• বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৭ আশ্বিন ১৪২৮  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ ; আত্মকথায় অমর্ত্য সেন 

  ড. সিদ্ধার্থ শংকর জোয়ার্দ্দার

০১ আগস্ট ২০২১, ১২:৫৮
dggf
ড. সিদ্ধার্থ শংকর জোয়ার্দ্দার (ছবি : দৈনিক অধিকার)

১ ১৯৯৮ সাল। লন্ডনে বিবিসি-র এক ইন্টারভিউতে প্রশ্নকর্তা জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি আপনার নিবাস কোথায় বলে মনে করেন”? “পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে আপনার অবস্থান--হার্ভার্ড থেকে ট্রিনিটি। ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকা। আবার আপনার পাসপোর্টে ভারতীয় নাগরিকত্ব, যেখানে ভিসায় পুরো পাসপোর্টটা পরিপূর্ণ। কাজেই আমরা আপনার বাড়ি কোথায় বলে আমি ধরে নেবো”? সে সময় তিনি ছিলেন ট্রিনিটি-তে। যে কারণে তিনি উত্তর দিলেন, “এখন যেহেতু আমি এখানে তাই ধরে নিন এটাই এখন আমার বাড়ি”। “ট্রিনিটি-তে একসময় ছিলাম ছাত্র, গবেষক, রিসার্চ ফেলো, আবার শিক্ষকও। আবার সাথে সাথে এটাও বলতে হবে, ম্যাসাসুটস-এর হার্ভার্ড স্কয়ারের পুরনো বাড়িটাই আমার ঠিকানা। তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে আমাকে এটাই বলতে হবে আমার বাড়ি ভারতবর্ষ বলতেই আমি সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবো, বিশেষ করে শান্তিনিকেতনের সেই ছোট্ট বাড়িটা যেখানে আমি বার বার ফিরে যায়”। অবশ্য এই ধরনের বেশ বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরে প্রশ্নকর্তা বেশ খানিকটা অস্বস্তির সাথে বলেন, “মনে হচ্ছে বাড়ির ধারণা সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বড্ড অপ্রতুল”। তবে প্রশ্নকর্তা যাই ভাবুন না কেন, বাঙালির ইতিহাসে যে কয়জন মানুষ বিশ্বনাগরিক হয়ে উঠেছেন তাঁদের অন্যতম হচ্ছেন নোবেল বিজয়ী দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। বাবা আশুতোষ সেনের বাড়ি ছিল মানিকগঞ্জে এবং তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক। দাদু ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন খুবই নামকরা পণ্ডিত ও ইতিহাসবিদ এবং বিশ্বভারতীর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বল্পকালীন উপাচার্য। ক্ষিতিমোহনের বাড়ি ছিল বিক্রমপুরে যিনি জীবনের একটা বড় অংশে শান্তিনিকেতনে অধ্যাপনা করেন। ক্ষিতিমোহন ১৯০২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃতে এম এ করেন। রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে তিনি ১৯০৮ সালে শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মাচার্য আশ্রমের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। সে কারণে বলা চলে পিতৃভূমি এমনকি মাতৃকূলের নিবাস পূর্বতন বাংলায়। অধ্যাপক সেন গর্বভরে সেকথা উচ্চারণ করেছেন বারংবার তাঁর লেখায়।

৮ জুলাই পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত অমর্ত্য সেনের আত্মজীবনী Home in the World: A Memoir শুরু হয়েছে এমনই সব প্রশ্নোত্তর দিয়ে। অমর্ত্য সেনের প্রতি আগ্রহ অনেকের মতো আমারও। আগ্রহটা তাঁর অর্থনৈতিক ও গাণিতিক ধারণা নিয়ে নয় বরং সমাজ, নৈতিকতা, বৈষম্য, উন্নয়ন, এবং সমাজতাত্বিক চেতনাবোধ সম্পর্কে তাঁর অভূতপূর্ব বিশ্লেষণ নিয়ে। ভারতবর্ষের সামাজিক বিবর্তন নিয়ে তাঁর লেখা Argumentative Indian আমার মনোযোগ কাড়ে দেড় দশক আগে। ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থা কীভাবে একটা দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে সেটা তিনি দেখিয়েছেন তাঁর এই গ্রন্থে। তা ছাড়া পশ্চিমা সংস্কৃতির সাথে পূবের মিল-অমিল নিয়ে সুবিস্তার আলোচনা আছে এখানে, সাথে আছে রবীন্দ্র ভাবনার দশ-দিগন্ত। ইত্যাদি কারণে সদ্য প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনীর প্রতি আমার কৌতূহল বড্ড মাত্রাতিরিক্ত। অতি অল্প সময়ে বইটা হাতে পেয়ে কৌতূহলের মাত্রা আমার মনে রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি তৈরি করে; আমার ধারণা, যে কেও বইটা হাতে পেলে তারও আমার মতো মানসিক অবস্থা তৈরি হবে।

যারা নীরদ সি চৌধুরীর Autobiography of an Unknown Indian পড়েছেন কিম্বা জহ্বরলাল নেহেরুর An Autobiography পড়েছেন তাঁরা নিশ্চয় জানেন একটা আত্মজীবনী তখনই বিশ্বমাত্রা পায় যখন ব্যক্তিগত কথন ছেড়ে তা ইতহাস, দর্শন, অর্থনীতি কিম্বা সামাজিক অবস্থার স্রোতের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে। সাথে সাথে সেটা ব্যক্তিক ও নৈব্যক্তিকতার মাঝে অপরিহার্য বন্ধন তৈরি করলে তখন সেটা ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে ওপরের দু’জন থেকে অমর্ত্য সেনের পার্থক্য হল তাঁরা দু’জনেই আত্মজীবনী লিখেছেন অপরিণত বয়সে, নীরদ ৫৪ বছরে, নেহেরু ৪৭ এ। সেদিক থেকে ৮৮ বছর বয়স পেরিয়ে লেখা অধ্যাপক সেনের আত্মজীবনী জীবনের একটা পরিপূর্ণ দালিলিক রোমাঞ্চকর পরিবেশনা। রবীন্দ্রনাথের পর অমর্ত্য সেন ছাড়া সম্ভবত অন্য কোন বাঙালি পশ্চিমা দেশে এতোটা বিচিত্রমুখী প্রভাব ফেলতে পারেনি। এক্ষেত্রে অমর্ত্য সেনের বিশেষত্ব হচ্ছে ইউরোপ এবং আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য, বঞ্চনা, বৈষম্য, বণ্টন, সামাজিক সমতা, নৈতিকতা, ভারতবর্ষ, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক ডিলেমা, ন্যায়, নীতি, অথবা ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, নিয়ে তিনি ব্যাপক আলোচনা করেছেন। এটা কোন বাঙালির ক্ষেত্রে বিরল ঘটনা।

দীর্ঘ জীবনের কোল ঘেঁষে সাপের মতোন তাঁর জীবন-ইতিহাস এগিয়েছে। এবং এক্ষেত্রে তিনি উপভোগ করেছেন সমস্ত কাল পার্বিক চড়াই-উৎরাই। ১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করা অমর্ত্য সেন জীবন গঠনের মুহূর্তগুলো কাটিয়েছেন ঢাকা ও শান্তিনিকেতনে। কিছুটা সময় বাবার চাকরির সুবাদে বার্মাতে। একারণে তাঁর জীবন প্রভাতে যে পূর্ব দিগন্তের সূর্য আলো ফেলেছিল তার বিস্তার পশ্চিম প্রান্তকেও বিভাষিত করেছে। কিছুতেই ভুলতে পারননি ঢাকার উয়ারি, লক্ষ্মীবাজার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, আর নারায়ণগঞ্জ থেকে মানিকগঞ্জ যাওয়ার নদী পথের অপূর্ব সব অভিজ্ঞতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নাম দিয়েছিলেন অমর্ত্য। তিনি ভেবেছিলেন, এ ছেলে সত্যি একদিন এই মর্ত্যলোক-কে জয় করবে! কথাটা যে খুব একটা মিথ্যা না সেটা যারা অমর্ত্য সেনকে জানার চেষ্টা করেছেন, তারা উপলব্ধি করবেন।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা, ইংরেজ শাসন, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, এবং অবশ্যই প্রতি পদে পদে রবীন্দ্রনাথের গল্প স্থান পেয়েছে আত্মজীবনীতে। তবে বড় একটা অংশ হচ্ছে একজন বাঙালির বিশ্বসভায় আসন করে নেয়ার ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথ(মৃত্যুকালে অমর্ত্য সেনের বয়স ছিল ৮ বছর) এবং তাঁর দাদু ক্ষিতিমোহন সেন কীভাবে তাঁর জীবন ও চিন্তা গঠনে ভূমিকা রেখেছেন তা তিনি বর্ণনা করেছেন পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য ও বাংলা ভাষার ওপর দখল নিয়েই তিনি ইংরেজি ভাষার ওপর পূর্ণাঙ্গ অধিকার নেন। Home in the World জীবনের নানাবিধ পরিণতির একটা সমন্বিত ফলাফল। ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের চার দেয়ালের ভেতর শুরু হওয়া জীবন এগিয়েছে প্রেসিডেন্সী কলেজের মধ্য দিয়ে। এখানে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পরীক্ষায় অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। সালটা ১৯৫১। ১৯৫৫ সালে তিনি ক্যামব্রিজের ট্রিনিটি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে প্রথম হন। ১৯৫৫-৫৬ সালে তিনি ক্যামব্রিজ থেকে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। এর পরপরই তিনি দেশে ফিরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন বিভাগ অর্থনীতির প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি যাদবপূরে ঐ বিভাগে অধ্যাপনা শেষে ট্রিনিটি-তে আবার দর্শন পড়েন। সামাজিক চয়ন তত্ত্ব, নৈতিক দর্শন, গাণিতিক যুক্তিবিজ্ঞান, ছাড়াও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল অসমতা, বঞ্চনা এবং ন্যায্যতা নিয়ে একটা সামগ্রিক দার্শনিক বোধ তৈরি করা। তিনি সেটা করেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। যার পরিণতি হিসেবে তিনি দার্শনিক অর্থনীতি-বিজ্ঞানের ওপর অর্থনীতিতে নোবেল পুরষ্কার পান। দর্শনের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ জন্মে প্রেসিডেন্সী থেকেই। একসময় তিনি আমেরিকান অর্থনীতিবিদ কেনিথ অ্যারো-র Social Choice and Individual values পড়ে দারুণ অনুপ্রাণিত হন। ১৯৬০-৬১ সালে ট্রিনিটি থেকে ছুটি নিয়ে ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি-তে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। এখানে তিনি অর্থনীতিবিদ পল স্যামুয়েলসন, রবার্ট সোলো, নরবাট ওয়েনার, ফ্রাঙ্কো মডিগিলানি প্রমুখ অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিকদের সম্পর্কে জানার ব্যাপক সুযোগ পান। এর ভেতর ১৯৬৪-৬৫ তে বার্কলির ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়াতেও অধ্যাপনা করেন। এরপর ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত বিখ্যাত কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে পড়ান। তা বাদে তিনি দুই দফায় দিল্লী স্কুল অব ইকনমিক্স-এ আধ্যাপনা করেন যথাক্রমে ১৯৬৩ ও ১৯৭১ সালে। এই ৭১ সালেই তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সের অধ্যাপক হন। সেখানে ছিলেন ১৯৭৭ পর্যন্ত। ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত অক্সফোর্ডে অর্থনীতি পড়ান। এর পরপরই তিনি হার্ভার্ড-এ যোগ দেন। ১৯৯৮ সালে তিনি আবার ট্রিনিটি-তে ফেরত আসেন। ২০০৪ সালে তিনি আবার ফেরত যান হার্ভার্ড–এ। ইতিহাসের অতি পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয় বিহারের নালান্দা-তে তাঁকে উপাচার্য নিয়োগ দেয় ভারত সরকার। এর আগে ২০০৭ সালে তাঁকে নতুন রূপে একটা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু করানোর জন্য নালান্দা মেন্টর গ্রুপের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। পৃথিবীর প্রাচীন ইতালির বোগনা বিশ্ববিদ্যালয়য় থেকেও নালান্দা বিশ্ববিদ্যালয় পুরনো। একসময় বৌদ্ধ দর্শন পড়তে এখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেকেই আসতেন। অধ্যাপক সেনের ব্যক্তিগত জীবন খুব বেশি একটা সরলরেখার মতো না। প্রথম স্ত্রী সাহিত্যিক নবনিতা দেব সেন একজন ভারতীয় লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাঁদের দুই কন্যা অন্তরা ও নন্দনা। অন্তরা একজন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান জা র্নালিস্ট আর নন্দনা বলিউড অভিনেত্রী। ১৯৭১ সালে লন্ডনে চলে গেলে সেনের সাথে নবনিতার বিচ্ছেদ ঘটে। দ্বিতীয় স্ত্রী ইভা কলরনি ছিলেন ইতালীয় জিউস অর্থনীতিবিদ। তাঁদের ছিল দুই সন্তান। মেয়ে ইন্দ্রানি নিউইয়র্ক ভিত্তিক সাংবাদিক আর ছেলে কবির ক্যাম্ব্রিজ, ম্যাচাসুটস-এর স্যাডি হিল স্কুলের শিক্ষক। ইভা ১৯৮৫ সালে ক্যান্সারে মারা গেলে তৃতীয়বার বন্ধনে আবদ্ধ হন হার্ভার্ড প্রফেসর ইমা রথচাইল্ড-এর সাথে। ইমা হার্ভার্ডে ইতিহাস পড়ান। ম্যাসাসুয়েটস ছাড়াও ইংল্যান্ডের ক্যমাব্রিজে তাঁর বাড়ি আছে। এবং অবশ্যই তাঁর বাড়ি শান্তিনিকেতনের “প্রতীচী”। এসব থেকে সহজেই অনুমান করা যায় অমর্ত্য সেনের বাড়ি কোথায়, এটার উত্তর কী হতে পারে? বরং বিবিসি-র প্রশ্নকর্তার প্রশ্নটা হওয়া উচিৎ ছিল, আপনার বাড়িটা কোথায় বলে আপনি মনে করেন না? কাজেই যে উত্তর অমর্ত্য সেন প্রশ্নকর্তাকে দিয়েছেন তার অন্যথা হলে বরং মন্দ হতো।

২ লন্ডনের পত্রিকা The Spectator এর কলামিস্ট ফিলিপ হেইন্সার গেল সপ্তাহে Home in the World আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন “In a captivating autobiography, Sen describes the thrill of growing up in a city teeming with bookshops and fierce intellectual debate”।বইয়ের কাভার ইমেজে অমর্ত্য সেন ব্যবহার করেছেন তাঁর ১৯৪৮ সালে শান্তিনিকেতনে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছবি। সাথে আছে বোন সুপর্ণা এবং কাজিন মিরা। তিনি ইচ্ছে করে শেষ বয়সের ছবি দেননি, দেননি অক্সফোর্ড কিম্বা কেমব্রিজের ছবি। এমনকি হার্ভার্ড কিম্বা এমআইটির কোন ছবিও। তিনি ব্যবহার করেছেন শান্তিনিকেতনের অনেক পুরনো একটা ছবি যেটা প্রতীকী অর্থে ধরলেও বেমানান হবে না যে তাঁর চাহনি ছিল বিশ্বভূমির দিকে। ঐটুকু জানালার ফাঁক দিয়ে তিনি বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন বিশ্বালোকে। ঠিক রবিঠাকুর যেমনটি নিজের জীবন সম্পর্কে যেমনটি বলেছিলেন, “সেদিন জীবনের ছোটো গবাক্ষের কাছে/ সে বসে থাকত বাইরের দিকে চেয়ে।/ তার বিশ্ব ছিল/ সেইটুকু ফাঁকের বেষ্টনীর মধ্যে”। সেই ছোট্ট ছেলেটি রবীন্দ্রনাথ জানালার ক্ষুদ্র বেষ্টনী ভেঙে যেমন বেরিয়ে পড়েছিলেন পূর্ব-পশ্চিম প্রান্ত আলোকিত করে অমর্ত্য সেন ঠিক তেমনি এই জানালা দিয়েই দেখতে পেয়েছিলেন পশ্চিমের আলো।

কলকাতা থেকে বিলেতে পড়ার আপাত অসম্ভব ব্যাপারটা সম্ভব হয়েছিলো বাবা আশুতোষ সেনের মনোবলের জন্য। অসম্ভব ছিল এই জন্য যে বিলেতে পড়ার খরচ নির্বাহ করার মতো সামর্থ্য ছিল না তাঁর। তারপরেও অনেক হিসেব করে বাবা দেখলেন লন্ডনে তিন বছর পড়ার খরচা তিনি জোগাড় করে ফেলবেন। সেসময় লন্ডনে বিশেষ কোন স্কলারশিপের প্রচলন ছিল না। ট্রিনিটি-তে ভর্তির উদ্দেশ্যে আবেদন করার অল্প কিছু পরেই তারা আরও কিছু ভালো আবেদনের প্রেক্ষিতে তাঁকে না করে দেয়। এর ফলে বলেত পড়া আপাত অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কিন্তু কিছু ছাত্র ভর্তি না হওয়ার ফলে সুযোগ আসে। ট্রিনিটির দিনগুলো ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। ভারতবর্ষে পড়াশুনার সময় যেসব অর্থনীতিবিদদের লেখা পড়ার সুযোগ হয়েছিলো সেসব অর্থনীতিবিদদের কাছে সরাসরি জানার অপূর্ব সুযোগ পেয়ে ভীষণ আপ্লুত হন অমর্ত্য সেন। তবে শিক্ষক হিসেবে তিনি চেয়েছিলেন অর্থনীতিবিদ মরিস ডব কিম্বা পিয়েরো শ্রাফা-কে। প্রাথমিকভাবে তিনি পেলেন অপেক্ষাকৃত তরুণ কেনিথ বেরিলকে। বেরিলের সাথে খুব সময়ের ভেতরেও তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যার ফলে খুব কম সময়ের ভেতরে ট্রিনিটিকে তিনি আপন করে নেন। একসময়ের আইজ্যাক নিউটন, ফ্রান্সিস বেকন কিম্বা টমাস ম্যাক্কুলি-র ট্রিনিটি তাঁর কাছে হয়ে উঠে অতি আপন। বিশ্বের নামকরা অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিকদের সাথে তাঁর সখ্য গড়ে উঠার পেছনে ছিল তাঁর অসম্ভব বিচক্ষণতা। দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা পাল্টে দেন তিনি। শুধু খাদ্যের অভাবেই দুর্ভিক্ষ হয়না, দুর্ভিক্ষ হয় সুসম বণ্টনের অভাবেও। নিজের চোখে শান্তিনিকেতনে তিনি দেখেছেন দুর্ভিক্ষের

৩ Home in the world শুধু একজন নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদের আত্মজৈবনিক কথনই নয়, একজন দার্শনিকের পশ্চিম দেশের অধ্যাপনা করার সংগ্রামই নয় অথবা ইউরোপ-আমেরিকার সামাজিক অবস্থা বর্ণনা করার জন্যও নয়–বরং প্রায় শতবর্ষের ভারতবর্ষ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক গতি প্রকৃতি সাথে বিশ্বের বহু দাশনিক ও অর্থনীতিবিদদের চিন্তার এক অনন্য দলিল বইটা। ভারতীয় প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য “মেঘদূত” কিম্বা “মৃচ্ছকটিক” থেকে ন্যায়, নীতি, উপদেশ নিয়েছেন তিনি, উপদেশ নিয়েছেন স্কটিশ দাশনিক ডেভিড হিউম, কিম্বা কেমব্রিজের ভিটগেন্সটাইনের অথবা আমেরিকান প্রেগমেটিস্ট-দের কাছ থেকে। তিনি আলোচনা করেছেন মার্ক্সসীয় অর্থনৈতিক ধারণা, কেইন্সের কিম্বা অরো–র চিন্তা ইত্যাদি। অধ্যাপক সেন বর্ণনা দিয়েছেন শিশু বয়সের বার্মার অভিজ্ঞতা, পুরনো ঢাকার জীবন, বাংলার নদ-নদীর উপাখ্যান,উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, ভারত বিভাজন, গান্ধী-রবীন্দ্রনাথ বিতর্ক, শান্তিনিকেতন, বিলেত যাওয়ার রোমাঞ্চকর প্রথম অভিজ্ঞতা; সাথে সাথে পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘ প্রবাস জীবন, ট্রিনিটি-তে “মাস্টার” হওয়ার গল্প ইত্যাদি। তবে স্বীকার করতে হবে, সময় যত এগিয়েছে অমর্ত্য সেন হয়ে উঠেছেন “বিশ্বনাগরিক” ইংরেজিতে যাকে বলে “সিটিজেন অব দ্যা ওয়ার্ল্ড”। রবীন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবিত অধ্যাপক অমর্ত্য সেন ছিলেন একজন উদার নৈতিক, মুক্তমনা, অসাম্প্রদায়িক, বহু সংস্কৃতির ধারক, এবং উন্নত বিশ্বচেতনার অনুসারী। কট্টর ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, উগ্রবাদ, এবং সামাজিক বৈষম্য তাঁকে পীড়া দেয়। অমর্ত্য সেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাঁর কাজের প্রতি আনন্দ। তিনি হার্ভার্ড গেজেটে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “I have never done work that I was not interested in. That is a very good reason to go on” । তিনি যেমন আনন্দের সাথে কাজ করেছেন তেমনি বিশ্বের যেখানেই গেছেন সেটা তাঁর আনন্দভূমি বলে তিনি ভেবেছেন। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের মতোই তিনি বলতে চেয়েছেন জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ।

ড. সিদ্ধার্থ শংকর জোয়ার্দ্দার, অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

ওডি/

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড