• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন

‘হতভাগ্য বাতিওয়ালা’-এর ঊনবিংশ পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস : হতভাগ্য বাতিওয়ালা

  মুহাম্মদ বরকত আলী

২২ আগস্ট ২০১৯, ১৫:৫৮
উপন্যাস
ছবি : প্রতীকী

হেড স্যার বললেন, তুমি না নিজের চোখে দেখলে সব টাকা সভাপতি রেখে দিলো? এবার একটু থেমে নরম স্বরে বলল, একটা টাকাও আমি রাখিনি। 

মৌসুমি ম্যাডাম বললেন, তাতো রাখবেন না, আমরা সারা জীবন কষ্ট করে মরি আর আপনি নেট নিয়ে পড়ে থাকেন। 

এই যা মরেছে। কি কথা বললরে বাবা। হেড স্যার এবার একটু রেগে গেলেন। দড়াম করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনার শুধু নেট নেট করেন, নেটে স্কুলের কাজ থাকে না? এখন তো সমস্ত কাজ নেটেই করতে হয়। আজ এটা করো তো কাল ওটা করো। কিছু না কিছু একটা কাজ প্রতিদিন তো থাকেই। আমি কি ফাঁকি দেওয়ার জন্য যাই? আর চাউলের টাকা? আমি একটা কানা কড়িও রাখতে পারিনি। আসার সময় সভাপতি তার দোকানে বসিয়ে চা শিঙ্গাড়া খাইয়ে সব নিয়ে নিয়েছে। তপু সাক্ষী আছে। 

হেড স্যার পূর্বের দিনের মত আজকেও রেগে গেলেন। সফদার চাচা পানি এনে হাজির। 

আপনি রেগে গেছেন স্যার। নিন পানি পান করুন। আমি আর সেদিন কার মত হাদিস শোনালাম না। মনে মনে আওড়ালাম, রেগে গেলে বসে পড়তে হয়। আর বসে থাকা অবস্থায় রেগে গেলে শুয়ে পড়তে হয়। শুয়ে থাকা অবস্থায় রেগে গেলে কী করতে হয় জানি না। তবে সূত্র মতে শুয়ে থাকলে গড়া গড়ি মারতে হয়। আপাত তো স্যার বসে বসে পানি পান করলেন। সিরাজ স্যার চুপচাপ বসে আছেন। কথা বলার কায়দা নেই। আন্দোলন থেকে পালিয়ে আসা লোকের কোনো কথা থাকতে পারে না। মেয়ে মানুষ একটু প্যাঁচাল হয়। মৌসুমি আপা আবার বিন বিন করতে লাগলেন, প্রতিবার অনুদানের পাবে আর এভাবে লোক দেখানো কাজ করবে বাকি টাকা গায়েব। এদিকে আমরা বেগার দিচ্ছি তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ফরিদ ভাই বললেন, কি আর হবে, কয়েক দিন পর এখান থেকে ওখান থেকে ইট চেয়ে নিয়ে আসবে। তারপর কোনো মনে প্রাচীরের কাজ করে বলবে টাকা শেষ। এভাবেই তো চলছে। এটা তো ওনাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। 

এখন সবাই আবার নীরব। মনে হয় কিছুটা শান্ত হয়েছে। মাঝে মধ্যে এমনটি হওয়া ভালো। মনের আক্ষেপ গুলো বের হয়ে আসে। মন পাতলা হয়। 

মৌসুমি ম্যাডাম বললেন, তপু তুমি না বলছিলে ক্লাসে যাবে? তাহলে যাচ্ছো না কেন? যাও, ক্লাস নাও গিয়ে। 

না ম্যাডাম, আমিও আজ যাচ্ছি না। আপনারা সকলেই যখন জোট বেধে ক্লাস বর্জন করেছেন তখন আমি একা বাদ যাই কেন? ক্লাস বর্জন চলছে চলবে। 

একটা কাজ করা যাক না, আমি স্লোগান দিচ্ছি আর আপনার সবাই এক সাথে তাল মিলাবেন। শুরু করা যাক, ‘আমাদের দাবি আমাদের দাবি।’

সফদার চাচা হাত উঁচু করে ইয়া জোরসে বলল, মানতে হবে মানতে হবে। 
শুধু মাত্র সফদার চাচা ছাড়া আর কেউ সাড়া দিলো না। 

মনটা একটু কেমন যেনো উদাস উদাস ভাব। মাঝে মধ্যে এমন হয়। আর এজন্য আমি বিকেল বেলা একলা বাইরে বের হই। গাজী স্যারের প্রতি আমার একটু দুর্বলতা আছে। মানুষটার প্রতি আমার খুব মায়া হয়। একটা মানুষ কতটা দুঃখ সহ্য করতে পারে সেটা আমার জানা নেই। কতটা কষ্ট পেলে একটা মানুষ বেঁচে থাকাটা অর্থহীন মনে করে সেটাও আমার কল্পনার বাইরে। আমি শুধু এটাই মনে করি যে, দুঃখ কষ্ট আর সুখ পুরোটাই নিজের ব্যাপার। যার যত চাহিদা তার ততো বেশি দুঃখ। তাই আমি আমার চাহিদা গুলোকে বেড়ে উঠতে দিই না। আমার যা আছে তাই নিয়েই আমি বেশ সন্তুষ্ট। চাহিদার শেষ নেই। একের পর এক চাহিদা চলে আসে। আর চাহিদা পূরণ না হলে একটা দুঃখ বুকের ভিতর ধাক্কা দেবেই। আমি সব সময় মনে করি আমার যা আছে অনেক মানুষের সেটাও নেই। সুতরাং আমি সুখি। কিন্তু সবাই তো আর এক মনের মানুষ না। 

এখন পড়ন্ত বিকেল। বিকেলের পরিবেশটা আমাকে খুব মুগ্ধ করে। হোক সেটা শীতের বিকেল কিংবা গরমের। আমি সব বিকেল দারুণ ভাবে উপভোগ করি। 

গাজী স্যারের বাড়ি এসেছি। বাড়ির ভিতরে স্যার নেই। কোথায় গেছেন কে জানে। ঘরের চালে দুটো শালিক ডেকে উঠল। পুরোপুরি নিশ্চুপ একটা বাড়ি। কোনো এক সময় বাড়িটা ছিলো সুখের স্বর্গ। কতই না স্বপ্ন খেলা করতো এই বাড়ির উঠোন জুড়ে। আজ সেই স্বপ্নরাও অভিমান করে হারিয়ে গেছে কোনো এক অজানায়। উঠোনটা স্যাঁত স্যাঁতে হয়ে আছে। গাছের পাতায় ছেয়ে গেছে উঠোন। মনে হচ্ছে কোনো এক পরিত্যক্ত বাড়ি এটা। হাহাকার করছে তাদের কর্তার জন্য। দেখি রাস্তায় কাউকে পাওয়া যায় কী না। বাড়ি থেকে বের হলাম রাস্তায়। একজন আসছে এদিকে। উনাকেই জিজ্ঞাসা করা যাক। 

এই যে শুনছেন, গাজী স্যার এখন কোথায় বলতে পারেন? আমি উনার সাথে একই ইশকুলে শিক্ষকতা করি। দেখা করতে এসেছিলাম। বাড়িতে নেই। মধ্যে বয়স্ক লোকটা তোরমজুরে বিচির মত দাঁত বের করে একটু ইঙ্গিতে স্বরে বললেন, বোকা মাস্টার বাড়িতে নেই?

এর আগের কয়েকজন বালকের মুখে শুনেছিলাম এই কথা। বোকা মাস্টার বলার কারণ জানার জন্য আমিও একটু নেকামো করলাম। 

বোকা মাস্টার, মানে বুঝলাম না? একজন সম্মানিত শিক্ষককে কিনা বলছেন বোকা মাস্টার?

লোকটা বললেন, যে নিজের খেয়ে সারা জীবন বনের মোষ চরায় সে বোকা ছাড়া আমি বোকা হবো। কথাটা বলে খলখলয়ে হাসতে লাগলো। 

ইচ্ছে করছে লোকটাকে একটু জবাব দিই বোকা মাস্টার বলার জন্য। কিন্তু বেলা পড়ে গেছে তাই পারলাম না ক্যাচাল করতে।
এই সময় উনি কোথায় থাকেন বলতে পারেন?
মাঝে মধ্যে ঐ ইট খোলার দিকে যেতে দেখে। ওখানেও থাকতে পারে। 

সেদিন ঐ বাচ্চা ছেলেরা বলেছিল গ্রামের মানুষ বোকা মাস্টার বলে ডাকে তাই তারও ঐ নামেই ডাকে। আজ তার দ্বিতীয়বারের মত প্রমাণ পেলাম। এখানে বোকার কী কাজ করল বুঝে আসে না। একটা মানুষ সারা জীবন বিনা পরিশ্রমে ছেলেমেয়েদের জীবনে আলো বিলিয়ে বেড়ানো কী বোকামি? ওদের কাছে সেটা বোকামি হলেও আমার কাছে এর চাইতে মহৎ কাজ আর কিছুই হতে পারে না। আর এটা যদি সত্যি সত্যি বোকামি হয়ে থাকে তবে আমিও সেই বোকামিটা করতে চায়। 

সামনেই একটা ইট খোলার চিমনি দেখা যাচ্ছে। বিকেল বেলা হয়তো স্যার প্রকৃতির সাথে কথা বলতে যায়। বাড়িতে কেউ নেই যে তার সাথে কথা বলবে। মানুষ একাকী থাকতে পারে না। সঙ্গীবিনা, একা থাকার জ্বালা আরও বাড়িয়ে দেয়। কথা বলার মানুষ না থাকলে ফুলের সাথে কথা বলতে হয়। পাখিদের সাথে বোকামি করতে হয়। ও পাখি আমাকে তোমার ডানায় চেপে ঘুরে বেড়াবে? পাখি কথা কয় না। সে আনমনে উড়ে বেড়ায় আকাশে। 

ইট খোলায় এখন ইট পোড়ানো হচ্ছে না। শীতের শুরুতে খোলা চালু করা হয়। প্রচণ্ড শীতে ইট পোড়াই মিস্তিরা রাতে খোলায় ইট পোড়ায় আর গান ধরে। সেই গান নিস্তব্ধ রাতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় দুর অজানায়। শীতের নিঝুম রাতে কাঁথা মুড়ি দিয়ে পোড়াই মিস্ত্রিদের গান শুনতে মন্দ লাগে না। মাঝে মধ্যে ইচ্ছে করেই আমি সেই গান শুনেছি রাত জেগে। সেই গানে তৃপ্তি পাই। রাতের সেই সুর এখন বন্ধ। চিমনিটার বেশ বিরতি চলছে। চিমনির মাথা দিয়ে কিছু কবুতর উঠে গেলো। এখন সেটা আপাত তো বুনো কবুতরের দখলে। ধোওয়ারা বিদায় নিয়েছে। 

যেদিন খোলায় আগুন জ্বালানো হয় সেদিন  থেকে বেশ কয়েক মাস আগুন জ্বলতেই থাকে। তখন দুর থেকে চিমনিটা মনে হয় এটা পৃথিবীর সব চাইতে বড় একটা হুঁকো। হুঁকোর মাথায় আগুন দেওয়া হয়েছে। কেউ জেনো সুখ টান দিচ্ছে আর ধোওয়া গুলো কুন্ডুলি পাকিয়ে অজানা কোথাও মিলিয়ে যাচ্ছে। খোলার আশে পাশে বেশ কয়েকটা পুকুর। এগুলো খনন করে ইট খোলায় মাটিগুলো পুড়িয়ে তৈরি করা হয়েছে ইট। পুকুর গুলোতে পানির ঢেউ খেলা করছে। সাদা রঙ্গের বক বসে আছে মাছের আসায়। এখানে বকেরা খেলা করে দিন ভর। নানান পাখির আনা গোনা। 

ফিরফিরে বিকেলের বাতাসটা বেশ মজা লাগছে। পুকুর গুলো থাকায় এখানকার বাতাস নির্মল কমল ঠাণ্ডা। এত সুন্দর পরিবেশে গাজী স্যার নিশ্চয় সারাদিনের ক্লান্তি মুছে ফেলার জন্যই এখানে ছুটে আসেন? কয়েকটা পুকুরের পাড়ে ঘুরে এলাম কিন্তু স্যারকে তো দেখছি না। লোকটা মজা করল নাতো? কিছু শ্রমিক খোলা থেকে ইট বের করে আনছে। বাঁশের বাকে করে দুই দিকে ঝুলিয়ে খোলার গর্ভ থেকে বের হয়ে আসছে পোড়া মাটির লাল অংশ ইট নামে। খোলার থেকে পোড়ানো ইট গুলো বের করে এনে বেশ কয়েক জায়গায় স্তূপাকারে রাখা হচ্ছে।

আগামী বছর খোলায় আগুন লাগানোর আগ পর্যন্ত এগুলো বিক্রি করা হবে। খোলার নিকটে আসতেই কেউ যেনো আমায় দেখে আড়াল হলো। এখানে কেউতো আমাকে চেনার কথা না। নিকটে এগিয়ে গেলাম। কাজ বন্ধ করে দিয়ে ওরা অনেকেই আমার দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়াল। আমি বুঝতে পারছি না আমাকে দেখে ওরা কাজ বন্ধ করে দিলো কেন? যদি ওরা ভাবে যে আমি খোলার মালিকের কোনো আত্মীয়, তাহলে তো তাদের কাজের গতি আরও বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ওরা আমার দিকে কৌতূহলের মতো তাকিয়ে আছে কেন?

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড