• মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য নিদর্শনগুলো

  মুজতাবা মাহমুদ নকীব

২০ আগস্ট ২০১৯, ১৪:১০
ছবি
ছবি : রাজু ভাস্কর্য

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকার রমনা এলাকায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বেই এলাকাটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নবাবদের প্রমোদকেন্দ্র হিসেবেও এই এলাকাটি বিখ্যাত ছিল। একাধিক পুরনো স্থাপত্য নিদর্শনও ছিল এই এলাকায়। পরবর্তীতে ইউরোপীয়দের আগমন ও ইংরেজ শাসনের পর কিংবা পাকিস্তান আমলে গড়ে উঠে কিছু স্থাপনা। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নিজস্ব কিছু ভবনও নান্দনিক স্থাপত্যে নির্মিত হয়। কালের আবর্তে এসব পুরনো স্থাপনা দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসম্পদে পরিণত হয়েছে। এগুলোর কোনোটি ধর্মীয়, কোনোটি প্রশাসনিক, কোনোটি রাজনৈতিক কিংবা কোনোটি সমাধিসৌধ। চলুন, চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক এসব স্থাপত্য নিদর্শনের ওপর।

গ্রিক মনুমেন্ট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের চত্বরে অবস্থিত এই গ্রিক স্মৃতি সৌধটি সেইন্ট টমাস গির্জার যাজক জে এম ম্যাকডোনাল্ডের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল।

মোঘল আমলে যখন সম্পদে, শিল্পে এবং সৌন্দর্য্যে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল এই ‘শহর ঢাকা’ তখন এশিয়া-ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বহু মানুষ নদীতে নৌকা ভাসিয়ে এসে নামতেন এই সবুজ-কোমল পলি মাটির শহরে। ইতিহাসবিদদের মতে গ্রিকরা ঢাকায় এসেছিল ইউরোপিয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচেয়ে পরে।

গ্রিকছবি : গ্রিক মনুমেন্ট

১৭৭০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে ঢাকায় দুই শতাধিক গ্রিক বসবাস করতেন। তারা বিশেষত কাপড়, পাট, লবণ ও চুনের ব্যবসা করতেন। ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি তারা এদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু এখানকার আবহাওয়ায় গ্রিকরা বেশি দিন বাঁচত না।

১৮৪০ সাল পর্যন্ত ঢাকায় ১২টি গ্রিক পরিবার ছিল। তাদের একটি গির্জা ছিল বলেও জানা যায়। মুনতাসীর মামুন কর্নেল ডেভিডসন যখন ঢাকায় বইতে উল্লেখ করেছেন, কর্নেল ডেভিডসন ১৮৪০ সালে ঢাকা সফরের সময় গির্জাটি পরিদর্শন করেন। তাঁর ভ্রমণকাহিনীতেই ঢাকায় গ্রিকদের গির্জাটির উল্লেখ পাওয়া যায়।

টিএসসিতে অবস্থিত হলুদ রঙের চার দেয়ালের ঘরটি আসলে একটি গ্রিক পরিবারের ৯ সদস্যদের মৃত্যু স্মৃতিকে ধরে রাখতে নির্মিত সমাধিসৌধ। আনুমানিক ১৮০০-১৮৪০ সালের মধ্যে এটি তৈরি করা হয়েছিল। বর্গাকার এবং সমতল ছাদ-যুক্ত এ স্থাপনায় প্রাচীন গ্রিসের ডরিক রীতি অনুসরণ করা হয়েছিল। চার কোণের দেয়াল কিছুটা প্রক্ষিপ্ত এবং পূর্ব দিকে এক মাত্র প্রবেশদ্বারটি অবস্থিত।

ভবনটির প্রবেশদ্বারের ওপরে একটি মার্বেল ফলক, যেখানে গ্রিক ভাষায় লেখা: ‘যাদের তুমি (ঈশ্বর) বেছে নিয়েছ এবং সঙ্গে নিয়েছ, তারা ভাগ্যবান’। সৌধের দেয়ালে ৯টি কালো পাথরের লিপি রয়েছে যার ৫টিতে প্রাচীন গ্রিক ভাষা এবং বাকি ৪টিতে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।

সবচেয়ে পুরনো পাথরটি সুলতানা আলেকজান্ডারের, যিনি ১৮০০ সালে মারা গিয়েছিলেন। ঘড়ির কাটার দিকদিয়ে প্রথম এপিটাফ টি সুলতানা আলেকজান্ডারের, ২য় টি থিয়োডোসিয়ার, ৩য়টি মাদালিয়েন এবং সোহিয়া জর্দানের এবং ৪র্থ এপিটাফটি নিকোলাস ডিমেট্রাস এলিস স্মরণে লেখা। এই সমাধিটি সর্বশেষ সংস্কার কারা হয়েছিল ১৯৯৭ সালে গ্রিক হাই কমিশনারের অর্থায়নে।

কালের আবর্তে গ্রিকরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রিক সমাধিসৌধটি এখনো তাদের স্মৃতি বহন করছে।

মধুর ক্যান্টিন
 
‘মধুর রেস্তোরাঁ’ সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের পশ্চিম পাশে অবস্থিত একটি রেস্তোরাঁ। এটি ‘মধুর ক্যান্টিন’ নামে অধিক পরিচিত। রেস্তোরাঁর পরিচালক প্রয়াত মধুসূদন দে'র স্মৃতি স্মরণে স্থাপিত একটি বিখ্যাত রেস্তোরাঁ। ১৩৭৯ বঙ্গাব্দের ২০শে বৈশাখ ক্যান্টিনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনীতি, সংস্কৃতি চর্চা এবং আড্ডার জন্য মধুর ক্যান্টিনের আলাদা খ্যাতি রয়েছে। ক্যান্টিনটির সামনেই মধু’র একটি ভাস্কর্য রয়েছে।

মধুর ক্যান্টিন

ছবি : মধুর ক্যান্টিন

জনশ্রুতি আছে, মধুর ক্যান্টিন ছিল বাগানবাড়ির নাচঘর। তবে হাকিম হাবিবুর রহমানের মতে, এটি ছিল বাগানবাড়ির দরবার কক্ষ। এখানেই ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলিম লীগ। আহসানউল্লাহ ঢাকার নবাব ছিলেন ১৮৪৬ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত। ঢাকা শহরে বিস্তৃত তার তিনটি বাগান ছিল। এর মধ্যে একটি শাহবাগে অবস্থিত ছিল। শাহবাগের বাগানবাড়ির নাচঘরটিই বর্তমান মধুর ক্যান্টিন বলে ধারণা করা হয়। অন্য মত অনুযায়ী, সেই বাগানবাড়িতে মার্বেল পাথরের তৈরি একটি গোলাকার বৈঠকখানা ছিল। এই বৈঠকখানাটিই বর্তমানে মধুর ক্যান্টিন নামে পরিচিত।

শহীদুল্লাহ হল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী হল। প্রথমে এই হলের নাম ছিল ঢাকা হল। ১৯৬৯ সালে এশিয়ার বিখ্যাত পণ্ডিত, জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্'র নামানুসারে এই হলের নাম করণ করা হয় শহীদুল্লাহ্‌ হল। পরে ১৭ জুন, ২০১৭ তারিখে এই হলের নাম ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হল করা হয়। এ হলে মোট ছয়টি ভবন রয়েছে। একটি তিন তলা অভিজাত মূল ভবন, যেটি কার্জন হলের নকশার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়াও ৫ তলা বিশিষ্ট দু’টি বর্ধিত ভবন রয়েছে।

শহিদুল্লা হল

ছবি : শহীদুল্লাহ হল

শহীদুল্লাহ হল এলাকার পূর্বের নাম ছিল বাগ-এ-মুসা খাঁ। এটি বারো ভূইয়াঁর অন্যতম ভূইয়াঁ ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খাঁয়ের নামে নামাঙ্করণ করা হয়। মুসা খাঁ সুবেদার ইসলাম খাঁয়ের নিকট যুদ্ধে হেরে যাবার পর যুদ্ধাবন্দি হিসেবে আটক ছিল। তবে সুবেদার ইসলাম খাঁ তার প্রতি বেশ সহৃদয় ছিল। হাকিম হাবিবুর রহমানের মতে, এটি একটি বাগান ছিল যা 'মুসলিম বাগান' হিসেবেও বিখ্যাত ছিল। সেই সময়ের নিদর্শন হিসেবে রয়েছে মুসা খাঁয়ের মসজিদ, এবং সমাধি।

মুসা খাঁর মসজিদ

মুসা খানের মসজিদ বা মুসা খাঁর মসজিদ বাংলাদেশের ঢাকা শহরে অবস্থিত ছায়া সুনিবিড়, মোগল স্থাপত্যের অনুকরণে নির্মিত মসজিদ। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর শহীদুল্লাহ হল ছাত্রাবাসের নিকটে ও কার্জন হলের পিছনে অবস্থিত। ধারণা করা হয় যে, এই মসজিদটি ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খান নির্মাণ করেন। ঢাকা শহরে বিনত বিবির মসজিদ এর পাশাপাশি এটি প্রাক-মুঘল স্থাপত্য নিদর্শন।

ইতিহাসবিদ আহমদ হাসান দানীর ‘ঢাকা : অ্যা রেকর্ড অব ইটস চেঞ্জিং ফরচুনস’ গ্রন্থে উল্লেখিত বর্ণনা মতে, মসজিদটি মুসা খাঁর নামে হলেও স্থাপত্যশৈলী অনুযায়ী এটি শায়েস্তা খাঁর আমলে বা তারপরে নির্মিত হয়েছিল।

মুসা খাঁ

ছবি : মুসা খাঁর মসজিদ

জনশ্রুতি অনুযায়ী বলা হয় যে, মসজিদটি বারো ভূঁইয়া প্রধান ঈসা খান এর পুত্র মুসা খান (মৃত্যু ১৬২৩ খ্রি) নির্মাণ করেন কিন্তু ইমারতের স্থাপত্যিক রীতি ঐতিহ্যগত ধারণাকে সঠিক বলে গ্রহণ করে না। মসজিদটির খোপ নকশাকৃত সম্মুখ ভাগ, গম্বুজের নিচে উন্মুক্ত প্রবেশপথ, অষ্টকোণাকার পিপার ওপর স্কন্দাকৃতির গম্বুজ এবং অতিরিক্ত মিনারসহ কোণার বুরুজগুলি তথাকথিত মুসা খান মসজিদটিকে নিকটবর্তী  খাজা শাহবাজ খান মসজিদ এর (১৬৭৯ খ্রি) সাথে প্রায় সাদৃশ্যপূর্ণ বলে প্রতীয়মান করে। এ কারণে মসজিদটির নির্মাণকাল ঐ একই সময়ের ধরা যেতে পারে। এ.এইচ দানী মনে করেন যে, এটি শায়েস্তা খান এর আমলে নির্মিত অথবা পরবর্তী সময়ে মুসা খানের পৌত্র মুনওয়ার খানের তৈরি এবং নির্মাতা তার পিতামহের স্মরণে মুসা খানের নাম অনুযায়ী এর নামকরণ হয়।

চক মসজিদ (১৬৭৬) ও ঢাকার অন্য আরও কয়েকটি মসজিদের মতো মুসা খান মসজিদটিও একটি উঁচু মেঝের ওপর নির্মিত, যার নিম্নদেশে খিলানছাদ বিশিষ্ট কয়েক সারি কক্ষ রয়েছে। এ কক্ষগুলোর দেওয়ালেও বুকশেলভ আছে। এ বিশেষ বৈশিষ্ট্য থেকে অনুমান করা যায় যে, এটি অবশ্যই ‘মাদ্রাসা মসজিদ’ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল।

শিবমন্দির

টিএসসির ভেতরে সুইমিংপুলের কাছে রয়েছে পুরনো মঠসদৃশ শিবমন্দির ও সমাধিসৌধ।

ঢাবি শিব

ছবি :শিবমন্দির

এই স্থাপনাগুলো ছিল টিএসসি’র লাগোয়া বর্তমান শিববাড়ির চৌহদ্দির ভেতরে। এই দুই শিব মন্দিরের এক লাইনেই আছে খুব সুন্দর ছোট্ট এক সমাধিসৌধ। ভিতের সমুখের শ্বেত পাথরের স্ল্যাবে উৎকীর্ণ আছে–
Late Sudhangsu Bhushon Bose
ASST REGISTRAR SENIOR BENCH CLERK
SECRETARY TO THE HONBLE CHIEF JUSTICE
HIGH COURT CALCUTTA
BORN 25 FEB 1876 DIED 14 MAY 1940

ফজলুল হক মুসলিম হল

অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হকের নামানুসারে হলের নামকরণ করা হয় ফজলুল হক হল। ১৯৪০ সালের ১ জুলাই ৩৬৩ জন ছাত্র নিয়ে শুরু হয় এই হলের যাত্রা। মূল ভবনের পাশাপাশি এর একটি বর্ধিত ভবন রয়েছে যা দক্ষিণ ভবন নামে পরিচিত। মোগল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হয়েছে এই ছাত্রাবাস।

ফজলুল হক

ছবি : ফজলুল হক মুসলিম হল

দেশ ভাগের পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের অনাবাসিক ছাত্র ছিলেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্র ছিল ফজলুল হক মুসলিম হল। এই হলের পুকুর পাড়ে আড্ডা দিয়েছেন এবং রাজনৈতিক সভা করেছেন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ফজলুল হক মুসলিম হল মিলনায়তনে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠিত হয় এবং সংগঠনের আলোচিত নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু উঠে আসেন। একই বছরের ২ মার্চ এই হলে আয়োজিত এক সভায় শেখ মুজিবুর রহমানের প্রস্তাবে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে ১১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত ওই সভা থেকেই আসে।

খাজা শাহবাজের মসজিদ

মোগল শাসনামলে শাহজাদা আযমের সময়কালে ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদ নির্মিত হয়। মসজিদটি হাইকোর্টের পিছনে এবং তিন নেতার মাজার এর পূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত। এর চত্বরে হাজী শাহবাজের সমাধি অবস্থিত। দৈর্ঘ্যে মসজিদটি ৬৮ ফুট ও প্রস্থে ২৬ ফুট। এতে তিনটি গম্বুজ রয়েছে।

খাজা

ছবি : খাজা শাহবাজের মসজিদ

ঐতিহাসিক মুনতাসীর মামুনের মতানুসারে, হাজী শাহবাজ ছিলেন একজন অভিজাত ধনী ব্যবসায়ী, যিনি কাশ্মীর হতে সুবা বাংলায় এসে টঙ্গী এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। ১৬৭৯ সালে তিনি জীবিত থাকাকালেই এই মসজিদ ও নিজের মাজার নির্মাণ করেন। তৎকালে সুবাহদার ছিলেন শাহজাদা মুহম্মদ আযম।

মসজিদ ভবনটির স্থাপত্যে উত্তর ভারতীয় মোগল-রীতি লক্ষ্য করা যায়।

সলিমুল্লাহ মুসলিম হল

১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত হয়েছিল তিনটি হল (ঢাকা হল, জগন্নাথ হল ও মুসলিম হল)। পরবর্তী সময়ে ঢাকা হলের নাম হয় শহীদুল্লাহ হল এবং মুসলিম হলের নাম রাখা হয় সলিমুল্লাহ মুসলিম হল। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম হল। হলের প্রথম প্রভোস্ট ছিলেন স্যার এ এফ রহমান।

মুসলিম

ছবি : সলিমুল্লাহ মুসলিম হল

১৯২৯ সালের ২২ আগস্ট বাংলার তৎকালীন গভর্নর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য স্যার ফ্রান্সিস স্ট্যানলি জ্যাকসন ঢাকার প্রয়াত নবাব বাহাদুর স্যার সলিমুল্লাহর নামানুসারে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৩১ সালের ১১ আগস্ট ভবনটি উদ্বোধন করা হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভবন

১৯০৪ সালে নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের সচিবালয় হিসেবে ভবনটি স্থাপিত হয়। নতুন প্রদেশের স্বল্পস্থায়ী মেয়াদে এটি সচিবালয় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

মেডিকেল

ছবি : ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভবন

১৯২১ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার যাত্রা শুরু করে, ভবনটির কর্তৃত্ব পায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেই সময় বিশাল এই ভবনের একপাশে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার, একাংশে ছিল ছাত্রদের ডরমেটরি এবং বাকি অংশ কলা অনুষদের প্রশাসনিক শাখা হিসেবে ব্যবহৃত হত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তখন পুরো ভবনটিতেই স্থাপিত হয় ‘আমেরিকান বেস হাসপাতাল’। তবে যুদ্ধ শেষে মার্কিনীরা চলে গেলেও ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটি থেকে যায়। পরবর্তীতে এটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের নিকট হস্তান্তর করা হয়।

তিন নেতার মাজার

তিন নেতার মাজার - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দোয়েল চত্বরের উত্তর পাশে অবস্থিত, স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলার তিন বিখ্যাত রাজনৈতিক নেতা - হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমুদ্দিন ও শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হক এর কবরের ওপর নির্মিত ঢাকার অন্যতম স্থাপত্য নিদর্শন।

তিন নেতার মাজার

ছবি : তিন নেতার মাজার

১৯৬৩ সালে স্থপতি মাসুদ আহমেদ এবং এস এ জহিরুদ্দিন প্রখ্যাত তিন নেতার স্মরণে এটি নির্মাণ করেন। এটি মূলত স্থাপত্যিক ভাস্কর্য।

কার্জন হল

ফেব্রুয়ারি ১৯, ১৯০৪ সালে ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় ও গভর্নর জেনারেল জর্জ কার্জন এই ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বঙ্গভঙ্গ ঘোষিত হওয়ার পর প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে গড়ে তোলার জন্য রমনা এলাকার যেসব ইমারতের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় কার্জন হল তার মধ্যে অন্যতম। দানী লিখেছেন, ‘কার্জন হল নির্মিত হয়েছিল টাউন হল হিসেবে’।

কার্জন হল

ছবি : কার্জন হল

কিন্তু শরীফউদ্দীন আহমদ এক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন এ ধারণাটি ভুল। এটি নির্মিত হয় ঢাকা কলেজের পাঠাগার হিসেবে। এবং নির্মাণের জন্য অর্থ প্রদান করেন ভাওয়ালের রাজকুমার। ১৯০৪ সালের ঢাকা প্রকাশ লিখেছিল, ‘ঢাকা কলেজ নিমতলীতে স্থানান্তরিত হইবে। এই কলেজের সংশ্রবে একটি পাঠাগার নির্মাণের জন্য সুযোগ্য প্রিন্সিপাল ডাক্তার রায় মহাশয় যত্নবান ছিলেন। বড়লাট বাহাদুরের আগমন উপলক্ষে ভাওয়ালের রাজকুমারগণ এ অঞ্চলে লর্ড কার্জন বাহাদুরের নাম চিরস্মরণীয় করিবার নিমিত্তে 'কার্জন হল' নামে একটি সাধারণ পাঠাগার নির্মাণের জন্য দেড় লক্ষ টাকা দান করিয়াছেন।’ ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে, ঢাকা কলেজের ক্লাস নেয়া হতে থাকে কার্জন হলে। পরবর্তী সময়ে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে কার্জন হল অন্তর্ভুক্ত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের জন্য, যা আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।

মীর জুমলার গেট

মীর জুমলার গেট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার একটি ঐতিহাসিক মোগল স্থাপনা। এই গেটটি ঢাকা গেট, ময়মনসিংহ গেট নামেও পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কার্জন হল ছাড়িয়ে দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমি যেতে চোখে পড়ে হলুদ রঙের মীর জুমলার তোরণ। এ গেটের তিনটি অংশের একটি রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবায়নযোগ্য শক্তি গবেষণা কেন্দ্রের দিকে, মাঝখানের অংশ পড়েছে রোড ডিভাইডারের মাঝে এবং অপর অংশটি রয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে তিন নেতার মাজারের পাশে।

মোগল আমলে বুড়িগঙ্গা নদী হয়ে ঢাকায় প্রবেশ করতে ব্যবহার করা হতো এ তোরণ। সেই সময় এর নাম ছিল 'মীর জুমলার গেট'। পরে কখনো 'ময়মনসিংহ গেট', কখনো ‘ঢাকা গেট’ এবং অনেক পরে নামকরণ করা হয় ‘রমনা গেট’। এ গেট রমনায় প্রবেশ করার জন্য ব্যবহার করা হতো বলে পরে সাধারণ মানুষের কাছে এটি রমনা গেট নামেই পরিচিতি পায়। তবে বাংলাদেশ সরকারের গেজেট অনুসারে এ তোরণ এবং আশপাশের জায়গার নাম দেওয়া হয়েছে ‘মীর জুমলার গেট’।

জুবলি গেট

ছবি : মীর জুমলার গেট

তোরণের স্তম্ভগুলো পরীক্ষা করেন এ. এইচ. দানী। তার মতে, এগুলো মোগল আমলে তৈরি হয়নি। কারণ স্তম্ভ দুটির গড়ন ইউরোপীয় ধাঁচে মূল শহরের সঙ্গে রেসকোর্সকে যুক্ত করার জন্য রেসকোর্সের উত্তর-পূর্ব দিকে একটি রাস্তা তৈরি করেন তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডস। এ রাস্তার প্রবেশমুখে ডস এ দুটি স্তম্ভ তৈরি করেন। যা এখনো অটুট রয়েছে। বর্তমান নজরুল এভিনিউর রাস্তাটিও ডস তৈরি করেন। 'বাগে বাদশাহী' নামে মোগল উদ্যানটি ইসলাম খাঁর আমলে ছিল রমনা অঞ্চলে (যেটি বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও পুরনো হাইকোর্ট ভবন)। হাইকোর্ট ভবনের পূর্ব কোণে একই ধরনের দুটি স্তম্ভবিশিষ্ট প্রবেশপথ ছিল। মূলত সে সময় এ স্তম্ভের মধ্য দিয়ে হাতির চলাচল ছিল।

বর্ধমান হাউজ

মোগল ও ইউরোপীয় শৈলীর সংমিশ্রণে তৈরি ঢাকার ঔপনিবেশিক আমলের একটি বিখ্যাত স্থাপনা বর্ধমান হাউস। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বহু মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনার সঙ্গে বর্ধমান হাউসের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই বর্ধমান হাউসের একটি পুরোনো ছবিও পাওয়া গেল বাংলা একাডেমির কাছ থেকে। ব্রিটিশ আমলে শাহবাগে ঢাকার নবাবদের যত স্থাপনা ছিল, সুজাতপুর প্যালেস তার একটি। এটিই পরে বর্ধমান হাউস হয় বলে কথিত আছে। ইতিহাসবিদ শরীফ উদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত ঢাকা কোষ-এ বলা হয়েছে, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর এই ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসন পরিষদের তিন সদস্যের একজন অবিভক্ত বাংলার বর্ধমানের মহারাজা স্যার বিজয় চাঁদ মাহতাব ১৯১৯ থেকে ১৯২৪ পর্যন্ত সময়ে কিছুকাল এই বাড়িতে থাকতেন বলে এর নাম হয় বর্ধমান হাউস। বিভিন্ন সময়ে সংস্কারের কারণে বর্ধমান হাউস তার আদিরূপ কিছুটা হারিয়েছে। ১৯৬২ সালে সংস্কারের সময় এটি তৃতীয় তলা করা হয়। বর্ধমান হাউসের নিচতলার দক্ষিণ দিকের একটি কক্ষ মূল্যবান কাঠ দ্বারা আচ্ছাদিত। জনশ্রুতি আছে, এটি নাচঘর ছিল।

বর্ধমান হাউজ

ছবি : বর্ধমান হাউজ

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাসভবন হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান ‘বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি দিন’ শিরোনামে একটি নিবন্ধে লিখেছেন, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার ও কাজী মোতাহার হোসেন এই ভবনে বসবাস করেছেন। এ দুই প্রখ্যাত শিক্ষাবিদের আতিথ্য গ্রহণ করেছেন বাংলার দুই মহান সাহিত্যস্রষ্টা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এর মধ্যে ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন দ্বিতীয়বার ঢাকায় আসেন, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি হিসেবে বর্ধমান হাউসে কয়েক দিন অবস্থান করেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর বর্ধমান হাউস পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়। যুক্তফ্রন্টের প্রস্তাবিত ২১ দফার একটি ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বর্ধমান হাউসে থাকবেন না। এখানে বাংলা ভাষার গবেষণাগার করতে হবে। এরপর ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর এখানে বাংলা একাডেমি উদ্বোধন করা হয়। বর্তমানে এই ভবনে বাংলা একাডেমির একুশে সংগ্রহশালা, পাঠাগার, ফোকলোর বিভাগসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারিতে বর্ধমান হাউসের চারটি কক্ষে স্থাপিত হয় ভাষা আন্দোলন জাদুঘর।

উপাচার্য ভবন

বঙ্গভঙ্গের পর ‘পুর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ’ এর লেফটেন্যান্ট গভর্নর এর বাসভবন হিসেবে গথিক স্থাপত্যকলায় নির্মিত হয় ভবনটি। নির্মাণ শেষ না হতেই বঙ্গভঙ্গ রদের রব উঠে। স্থপতি এর কাজ শেষ করতে দ্বন্দ্বে ছিলেন।

িউপযার্য

ছবি : উপাচার্য ভবন

আর এটি লে. গভ. বেইলির পছন্দও হয়নি। তাই বঙ্গভঙ্গের পর এই ভবনকে প্রশাসনিক দপ্তর হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ১৯২১ সালে এটিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট হস্তান্তর করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এই বাড়িতে বসবাস করে থাকেন।

গুরুদুয়ারা নানকশাহী

ঢাকার গুরুদুয়ারা নানকশাহী বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে অবস্থিত একটি শিখ ধর্মের উপাসনালয়। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ক্যাম্পাসের কলাভবনের পাশে অবস্থিত। এই গুরুদুয়ারাটি বাংলাদেশে অবস্থিত ৯ থেকে ১০টি গুরুদুয়ারার মধ্যে বৃহত্তম।

কথিত আছে যে, ঢাকার এই গুরুদুয়ারাটি যেখানে অবস্থিত, সেই স্থানে ষোড়শ শতকে শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক অল্প সময়ের জন্য অবস্থান করেছিলেন। এই স্থানে থাকা কালে তিনি শিখ ধর্মের একেশ্বরবাদ এবং ভ্রাতৃত্ববোধের কথা প্রচার করেন, এবং ধর্মের আচার অনুষ্ঠান পালনের শিক্ষা প্রদান করেন।

গুরুদুয়ারা নানকশাহী

ছবি : গুরুদুয়ারা নানকশাহী

শিখ ধর্মের ৬ষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ সিং-এর সময়কালে (১৫৯৫-১৬৪৪ খ্রি.) ভাইনাথ (মতান্তরে আলমাস্ত) নামের জনৈক শিখ ধর্ম প্রচারক এই স্থানে আগমন করে গুরুদুয়ারাটি নির্মাণের কাজ শুরু করেন। কারও কারও মতে, গুরুদুয়ারাটি নির্মাণের কাজ শুরু হয় ৯ম শিখ গুরু তেগ বাহাদুর সিং-এর সময়কালে (১৬২১-১৬৭৫ খ্রি.)। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে এর নির্মাণকার্য সমাপ্ত হয়। পরবর্তীতে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি ভগ্নদশা প্রাপ্ত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ১৯৭২ সালে গুরুদুয়ারাটির ভবনের কিছু সংস্কার করা হয়। ১৯৮৮-৮৯ সালে এটির ব্যাপক সংস্কার সাধন করা হয়, এবং বাইরের বারান্দা ও সংলগ্ন স্থাপনা যোগ করা হয়। সংস্কার কার্যের অর্থায়ন করা হয় বাংলাদেশে ও বিদেশে অবস্থানরত শিখ ধর্মাবলম্বীদের দানের মাধ্যমে। ঢাকার আন্তর্জাতিক পাট সংস্থার তদানিন্তন প্রধান সর্দার হরবংশ সিং-এর নির্মাণকার্য তদারকি করেন। দর্শনার্থীদের নানা কৌতুহল জাগায় এই উপাসনালয়।

তথ্যসূত্র:

১. উইকিপিডিয়া
২. বাংলাপিডিয়া
৩. সাদিয়া নাসরিন-এর নিবন্ধ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড