফা অর্জন সম্ভব।

একটি বিষয় আমাদের মাথায় রাখা প্রয়োজন, বিদ্যমান যে সংকট তা দ্রুতই কেটে যাবে আশা করা যায়। মূল্যস্ফীতিও লক্ষ্যমাত্রার নীচে নেমে আসবে। কিন্তু এত দেন দরবার করে এক ডিজিটের ঋণের হার বাস্তবায়ন করা হলো তা পুনঃরায় আর করা যাবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বিনিয়োগ বাড়ানোর যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সরকার এই নীতি বাস্তবায়ন করেছিল তা প্রমাণের সুযোগ পাওয়ার আগেই যদি উঠিয়ে দেওয়া হয় তবে ভবিষ্যতে ঋণের সুদ বিষয়টি নিয়ে কোন বড় রকমের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের অবস্থান অনেক দূর্বল হয়ে যেতে পারে। একবার ছেড়ে দিলে আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির থেকে সর্বোচ্চ এক-দুই শতাংশ বেশি হবে কিন্তু ঋণের সুদহার কোথায় গিয়ে দাড়াবে তার কোন সীমানা থাকবে না।

গত কয়েক মাসে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধিতে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল তা আবার নেমে যেতে পারে। তাছাড়া আমানতের সুদহার ১ শতাংশ বাড়ালেই বিদ্যমান মূদ্রাস্ফীতিকে কভার করা সম্ভম। সুতরাং সুদের হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেবার যে আলোচনা চলছে তাতে হুবহু কর্ণপাত না করে বিদ্যমান নীতির মধ্যে থেকে যতটুকু আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা যায় তা করতে হবে। কারণ কেবল ব্যাংক ব্যবসা সফল হলেই অর্থনীতি ভাল হবে তা ভাবার কারণ নেই। বিনিয়োগ বান্ধব না হলে কর্মসংস্থান র্সষ্টি হবেনা যেটি হবে সরকারের জন্য আরেক চ্যালেঞ্জ। ব্যবসা এবং ব্যাংকিং ব্যবসাসর মধ্যে সমন্বয় এবং ভারসাম্য থাকা মঙ্গলজনক।

লেখক: মাইনুল হোসেন আসিফ

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড