• শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ৮ কার্তিক ১৪২৮  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

মার্কিনিদের বিদায়

আফগানিস্তান ক্ষত বইবে বহুকাল

০১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:৫৯
মার্কিনিদের বিদায়
বিমানে চেপে আফগান ভূখণ্ড ছেড়ে যাচ্ছেন মার্কিন সেনা সদস্য (ছবি : ইউএস টুডে)

যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র আফগানিস্তানের কাবুল বিমানবন্দর ত্যাগ করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর শেষ বিমানটিও। এর মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটেছে। মার্কিন মিশনের দায়িত্বে থাকা কমান্ডার জেনারেল কেনেথ ম্যাককেনজির বরাতে মার্কিন মিডিয়াতে তথ্যটি জানানো হয়।

জেনারেল ম্যাককেনজি জানিয়েছেন, কাবুলের স্থানীয় সময় ৩০ আগস্ট দিবাগত রাত ১২টার কিছু আগে শেষ মার্কিন সামরিক বিমান সি-১৭ কাবুলের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় ছিল সোমবার বেলা ৩টা ২৯ মিনিট।

জেনারেল ম্যাককেনজি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ৩১ আগস্টের সময়সীমার মধ্যেই আফগানিস্তানের আকাশসীমা ছেড়ে দিয়েছে মার্কিন বাহিনী।

আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক মিশন অবসানের ঘোষণা দিয়ে জেনারেল ম্যাককেনজি বলেন, কাবুল থেকে সব মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সামরিক ব্যবস্থাপনায় আফগানিস্তান থেকে লোকজন সরিয়ে নেওয়ার মার্কিন মিশনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হলেও দেশটিতে কিছু আমেরিকান এখনো আটকে আছেন বলে জানান জেনারেল ম্যাককেনজি। এছাড়া দেশত্যাগ করতে ইচ্ছুক, এমন সব আফগান নাগরিককেও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।

এখন কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে বাকি লোক আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে বলে জানান জেনারেল ম্যাককেনজি। এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। কাবুল ত্যাগ করা শেষ মার্কিন সামরিক বিমানে কতজন আরোহী ছিলেন, সে সম্পর্কেও কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

জেনারেল ম্যাককেনজি মার্কিন সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন যে কাবুলের মাটিতে শেষ পর্যন্ত দাঁড়ানো ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ৮২তম সামরিক এয়ারবর্নের অধিনায়ক জেনারেল ক্রিস্টোফার ডোনাহিউ ও আফগানিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত রস উইলসন। উভয়ই কাবুল ত্যাগ করা শেষ মার্কিন সামরিক বিমানে রয়েছেন।

জেনারেল ম্যাককেনজির বরাতে মার্কিন মিডিয়াগুলো জানায়, শেষ ফ্লাইট পর্যন্ত কাবুল থেকে ১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই লোকজনের মধ্যে মার্কিন সামরিক-বেসামরিক নাগরিক, তৃতীয় দেশের লোকজন ও আফগানরা রয়েছেন।

২০০ মার্কিনিকে কাবুলে ফেলে গেছে যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে জানানো হয়, সোমবার মার্কিন সামরিক বাহিনী চূড়ান্তভাবে আফগান ভূখণ্ড ছাড়লেও কাবুলে প্রায় ২০০ মার্কিন নাগরিককে ফেলে রেখে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে দেশ ছাড়তে ইচ্ছুক হাজার হাজার আফগান নাগরিককেও ফেলে রেখে গেছে দেশটি। কাবুল ছাড়ার জন্য তাদেরকে এখন তালেবানের অনুমতির ওপর নির্ভর করতে হবে বলেও জানিয়েছে এপি।

আরও পড়ুন : যেভাবে শেষ সৈন্যটি কাবুল ছাড়ল

এ দিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্তভাবে আফগানিস্তান ছাড়লেও দেশটিতে থাকা মার্কিন নাগরিক ও আফগানদের বের করে আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাবে ওয়াশিংটন। এছাড়া কাবুল বিমানবন্দর ফের চালু হলে বিমানের মাধ্যমে বা স্থলপথে তাদেরকে বের করে আনতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবেশীদের সঙ্গে কাজ করবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, কাবুলের মার্কিন কূটনৈতিক মিশন স্থগিত করে দোহায় নিয়ে যাওয়া হলেও, আমেরিকান নাগরিক এবং যে আফগানদের যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট রয়েছে, তারা চাইলে তাদের আফগানিস্তান ছাড়তে সহায়তা করা হবে।

ওয়াশিংটনে তিনি বলেন, এটি ছিল ব্যাপক সামরিক, কূটনৈতিক এবং মানবিক কর্মযজ্ঞ এবং যা যুক্তরাষ্ট্র অনেক চ্যালেঞ্জের সাথে বাস্তবায়ন করেছে। তার ভাষায়, ‘নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো। সামরিক মিশন সমাপ্ত হয়ে নতুন এক কূটনৈতিক মিশন শুরু হলো।’

যদিও ব্লিংকেন এটিও বলেছেন যে, তালেবানকে বৈধতা অর্জন করতে হবে। সেই সঙ্গে তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে কি না এবং নাগরিকদের ভ্রমণে স্বাধীনতা দেওয়া, নারীদের অধিকার রক্ষা এবং সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে দমন করছে কি-না এসব বিষয় বিশ্ববাসীর নজরে থাকবে।

যুদ্ধাস্ত্র নষ্ট করে গেল মার্কিন সেনারা

আফগানিস্তান ত্যাগের আগেই নিজেদের সামরিক বিমান, সাঁজোয়া যানবাহনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম পুরোপুরি নষ্ট করে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সোমবার স্থানীয় সময় গভীর রাতে কাবুল বিমানবন্দর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শেষ ফ্লাইটটি ছাড়ার আগেই সবকিছু নিষ্ক্রিয় করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সৈন্যরা।

মার্কিন মিশনের দায়িত্বে থাকা কমান্ডার জেনারেল কেনেথ ম্যাককেনজি জানিয়েছেন, এবার ৭৩টি সামরিক বিমান, ৭০টি সাঁজোয়া যান এবং আরও ২৭টি সামরিক সরঞ্জাম নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। যেন পরবর্তীকালে তালেবান বাহিনী এগুলো আর ব্যবহার করতে না পারে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের ফেলে যাওয়া এই সামরিক বিমানগুলো আর কখনওই আকাশে উড়তে পারবে না। এগুলো আর কেউ চালাতেও পারবে না।

মার্কিন মিডিয়া লস অ্যাঞ্জেলস টাইমসের পোস্ট করা একটি ভিডিয়োতে দেখা যায়, তালেবান সদস্যরা কাবুল বিমানবন্দরের ভেতরে প্রবেশ করেই মার্কিন সামরিক বিমান এবং অন্যান্য জিনিসপত্র পরীক্ষা করে দেখছেন। এবার যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের উচ্চ প্রযুক্তি সম্পন্ন রকেট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও নিষ্ক্রিয় করে গেছে। মূলত এর কিছুই তারা নিজেদের সঙ্গে করে নিয়ে যায়নি।

আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর অনেক আধুনিক যুদ্ধসরঞ্জাম এরই মধ্যে তালেবানের হাতে চলে গেছে। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। এমনকি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ নিয়ে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পদত্যাগও দাবি করেছেন।

কাবুল বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিল তালেবান

যুক্তরাষ্ট্রের শেষ ফ্লাইট কাবুল ত্যাগের পরপরই আফগানিস্তানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে তালেবান। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, আফগানিস্তান এখন থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র। বিবৃতিতে দীর্ঘ ২০ বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর আফগানিস্তান ত্যাগের ঘটনাটিকে ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন : বিশ্ব জয়ের পথে তুরস্কের ‘অ্যাটাক ড্রোন’

মঙ্গলবার রাজধানী কাবুলে অবস্থিত হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে তালেবান যোদ্ধারা। মূলত এরপরই তাদেরকে জয় উদযাপন করতে দেখা যায়। এ সময় আকাশে গুলি ছুড়ে আনন্দ প্রকাশ করেছেন বাহিনীটির সদস্যরা। এর আগে তালেবান গোটা দেশের নিয়ন্ত্রণ নিলেও কাবুল বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণে ছিল মার্কিন সেনাবাহিনী। কিন্তু অবশেষে সেই বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণও চলে এলো তালেবান যোদ্ধাদের হাতে।

অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিয়োতে তালেবান যোদ্ধাদের বিমানবন্দরের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে তাদের হাঁটতে দেখা গেছে। একই সঙ্গে তারা সেখানে ঠিক কী কী করছেন সেটাও ক্যামেরাবন্দি করা হয়েছে। ভিডিয়োতে এ সময় সেই ব্যক্তিদের পেছনে কয়েকটি বিমান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

এরপর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়- ‘আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা। সকল বিমানই এখানে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা সফলতার সঙ্গে বিমানবন্দরের ভেতরে প্রবেশ করেছি। এখানে কোনো ধরনের সমস্যা নেই। আল্লাহর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।’

তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের প্রতি আমাদের বার্তা হচ্ছে- চিন্তার আর কোনো কারণ নেই। সবকিছুই ভালোভাবে চলছে। মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা।’

আফগান যুদ্ধের প্রেক্ষাপট

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে আল-কায়েদার বাহিনীর আক্রমণের পর আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক বাহিনীর অভিযান শুরু হয়। হামলার মাধ্যমে আফগানিস্তানের তখনকার তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তৎকালীন তালেবান সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালিয়েছিল। পরে আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র।

২০ বছরের আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় আড়াই হাজার সেনা প্রাণ হারান। আহত ২০ হাজারের বেশি। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার কাবুল ত্যাগ করার প্রাক্কালে জঙ্গি হামলায় ১৩ মার্কিন সেনা নিহত হন। এ ঘটনা আমেরিকানদের বিমর্ষ তোলে।

যুক্তরাষ্ট্র সম্মানজনকভাবে আফগানিস্তান ত্যাগ করতে পারেনি বলে সমালোচনা আছে। আফগানিস্তান ত্যাগ করার আগেই ১৫ আগস্ট দেশটি তালেবানের দখলে চলে যায়। দুই সপ্তাহের বেশি সময় তালেবানের সঙ্গে সমঝোতা করেই মার্কিন বাহিনী কাবুল বিমানবন্দরে অবস্থান করে লোকজনকে নিরাপদে সরিয়ে নিচ্ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম এই যুদ্ধের অবসানের ঘোষণায় যুদ্ধবিরোধী মার্কিন লোকজনের মধ্যে স্বস্তি দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান গণমাধ্যম এই যুদ্ধের ‘অর্জন’ বিশ্লেষণ করছে।

আরও পড়ুন : ‘মার্কিন নেকড়ে আফগান ভূমিতে ধূর্ত শিয়াল হয়েছে’

২০ বছর আগে যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ, সে যুদ্ধের সমাপ্তি টানলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেন। অবশ্য যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে গিয়ে বাইডেন সমালোচিত হচ্ছেন। বিশেষ করে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারার জন্য তাকে দায়ী করা হচ্ছে।

ওডি/কেএইচআর

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড