‘হঠাৎ পাওয়া’-এর ৮ম পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস : হঠাৎ পাওয়া

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ১৫:০৭

  শারমিন আক্তার সেজ্যোতি

জোবায়েরের কথায় সাজু চুপ হয়ে গেলো। আমজনতা চিঠি পড়ার জন্য উৎসুক হয়ে উঠলো। নেহার বিয়ের কথা শুনে এবারের চিঠির উপর মোমিনেরও আগ্রহ জন্মালো, একটা মেয়ে তার বিয়ের দিনে প্রাক্তন ক্রাশকে চিঠিতে ঠিক কি লিখতে পারে তা জানা তো আর সবার ভাগ্যে হয় না। সুযোগ এবং চিঠি দুটোই যেহেতু সামনে তো অপেক্ষা করার কোন মানে নেই।   

এতক্ষণে সাজু জেনে গেছে অভি নেহার চিঠি হাতে দাঁড়িয়ে, এই নেহাকে নিয়ে আবিরের মুখে কম গল্প শোনে নি সাজু। নেহা মেয়েটার জন্য আগেও সাজু আবিরের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে, প্রেমের অবহেলা সাজু মানতে পারে না। যদিও ওর কাছে প্রেমের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা আছে, তবে অপমান গায়ে মেখে চুপ হয়ে থাকা সাজুর ডিকশনারিতে একদম নেই। কিছুটা আগ বাড়িয়েই সাজু বলে উঠলো- 

‘জোবায়ের, চিঠি পড়ায় তুই ওস্তাদ ভাই, শুরু কর। তবে একটু এক্সপ্রেশন ও দিস মাথায় রাখিস মেয়েটার আজ বিয়ে আর হ্যাঁ, এটা একটা প্রেমের চিঠি মাথায় রাখিস বন্ধু। প্রেম তো অবিনশ্বর হয় রে, কোন ছাঁকা প্রেমকে ছুতে পারেনা বুঝলি।’

জোবায়ের সাজুকে উদ্দেশ্যে করে মনেমনে বিড়বিড় করে উঠলো, ‘ব্যাটা খবিশ, প্রেমের বানী দিচ্ছে আবার নিজে তো..।’

তুষার অভিকে দেখছে একদৃষ্টিতে, চিঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে অভি যে খুব বিব্রত বোঝা যাচ্ছে, নিজেকে একবার অভির জায়গায় ভাবতে গিয়ে তুষার ব্যস্ত হয়ে জোবায়েরকে বলে উঠলো, ‘দেখ তো কি লিখছে জোবায়ের।’

জোবায়ের অভির কাছ থেকে চিঠি নিয়ে পড়া শুরু করবে, অভি চলে যাচ্ছিল কিন্তু তুষার ওকে আটকায় বললো, ‘ আরে এত সিরিয়াস হস কেন! তুই ও বিনোদন নে। তোর জন্য সামনে আরও অনেক রাধা অপেক্ষা করছে ভাই। রমণীদের মন ভেঙ্গে দেবদাস হইস না! 

অভি হেসে দিলো, খুব কষ্টের পড়ে হাসি! লজ্জা লুকানোর হাসি। জুবায়ের পড়া শুরু করলো....

প্রিয় তুষার,

আচ্ছা চিঠি না পড়ার কি আছে? বলো তো। ভাব থাকা ভালো, তবে তোমার কি মনে হয় না তোমার ভাবটা একটু বেশিই। হাসছো নিশ্চয়ই, হাসো বেশি করে হাসো। তোমার প্রতি আমার ভালোলাগাটা প্রবল ছিলো, হতে পারে সেটা ভালোবাসা ছিলো।

কিন্তু প্রেম! নাহ, প্রেম মোহ মায়ায় আচ্ছন্ন একটা পুটলি তুষার। আমার স্বীকারোক্তিকে শুধুই প্রেম ভেবে থাকলে ভুল করবে। ভালোবাসাটা প্রেম থেকে একটু আলাদা হয় তুষার। আমি জানি না আমি কিভাবে তোমার প্রতি ঝুঁকে গেছি। হয়তো ভালোবাসা এভাবেই হঠাৎ উকি দেয়, সামান্য একটু অনুভূতি জীবনে পরোক্ষভাবে গেঁথে যায়।  

যার কাছে অপর পক্ষের উপেক্ষা কিংবা বিদ্রূপেও নিজেকে ছোট মনে হওয়ার সেই বিশাল অনুভূতি টাই লোপ পায়। আমি তোমাকে দোষ দিতে পারি না, আমার পরিস্থিতির জন্য তুমি দায়ী না তুষার। 

তবে চাইলে তোমাকে একটুখানি দোষারোপ করলেও করতে পারি কি বলো? সেদিন কেনও আমার সামনে এসেছিলে তুষার? অবশ্য জীবনটা এমনই চলার পথে দেখা হবে, প্রণয় হবে আবার সময়ে সময়ে সব মিলিয়ে যাবে! 

কেউ ঝুঁকে পড়বে তো কেউ স্থির হয়ে দাঁড়িয়েই জীবনটা কাটিয়ে দেবে। আমি সাময়িক বধির হয়ে গিয়েছিলাম তুষার। চিরতরে বধির হতে চাইনা। তাই জীবনের এই অধ্যায়টা অসম্পূর্ণই থাক।

তুষার আমি যদিও প্রেমে বিশ্বাসী কিন্তু লীলাখেলাতে না। তোমার বন্ধু অভি। বড় বিচিত্র প্রেমিক সে। সে শুধুই নতুন কে জয় করতে চায়। কিন্তু তুষার জীবনটাই তো নতুন এ ভরপুর। প্রকৃত প্রেম সব নতুনকে গ্রহণ করতে পারে না। গ্রহণ করতে চাওয়াটাও লজ্জার। 

প্রেম রঙিন কিংবা মলিন এক নতুনকে বেছে নেয়। যা কখনো পুরনো হয় না। হাজার নতুন তার চোখ ধাধিয়ে দেয় না। তার চোখ হবে স্থির। অভি আমাকে রঙে মোড়ানো ঠোঙা ভেবে জয় করতে উদ্যত হয়ে আছে, কিন্তু আমার আসল রঙ ওর কাছে পৌঁছায়নি।

তাই আজকে ওকে একটু ডেকে এনেছিলাম। বলেছিলাম তোমাকে গ্রহণ করে নিয়েছে, এসে নিয়ে যাও। অভি এসেছিলো, আমি কনের সাজে ওর সামনে গিয়ে আঙ্গুল দিয়ে আমার হবু বরকে দেখিয়ে দিয়েছিলাম। ও এটা প্রত্যাশা করেনি, খুব বিব্রত হয়েছে। হওয়ারই কথা।  

তবে আমি কিন্তু আমার কথা রেখেছি তুষার। অভিকে গ্রহণ করেছি। তবে আমার ব্যক্তিগত বার্তাবাহক হিসেবে। গ্রহণ তো গ্রহণ। হোক না রূপ ভিন্ন তবুও তো গ্রহণ। তাই না বলো।

তুমি তো আমাকে সেটুকু ও দেওনই। কৃপণ তুমি। সেক্ষেত্রে আমি তোমার থেকে বেশ উদার। 

ভালো থাকো, তুষার।

ইতি অপরিচিতা নেহা।

(চলবে..)