• মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮  |   ২৫ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কিছু মানুষের কাছে নতুন করে জন্ম নিলাম : রণজিৎ সরকার

  সাজেদুর আবেদীন শান্ত

১৯ জুন ২০২১, ১৫:৫২
সাহিত্যিক রণজিৎ সরকার
সাহিত্যিক রণজিৎ সরকার (ছবি : সংগৃহীত)

সময়ের জনপ্রিয় সাহিত্যিকদের অন্যতম একজন রণজিৎ সরকার। তিনি শিশুদেরও প্রিয় লেখক। শিশুকিশোরদের জন্য লিখছেন শিক্ষামূলক গল্প, উপন্যাস। রণজিৎ সরকার সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার খোকশাহাট গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতৃভূতি সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সরাইদহ গ্রামে। বাবা নারায়ণ সরকার ও মা শোভা সরকারের তিন সন্তানের মধ্যে তিনি একমাত্র পুত্র সন্তান।

রণজিৎ সরকার হিসাববিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করলেও লেখালেখির নেশা থেকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন সাংবাদিকতা। দৈনিক গণকণ্ঠ, বিডিওয়েব, রাইজিংবিডি ডটকমে কাজ করেছেন নিষ্ঠার সাথে। বর্তমানে তিনি দৈনিক আমাদের সময়-পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে ছয় বছর ধরে কর্মরত আছেন। রণজিৎ সরকার সাংবাদিকতার পাশাপাশি নিয়মিত লিখছেন জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, ছোটকাগজ, অনলাইনে ও বিদেশি পত্রিকাতেও। প্রথম গল্পের বই ‘স্কুল ছুটির পর’ ২০১২ সালের বইমেলায় প্রকাশ হলে ব্যাপক সাড়া পায়।

সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের একুশে বইমেলায় তার বইয়ের সংখ্যা ৫২ ছাড়িয়ে গেছে। উল্লেখ্যযোগ্য বইগুলো হলো-স্কুল ছুটির পর, স্কুল ছুটির দিনগুলি, মায়ের সাথে স্কুলে, শিশুতোষ মুক্তিযুদ্ধের গল্প, মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ব, শিশুতোষ একুশের গল্প, ছোটদের মুক্তিযুদ্ধের অজানা গল্প, প্রেমহীন ক্যাম্পাস, ভাষা শহিদদের গল্প, বীরশ্রেষ্ঠদের গল্প, নায়িকার প্রেমে পড়েছি, পথে পাওয়া, গল্পে গল্পে জাতীয় চার নেতা, পরির সাথে দেশ ঘুরি, স‚র্যশিকারি, ক্যাম্পাসের প্রিয়তমা, ভাষাশহিদ ও বীরশ্রেষ্ঠদের গল্প, গল্পে গল্পে বর্ণমালা, শিশুকিশোরদের বঙ্গবন্ধু, প্রেম জ¦লে ডুবে যাই, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে সুমনা, প্রেমভ‚মির নিমন্ত্রণলিপি।

সম্প্রতি রণজিৎ সরকার কালি ও কলম পুরস্কার পান। তার সাহিত্য জীবনের গল্প, পুরস্কার প্রাপ্তি ও ভবিষৎ পরিকল্পনার কথা জানায় সাজেদুর আবেদীন শান্তকে-

সাজেদুর আবেদীন শান্ত : কেমন আছেন? ছোটবেলা কেমন কেটেছে?

রণজিৎ সরকার: মানুষের মনজগতে পরস্পর দুটি দিক বিরাজ করে। একটি ভালো অন্যটি মন্দ। বিভিন্ন কারণে ভালো মন্দের উপর মনের অবস্থান নির্ভর করে। কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ঘোষণার পর থেকে আমার মন এখনো আনন্দে উৎফুল্ল আছে। এত ভালো আগে কখনো ছিলাম না। সত্যি আমি এখন সত্যিকারের অনেক ভালো সময় পার করসি। খুশির আনন্দে ভালো সময় কেটে যাচ্ছে। আমার জন্ম মামা বাড়ি। মামাবাড়ি খোকশাহাট গ্রামে। যদিও আমার মামা বাড়ি আর আমাদের বাড়ি দুরত্ব মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ। অথচ গ্রামে আলাদ। আমাদের গ্রামের নাম সরাইদহ। গ্রামের মেঠোপথে ঘুরে, গাছে উঠে, পুকুরে সাতার কেটে বিকালে খেলাধুলা আর স্কুলে যাওয়া আসা করে কেটেছে বেশ। ছোটবেলা আমার একটা নেশা ছিল মাছ মারা। কোন কোন দিন স্কুল থেকে ফিরে বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে যেতাম বিলে। শৈশবের জীবনটাকে খুব মিস করি।

সাজেদুর আবেদীন শান্ত : প্রথম লেখা প্রকাশের অনুভূতি সম্পর্কে যদি বলতেন? কোথায় প্রথম লেখা প্রকাশ?

রণজিৎ সরকার : আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। মাকে নিয়ে একটা কবিতা লিখেছিলাম। ছোটবেলা স্কুলে যাওয়ার আসার পর ভূইয়াগাঁতী বাজারে সেলুনের দোকানগুলোতে বিভিন্ন রকমের পেপার রাখত। আমি সুযোগ পেলেই পড়তাম। করতোয়া পত্রিকায় দেখি লেখা আহব্বান করেছে। আমি মাকে নিয়ে লেখাটা ডাকযোগে পাঠিয়ে দিলাম। পাঠিয়ে দেওয়ার পর থেকে প্রচন্ড আগ্রহ নিয়ে থাকতাম। কবিতা আর নিজের নামটা ছাপার অক্ষরে দেখার জন্য অস্থির হয়ে থাকতাম। দুই সপ্তাহে পরে লেখাটা প্রকাশ হলো। আমি ছাপার অক্ষরে নিজের নাম আর আমার সৃষ্টিকর্ম কবিতাটা দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম। পত্রিকাটা নিয়ে যাকে সামনে পাই তাকেই দেখাই। কি যে আনন্দের পেতে লাগল তা আর বলে শেষ করা যাবে...।

সাজেদুর আবেদীন শান্ত: আপনার ভেতর লেখক সত্ত্বার বিকাশ ঘটে কবে থেকে? কখন মনে হলো আপনি একজন লেখক?

রণজিৎ সরকার : প্রথম কয়েকটি কবিতা আর গল্প প্রকাশ হলো। তখন আত্মবিশ্বাস বাড়তে লাগল। স্কুল বন্ধুদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ একটু গুরত্ব দিতে লাগল। কেউ কেউ প্রসংশা করে। প্রতিটি মানুষ কিন্তু সত্যি কার অর্থে নিজের প্রসংশা শুনতে পছন্দ করে। আমিও আনন্দিত হলে লাগল। তখন ধীরে ধীরে লিখতে লাগল। তখন একটু জিনিস নিজের ভেতর পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। লিখতে বসলেই ভালো হোক আর মন্দ হোক লেখা আসতে থাকে। আমার ৫২টি বই প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু আমি এখনো বলতে পারি না আমি একজন লেখক। তবে ভালো লেখা লিখে যদি লেখক হতে পারি সে সাধনার চর্চায় আছি।

সাজেদুর আবেদীন শান্ত: আমরা জানি দীর্ঘ একটা পথ আপনি অতিক্রম করেছেন লেখালেখিতে? এ সম্পর্কে আপনার অনুভূতি কি?

রণজিৎ সরকার : লেখালেখি পুতুল বা লুডু খেলা নয়। কারও কারও কাছে হতে পারে লুডু খেলার মতো। কিন্তু প্রকৃত লেখকেরা কিন্তু এই খেলায় মত্ত হবে না। এ খেলা দীর্ঘ পথ। শৈশব থেকেই লেখালেখি শুরু করেছি। এখনো এই লাইনে আছি। লাইনচুত্য হয়নি। লেখালেখির সময়টাকেই আমি সব চেয়ে শ্রেষ্ঠ সময় বলে মনে করি। লেখালেখির অনুভূতি জগতটা একটা বিশাল জগত, লেখার সময় কত জায়গায় ভ্রমণ করে আসা যায়। আর এই ভ্রমণে যে একবার আনন্দ পেয়েছে। সে আর কোনো দিন লেখালেখি ছাড়া থাকতে পারবে না। আর আমি নিয়ম করে প্রতিদিন সে ভ্রমণে বেড়াই।

সাজেদুর আবেদীন শান্ত : কবিতা উপন্যাস নাকি গল্প কিসে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

রণজিৎ সরকার : আমার লেখালেখি কবিতা দিয়েই শুরুটা হয়েছিল। এখন দীর্ঘ দিন কবিতা লিখিনি। এখন টুকুটাক চেষ্টা করছি। ৫২টি বইয়ের ভেতর কিন্তু কোনো কবিতার বই নেই। আমার সব বই গল্প উপন্যাস। তবে আমি গল্প উপন্যাস লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

সাজেদুর আবেদীন শান্ত : বর্তমানে আপনি যে পেশাতে আছেন, তা আপনার জন্য কতটা স্বস্তিদায়ক?

রণজিৎ সরকার : আমি সাংবাদিকতা পেশায় আছি। এটা আপনার জানা আছে কিনা জানি না। পৃথিবীর বিখ্যাত প্রায় সব লেখক কিন্তু পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। আমি হিসাব বিজ্ঞানে অনার্স মাস্টার্স করে ভালো চাকরির সুযোগ পেয়েও অন্য পেশায় না গিয়ে সাংবাদিকতা পেশা বেছে নিলাম। বিখ্যাত লেখকদের জীবনী পড়ে মনে মনে একটা ধারণা জন্ম নিয়েছিল সাংবাদিক পেশায় থাকলে হয়তো ভালো লিখতে পারব বড় লেখক হতে পারব। সেই আশা থেকেই এই পেশায় আসা। কিন্তু বর্তমান সাংবাদিকতা মোটাও একজন লেখকের জন্য স্বস্তিদায়ক পেশা নয়।

সাজেদুর আবেদীন শান্ত : লেখালেখির ক্ষেত্রে বিদেশি কোনো লেখক কি আপনাকে প্রভাবিত করেছে বা অনুপ্রেরণা যুগিয়েছ?

রণজিৎ সরকার: আমি কারও লেখা দ্বারা প্রভাবিত হয়নি। তবে অনেক লেখকের ভালো ভালো লেখা পড়ে অনুপ্রেরণা পেয়েছি। মনে মনে ভাবি তাদের চেয়েও যদি কোন দিন ভালো লিখতে পারি।

সাজেদুর আবেদীন শান্ত : কতটা পথ সংগ্রাম করেছেন? কখনো কি ব্যর্থতা দিয়ে সফলতাকে মেপেছেন?

রণজিৎ সরকার : মানুষ সংগ্রাম ছাড়া কিন্তু কোন কিছু অর্জন করতে পারে না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা ভাবুন না একবার। প্রতিটি মানুষ কিন্তু সংগ্রাম ছাড়া জীবনে ভালো কিছু অর্জন করতে পারেনি। সংগ্রামের পথ কখনো শেষ হবে না। এই পথ জীবিত অবস্থায় থাকা পর্যন্ত চলবে। তবে হ্যাঁ, পৃথিবীতে বিখ্যাতদের জীবনে থেকে বোঝা যায় ব্যর্থ ছাড়া কোন ভাবেই বড় কোন সাফল্য আসেনি। আমার জীবনে ব্যর্থতা অনেক এসেছে। আর সে ব্যর্থতাগুলো হয়তো সামনের দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি বেড়েছে। আর সেই শক্তি কাজে লাগিয়ে সাফল্যের জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি। সফল হয়েছি।

সাজেদুর আবেদীন শান্ত : ফেসবুক সাহিত্য: বাংলা সাহিত্যের শত্রু নাকি মিত্র?

রণজিৎ সরকার : সাহিত্যচর্চা ও লেখা প্রকাশ ধরন বদলে গেছে। লিটলম্যাগ, দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতা, সাহিত্য ম্যাগাজিন এরপর এল ব্লগ তারপর ফেসবুক। ফেসবুকে যারা একটা কবিতা ও বড় একটা স্ট্যাস্টাস লিখে নিজেকে লেখক দাবি করছে, সেক্ষেত্রে সেটা বলব সেটা হলো ব্যক্তিগত ব্যক্তিসাহিত্যিক এটা আসলে ‘মূলধারা’ বা মেইনস্ট্রিম সাহিত্য ধরা যাবে না। ফেসবুকে লিখেই যদি কেউ সাহিত্যিক হতে চায় তাহলে সেটা কখনো মূলধারা সাহিত্য কি সেটা সে বুঝতেই পারবে না। তবে হ্যাঁ, কেউ যদি ফেসবুকে ব্যক্তিগত সাহিত্য চর্চা করতে করতে মূলধারার সাহিত্যে প্রবেশ করতে পারে তাহলে সাহিত্যে উপকার হবে। সাহিত্যচর্চা এগিয়ে যাবে। বর্তমানে ফেসবুকে সাহিত্যচর্চা নিয়ে খুশি হলে বিপদ আছে। এ বিপদ থেকে সাহিত্যকে উদ্ধার করতে হবে।

সাজেদুর আবেদীন শান্ত : কালি ও কলম লেখক পুরস্কার পেয়ে কেমন অনুভূতি হচ্ছে?

রণজিৎ সরকার : কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার পাওয়াতে আমাকে সাহিত্যপ্রেমিদের মাঝে নতুন করে পরিচয় করে দিল। কিছু মানুষের কাছে আমি নতুন করে জন্ম নিলাম।

আমি প্রতিদিন নিয়ম করে লেখালেখির চেষ্টা করি। কোন লেখক হয়তো পুরস্কার পাওয়ার জন্য লেখেন না। তবে হ্যাঁ কাজের স্বীকৃতি চায় প্রতিটি মানুষ। সেটি পেলে মন আনন্দে ভরে ওঠে। কালি ও কলাম পুরস্কার আনন্দের অনুভূতির অনুভব দিগুণ বাড়িয়ে দিল। পুরস্কারটি ঘোষণার পর মানুষের অনেক সাড়া পেয়ে বুঝলাম মানব জন্মের কখনো কখনো মনে হয় দ্বিতীয় জন্মও হয়। পুরস্কার একজন লেখককে লেখার প্রতি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। আমারও বেড়ে গেল।

সাজেদুর আবেদীন শান্ত : তরুণ লেখকদের জন্য আপনার উপদেশ?

রণজিৎ সরকার: আমি নিজেও তো তরুণ। উপদেশ দেওয়ার মতো যোগ্যতা মনে হয় আমার নেই। তবে আমার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা বলতে পারি তাহল, একজন লেখকে ধৈর্যশীল হয়ে সাধনার মধ্যে দিয়ে সাহিত্যচর্চা করতে হবে। সাহিত্যচর্চা পরিশ্রমের কাজ। এই পরিশ্রমে ফাঁকি দিলে চলবে না। সফল হতে হলে মনের ভেতর সব সময় লেখালেখি ও বইপড়ার চিন্তা নিয়ে কাজ করতে হবে। আর এই চিন্তার কাজটাই কিন্তু সাহিত্যচর্চার যন্ত্রণা। আর এই যন্ত্রণাটা ধৈর্য ধরে সহ্য করতে হবে। কালজয়ী বইগুলো পড়ে শেষ করতে হবে। এবং নিয়ম করে প্রতিদিন লিখতে হবে।

ওডি

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড