• শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কবি ও ছোটকাগজ সম্পাদক মাসুদার রহমান-এর সাথে আলাপচারিতা

  তৌহিদ ইমাম

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:০৪
মাসুদার রহমান
কবি ও ছোটকাগজ সম্পাদক মাসুদার রহমান

তৌহিদ ইমাম : মাসুদার ভাই, এই কবোষ্ণ সন্ধ্যায় আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি। এখন আমরা যে সময়সন্ধি অতিক্রম করছি, তাতে আমাদের আলাপন কতটা তাৎপর্য বহন করবে, জানি না। এটা কোনো ক্যাজুয়াল ইন্টারভিউ নয়, আড্ডা মাত্র। প্রথমেই আপনার ছেলেবেলাটা সম্পর্কে জানার আগ্রহ হচ্ছে। মানে কোথায় জন্ম আপনার, বাবা কী করতেন, পারিবারিক আবহ, পরিবেশ কেমন ছিলো ইত্যাকার বিষয় আর কি।

মাসুদার রহমান : শুভ সন্ধ্যা! তোমাকেও ভালোবাসা অশেষ। ঠিকই বলেছো, পৃথিবীজুড়ে খারাপ সময় অতিক্রম করছে মানুষ। মানুষের এই অসহায়ত্ব মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেই নিজের ভেতরে টের পাচ্ছি। আমরা আমাদের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অশনি সংকেত শুনে আসছি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, কিন্তু কান দিইনি। প্রকৃতিবোধ বা প্রকৃতিচেতনা আজো সেভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়নি, কারণ মানুষ আজ মানসিকভাবেই প্রকৃতিবিচ্ছিন্ন। বিপন্নতা ও অস্তিত্ব সংকট সম্পর্কে এখনো ওয়াকিবহাল নয়। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমাদের মিডিয়াও সঠিকভাবে দায়িত্ব বা দায়বদ্ধতা পালনে ব্যর্থ অথবা উৎসুক নয়। অল্পকিছু সংবেদনশীল মানুষ বিপর্যস্ততায় উদ্বিগ্ন। তারা নিশ্চয় সময় থেকে এগিয়ে থাকা মানুষ, তারা মূলত কতিপয় কবি শিল্পী ও স্রষ্টা। যারা মনে করতে পারেন ‘বৃক্ষরোপণ’ ছেলেমেয়ের বিবাহের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের দেখে মানুষ প্রশংসায় হাততালি বাজিয়ে যায়, তার বেশি কোনো প্রয়োজন বোধ করে না। আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের থেকেও শিক্ষা নেওয়া উচিত, যারা সন্তান জন্মের পর সন্তানের ভবিষ্যৎ সেভিংস হিসেবে বৃক্ষরোপণ করেন। এর চেয়ে ভালো উদ্যোগ আর কী হতে পারে? প্রকৃতিচেতনা এক সময় প্রায় সকল জাতি সম্প্রদায়ের মধ্যেই ছিলো। আমাদের চৈতন্যের মধ্যেও তা খুব শক্তপোক্তভাবেই ছিলো। প্রাচীন প্রবাদ প্রবচনে তার প্রমাণ মেলে। এই অভিযোগ রেখেই আজকের আড্ডা শুরু করতে হচ্ছে। মনে করি তা খুব অপ্রাসঙ্গিক নয়। অভিযোগের আঙুলটি নিজের দিকেই। মূলত এক কৃষিজীবী পরিবারে জন্ম আমার। কৈশোরে দেখেছি পিতামহ তখনো জীবিত এবং তিনিই পরিবারপ্রধান। তার অভিভাবকত্বের ছায়া নিবিড় ছিলো আমার উপরে। পিতামহী ছিলেন মায়ের অধিক। তার কোলেই প্রতিপালিত হয়েছি। বাবা স্কুলশিক্ষক, পিতামহের একমাত্র পুত্র। কৃষিজীবী পরিবারে যা হয়, জমিজিরেত চাষ-আবাদ গোয়াল-গরু, জমিচাষের কাজে মহিষ, কৃষিকাজের কিষাণ-কামলা, শস্যবপন, মলন-মাড়াই এসব দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। উঠোনে হাঁস মুরগির হুল্লোড়, তাদের যৌনক্রিয়া এসব খুব স্বাভাবিক ছিলো। উঠোন পেরিয়ে অবারিত সবুজ, দূরে দিগন্ত, গাছপালা, পুকুরদিঘী, মাথার উপরে আকাশ- যে আকাশে একটি হেলিকপ্টার বা বিমান উড়তে দেখলে সমস্ত গ্রাম তখন বেরিয়ে উঁচু সড়কের উপরে এসে দাঁড়াতো, আকাশযান দেখবার হুল্লোড়! উৎফুল্লতা। যদিও বছরে দু’একবার এই পক্ষীসদৃশ যানটি হঠাৎ দেখা দিয়ে যেতো। তখনো পৃথিবী নির্মল ছিলো, বিশেষত আজকের দিনের থেকে। দেখেছি হেমন্তে মাঠ থেকে ফসল উঠিয়ে নেবার পর পুরো মাঠ বিরান পড়ে থাকতো। ধানের নাড়া মাড়িয়ে চলে আসতাম গ্রামের পূর্ব-মাঠে হারাবতি নদীর কাছে। শুকিয়ে যাওয়া নদীর পাড়ে ছোট ছোট ঝর্ণা বইতো। এখন সেসব আর দেখা যায় না। জমিগুলো বহুফসলী হয়ে উঠেছে। পাম্পে ভূগর্ভ থেকে পানি উঠিয়ে সেচকাজ চলে। সে কারণে পানির স্তর নেমে গেছে। এতসব কিছু এই সামান্য জীবনে চোখের সামনেই ঘটে গেলো। আমাদের পরিবারের একজন সদস্য কায়মদ্দিন নানা। সংক্ষেপে ডাকতাম কায়নানা। শিল্পী সুলতানের আঁকা পেশীবহুল মানুষদের একজন। তামাটে বর্ণ, সুঠামদেহী মানুষটি গৃহস্থবাড়ির একজন কাজের মানুষ হয়েও বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে খেতখামার হালবলদ কামিন কামলা সামলাতেন। শুনেছিলাম শৈশবেই বাড়ির একজন হয়ে আসেন তিনি। তার মুখেই শুনতাম বৃটিশ-হিন্দুস্থান-পাকিস্তানের গল্প। মুক্তিযুদ্ধের গল্প। তার শৈশবে বাপদাদার অনটনের সংসারে যা হয়েছিলো- শীতবস্ত্রহীন মানুষের মাছ ধরা জাল মাদুর খড়বিচালি কিংবা চট ব্যবহারের অভিনব শীতনিবারণ। এই কায়মদ্দিন নানা বাতাসের গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারতেন সেদিন রোদ নাকি বৃষ্টি, মেঘ কিংবা কুয়াশা। পর্যবেক্ষণ ছিলো পতঙ্গ-পিঁপড়েদের চলা। পাখির উড়াল। বুঝে ফেলতেন ঝড়ের পূর্বাভাস, খরা বা বৃষ্টির সম্ভাবনা। তার থেকে এর অনেক প্রমাণও পেয়েছিলাম। শৈশব নিয়ে অনেক বলার আছে, এই পরিসরে বলতে যাওয়া কতটা প্রাসঙ্গিক হবে জানি না; তবে তা হয়ত অন্য লেখায় বলবো কখনো।

তৌহিদ ইমাম : মানুষের জীবনে, বিশেষত সৃষ্টিশীল মানুষের জীবনে, শৈশব-কৈশোরকালটা গভীর প্রভাব রাখে। আপনার নিজের সৃষ্টিশীলতায় সে সময়টা কতটা প্রভাব রেখেছে বলে মনে হয়?

মাসুদার রহমান : এ কথা সঠিক, শৈশব-কৈশোর মানুষের জীবনে বড় প্রভাবক। তবে তা বোধ করি অংকের মতো কিছু না, ২+২=৪ এমন তো নয়। আগেই বলেছি, আমার শৈশব-কৈশোর নিবিড় এক গ্রামীণ আবহে বেড়ে উঠেছিলো। মাধ্যমিক স্কুলজীবনও বাড়ি থেকে ১৫ কি.মি. দূরের স্কুল আর সেই স্কুলহোস্টেলে। মাইল মাইল অন্তহীন সবুজ ফসলী মাঠের প্রান্তে লাল ইটরঙা এক স্কুলহোস্টেল। থাকতাম সেই স্কুলহোস্টেলে। অনেকটা মেসের মতো, নিজেদের তিনবেলা খাবারের জন্য আনাজপাতি চালডাল আমরা নিজেরাই মাইল মাইল হেঁটে গিয়ে কেনাকাটা করে আনতাম। প্রকাণ্ড বটপাকুরের নিচে বসা সেইসব হাট, হাটের মানুষ, সারি সারি খোলা দোকানপাটের আশ্চর্য বর্ণগন্ধ। সেসবের কিছু কিছু ঘুরেফিরেই এসেছে আমার লেখায়। আমার শৈশব, গ্রামপারিপার্শ্ব লোকজন এসেছে, কিন্তু তার বাইরে আমার দেখা কোনো সিনেমা গ্রন্থপাঠ কল্পনা তাও লেখার অনিবার্য হয়ে উঠে। এই নগরায়নে যে প্রজন্ম বড় হয়ে উঠলো বা উঠছে, তাদেরও অনেকেই শিল্পসাহিত্য করতে আসবে। তারা প্রকৃতি এবং জনজীবনের অভিজ্ঞতা তাদের নিজের মতো করেই নেবে। লিখবেও।

তৌহিদ ইমাম : স্কুল-কলেজ কিংবা উচ্চতর শিক্ষাজীবনে এমন কোনো শিক্ষককে কি পেয়েছিলেন, যিনি সযত্ন উস্কে দিয়েছিলেন আপনার সৃষ্টিশীলতাকে?

মাসুদার রহমান : শিক্ষকদের মধ্যে সেভাবে কাউকে উল্লেখ করবার মতো নেই। বিস্তর দূরত্ব ছিলো শিক্ষকদের থেকে, সেইটা আমারই অযোগ্যতা। তবে মাধ্যমিকের আগে যে প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করেছি, তাও এক গ্রামীণ পরিবেশেই, যে স্কুলের কথা একটু আগেই বললাম। হোস্টেলে থাকায় প্রাত্যহিক খাবারের সবজি-মাছ-মাংস-মসলাপাতি কেনাকাটার জন্য ওই অঞ্চলের হাটবাজারে যাতায়াত করতাম। ডুগডুগির হাট বলে একটি হাট আমাকে বেশ টানতো। তা নানা কারণেই। তবে প্রশ্নের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক যে কথাটি, তা হলো- ওই হাটে গেলেই একজন কবির দেখা পেতাম। কবি কফিল উদ্দিন। স্বাধীনতার আগে-পরে ‘সওগাত’, ‘মোহাম্মাদী’সহ আরো অনেক পত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন তিনি। খুব উদাসীন হাটের অলিগলি হেঁটে বেড়াতেন। দাঁড়িয়ে থাকতেন। ডুগডুগির হাট থেকে দুই কিলোমিটার দূরেই তার বাড়ি। গ্রামের নাম পালশা। তিনিই আমার প্রথম কবিদর্শন। পাতলা চেহারা, লম্বা কাঁচাপাকা চুল কাঁধ ছুঁয়ে নেমে গেছে। তফাতে দাঁড়িয়ে দেখতাম তাকে। কী এক মুগ্ধতা ছিলো তার প্রতি! সে সময় তার প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছিলো, নাম ‘অশ্রু বাদল’। কবির বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে প্রকাশিত হয়েছিলো তার প্রথম বই। সে অর্থে বিলম্বিত প্রকাশ বলা যায়। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের কাছে একদিন খবর এলো, কবি কফিল উদ্দিনের কবিতার বই প্রেসে আছে, প্রি-অর্ডারে কারা নিতে আগ্রহী? তালিকা করা হলো। খুব আগ্রহ নিয়ে তালিকায় নাম দিলাম। হাতে বই পেলাম। ভেবেছিলাম বইটি বেরিয়ে গেলো, এবার দেশজুড়ে কবির নাম ছড়াবে। তারপর আরো সময় পেরিয়ে গেলো, জেলা শহরের লেটার প্রেসে ছাপা হয়ে বেরুলো তার আরো কয়েকটি বই। কিন্তু তাকে কবি হিসেবে কেউ চিনলো না। মাঝে-মধ্যে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি, আমি কি ভুলে গেছি আমার প্রথম কবিদর্শন কফিল উদ্দিনকে?

(ক্রমশ...)

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড