• বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

শূন্যে তাহার চলাফেরা

  রনি রেজা

১৩ নভেম্বর ২০১৯, ১৫:৫৫
ছবি
ছবি : প্রতীকী

রোদ-ঝলমলে শীতের আকাশ। মা-পাখির মতো মেপে মেপে তা দিচ্ছে সূর্য। সেদিক দিয়ে দিনটিকে ভালো বলা যায়। কোনো ব্যক্তিগত ঝামেলাও নেই। বাড়িতে কথা হলো মাত্র, আজ বাবা-মায়ের মধ্যেও কোনো ঝগড়া হয়নি। তবু মন ভালো নেই ধ্রুবর। এই ভালো না থাকার অবশ্য নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। কারণ খুঁজতেও চায় না সে। প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করায় বিশ্বাসী ধ্রুব এতকিছু নিয়ে ভাবতে চায় না। ছেড়ে যাওয়া প্রেয়সীর পেছন থেকে যে নান্দনিক হাঁটা উপভোগ করতে জানে তার অত চিন্তা কী? মন খারাপই যাপন করতে হয়- বিশ্বাস ধ্রুবর। অত না ভেবেই মোবাইল ফোনটা বন্ধ করে বেরিয়ে পড়ে চট করে। এমন মাঝে-মধ্যেই হয়। অচেনা-অজানা গলিতে যেদিক দু’চোখ যায় হাঁটতে ভালো লাগে। 

যতক্ষণ না ক্লান্তি ভর করে, ক্ষুধা চেপে ধরে; হাঁটতে থাকে ধ্রুব। হাটতে হাটতেই মন ভালো হয়ে যায় কোনো না কোনো কারণে। আজ কচুক্ষেতের বাসা থেকে বের হয়ে ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে হাটতে হাটতে সৈনিক ক্লাবে গিয়ে ওঠে। কি মনে করে রাস্তা পার হয়। ওপারে গুলশান, বনানীর দিকে অনেকগুলো সরু গলি আছে। সেদিক কোনো একটায় ঢুকে পড়বে এমন ভাবনা থেকেই হয়তো রাস্তা পার হয়। কিন্তু আটকে যায় এক সুন্দরীর চোখে। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখে নেয়। কিন্তু নিরবিচ্ছিন্নভাবে দেখতে পারে না। আগন্তুক গাড়ির হেলপারের হাঁক-ডাকে ছন্দ ভাঙে বারবার। শেষে সিদ্ধান্ত নেয় একটা গাড়িতে উঠে পড়বে ধ্রুব। সিদ্ধান্তের পর আসা প্রথম গাড়িটিতে উঠতে গেলে হেলপার জিজ্ঞেস করে গন্তব্য। কোথায় বলবে ভেবে পায় না ধ্রুব। এ করেই গাড়িটি চলে যায়। গাড়িতে উঠতে একটি গন্তব্য দরকার ভেবে আনমনেই বলে ফেলে নাবিস্কোর কথা। 

এতেও গাড়ি নেয় না। গাড়ি চলে যাওয়ার পর ধ্রুব দেখতে পায় একটি শিরোনামহীন গাড়ি আসছে। তার সামনে, গায়ে কোথাও কিছু লেখা নেই। না গাড়ির নাম, না গন্তব্য। এটায়-ই উঠবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই উঠে পড়ে হেলপারকে ঠেলে। উঠে পড়ে মেয়েটিও। ধ্রুব যে সিটে বসেছে ঠিক তার আগের সাড়ির উল্টো পাশের সিটে বসেছে মেয়েটা। ধ্রুবর তো নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য নেই। মেয়েটি ওকে অনুসরণ করে কী ভুল করেছে তা বুঝতে পারে ভাড়া মেটানোর সময়। নাবিস্কোর ভাড়া দিতে গেলে সুপারভাইজার জানায় এ গাড়ি যাচ্ছে ফার্মগেট-কারওয়ানবাজারের দিকে। 

এতক্ষণে মহাখালী ফ্লাইওভারে উঠে পড়েছে গাড়ি। নামতে হলে বিজয় স্মরণি নামতে হবে। মেয়েটি রাজি হয়। এরপরই ধ্রুবর ভাড়া দেয়ার পালা। মেয়েটির দেখাদেখি সেও দশ টাকা বের করে দেয়। গন্তব্য জিজ্ঞাসা করলে বলে আমিও নামবো বিজয় স্মরণি। সম্ভবত আমিও শব্দটিতে খটকা লাগে মেয়েটিসহ আশ-পাশে বসে থাকা যাত্রীদের। মেয়েটিকে ধ্রুব অনুসরণ করছে বলেই ধরে নেয় সবাই। সবার ঢ্যাব-ঢ্যাবানি চাহনি সেই কথাই বলে। ধ্রুবও বিষয়টি উপভোগ করে। আচরণটা আরেকটু সন্দেহজনক করে; সবাইকে বিভ্রান্ত করতে। বিজয় স্মরণি পৌঁছেই দ্রুত নেমে পড়ে ধ্রুব। 

এরপর দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। যেন মেয়েটির জন্যই অপেক্ষা। মেয়িটি ধ্রুবকে পেরিয়ে গেলে পিছু নেয় আরেকবার। মেয়েটির হাঁটার গতির সঙ্গে তাল মেলায় ধ্রুব। বাঁক নিয়ে দ্রুত নাবিস্কোর দিকে মেয়েটি চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে ধ্রুব। মন এখন অনেকটা ভালো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্লুইচ ওপেন করে। ফোন করে মাহবুব ভাইকে। মোটা ফ্রেমের চশমা পরে, মাথাভর্তি চুল নিয়ে হাতিরঝিলে হাজির হন মাহবুব ভাই। একে একে হাজির হয় রাজিব, মুক্তা, অনিক। আজকের ঘটনা শোনায় ধ্রুব। ট্যাব থেকে মুখ তুলে ফিক করে হেসে ওঠে অনিক। বলে- বুঝেছি। হিমু ভর করেছে। এসব তো হিমুর কার্যকলাপ।
 
অনিককে থামিয়ে দেন মাহবুব ভাই- কথায় কথায় হিমু-টিমু টেনো নাতো। এই প্রজন্মের মাথা থেকে হুমায়ূন আহমেদ ভূত তাড়ানো গেল না। শুধু হিমু, মিসির আলী, রূপা, বাকের ভাই খুঁজতে থাকে। আরে ভাই, কোনো কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গে কোনো ঘটনা মিলে গেলেই সেটাকে অনুসরণ করা হয়ে যায়? এসব হওয়ার প্রাকৃতিক কারণও আছে। এ বয়সে সব ছেলে-পুলেরই এমন দু’একটা ঘটনা ঘটে। নানা যুক্তি দিয়ে মাহবুব বোঝাতে চেষ্টা করেন এখানে কোনো হিমু চরিত্রের উপস্থিতি নেই। এমন সময় বেজে ওঠে রাজিবের মোবাইল। পাড়ার ছেলেরা ফোন করেছে। চৌরাস্তার মোড়ে কারা এসে ঝামেলা পাকিয়েছে। ওদের শায়েস্তা করতে হবে। এবারও মুখের সামনে থেকে ট্যাবটা সরিয়ে ৩০ ডিগ্রি মাথা ঝুঁকিয়ে মৃদু হাসি নিক্ষেপ করে অনিক। 
‘বাকের ভাই’
বলেই ফের মাথা গোঁজে ট্যাবে। 
ক্ষেপে যায় রাজিব। তুমি একেকজনের ভেতর হিমু, বাকের ভাই খুঁজছ; তুমি কি শুভ্রর মতো আচরণ করছো না? সারাক্ষণ ট্যাবে মুখ গুঁজে রাখ। পিডিএফ পড়তে থাকো। আমরা কিছু বলি? কার ভেতর নেই হুমায়ূন আহমেদ? সবার ভেতরই আছে। স্বীকার করো বা না করো। 

থামানোর চেষ্টা করেন মাহবুব ভাই। এবারও শুরু করেন নানা যুক্তি। এবারও রহস্যেও হাসি নিক্ষেপ করে। আস্তে করে বলে ওঠে মিসির আলী স্যার। মাহবুব ভাইয়ের রক্তচক্ষুর সামনে আবার নিমিষেই মিইয়ে যায় অনিক। ফের বলে ওঠে- না। মানে, মিসির আলী স্যার তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। আমাদের মাহবুব ভাই খোলা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অর্থাৎ সর্বত্র বিরাজমান। এ কথা শুনে ক্ষণিকের জন্য থেমে যান মাহবুব ভাই। চেষ্টা করেন চেহারায় রাগী রাগী ভাব ফুটিয়ে তুলতে। কিন্তু বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেন না। পরক্ষণেই হেসে ফেলেন। বলেন- আসলেই প্রতিটি মানুষের মধ্যেই হুমায়ূন আহমেদকে পাওয়া যায়। মানুষেল সম্ভাব্য সব চরিত্র নিয়েই তিনি লিখেছেন। আশপাশের স্বাভাবিক চরিত্রগুলোর ভেতরও ফুটে ওঠে হুমায়ূন আহমেদের কোনো না কোনো চরিত্র।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড