• সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২০, ২২ আষাঢ় ১৪২৭  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বই আলোচনা

গল্পের নান্দনিকতা ‘এখানে ভীষণ রোদ’

  তাজরিয়ান আলম আয়াজ

০২ মার্চ ২০২০, ১১:২০
প্রচ্ছদ
প্রচ্ছদ : গল্পগ্রন্থ ‘এখানে ভীষণ রোদ’

হেলাল হাফিজের প্রতিটি কবিতা পড়ার পর আমার মনে তীব্র এক নৈরাশ্য বাসা বাঁধে। আমার কাছে মনে হয়, প্রতিটি পঙক্তি বুঝি আমার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছে, ভ্রুকুটি করছে। যেন বলছে, ‘আরে গাধা, আমাদেরকে এমন নিখুঁতভাবে সাজিয়ে আস্ত কবিতায় রূপ দেয়ার দায়িত্ব তো আসলে তোর ছিল। তুই দেরি করলি বলেই তো হেলাল হাফিজ লিখে ফেলেছেন!’

আমার অল্প কিছু প্রিয় কবিতা আছে। সেগুলো আমি বারবার পড়ি, সময় পেলেই পড়ি। তবু সেগুলো আমার মুখস্থ হয় না। মুখস্থ না হওয়ার মূল কারণ, প্রতিবার পড়ার সময় আমার ভেতর আক্ষেপ জন্ম নেয়। নিজেই নিজেকে ক্রমাগত অভিসম্পাত করতে করতে বলি, এই কবিতা আসলে আমার লেখার কথা ছিল। অথচ আমার হয়ে অন্য কেউ লিখে ফেলেছে। এর চেয়ে লজ্জার আর কী-ই বা থাকতে পারে?

গল্প, কিংবা আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে - গদ্য পড়ার সময় আমার এমন হয়েছে কমই। কিছু কিছু বাক্য যে মনে দাগ কাটেনি, তা নয়। তবে সেই দাগ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি অধিকাংশ সময়েই। সেদিক দিয়ে ‘এখানে ভীষণ রোদ’ বইয়ের লেখক ওয়ালিদ প্রত্যয়ের কথা আলাদাভাবে বলতে হবে। মাঝে মাঝে উনার আস্ত গল্প পড়ে আমার মনে হয়, এটি আসলে আমারই লেখার কথা ছিল। ওয়ালিদ প্রত্যয়ের চেয়ে অর্ধদশক পরে জন্ম না নিলে বোধহয় আমিই এগুলো লিখতাম।

‘এখানে ভীষণ রোদ’ একটি গল্পগ্রন্থ। এই বইটির মাধ্যমেই লেখক কিংবা ‘বইয়ের লেখক’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন ওয়ালিদ প্রত্যয়; অর্থাৎ এটি তার প্রথম বই। আটটি গল্প কিংবা ছোটগল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে বইটি। প্রতিটি গল্পই সুন্দর, অনেকদিন মনে রাখার মতো। সাবলীল ভাষায় এবং ঝরঝরে গদ্যে রচিত। আমরা যা দেখি, তা-ই আসলে গল্প। কিন্তু এই গল্পকে ফুটিয়ে তুলতে পারাতেই লেখকের সার্থকতা। জীবনকে দেখা এবং নিজের মতো করে কাগজের কারাগারে বন্দি করতে পারলেই তা হয়ে ওঠে জীবন্ত গল্প। গল্পের নান্দনিকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা জীবনই সর্বাবস্থায় শৈল্পিকতার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। লেখক ঠিক সেইটাই করেছেন বইয়ে। প্রথম বইয়ে এমন দক্ষতার স্বাক্ষর রাখা লেখক আর যাই হোক, ‘পণ্ডশ্রম’ করেননি; সে কথা নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করা যায়। লেখকের জন্য দোয়া আর শুভকামনা - দুটিই জানিয়ে দেয়া যায় কিছুমাত্র কৃপণতা না করেই। 

জীবনে রোজ রোজ দেখা শত শত গল্পের খোঁজ করলে পাওয়া যায় গল্পের পেছনের অদেখা গল্পও। দেখা গল্প যদি আনন্দের হয়, অদেখা গল্প হয় বেদনার। উল্টোটিও সত্যি। বইটির প্রথম গল্প ‘রঙিন টিভি’তে পাওয়া যায় ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামির জীবন দেখতে দেখতে দেখা হয়ে যাওয়া যাপিত জীবনের অদেখা দিকটিও। ‘আর্টিস্ট-প্রস্টিটিউট’ গল্পে দেখা হয় ভবঘুরে-বাউণ্ডুলে শিল্পীর জীবনযাপনের শৈল্পিকতা; নিশ্চিত জীবনের হাতছানিকে অনিশ্চিত অথচ অনিন্দ্যসুন্দর জীবনের মোহে প্রত্যাখ্যানের আখ্যান।

প্রতিদিন কত কত টাকা খরচ করি আমরা। হাতবদল হয় বঙ্গবন্ধুর ছবি সম্বলিত কত কত কাগুজে নোট। কাগুজে নোটগুলো সাক্ষী হয় জীবনের অনন্য কিছু দিকের, সে খেয়াল ক’জন রাখে? ‘সাক্ষী’ গল্পে উঠে এসেছে এমনই কয়েকটি জীবন। ‘আয়েশা’ গল্পে বলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এক অদ্ভুত ঘটনার; যেখানে বাঙালি তরুণী আয়েশাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন পাকিস্তানি মেজর ইশহাক; বিনিময়ে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন আয়েশার বাবা মজিদ খলিফার জীবন। 

‘সবজিওয়ালার ঘামে ভেজা পালংশাক’ গল্পটি সম্পর্কে কিছুই বলব না। এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ গল্প সম্ভবত এটিই। গল্পটি পড়া শেষে কিছুক্ষণ যদি স্তব্ধ না হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার মধ্যে অনুভূতি বলে হয়তো কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। নামগল্প ‘এখানে ভীষণ রোদ’কে আমি বলব এই বইয়ের দ্বিতীয় সেরা গল্প। মধ্যবিত্ত বাবার গল্প, যিনি তার ছেলেকে স্থাপত্যবিদ্যায় পড়াচ্ছেন। এই গল্পটা পড়ে মনে হয়েছে, ভীষণ যত্ন নিয়ে আদুরে ঢঙে গল্প বলে চলেছেন লেখক।

‘রক্তশূন্যসমগ্র’ গল্পটিতে দেখা যায় অদ্ভুত এক ক্যাম্পেইনের; যেখানে দেশের সবচেয়ে দুঃখী মানুষটিকে পুরস্কৃত করা হবে। প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত রাউন্ডে তিনজন দুঃখী লোক একে একে শোনান তাদের দুঃখের গল্প। শেষ অবধি দেখা যায়, দুঃখী মানুষের সংখ্যা তিনজন নয়; আসলে চারজন। তাহলে আরেকজন কে?

লেখাটি শেষ করব ‘কাজোরী’ গল্পে কথককে উদ্দেশ্য করে গল্পের নায়িকা (কিংবা নায়িকা নয়) কাজোরীর বলা কয়েকটি কথা দিয়ে।
‘তুমি একটা প্রেমের গল্প লেখার জন্য আকাশ-পাতাল ঘুরে এসেছ, মানুষের কাছে গিয়েছ, মানুষীর কাছে গিয়েছ। অথচ একবারও আমার কাছে প্রেমের গল্প খুঁজতে আসোনি। আমার ঠোঁটে তোমার জন্য যে কত গল্প জমা হয়ে আছে - তুমি খোঁজই করলে না। লেখক সাহেব, ভুল জায়গায় খুঁজলে কি প্রেম পাওয়া যায়?’

আরও পড়ুন : লাওয়ারিশ : সহজিয়া কবিতার স্নিগ্ধ ও মুগ্ধস্রোত

বই পরিচিতি
গল্পগ্রন্থ : এখানে ভীষণ রোদ
লেখা : ওয়ালিদ প্রত্যয়
প্রকাশক : নালন্দা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড