• মঙ্গলবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ঢাবি শিক্ষার্থীর মৃত্যু : মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তবায়ন জরুরি

  মো. সাঈদ মাহাদী সেকেন্দার

০১ জুন ২০২১, ১৮:২৪
sdfsdf
ছবি : দৈনিক অধিকার

মাদকাসক্তি বলতে মাদকদ্রব্যের প্রতি প্রচণ্ড আসক্তি বা নেশাকে বুঝায়। যেসব দ্রব্য সেবন বা পান করলে তীব্র নেশার সৃষ্টি হয় সেগুলো মাদকদ্রব্য। কোন কোন ঔষধকে ব্যবহারগত কারণে মাদকদ্রব্য বলা হয়। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোন ঔষধ অতিরিক্ত সেবন করলে এবং এর প্রতি আসক্তি জন্মালে সেটাও মাদকের আওতায় পড়ে। অতএব যেসব দ্রব্য সেবন করলে মানুষের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে এবং সেগুলোর প্রতি সেবনকারীর প্রবল আসক্তি জন্মে সেগুলোই হল মাদকদ্রব্য। যেমন – বিড়ি, সিগারেট, চুরুট, মদ, গাঁজা, ভাং, আফিম, হেরোইন, পেথিডিন, ফেনসিডিল ইত্যাদি। যারা মাদকদ্রব্য সেবন করে মাদকদ্রব্যের প্রতি তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্ভরশীলতা সৃষ্টি হয়। তারা মাদকদ্রব্য সেবন করা থেকে বিরত থাকতে পারে না। যদি কোন কারণে তারা মাদক গ্রহণ করতে না পারে, তাদের মধ্যে মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক উপসর্গের সৃষ্টি হয়। যেমন – মেজাজ খিটখিটে হয়, ক্ষুধা ও রক্তচাপ কমে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হয়, নিদ্রাহীনতা দেখা দেয়, আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনা দেশে মাদকের উল্লেখিত পরিচিত বিষয়ের বাইরে আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। সম্প্রতি রাজধানীর একটি বাসা থেকে এলএসডি নামক (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথ্যালামাইড) মাদক জব্দ করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের রমনা বিভাগ। ডিবি বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে তারা এই মাদকের সন্ধান পেয়েছে।ডিবি সূত্রে দেশে এলএসডি জব্দের ঘটনা এটাই প্রথম।নানাভাবে এলএসডি বাজারজাত করা হয়। যেমন: ব্লটার পেপার বা নকশা করা বিশেষ কাগজে এলএসডি মেশানো হয়। এভাবেই এলএসডি বেশি সহজলভ্য। এ ছাড়া ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল আকারে, তরল বা কিউব আকারে পাওয়া যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনস্থ মাদক বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ড্রাগ অ্যাবিউজের তথ্য অনুযায়ী, ডি-লাইসার্জিক অ্যাসিড ডায়েথিলামাইড বা এলএসডি রাসায়নিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি একটি পদার্থ যা রাই এবং বিভিন্ন ধরণের শস্যের গায়ে জন্মানো এক বিশেষ ধরণের ছত্রাকের শরীরের লাইসার্জিক অ্যাসিড থেকে তৈরি করা হয়।এটি স্বচ্ছ, গন্ধহীন একটি পদার্থ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের মতে এটি পাউডার, তরল, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের আকারে পাওয়া যায়।

এলএসডি'কে 'সাইকাডেলিক' মাদক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই ধরণের মাদকের প্রভাবে সাধারণত মানুষ নিজের আশেপাশের বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে অনুভব করে এবং কখনো কখনো 'হ্যালুসিনেট' বা অলীক বস্তু প্রত্যক্ষও করে থাকে।গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী নেদারল্যান্ডস থেকে এলএসডি মাদক আমদানি করা হয়।অনলাইনভিত্তিক অর্থ লেনদেন (পেমেন্ট) ব্যবস্থা পেপ্যালের মাধ্যমে টাকার লেনদেন হয়।ডিবির অভিযানে ২০০টি এলএসডি জব্দ করা হয়েছে।যা প্রতিটি তিন হাজার টাকা মূল্যে তাঁরা বিক্রি করেন।

ডিবি সূত্র বলছে, ১৫ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র হাফিজুর রহমানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল এলাকায় তাঁর তিন বন্ধু এলএসডি সেবন করান। এর প্রতিক্রিয়া শুরু হলে তিনি শুধু একটি শর্টস পরে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে এক ডাব বিক্রেতার ভ্যানে রাখা দা নিয়ে তিনি নিজের গলায় আঘাত করেন এবং তার মৃত্যু হয়।ঘটনাটি আমাদের নতুন করে যেমন ভাবিয়ে তুলছে তেমনিভাবে শিহরিত করছে।

আমরা অবগত আছি, মাদকাসক্তি বর্তমান সমাজের একটি বড় সমস্যা। যারা মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে তারা তাৎক্ষণিক মৃত্যুমুখে পতিত না হলেও, মাদক গ্রহণের কারণে তারা নানা ধরনের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হয়। মাদকের কারণে শুধু যে মাদকাসক্ত ব্যক্তিই ক্ষতগ্রস্ত হয় তা নয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তির বাবা-মা, ভাই-বোন, ছেলেমেয়ে, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবার জীবনে প্রভাব পড়ে। সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা মাদকের অর্থ জোগাড় করার জন্য চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানিসহ বিভিন্ন অসামাজিক বেআইনি কাজকর্মে লিপ্ত হয় যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও জাতির জন্য খুব ক্ষতিকর। মাদকাসক্তির ভয়াবহ পরিণাম থেকে যুব সমাজসহ দেশের সবাইকে রক্ষা করতে হলে মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। মাদকদ্রব্য যাতে সহজে পাওয়া না যায় তার জন্য যে আইন আছে তা যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন আইন তৈরি করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন করে তুলতে জনমত গঠন করা জরুরি এবং এসকল দাবি দীর্ঘদিন ধরে উত্থাপিত হয়ে আসলেও বাস্তবে তা দৃশ্যমান নয়।

পরিশেষে বলতে চাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমানের মৃত্যুতে তার পরিবারের যেমন স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে, তেমনি প্রতিনিয়ত যুবসমাজ মাদকাসক্ত হয়ে নিজের ও পরিবারের স্বপ্ন ভঙ্গ করে চলেছে। মাদকাসক্তি যেহেতু সামাজিক ব্যাধি তাই এ সমস্যা সমাধানের উপায় ও সমাজকে বের করতে হবে। এজন্য সামাজিকভাবে মাদক ব্যবহারের প্রতিন্ধকতা সৃষ্টি করতে হবে। সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে এবং তা বৃদ্ধি করতে হবে সমাজে সকল স্তরে। এক্ষেত্রে মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মাদকের প্রতিকার করতে হলে পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে মাদক বিরোধী অভিযান এক্ষেত্রে মা-বাবা কিংবা বড় ভাই-বোন মাদকের কুফল ও ভয়াবহতা সম্পর্কে পারিবারিক আলোচনা ও তা থেকে বিরত থাকতে পরিবারকে উৎসাহিত করবেন।ধ্বংস ডেকে আনা ছাড়াও মাদকাসক্তি প্রচলিত মূল্যবোধ, জীবনশৈলী ও অর্থনীতির প্রভূত ক্ষতি করছে।চলমান পরিস্থিতিতে সরকারের মাদকবিরোধী জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তবায়ন জোরদার করতে হবে।" চলো যাই যুদ্ধে,মাদকের বিরুদ্ধে "স্লোগানের বাস্তবায়ন জরুরি। এখনি মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যার্থ হলে, দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ফলাফল শূন্য হবে। তাই সরকারের দায়িত্বশীল আচরণের মধ্যদিয়ে সমগ্র দেশবাসীকে মাদক বিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার করার মাধ্যমে এ ক্ষতিকর মাদকের হাত থেকে ছাত্র ও যুব সমাজকে বাঁচাতে হবে। নতুবা মাদকাসক্তির ফলে ধ্বংস হবে দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম , বিনষ্ট হবে আধুনিক সভ্যতা, ম্লান হবে সরকারের অর্জন ও সুনাম ।

মো: সাঈদ মাহাদী সেকেন্দার, সাধারণ সম্পাদক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র

ওডি/

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড