• মঙ্গলবার, ১১ মে ২০২১, ২৮ বৈশাখ ১৪২৮  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

আমাদের বিবেকে জং ধরেছে

  রহমান মৃধা

১৫ এপ্রিল ২০২১, ১২:২০
রহমান মৃধা
ফাইজারের প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের সাবেক পরিচালক রহমান মৃধা (ছবি : সংগৃহীত)

এক দিকে পহেলা বৈশাখ, অন্য দিকে রমজান মাস, তারপর মহামারির কারণে সারাদেশ লকডাউনে, এ এক ভিন্ন সময়। এ সময় অবকাশের সময় নয়, এ সময় একটু ভাববার সময়। আমার ভেতরেও ঢুকেছে ভাবনা।

কবে থেকে মানবজাতি তার হিসাব-নিকাশ করতে শিখেছে? কবে থেকে মানুষ জাতি জানতে এবং বুঝতে শিখেছে যে তারা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব? কবে থেকে তারা ভাবতে চেষ্টা করছে যে তারা আদৌ শ্রেষ্ঠ জীব কিনা! পশুপক্ষী একে অপরকে ঘৃণা করে, দুর্বলকে ধ্বংস করে, একে অপরকে খায়। মানুষ জাতি এখনও সেটা সচরাচর করছে না ঠিকই তবে তার চেয়েও জঘন্য কাজ করছে।

যেমন মানুষ হয়ে মানুষকে তিলে তিলে শেষ করে চলছে, ধর্ষণ করছে, দুর্নীতি করছে এমনকি নিজ স্বার্থে মেরেও ফেলছে। তাহলে পশুপক্ষী ও মানুষের মধ্যে তফাৎ রইল কোথায় এবং মানুষ যে শ্রেষ্ঠ জীব তার বা কী প্রমাণ রইল?

মানুষ নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থের রেফারেন্স দিয়ে তাদেরকে শ্রেষ্ঠ বলে প্রমাণ করতে চায় কিন্তু বাস্তবে কি তার কোনো প্রতিফলন দেখাতে পারছে?

আমি নিজেই সেই মানুষ জাতির অন্তর্ভুক্ত একটা জীব। আজ যাদের মুখে বুলি তারাই হয়েছে কুলি। পবিত্র কুরআনের রেফারেন্স দিয়ে বলা হচ্ছে জেনা করা হারাম, নারী জাতিকে বেপরোয়া বা পর্দার আড়ালে হতে দেওয়া যাবে না ইত্যাদি। একই সাথে পকেট থেকে তাদেরই মুঠোফোন চেক করলে দেখা যাচ্ছে তারা পর্ণোছবি দেখে।

তাহলে প্রশ্ন এখন, সমাজের কাম কাজ ফেলে এই যে এক শ্রেণির ভণ্ড সাধারণ মানুষকে বলি শুনিয়ে আখেরাতের টিকিট কিনতে উঠে পড়ে লেগেছে, কী হবে এখন এদের?

ধরা খাওয়ার আগ পর্যন্ত সবাই হাজি কিন্তু ধরা খেলেই মুহূর্তের মধ্যে পাজি হয়ে যাচ্ছে, তার কী করা? আমি নিজেই যে একজন ভালো মানুষ তাও তো সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারছিনে! কারণ আমি তো তাদেরই একজন। এই যে আমার চারিপাশে এতকিছু হচ্ছে আমি দিব্যি দেখছি, শুনছি অথচ কিছুই করছিনে, এমনকি প্রতিবাদও করছিনে। কী দাঁড়াল ঘটনা? আমি তাদেরই একজন, আমিও মানুষ, আমি সেই দাবিদার শ্রেষ্ঠ জীব! আসলে কি তাই?

আমি একজন দুর্বল মানুষ। কিন্তু কেন? কী কারণ রয়েছে এর পেছনে? মহামারি পৃথিবীতে এসেই অ্যাটাক করল কাদের? দুর্বলদের, যারা অসুস্থ, বৃদ্ধ ঠিক তাদের। সবলরা যখনই এটা জেনে গেল কী হলো? তারা আরও সবল হতে উঠে পড়ে লেগে গেল। কিছুদিন যেতে দেখা গেল মহামারি সবলদেরও অ্যাাটাক করছে, এটা জানা বা দেখার পরে সবলদের মধ্যেও ভয় ঢুকেছে, আতঙ্ক ঢুকেছে, যার ফলে মহামারিকে সবাই এড়াতে চেষ্টা করছে।

এখন মানুষের চরিত্রে যে মহামারি ঢুকেছে এটা এড়ানোর কি উপায়! বুলিতে শ্রেষ্ঠ অথচ ঝুলিতে নিকৃষ্ট এর নাম মানুষ। কথার সঙ্গে কাজের কোনো মিল নেই, এর নাম মানুষ। আমরা সবাই বলছি কী করতে হবে, কিন্তু কেউ সেটা করছি না।

আল্লাহ-পাক বলেছেন এটা করতে হবে, নবী করিম (সা.) বলেছেন এটা করতে হবে, মাওলানা সাহেব বলেছেন এটা করতে হবে, আমি বলছি এটা করতে হবে, সে বলছে এটা করতে হবে, কিন্তু করবে কে সেটা? মানুষ না পশুপক্ষী? যদি সত্যিই শ্রেষ্ঠ হতে চাই তবে বলা নয় করা শিখতে হবে। আল্লাহ পাক রাব্বুল আল আমিন শুধু বলেই ক্ষান্ত হননি তিনি আমাদের মধ্যে বিবেক ঢুকিয়ে দিয়েছেন, আমরা সেটাকে কাজে না লাগিয়ে পুরো জীবনটাই পার করে চলেছি। যার ফলে বিবেকের এই অবক্ষয়।

বিবেককে আমরা আমাদের স্বার্থের বোঝা বয়ে বেড়ানো গাধা বানিয়ে ফেলেছি। অর্থাৎ বিবেকের সঠিক চর্চা করছি না। বিবেকের সঠিক চর্চা না করার কারণে বিবেক অকেজো হয়ে পড়েছে, বিবেকে জং ধরছে। আর সেই জং ধরা বা মরিচা পড়া বিবেকের কারণেই বর্তমান পৃথিবীর এই অবস্থা।

একটি গল্প মনে পড়ে গেল। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিশ্বাসের ভাঙ্গন লেগেছে। অবস্থা এতই ভয়াবহ যে, কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। কারণ স্বামী সাদা, স্ত্রীও সাদা, অথচ তাদের বাচ্চা হয়েছে বাদামি। এমতাবস্থায় ডিভোর্স ছাড়া কোনো গতি নেই। স্ত্রী বলল স্বামীকে আচ্ছা, ডিভোর্সড যখন হবই, দুজনে একবার শেষ চেষ্টা করি। স্বামী বলল কী সেই শেষ চেষ্টা? স্ত্রী বলল চলো একজন মনোবিজ্ঞানীর শরণাপন্ন হই। রাজি হয়ে দুজনেই শেষে হাজির হলো একজন বহু বছরের অভিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানীর কাছে।

মনোবিজ্ঞানী দুজনার কথা শুনলেন। তিনি নিজেও ভীষণ কনফিউজড, ভাবছেন এ কী করে সম্ভব! কিছুক্ষণ ভাবনার পর জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা আপনাদের যৌন মিলন তখন কি নিয়মিত হতো? উত্তরে দুজনেই বলল, না, খুব একটা হতো না। মাঝে মধ্যে নিশ্চয় হতো, নাকি! উত্তরে উভয়ই বলল সেই কবে একবার হয়েছিল তাও তো ঠিক মনে করতে পারছি না।

মনোবিজ্ঞানী তখন বললেন, বুঝেছি কেন বাচ্চার চেহারা আপনাদের মতো হয়নি। স্বামী ও স্ত্রী খুব আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, কী বুঝলেন? মনোবিজ্ঞানী বললেন, ভালোবাসায় জং ধরেছে? স্বামী-স্ত্রী রেগে গিয়ে বললেন, সে আবার কী? ভালোবাসায় আবার জং ধরে নাকি? ইয়ারকি করার আর জায়গা পেলেন না আপনি?

আরও পড়ুন : এ এক নতুন সময়

মনোবিজ্ঞানী বললেন, না ইয়ারকি না, দেখেন আপনাদের যে সম্পর্ক তাতে মনে হচ্ছে আপনাদের ভালোবাসায় ভাঙ্গন লেগেছে বাচ্চার জন্মের শুরুতে। তার প্রমাণ আপনাদের মধ্যে দৈহিক মিলন হয় না বললেই চলে। সে ক্ষেত্রে বুঝতে পারছেন কেন আপনাদের বাচ্চার গায়ের রং কারও মতো হয়নি। স্বামী কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর বিদায়বেলায় মনোবিজ্ঞানীকে শুধু বললেন, ভালোবাসায়ও তাহলে জং ধরে?

লেখক : রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে।

[email protected]

ওডি/কেএইচআর

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড